E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

গুরু

ক্লাস থেকে ফেরার পথে কথাগুলি কানে যেতেই অমলেশবাবু গমগমে গলায়, বললেন, “ম্যালেরিয়া হলে আপনাকে তেতো কুইনাইনই খেতে হবে। মিষ্টি কাফ-সিরাপে তখন কাজ হবে কি? হবে না।”

প্রাণজয়

শেষ আপডেট: ০৯ অগস্ট ২০২৬ ০৭:৪০

ছবি: প্রসেনজিৎ নাথ।

শীতের কুয়াশা ভেদ করে কাঁচা সোনার মতো সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়েছে শহরের বুকে। যানজটহীন রাজপথ ধরে মসৃণ গতিতে এগিয়ে চলেছে ঝকঝকে বিদেশি গাড়ি। পিছনের নরম সিটে শরীর ডুবিয়ে চিন্তামগ্ন দেবাংশু। বাইরের চলমান জনস্রোত নির্বাক ঝর্নার মতো আছড়ে পড়ছে তার নির্লিপ্ত চোখের উপর। অসংখ্য মানুষ ডেঁয়োপিঁপড়ের মতো পিলপিল করে ছুটছে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যের দিকে। মানুষ কি শেষ পর্যন্ত তার লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে? মানুষের শেষ গন্তব্য কোথায়? নানা অলিগলি ঘুরে জীবন কি শেষ অবধি…

গাড়ি ট্রাফিক সিগন্যালে লাল আলোর বেড়াজালে থামতেই দেবাংশুর চিন্তার জাল ছিঁড়ে গেল অসমাপ্ত স্বপ্নের মতো। রাস্তার দু’দিকে আগাছার মতো গজিয়ে উঠেছে অসংখ্য ছোট-বড় সস্তা খাবারের দোকান। দেবাংশুর চোখ আটকে গেল ক্যামেরার স্টিল-ফোটোর মতো, ফুটপাতের এক চায়ের দোকানে। সেই একই রকম বসার ভঙ্গি— মেরুদণ্ড সোজা, বাঁ হাতে ভাঁজ করা খবরের কাগজ, ডান হাতে ধোঁয়া-ওঠা লিকার-চায়ের গ্লাস। সেই ব্যাকব্রাশ করা চুল, ঘন মোটা গোঁফ, টিকোলো নাক, ঋজু দেহ। শুধু বয়সের কিছু ধুলোবালি জমেছে মুখের উপর। দেবাংশুর চোখ ভুল করেনি, এই মানুষটিকেই সে গত দশ বছর হন্যে হয়ে খুঁজছে…

গাড়ি থেকে নেমে হনহন করে একটু এগিয়ে গিয়েও থমকে দাঁড়াল দেবাংশু। ভুল হচ্ছে না তো? কাঁচাপাকা চুলদাড়ির জঙ্গলের মধ্যে মুখটি পরিচিত হলেও, পোশাক-আসাক মিলছে না যে! আপাদমস্তক গেরুয়া বসন। উপরে হাফ-হাতা ফতুয়া। নীচে খাটো ধুতি। খালি পা! তবুও বুকভরা সংশয় নিয়ে কিন্তু-কিন্তু করে এগোয় সে, “স্যর, চিনতে পারছেন? আমি দেবাংশু…”

খবরের কাগজ থেকে মুখ তুলতেই কালো ফ্রেমের মোটা কাচের চশমা আর ফাইবার গ্লাসের রিমলেস চশমার দৃষ্টিপথ মিলে যায়এক সরলরেখায়। প্রাক্তন মেধাবী ছাত্রকে কাছে পেয়ে ষাট বছরের পুরাতন চোখ দু’টি চকচক করে ওঠে আনন্দে-উত্তেজনায়।

নিজের অজানতেই মাথা নিচু হয়ে আসে দেবাংশুর। মধ্যপ্রদেশ স্ফীত হওয়ার কারণে আজকাল নিচু হতে অসুবিধে হয়। তবুও পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষ থাকেন, যাঁদের সামনে মাথা নিচু করতে পারলে বুকের বোঝা অনেকটা হালকা হয়। দেবাংশুর কাছে অমলেশ সান্যাল তেমনই একজন।

*****

“পুরো পাঁচ আঙুলের দাগ পড়ে গেছে! দেখুন স্যর, এক বার ভাল করে দেখুন!” ভদ্রলোক থামতেই ভদ্রমহিলা শুরু— “ছেলে আমার কাল থেকে কিচ্ছু মুখে তোলেনি…”

প্রধান শিক্ষকের মুখ আষাঢ়ের আকাশের মতো গম্ভীর। ভাবছেন কী ভাবে পরিস্থিতি সামলাবেন। বড়লোক বাপ-মায়ের অভিযোগ, তাদের ছেলেকে এভাবে মারধর করা উচিত হয়নি সান্যালবাবুর। আজ দু’জন এসেছে। কাল দশ জন আসবে। অবস্থা আরও জটিল হতে পারে। দিনকাল ভাল নয়...

“আপনারা মাস্টার মানুষ, অবশ্যই ছাত্রদের শাসন করবেন। সে অধিকার আপনাদের আছে। তাই বলে এ ভাবে শাস্তি দেবেন?” একটু থেমে চতুর অভিভাবক আবার বলল, “শিশুমনের উপর এ-সব ঘটনার ছাপ থেকে যায়। ভবিষ্যতে এর খারাপ প্রভাব...”

ক্লাস থেকে ফেরার পথে কথাগুলি কানে যেতেই অমলেশবাবু গমগমে গলায়, বললেন, “ম্যালেরিয়া হলে আপনাকে তেতো কুইনাইনই খেতে হবে। মিষ্টি কাফ-সিরাপে তখন কাজ হবে কি? হবে না।”

এরকম ঘোরালো পরিস্থিতিতে অমলেশের কথা শুনে সহশিক্ষকরাও স্তম্ভিত! কেউ কেউ বিরক্ত। কিন্তু অমলেশ অভিভাবকদের উদ্দেশে বললেন, “আপনাদের ছেলে যে অপরাধ করেছে, তার জন্য একটা চড় যথেষ্ট নয়। জানেন ও কী করেছে?”

এতক্ষণ যে বাপ-মায়ের মুখে খই ফুটছিল, তারা কেমন যেন মিইয়ে গেল অমলেশের সামনে। জিজ্ঞাসু চোখ তুলে তাকেতেই অমলেশ বললেন, “আপনাদের ছেলে সকলের অজানতে ছাত্রীদের বাথরুমের মধ্যে ঢুকে কী করছিল, ওকেই জিজ্ঞাসা করুন।” একটু থেমে আরও উত্তেজিত স্বরে, “মা সরস্বতীর আরাধনা করার যোগ্যতা ওর নেই। ওকে টিসি দিয়ে স্কুল থেকে তাড়িয়ে দেওয়া উচিত। দুষ্ট গরুর থেকে শূন্য গোয়াল অনেক ভাল।”

কথাগুলি এত রূঢ় ভাবে না বললেও চলত। কিন্তু রসায়নের শিক্ষক অমলেশ সান্যালের রসকষের বড্ড অভাব! স্পষ্ট কথা রাখঢাক না করে মুখের উপর বলেন। অভিভাবক সহকর্মী ছাত্রছাত্রী— কোনও ভেদাভেদ নেই। এই কারণে অসম্ভব ভাল শিক্ষাদানের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ছাত্রমহলে জনপ্রিয়তা নেই তাঁর। ভয়ে-ভক্তিতে সকলেই কমবেশি এড়িয়ে চলে। মেধাবী ছাত্রছাত্রীরাও ক্লাসরুমের বাইরে তাঁর ধারে-পাশে বিশেষ আসে না। দেবাংশুও এর ব্যতিক্রম নয়। গভীর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন অমলেশবাবুকে, সেও মনে-মনে বিশেষ পছন্দ করে না।

অথচ এই নীরস নিয়মনিষ্ঠ আবেগহীন অপছন্দের মানুষটিই একদিন দেবাংশুর জীবনে সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিলেন। দেবাংশুর পরিবারে তখন একটার পর একটা বিপর্যয় সুনামির মতো আছড়ে পড়ছে। প্রথমে বাবার বাইপাস সার্জারি। বাবা একটু সুস্থ হতে না হতেই মায়ের ব্রেস্ট ক্যান্সার। মধ্যবিত্ত পরিবারটিকে নিঃস্ব করে চলে গেল মা। বাপ-ব্যাটার দু’জনের সংসার বাঁশপাতার মতো তিরতির করে কাঁপছে সর্বক্ষণ। ভয়ে এবং অনিশ্চয়তায়। আজ বাড়িতে চাল আছে। দু’দিন পর হাঁড়ি চড়বে কি না কেউ জানে না! এই সবের মধ্যেও একটাই সান্ত্বনা— দেবাংশুর তুখোড় রেজ়াল্ট। মাধ্যমিক উচ্চ মাধ্যমিকে ছিয়ানব্বই-সাতানব্বই শতাংশের উপর নম্বর। মেডিক্যালে প্রথম একশো জনের মধ্যে র‍্যাঙ্ক। অথচ তখন অবস্থা-পড়ে-আসা দেবাংশুর বাবার অবস্থা শীতের অশ্বত্থ গাছের মতো, শূন্য রিক্ত অসহায়। ছেলেকে ডাক্তারি পড়ানোর কথা স্বপ্নেও ভাবেন না।

সেই সময় অমলেশ সান্যাল বটবৃক্ষের মতো আবির্ভূত হলেন। গোপনে দেবাংশুকে ডেকে একটা দশ হাজার টাকার চেক হাতে ধরিয়ে বললেন, “আমি কোনও কথা শুনতে চাই না। তুই কলকাতা মেডিক্যালে ভর্তি হবি…”

সেদিন দেবাংশু কোন কথা বলতে পারেনি। শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েছিল তার অপছন্দের মাস্টারমশাইয়ের দিকে! পরে আরও বেশ কয়েক বার প্রয়োজন অনুযায়ী মোটা টাকা দেবাংশুর পকেটে গুঁজে দিয়েছেন আমলেশ সান্যাল।

তার পর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। এমবিবিএস, এমএস পাশ করার পর দেবাংশুর জীবনটা দীপাবলির রাতের মতো পাল্টে গেছে। এখন ওটি-তে ঢুকলেই বন্যার জলের মতো অর্থ দেবাংশুর অ্যাকাউন্টে ঢোকে। অথচ যার জন্য এত কিছু, সেই অকৃতদার মানুষটা হঠাৎই চাকরি থেকে ভলান্টারি রিটায়ারমেন্ট নিয়ে কর্পূরের মতো উবে গেল!

*****

তাই সেদিন আর অমলেশ স্যরকে দেখে নিজেকে ধরে রাখতে পারেনি দেবাংশু। যার আধ ঘণ্টা সময়ের মূল্য কয়েক লক্ষ টাকা, সেই বিখ্যাত সার্জেন দেবাংশু দাশগুপ্ত ফুটপাতের চায়ের দোকানে দেড় ঘণ্টা কাটিয়ে দিয়েছিল নির্দ্বিধায়। তার পর আজ আবার সমস্ত জরুরি কাজ বাতিল করে হাজির হল স্থানীয় গৌড়ীয় মঠের এক চিলতে ছোট্ট কামরায়। একটা ছ’ফুট বাই তিন ফুটের তক্তপোশ। ছোট্ট কাঠের চেয়ার-টেবিল। জলের কুঁজো। হ্যাঙারে ঝুলন্ত খানকতক বহুব্যবহৃত পুরাতন গেরুয়া। আর দেওয়াল-আলমারিতে সামান্য কিছু বই ছাড়া আর কিছু নজরে এল না দেবাংশুর। বাহুল্যবর্জিত নিরাভরণ আবাস। চার দিক ধূপ-ধুনোর সুগন্ধে ম-ম করছে। এখানে পা দিয়েই বোঝা যায়, এ ঘর সাধারণ গৃহীর নয়।

স্যরকে প্রণাম করে দেবাংশু বলল, “সেদিন একটা কথা জিজ্ঞেস করব ভেবেও করা হয়নি। আপনি হঠাৎ চাকরি ছেড়ে দিলেন কেন?”

নড়বড়ে পুরনো চেয়ারে বসে মুচকি হেসে অমলেশ বললেন, “চাকরি করার ইচ্ছেই ছিল না কোনও দিন। আমার শিক্ষাজীবনের অধিকাংশই কেটেছে মঠ-মিশনে। বাল্যকাল থেকে চোখের সামনে দেখছি মহারাজদের শৃঙ্খলাময় জীবন। তখন থেকেই সন্ন্যাসজীবনের প্রতি আকর্ষণ। ভেবেছিলাম পড়াশোনা শেষ করে আমিও... কিন্তু তা হয়নি।”

“কেন? সন্ন্যাস নিলেন না কেন?”

“খুব ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছি। অনেক দুঃখ-যন্ত্রণার পাহাড় অতিক্রম করে মা আমাকে মানুষ করেছিল। এই এত বড় জগতে মা ছাড়া আমার আর কেউ ছিল না। ঠিক একই রকম, আমি ছাড়া মায়েরও আর কেউ ছিল না। তাই বৃদ্ধবয়সে তাকে ছেড়ে যেতে পারিনি। ভেবেছিলাম, যত দিন মা থাকবে, আমিও চাকরি করব। মা যেদিন চলে যাবে, আমিও সেদিন সংসার ছাড়ব।”

“তা হলে আপনার মা গত হওয়ার পরই আপনি চাকরি ছেড়ে সন্ন্যাস নিলেন?”

“সে আর হল কোথায়?” হাসতে-হাসতে অমলেশ বললেন, “যখন চাকরি ছাড়লাম তখন চল্লিশের কোঠা পেরিয়েছি। ওই বয়সে শরীর কঠিন ব্রহ্মচর্যের ধকল নিতে পারত না। তা ছাড়া, তত দিনে অনুভব করেছি, সন্ন্যাস শুধুমাত্র একটা ‘বেশ’ নয়— একটা অবস্থা। সাধনার উচ্চতম মার্গে এই অবস্থা লাভ হয়। সন্ন্যাস শব্দের অর্থ— সং অর্থাৎ সংস্কার ন্যাস (ত্যাগ)। শাস্ত্রে আছে, সন্ন্যাসী চার প্রকার— বৈরাগ্য-সন্ন্যাসী, জ্ঞান-সন্ন্যাসী, জ্ঞান-বৈরাগ্য সন্ন্যাসী এবং কর্ম-সন্ন্যাসী। আমি চারটি পথের একটিতেও অগ্রসর হতে পারিনি।” একটু থেমে আস্তে-আস্তে স্বগতোক্তির মতো বললেন, “এ বড় কঠিন ব্রত। আজকাল সংস্কারনাশী সন্ন্যাসীর বড় অভাব। সততানাশী সন্ন্যাসীতে ভারতবর্ষ ছেয়ে গেছে।”

“আপনার গেরুয়া বসন দেখে ভেবেছিলাম...” কথা শেষ না করেই থেমে গেল দেবাংশু।

“গেরুয়া দেখলেই লোকে ভাবে বিরাট ধার্মিক। আসলে ধর্ম সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা আজও স্পষ্ট নয়...” আত্মমগ্ন অমলেশ হয়তো আরও কিছু বলতেন, কিন্তু তার আগেই, “স্যর, আপনার মতে ধর্ম কী?” কৌতূহলী দেবাংশু প্রশ্ন করল।

“ধর্ম সম্বন্ধে অনেকেই অনেক কথা বলেছে। মহাত্মারা ধর্মকে নানা ভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তবে গত বিশ বছর এই পুণ্যভূমির বিভিন্ন ধর্মক্ষেত্র পরিভ্রমণ করে এবং ধার্মিক মানুষদের সংস্পর্শে এসে আমি উপলব্ধি করেছি, সত্যই ধর্ম। যা সত্য তা-ই ধর্ম।” একটু থেমে দেবাংশুর চোখে চোখ রেখে অমলেশ বললেন, “এবার হয়তো তুই জানতে চাইবি, সত্য কী? সত্য তো আপেক্ষিক। ম্যান টু ম্যান ভ্যারি করে। না, সত্য ব্যক্তিনির্ভর নয়। যা পূর্বে ছিল, এখনও আছে এবং পরেও থাকবে তারই নাম— সত্য। যা সত্য তা অবিনশ্বর। এই সত্যকে জানার জন্যই সারা পৃথিবী জুড়ে এত ধর্মস্থান, এত ধর্মগুরুর ছড়াছড়ি। তাদের কাছে দীক্ষা নেওয়ার হুড়োহুড়ি! অথচ মূল বিষয়টি কিন্তু খুবই সহজ-সরল। ”

“তা হলে মানুষকে প্রকৃত সত্য জানার জন্য দীক্ষা নিতে হবে?” চিন্তিত মনে প্রশ্ন করে দেবাংশু।

অমলেশ হো-হো করে হাসতে-হাসতে বললেন, “ছেলেবেলার অভ্যাসটা দেখছি তোর আজও যায়নি। একটার পর একটা প্রশ্ন। ভাল।” তার পর দেবাংশুর জিজ্ঞাসু চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “দীক্ষা নিতে হলে তো গুরু দরকার। আজকের দিনে তুই ‘গুরু’ কোথায় পাবি? ‘গু’ মানে অজ্ঞানতার অন্ধকার। ‘রু’ শব্দের অর্থ তন্নিরোধক বিমল চৈতন্য। অর্থাৎ যিনি অজ্ঞানতার অন্ধকার দূর করে শিষ্যের মধ্যে জ্ঞানের প্রকাশ ঘটান, তিনিই গুরু। এই কলিযুগে এরকম মানুষ ক’জন আছেন? অধিকাংশই ভক্ত-শিষ্যের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাওয়া ভণ্ড।”

বাইরে বিকেল ঢলে পড়েছে সন্ধ্যার কোলে। অস্তগামী সূর্যদেব দিগন্তের আড়ালে মুখ লুকিয়েছেন আজকের মতো। ঘসা কাচের মতো ঝাপসা চরাচর অপেক্ষা করছে রাত্রির আলিঙ্গনের জন্য। জানালা দিয়ে প্রকৃতির সেই সন্ধিক্ষণের দিকে তাকিয়ে কিছুটা ক্ষুব্ধ স্বরেই অমলেশ বললেন, “কানে ফুঁ দেওয়া মানে দীক্ষা নয়। ‘দীক্ষা’ শব্দের বিরাট ব্যাপ্তি...”

ঢং-ঢং করে ঘণ্টাধ্বনি হল দূরে কোথাও। কথা অসমাপ্ত রেখেই অমলেশ তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়ালেন চেয়ার থেকে। বললেন, “মন্দিরে আরতির সময় হল। এখন আমায় যেতে হবে। পরে আবার কথা হবে।”

দেবাংশু কিছুটা সঙ্কুচিত ভাবে অমলেশের পায়ের কাছে ফুল-মিষ্টি আর একটা সাদা খাম নামিয়ে রেখে ইতস্তত করে বলল, “স্যর, আপনার ঋণ এ জীবনে শোধ করা সম্ভব নয়। এগুলি আমার প্রণামী হিসাবে গ্রহণ করুন।” অমলেশ প্রথমে কিছুটা ইতস্তত করলেও, শেষ পর্যন্ত নিরাশ করেলেন না তাঁর মেধাবী বিনয়ী ছাত্রকে। হাসিমুখেই নিলেন উপহার সামগ্রী। দেবাংশুও নিশ্চিন্ত হল।

কয়েক দিন পরেই নিশ্চিন্ত দেবাংশুকে অবাক করে তার মোবাইলে একটা ছোট্ট মেসেজ এল। ব্যাঙ্কে টাকাপয়সা জমা পড়লে বা তোলা হলে ওরকম মেসেজ সকলের মোবাইলেই আসে। কিন্তু এই মেসেজের বয়ানটা অদ্ভুত। ওর অ্যাকাউন্ট থেকে মাত্র এক টাকা ডেবিট হয়েছে বলে ব্যাঙ্ক জানাচ্ছে!

হতভম্ব দেবাংশুকে স্তব্ধ করে মিনিট কয়েকের মধ্যে তার ফোনে আরও একটি মেসেজ এল— “বুঝলি দেবাংশু, মানুষ মাত্রই লোভী। পৃথিবীতে এমন এক জনও মানুষ নেই, যার লোভ নেই। তোর ব্ল্যাঙ্ক চেক দেখে আমারও বড্ড লোভ হল। তাই আর সামান্য কিছু টাকা নয়, তোর ষোলো আনাই নিলাম।”

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Bengali Story Short story

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy