সে দিন আমাদের ‘রজনী ধাম’ আলোকিত হয়ে উঠেছিল। সে এক অলৌকিক আলো। সেই আলো উত্তমকুমারের আলো। তিনি সেদিন আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন। পরনে পাজামা, পাঞ্জাবি। পাঞ্জাবির ওপরে একটা নেভি ব্লু রঙের জহর কোট, যেন উত্তমকুমার পরবেন বলেই ওটা তৈরি হয়েছে।
সেদিন ছিল সরস্বতী পুজো। ১৯৭৫ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি। আমাদের বাড়িতে ভাইফোঁটা আর সরস্বতী পুজো ছিল সবচেয়ে বড় দুই উৎসবের দিন। যৌথ পরিবারে সে এক একান্নবর্তী আনন্দের দিন। সরস্বতী পুজোর দিন সকাল থেকেই বাড়িতে উৎসব।
সেই সরস্বতী পুজোর দিনে উত্তমকুমার এলেন আমাদের বাড়িতে। আমাদের পুষ্পাঞ্জলি শেষ হতে না হতেই সকাল দশটা নাগাদ আমাদের বাড়িতে এলেন। সরস্বতী ঠাকুরের দিনে যেন আর এক দেবতার আগমন ঘটল রজনী ধামে।
হ্যাঁ, যে বাড়িতে আমরা থাকতাম, তার নাম রজনী ধাম। বাড়ির বাইরে শ্বেতপাথরের ফলকে লেখা থাকত বাড়ির নাম। নীচের এক টুকরো উঠোন পেরিয়ে আমাদের ঘর–দুয়ার। আমরা থাকতাম নীচের তলায়।
আমাদের বাড়িটা ছিল হাজরা রোডের ঠিকানায়। হাজরা রোড আর ল্যান্সডাউন তথা শরৎ বোস রোডের ক্রসিংয়ের কাছেই আমাদের বাড়ি।
উত্তমকুমার সম্পর্কে অনেক কিছুই তখন আমাদের জানা। তাঁর সঙ্গে স্টুডিয়োতে দেখা হয়েছে তার আগে। কিন্তু তিনি যে আমাদের বাড়িতে আসতে চাইবেন, সেটা তখনও ভাবিনি।
মধ্যমণি: পার্থ মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে তাঁর ভাই বোন ভাইপোদের মাঝে মহানায়ক।
তখন আমি ক্লাস টেন–এ পড়ি। রমেশ মিত্র স্কুল। পরে জেনেছি, এই স্কুলের ছাত্রী ছিলেন গৌরীদেবী। বিয়ের আগে, প্রেমপর্বে গৌরীকে এক চিলতে দেখতে পাওয়ার আশায় রমেশ মিত্র স্কুলের একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকতেন অরুণকুমার চট্টোপাধ্যায় নামের এক যুবক। যিনি গৌরীর গানের শিক্ষকও ছিলেন। উত্তমকুমার হতে তখনও তাঁর অনেক দেরি। কারণ, সিনেমার জগতে তখনও প্রবেশ ঘটেনি অরুণের। গৌরী–উত্তম পরিণয়ও তখন অনেক দূরে। কারণ, তখনও পোর্ট কমিশনার্সের চাকরিটা পাননি উত্তমকুমার।
রমেশ মিত্র স্কুলের কথাটা মনে পড়ে গেল। কারণ, উত্তমকুমার একবার জিজ্ঞেস করলেন, কোন্ স্কুল তোমার? উত্তর দিয়ে ছিলাম ‘রমেশ মিত্র’। কিন্তু তখনও জানতাম না, গৌরীদেবীও এক সময় এই স্কুলের ছাত্রী ছিলেন।
কিন্তু, উত্তমকুমার নিশ্চয়ই রমেশ মিত্র স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্রী শর্মিতা মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে গল্প করার জন্য ‘রজনী ধাম’–এ আসেননি। হ্যাঁ, তখনও তো মুখোপাধ্যায় ছিলাম। পরবর্তী কালে চট্টোপাধ্যায় হয়েছি, এই পদবির একজন মানুষকে বিয়ে করেছি বলে। কী অদ্ভুত নিয়ম আমাদের সমাজের! আমর বর তো পদবি বদলে মুখোপাধ্যায় হতে পারত বিয়ের পর। হয়নি। সে অন্য প্রসঙ্গ।
তবে, চট্টোপাধ্যায় উত্তমকুমারেরও পদবি, এটা একটা সান্ত্বনা হতে পারে।
আমার দাদা (রাঙাদা) হলেন পার্থ মুখোপাধ্যায়। তপন সিংহের ‘অতিথি’ সিনেমার ‘তারাপদ’ হয়ে অল্পবয়সেই বিখ্যাত হয়ে যান রাঙাদা। তার পর তরুণ মজুমদারের ‘বালিকা বধূ’র নায়ক হিসেবে রাঙাদার খ্যাতি আরও বাড়ে। বাড়িতে তখন রাশি রাশি ফ্যান লেটার আসে তাঁর নামে। তখন তো এসএমএস, ওয়টস্যাপ এসে জগৎ ভরে দেয়নি। সেলফি তো দূর অস্ত। ফলে চিঠিই ছিল ভরসা। ফ্যানরা প্রচুর চিঠি লিখতেন। কী ভাবে তাঁরা ঠিকানা পেতেন, সেটা তখন খুব রহস্যময় লাগত। নিশ্চয়ই সেই সময়ের সিনেমা-ম্যাগাজ়িনে তারকাদের ঠিকানা ছাপা হত।
‘অতিথি’ ছবিতে অভিনয় করে সেরা শিশু অভিনেতার জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন রাঙাদা। ইন্দিরা গান্ধীর হাত থেকে পুরস্কার নিচ্ছেন, সেই ছবিটা আমাদের বসার ঘরে বাঁধানো ছিল। উত্তমকুমার ছবিটা দেখে বলেছিলেন, প্রথম সিনেমাতেই বাজিমাত করেছে পার্থ।
‘অতিথি’ ছবিকে অনেকেই পার্থ মুখোপাধ্যায়ের প্রথম ছবি বলে লেখেন। কিন্তু তার আগে চিত্ত বসুর ‘মা’ ছবিতে ছোট্ট ছেলের পার্ট করেছিলেন রাঙাদা।
‘অতিথি’ ১৯৬৫ সালের ছবি। ১৯৬৭–তে ‘বালিকা বধূ’। ১৯৭১ সালে উত্তমকুমারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা শুরু রাঙাদার, ‘ধন্যি মেয়ে’ ছবিকে কেন্দ্র করে। এই ছবিতে রাঙাদা করেছিলেন ফুটবল–পাগল উত্তমকুমারের ভাই ‘বগলা’।
অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনায় এই ছবি আলোড়ন তুলেছিল তখন। আজও ‘ধন্যি মেয়ে’র আবেদন ফুরোয়নি। এক দিকে উত্তমকুমার–সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের অনবদ্য জুটি, অন্য দিকে পার্থ মুখোপাধ্যায় আর জয়া ভাদুড়ির রসায়ন। এ ছাড়া তাবড় তাবড় শিল্পী ছিলেন সেই ছবিতে। জহর রায়, রবি ঘোষ তো অতুলনীয়। এই ছবির বেশ কয়েকদিনের আউটডোর হয়েছিল হাওড়ার জগৎবল্লভপুরে। সেখানে চণ্ডীমাতা ফিল্মসের কর্ণধার নারায়ণ সাধুখাঁর বাড়িতেই ছিলেন উত্তমকুমার। রাঙাদাও ওখানে ছিলেন। রাঙাদার কাছে শুনেছি, ওই বাড়িতে উত্তমকুমারের জন্য একটা ঘর বিশেষভাবে যত্ন করে রাখা থাকত। ওই ঘরে অন্য কারও থাকার অনুমতি ছিল না।
‘ধন্যি মেয়ে’ উত্তমকুমারের সঙ্গে রাঙাদার প্রথম ছবি। প্রথম ছবিতেই উত্তমকুমারের সঙ্গে নিবিড় ঘনিষ্ঠতা হয় রাঙাদার। ঠিক ‘বগলা’কে যেমন ভালবাসতেন এই ছবির উত্তমকুমার, বাস্তবেও ক্রমশ সেই ভালবাসা, স্নেহ তাঁর কাছ থেকে পেয়েছেন রাঙাদা। অনেক গল্প শুনেছি ওঁর কাছে।
উত্তমকুমারের খ্যাতি তো তখন আকাশ–ছোঁয়া। ফলে, শুরুতে শ্রদ্ধা ও সম্ভ্রম মেশানো দূরত্বই রাখতেন রাঙাদা। কিন্তু সেই দূরত্বের পাঁচিল ভেঙে দিয়েছিলেন স্বয়ং উত্তমকুমার। এমনকি ‘ধন্যি মেয়ে’র শুটিং শেষ হওয়ার আগেই পার্থকে ‘তুই’ বলা শুরু করেছিলেন। রাঙাদাকে একদিন বলেছিলেন, “তুই আমাকে ‘আপনি’ ‘আপনি’ করিস কেন? নিজের দাদাকে কেউ ‘আপনি’ বলে?”
ফলে, রাঙাদাও তাঁকে ‘দাদা’ ছাড়া কখনও সম্বোধন করেননি। ‘আপনি’ ছেড়ে বরাবরের জন্য উত্তমকুমারকে ‘তুমি’ বলেছেন।
রাঙাদার কাছে তাঁর এত কথা, এত গল্প শুনেছি যে, উত্তমকুমারকে আমরাও বড় দাদা হিসেবেই ভেবেছি মনে মনে। কিন্তু ভাবলেই তো হবে না। তিনি তো উত্তমকুমার। তাঁর সামনে যাওয়া মানে এক অবিশ্বাস্য, অলৌকিক মানুষের সামনে যাওয়া।
প্রথম দর্শন
আমাদের বাড়িতে আসার আগে উত্তমকুমারের সঙ্গে প্রথম দেখা হয় ময়রা স্ট্রিটের বাড়িতে। এটাকে ঠিক দেখা হওয়া বলে না, দর্শন বলাই ভাল। সেদিন লক্ষ্মীপুজো। খুব সকাল-সকাল রাঙাদার সঙ্গে আমি আর ছোড়দি (শর্মিলা) পৌঁছে গেছি ময়রা স্ট্রিটে।
উত্তমকুমারের ভবানীপুরের গিরিশ মুখার্জি রোডের বাড়ির লক্ষ্মীপুজো তো বিখ্যাত। ময়রা স্ট্রিটেও লক্ষ্মীপুজোর আয়োজন ছিল।
সেদিন উত্তমকুমারের জ্বর। ধুতি পরেছেন। গায়ে একটা সিল্কের জোড় বা উত্তরীয় জড়ানো। যদিও জ্বর, যদিও মুখচোখ থমথমে, তবুও অপূর্ব সেই রূপ। রাঙাদাকে বললেন, পার্থ, আমার জ্বর। এক্ষুনি ভবানীপুরে যাব মায়ের কাছে। ওখানে তো পুজো। তুই বোনেদের নিয়ে এলি। আজ কোনও কথা হল না। তার পর ছোড়দি আর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমাদের সঙ্গে পরে একদিন জমিয়ে আড্ডা হবে।
আমরা তাতেই আপ্লুত। আমাদের বাড়িতে আসার আগের বছর, ১৯৭৪ সালে উত্তমকুমারের সঙ্গে দেখা হল, কথা হল। কথা, মানে আমরা আর কী কথা বলব তাঁর সঙ্গে। তিনিই কথা বললেন, আমি আর ছোড়দি ‘হ্যাঁ’ ‘হুঁ’ করে উত্তর দিলাম।
একবার তাঁর সঙ্গে দেখা হল টালিগঞ্জের স্টুডিয়োতে। সেদিন ওঁর তাড়াতাড়ি প্যাক-আপ হওয়ার কথা। ছবির নাম ‘বাঘবন্দী খেলা’। এই ছবিতে উত্তমকুমারের ছেলের ভূমিকায় রাঙাদা।
উত্তমকুমারের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে রেখেছিলেন রাঙাদা, তাই শুটিং ফ্লোরে ঢুকতে পেরেছিলাম আমরা। ক্যামেরার পিছনে প্রায়ান্ধকার অঞ্চলে দাঁড়িয়ে এক ঝলক শুটিং দেখলাম তাঁর। পর্দায় যে উত্তমকুমারকে দেখি, তিনি চোখের সামনে অভিনয় করছেন। নবম শ্রেণির ছাত্রীর কাছে সে এক বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা।
দৃশ্যটা ছিল এরকম— হার্ট অ্যাটাক হয়েছে উত্তমকুমারের। সংলাপটা ছিল এরকম— ‘ভোলা আমায় ধর তো’।
‘বাঘবন্দী খেলা’য় অসাধারণ অভিনয় করেছিলেন তিনি। বড় হয়ে যতবার ছবিটা দেখেছি, মুগ্ধ হয়েছি। এমন একটা নেগেটিভ চরিত্রে উত্তমকুমারের অভিনয় ছিল অতুলনীয়। পরবর্তীকালে শুনেছি, এই ছবির প্রযোজক অসীমা ভট্টাচার্য যখন এই চরিত্রটা ওঁকে করতে বলেন, উত্তমকুমার বলেছিলেন, ‘“আমাকে ভিলেন বানিয়ে দিচ্ছ?” যে প্রযোজকের ‘চৌরঙ্গী’ ছবিতে তাঁর অভিনীত ‘স্যাটা বোস’ তখনও দর্শকদের মনে জ্বলজ্বল করছে, সেই রকম সময়ে ‘বাঘবন্দী খেলা’র ভিলেন চরিত্র! এই ছবিতে তাঁর অভিনয় তখন তো মানুষকে চমকে দিয়েছিলই, আজও তা অবিস্মরণীয়।
অসীমা ভট্টাচার্যের কাছে ওই ‘ভিলেনের প্রস্তাব’–এর বিষয়টা অনেক পরে শুনেছিলাম, যখন তিনি আমাদের বৌদি, মানে, রাঙাদার স্ত্রী হিসেবে আমাদের পরিবারে এসে গেছেন।
সেদিন শুটিং শেষ হলে উত্তমকুমারের কাছে আমাদের নিয়ে গেলেন রাঙাদা। উনি বললেন, সে বার লক্ষ্মীপুজোর দিনে তোমাদের সঙ্গে কথা বলতে পারিনি। আজ অনেকক্ষণ আড্ডা দিতে চাই। তোমরা আমাকে সময় দেবে তো?
আমরা তো লজ্জায় একশেষ।
হঠাৎ আমাদের জিজ্ঞেস করলেন, পার্টটা ঠিকমতো করতে পেরেছি তো?
এই জিজ্ঞাসার মধ্যে কোনও রসিকতা ছিল না। কিন্তু, এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার অধিকারী তো আমরা নই। শুধু বলেছিলাম, খুব ভাল লেগেছে। সিনেমার চেয়েও ভাল।
শুনে, একটু হেসে বললেন, খুব ভাল বলেছ তো। আমার মনে থাকবে।
তার পর ফোটোগ্রাফারকে ডাকলেন। ছবি তোলা হল তাঁর সঙ্গে। উত্তমকুমারের এক দিকে আমি, অন্য দিকে ছোড়দি। সেই ছবির প্রিন্ট দেখে, স্কুলের বন্ধুরা তো আমার চেয়ে বেশি উত্তেজিত। কেউ কেউ বলল, দাঁড়া, তোর হাতটা ছুঁয়ে দিই। উত্তমকুমারের পাশে দাঁড়িয়েছিলি। ওঁর ছোঁওয়া লেগে আছে তো।
আমাদের ছবি তোলা পর্বের পর, শুরু হল অন্য এক কাণ্ড। দু’তিন জন সাংবাদিক ও ফোটোগ্রাফার একসঙ্গে হাজির। তাঁরা প্রায় সমস্বরে বলতে থাকলেন, দাদা, ‘অমানুষ’ ছবির জন্য বিএফজেএ আপনাকে সেরা অভিনেতার অ্যাওয়ার্ড দেওয়ার কথা আজ
ঘোষণা করেছে।
উত্তমকুমার তাঁদের একটু থামতে বলার জন্য হাত তুললেন। কিন্তু এই প্রথম বোধহয় ফোটোগ্রাফাররা তাঁর কথা শুনলেন না। অবিরত ক্যামেরার শাটারের শব্দ হচ্ছিল। উত্তমকুমারের ছবি তুলে তুলেও সাধ মিটছিল না তাঁদের।
উত্তমকুমারের বকুনি
উত্তমকুমারের সঙ্গে অধিকাংশ ছবিতে রাঙাদা হয় তাঁর ভাই, নয় তাঁর ছেলে। ‘ধন্যি মেয়ে’তে ভাই, ‘অগ্নীশ্বর’, ‘বাঘবন্দী খেলা’য় ছেলে। ‘দুই পুরুষ’ ছবিতেও রাঙাদা উত্তমকুমারের ছেলে। ‘সেই চোখ’ ছবিতে উদ্ভট এক খেয়ালি মানুষের চরিত্রে উত্তমকুমার। ছবিতে মহুয়া রায়চৌধুরীর চরিত্রটা ছিল রাঙাদার প্রেমিকার। অন্য দিকে, ছবির মধ্যে উত্তমকুমার ঠিক করলেন, তিনি বিয়ে করবেন মহুয়াকে। এই ছবিতে রাঙাদাকে চড় মারার একটা দৃশ্য নিয়ে বেশ মজা হয়েছিল। রাঙাদা বারবার চাইছিলেন উত্তমকুমার সত্যি–সত্যি তাকে চড় মারুন। এটাই ছিল চিত্রনাট্যে। কিন্তু উত্তমকুমার বলেছিলেন, সেটা হয় না। লেগে গেলে তুই অন্য ছবির কাজ করতে পারবি না। আমি ক্যামেরার অ্যাঙ্গল দেখে এমন ‘চিট শট’ দেব, কেউ বুঝতেই পারবে না, আমি তোকে জোরে চড় মারিনি।
রাঙাদা বাধ্য হয়ে মেনে নিয়েছিলেন উত্তমকুমারের কথা। এবং পর্দায় এই দৃশ্যটা দেখার পর রাঙাদার একবারও মনে হয়নি, উত্তমকুমার ওঁকে সত্যি–সত্যি চড় মারেননি।
উত্তমকুমার বারবার রাঙাদাকে বলতেন, সাধনা ছাড়া কিচ্ছু হয় না। নিষ্ঠা চাই, পরিশ্রম চাই, গভীর মনোযোগ চাই, আর, একা একা প্র্যাকটিস করা চাই। হাল ছাড়বি না কখনও।
রাঙাদার মুখে এই সব কথা শুনতে শুনতে সত্যিই অনুভব করেছি, সাধনা ছাড়া উত্তমকুমার হওয়া যায় না। যত দিন যাচ্ছে, এই উপলব্ধি আরও দৃঢ় হচ্ছে।
‘দুই পুরুষ’ ছবিতে রাঙাদার বাবার চরিত্রে উত্তমকুমার। এই চরিত্রটি আদর্শ হারিয়েছে জীবনে। ছেলে অরুণের চরিত্রে রাঙাদা। বাবার পছন্দ করা পাত্রীকে বিয়ে করতে অস্বীকার করায়, উত্তমকুমার অরুণ তথা পার্থকে বলেন, আমার পছন্দ করা পাত্রীকে বিয়ে না করলে তুমি বাড়ি থেকে
বেরিয়ে যাও।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে, দেওয়াল থেকে একটা ফোটো–ফ্রেম খুলে নিতে যায় রাঙাদা। সেই ফ্রেমের ভেতরে লেখা ছিল জীবনের একটা আদর্শের বাণী।
উত্তমকুমার বলছেন, তুমি ওটা নেবে না। এই ফ্রেমটা দেওয়ালেই থাকবে অরুণ।
বেশ বড় একটা দৃশ্য। দেওয়াল থেকে নামিয়ে নেওয়া ফোটোফ্রেমটা নিয়ে বাবা–ছেলের কাড়াকাড়ি শুরু হয়। তখন, ওই ফোটো–ফ্রেমের একটা কোণ উত্তমকুমারের বুকে জোরে লেগে যায়। এবং উত্তমকুমার শট–এর মধ্যে ‘আহ’ বলে একটা আওয়াজ করেন। সবাই ভাবলেন, চিত্রনাট্য অনুযায়ীই এটা হয়েছে। কিন্তু, এমন একটা পরিস্থিতিতে, উত্তমকুমারের জোরে লেগেছে বলে, ‘শট’ থামিয়ে ‘কাট’ বলে দেয় রাঙাদা।
দৃশ্যটা নষ্ট হয়ে গেল। উত্তমকুমার প্রচণ্ড চিৎকার করে, রেগে রাঙাদাকে বলে উঠলেন, কে তোকে শট–টা কাটতে বলল? কতক্ষণ তোর সঙ্গে এটা নিয়ে রিহার্সাল করেছি। কী সুন্দর এগোচ্ছিল দৃশ্যটা। নষ্ট করে দিলি? হ্যাঁ, আমার খুব জোরেই লেগেছিল। কিন্তু সেটা তো এই সিনটার চেয়ে বড় নয়।
মাথা হেঁট করে সবটা শুনেছিলেন রাঙাদা। এবং কেঁদে ফেলেছিলেন। তার পর, রাঙাদাকেই ভোলালেন উত্তমকুমার। কফি খেয়ে, রিহার্সাল দিয়ে আবার নেওয়া হল দৃশ্যটা।
এই ঘটনাটা বলে রাঙাদা আমাকে বলেছিলেন, এমন সাধক না হলে কি উত্তমকুমার হওয়া
যায়? দুশো বছর পরেও উত্তমকুমার ঠিক উত্তমকুমারই থাকবেন।
রাঙাদার মুখে উত্তমকুমারের এত গল্প শুনেছি যে মানুষটা খুব কাছের হয়ে উঠেছিলেন। একটা গল্প রাঙাদা অনেক বার বলেছেন। ঘটনাটা বেশ কয়েক বছর আগের। তখন আমি নেহাতই শিশু। কিন্তু পরে অনেক বার শুনেছি গল্পটা।
এক বার বন্যাত্রাণের জন্য মুম্বই ও বাংলার শিল্পীরা ইডেন গার্ডেন্সে একটা প্রদর্শনী ক্রিকেট ম্যাচ খেলেছিলেন। উত্তমকুমার খেলেননি, কিন্তু তিনি ছিলেন বাংলার নন–প্লেয়িং ক্যাপ্টেন। মুম্বইয়ের ক্যাপ্টেন ছিলেন রাজ কপূর। প্রথমে ব্যাট করেছিল মুম্বই। এবং দুর্দান্ত খেলছিলেন রাজ কপূর। ছক্কা হাঁকাচ্ছিলেন আর গ্যালারির হাততালি কুড়োচ্ছিলেন। উত্তমকুমার রাঙাদাকে বলেন, রাজ কপূর এগিয়ে এসে বল মারছেন ছক্কার জন্য। তুই গুড লেংথ স্পটে বল ফেল।
গুরুবাক্য মেনে সেভাবেই বল করেন রাঙাদা। এবং রাজ কপূর বোল্ড আউট। সবাই উচ্ছ্বসিত। খেলার পরে রাঙাদার মাথার চুল ঘেঁটে দিতে দিতে উত্তমকুমার বলেছিলেন, তুই এইটুকু ছেলে, রাজ কপূরকে বোল্ড করে দিলি? তোকে কেউ আটকাতে পারবে না।
দুপুরে উত্তমকুমারের আদর, রাতে গ্র্যান্ড হোটেলে পার্টি। রাঙাদা গিয়েছিলেন। রাত দশটার সময় উত্তমকুমার রাঙাদার কাছে এসে ধমকের সুরে বলেন, এত রাত্তির পর্যন্ত তুই পার্টিতে কেন আছিস? কে এতক্ষণ থাকতে বলেছে? এক্ষুনি বাড়ি চলে যা।
বকুনি খেয়ে রাঙাদা সটান বাড়ি চলে এসেছিলেন। এই গল্পটা বলে রাঙাদা বলতেন, নিজের দাদা না হলে কেউ এভাবে বকুনি দেয়?
বেগম মেরী বিশ্বাস
এক পয়লা বৈশাখ খুব সকাল-সকাল ছোড়দি আর আমি রাঙাদার সঙ্গে গিয়েছিলাম ময়রা স্ট্রিটের বাড়িতে। ধুতি-পাঞ্জাবি পরে উত্তমকুমার এলেন বাইরের ঘরে। ধুতি-পাঞ্জাবিতে আর কাউকে কোনও দিন এমন সুন্দর লাগেনি, আজ পর্যন্ত।
এখান থেকে বসুশ্রীতে যাবেন উত্তমকুমার। বসুশ্রীর নববর্ষের অনুষ্ঠান তো বিখ্যাত। রাঙাদাও যাবেন। আমরা দু’বোন বাড়ি ফিরব।
‘দুই পুরুষ’ ছবির একটি দৃশ্যে উত্তমকুমারের সঙ্গে পার্থ মুখোপাধ্যায়।
একটু কথাবার্তা বললেন উত্তমকুমার। তার পর রাঙাদার সঙ্গে আলাদা করে কিছু কথা বললেন। পরে জেনেছি, উত্তমকুমার সেদিন বলেছিলেন, আমি বিমল মিত্রের ‘বেগম মেরী বিশ্বাস’ নিয়ে ছবি করব। আমার ইচ্ছে, সোমা (সু্প্রিয়া দেবীর মেয়ে) আর শর্মিতাকে দুটো চরিত্রে নেব। তোর মত আছে তো?
রাঙাদা বলেছিলেন, আমাদের বাড়িটা তো কনজ়ারভেটিভ। অনুমতি পাওয়া কঠিন।
উত্তমকুমার বলেছিলেন, আমিই তো করব ছবিটা। অসুবিধা কী? ঠিক আছে, তুই বাড়িতে
কথা বল।
ছবিটা অবশ্য উত্তমকুমার করতে পারেননি। তখন তো ছোট ছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় উপন্যাসটা পড়েছি। ভেবেছি, এমন একটা সুবিশাল উপন্যাস থেকে ছবিটা কি করতে পারতেন উত্তমকুমার? এই প্রশ্নটা অনেক পরে যখন নিজের মনের মধ্যে জেগেছে, তখন উত্তর পেয়েছি, ‘বনপলাশির পদাবলী’র মতো ছবি যিনি করতে পারেন, তাঁর পক্ষে সম্ভব ‘বেগম মেরী বিশ্বাস’ নিয়ে ছবি করা। রমাপদ চৌধুরীর ‘বনপলাশির পদাবলী’ও তো বহু চরিত্র নিয়ে গঠিত এক সুবিশাল ও গভীর উপন্যাস। এই ছবির পরিচালনাই শুধু নয়, চিত্রনাট্যও লিখেছিলেন উত্তমকুমার। তাই, তাঁর পক্ষেই সম্ভব ছিল এই কাজ।
অবশ্য এই ছবি হলেও আমি অভিনয় করতে পারতাম না। কারণ, অনুমতি মেলেনি বাড়ি থেকে। সে-কথা কি উত্তমকুমার জেনেছিলেন? আমার
জানা নেই।
আমার এ ঘর বহু যতন করে
সত্যিই সে এক তোড়জোড় ছিল তিনি আমাদের বাড়িতে আসবেন বলে। ঘরদোর সাজিয়ে-গুছিয়ে তৈরি রেখেছিলাম আমরা। আমি তাঁর ফ্যান ছিলাম না। কিন্তু তাঁকে ভালবাসতাম, যে ভালবাসায় মিশে ছিল অপরিসীম শ্রদ্ধা। কী ভাবে তিনি উত্তমকুমার হয়ে উঠেছিলেন, অনেকেরই সেটা জানা আছে। নিষ্ঠা, পরিশ্রম, জেদ এবং সাধনা। এই মানুষটার জন্য শুধু ইট–পাথরের ঘর নয়, ভিতর–ঘরটাও বহু যতন করে ধুয়েমুছে রেখেছি, আজও। বিস্ময় আজও ফুরোয়নি তাঁকে নিয়ে।
বাড়িতে আমরা দুই বোন বলেই রেখেছিলাম, উনি এলে চা–জলখাবার দেওয়ার কাজটা আমরা করব না। আমি আর ছোড়দি ঘোষণাই করে দিয়েছিলাম, আমরা সোফায় দু’জনে তাঁর দু’পাশে বসে থাকব।
সেটাই হয়েছিল। তিনি এলেন। মনে হল, এ-বাড়ির বড় ভাই এসে বসলেন ঘরেতে। দাদাদের সঙ্গে অনেক গল্প হল তাঁর। আমাদের দিয়েও কথা বলিয়ে নিলেন তিনি।
তাঁর জন্য কৃষ্ণনগর থেকে সরভাজা, ক্ষীরের শিঙাড়া এনেছিলেন সেজদা। সাদা ক্ষীরের শিঙাড়া দেখে খুব খুশি তিনি। বললেন, আমি এটাই
খেতে চাই।
আর কিছু খেলেন না। বাবাকে প্রণাম করলেন। মা যখন চা নিয়ে এলেন, উঠে এসে প্রণাম করতে গেলেন। মায়ের আপত্তি শুনলেন না। বললেন, পার্থর মা তো আমারও মা।
ততক্ষণে বাড়ির বাইরে ভিড় জমে গেছে। রাঙাদার সঙ্গে একবার উঠে গিয়ে সকলকে নমস্কার করে আবার ফিরে এলেন।
রাঙাদার পছন্দের ফোটোগ্রাফার ছিলেন বিশুদা। তিনি ছবি তুললেন অনেক।
তিনি চলে যাওয়ার পর বিশ্বাস করতে কেমন অসুবিধে হচ্ছিল যে, উত্তমকুমার এসেছিলেন আমাদের বাড়ি।
তার পর বেশ কয়েকবার দেখা হয়েছে তাঁর সঙ্গে। গেছি রাঙাদার সঙ্গে।
১৯৮০–র ২৪ জুলাই আচমকা চলে গেলেন তিনি। ২৫ এপ্রিল তাঁকে নিয়ে শেষযাত্রায় হাজার হাজার মানুষের ভিড়। আমাদের বাড়ির
কাছের রাস্তা, শরৎ বোস রোড দিয়ে নিয়ে যাওয়া হল তাঁকে।
সেই দৃশ্য দেখার জন্য তৈরি ছিলাম না। সবার চোখে জল। অসম্ভব বিষাদে মন ভরে রয়েছে।
আমাদের ‘রজনী ধাম’ সেদিন ভরদুপুরেই অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল।
মনে হয়েছিল, আজও মনে হয়, উত্তমকুমারের আর একটা অর্থ হল— আলো। তিনি আলোকপুরুষ। যাঁর কথা ভাবলেই মনের স্মৃতিপট আলোয় আলোয় পূর্ণ হয়ে ওঠে।