E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

আকাশ জুড়ে ঘুড়ির খেলা

সত্তর নম্বর নেতাজি সুভাষ রোড— ঠিকানাটা সবুজ কালিতে লিখতে লিখতে বাইরের দিকে এক বার তাকিয়েছিল অনুপম। মেঘলা আকাশ, সকাল থেকে গুম হয়ে আছে চার দিক। উপরে হাওয়া নেই, ঘোলাটে আকাশের গায়ে আড়াআড়ি হাওড়া ব্রিজ ভেসে আছে।

সুতপন চট্টোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৬:৫০

ছবি: মহেশ্বর মণ্ডল।

কলকাতা শহরের প্রবেশদ্বারে সত্তর নম্বর নেতাজি সুভাষ রোডের এগারো তলায় ছিল অনুপম। দশতলা অবধি সর্বত্র চলতি ব্যবসা, সকাল ন’টা থেকে রাত্রি বারোটা। প্রথম যেদিন এই বাড়িতে এসেছিল সে, সেদিন বাড়িটির আসল চেহারা ঠিকমতো ধরতে পারেনি। ব্যবসার সময়ের শেষ, অনেক ঘরেরই দরজা বন্ধ, অনেক সাজানো মালপত্র ঘরের মধ্যে চলে গেছে, দূরের লোক ব্যবসার ঘরটি বন্ধ করে কোনও ট্রেন ধরে হয়তো মেদিনীপুর কিংবা মেমারির পথে। তখন প্রায় সন্ধে হয় হয়। যার কাছে থাকবে বলে এসেছিল, সে আনন্দদা।

সত্তর নম্বর নেতাজি সুভাষ রোড— ঠিকানাটা সবুজ কালিতে লিখতে লিখতে বাইরের দিকে এক বার তাকিয়েছিল অনুপম। মেঘলা আকাশ, সকাল থেকে গুম হয়ে আছে চার দিক। উপরে হাওয়া নেই, ঘোলাটে আকাশের গায়ে আড়াআড়ি হাওড়া ব্রিজ ভেসে আছে। দূরে কারখানার চিমনি গঙ্গার উপর লাইন দিয়ে ভেসে আছে, তাদের সামনে জাহাজ, ছোট-মাঝারি মাপের। চিঠির শেষ লাইনটা ঠিক কী লিখবে দু’বার ভাবল। কী লিখবে? আমি ভাল আছি? নিরাপদে আছি? অনুপম জানে এ কথাগুলো অন্তঃসারশূন্য হলেও তার দিদিমার কাছে এই দু’টি বাক্যই অমোঘ! কী দারুণ অর্থবহ। কোলে পিঠে করে, পরম আদরে ও ভালবাসায় বড় করে তোলা তাকে নিয়ে দিদিমা সারাক্ষণ উৎকণ্ঠিত থাকে।

তার বদলে সে লিখল, ‘আমি যেদিন আসিয়াছি, সেদিন দু’টি জিনিস পাইয়াছি। একটি কলকাতার ঠিকানা আর দুই, ছাদের কার্নিশে দাঁড়াইয়া হাওয়ায় ভাসমান একটি কাটা ঘুড়ি। লাল আর হলুদ রঙের।’ হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে ঘুড়িটা আছড়ে পড়েছিল দেওয়ালে। অনুপম হাত বাড়িয়ে ধরে ফেলতেই কলকাতা শহর থেকে এক মুহূর্ত মনটা ছুটে গিয়েছিল দ্বারবাসিনী গ্রামের অগ্রহায়ণের শেষ বিকেলের মাঠে। ধান তোলা শেষ। গোড়া কাটা ধানগাছের শেষটুকুতে বিকেলের শিশির জমেছে। হারান কিংবা হরির বাড়ানো ঘুড়ির সঙ্গে গোঁত্তা মেরে কাটাকাটি লাগিয়ে ছুট। এসময় অনুপমের লাটাইতে সুতো কোথায় যে, অনেকক্ষণ লড়বে? তাই টানে যদি ভোকাট্টা করা যায়।

অবাক হয়েছিল, এখানে মাঠ নেই, এখানে কোনও সীমাহীন আকাশ নেই, কে লাটাই হাতে ঘুড়ি উড়িয়েছে তাকে দেখাও যায় না। উপর থেকে নীচের দিকে তাকিয়েছিল সে। নেতাজি সুভাষ রোডে হাজার হাজার মানুষ, কারও হাতে লাটাই নেই। তা হলে কোথা থেকে এত ঘুড়ি আকাশে উড়ছে? ভাবতে ভাবতে সে হাতের মণিবন্ধে জড়িয়ে নিয়েছিল ধারালো সুতো। ঘুড়িটা বাধ্য ছেলের মতো পায়ের কাছে এসে পড়ে ছিল। অনুপম যত্নে তুলে রেখেছিল ঘরে।

ঘর নয়। পাশের বিল্ডিং-এর উঁচু দেয়াল থেকে করোগেটেড চাল নামানো। তার নীচে কাঠের পাটাতন আড়াল দিয়ে পাশাপাশি ছোট ছোট খুপরি। টানা দশটা ঘর পশ্চিম থেকে পুবে। ছাদের এক কোণে পাশাপাশি বাথরুম, সারাদিন গঙ্গার জল আসে। এখানে সকলের সঙ্গে এখনও পরিচয় হয়নি অনুপমের। শিউচরণ বিকেলে সাবান মাখতে মাখতে বলল, “কি দাদাবাবু, গরম মালুম হচ্ছে?”

অনুপম বলল, “হ্যাঁ। খুব।”

“আর ক’দিন থাকলে বুঝতে পারবেন। দিনের বেলা এখানে থাকা যায় না। রাতটাই আসল।”

“তাই নাকি?” বিস্ময় প্রকাশ করল অনুপম।

“নয়? রাত ছাড়া এ শহরে কিছুই নেই। এক দিন রাতের বেলায় আমার সঙ্গে চলুন।”

“কোথায়?” জানতে চায় অনুপম।

“আগে বলব না,” বলে শিউচরণ হাতের তালুর জলে নাক ডুবিয়ে জোরে টান দিলে দু’বার। তার পেটানো শরীরের মাংসপেশি ফুলে ফুলে ওঠল। বসে স্নান করতে করতে দু’বার সে সূর্যপ্রণাম করল পূর্ব দিকে। যাকে সে প্রণাম করল, সে তখন মধ্য আকাশ থেকে পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়েছে।

“এ ঠিকানাটা পেলেন কী করে অনুপমবাবু?” আলাপের পর কথাটা জিজ্ঞেস করেছিল শ্যামলাল মোতা। পাঁচতলার পুরো একটা ঘর শ্যামলাল মোতার। সাদা ধপধপে চাদরে মোড়া মাঝের এক-তৃতীয়াংশ। দেয়ালে লাগানো পাশাপাশি তিনটি তাকিয়া। ডান দিকে দুটো লাল টেলিফোন। তাকিয়ায় হেলান দিয়ে ডান চোখে প্রশ্ন করছিল। বাঁ চোখটা শিউচরণের দিকে। ট্যারা মানুষকে পছন্দ করে না অনুপম। শ্যামলালের ঘরের সামনে ট্যাপ। ট্যাপ থেকে জল ভরতে ভরতে উত্তর দিয়েছিল সে, “আনন্দদার কাছে। উনি আমাদের গাঁয়ের লোক।”

“অ। তা কী করা হয়?” প্রশ্ন করেছিল শ্যামলাল।

“চাকরি খুঁজছি...” বলতে বলতে বালতিটা জলে ভরে এসেছিল।

শিউচরণ দাঁড়িয়ে ছিল পাশে। ফিসফিস করে বলেছিল, “ঠিকুজি-কুষ্ঠি মনে আছে? যদি না থাকে তো কেটে পড়ুন।”

পিছল সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে উঠতে শ্যামলালকে আড়চোখে একবার দেখেছিল অনুপম। কিছুক্ষণ পর উপরে উঠে এসেছিল শিউচরণ। গলা নামিয়ে বলেছিল, “বাবুর কাছে একদম ঘেঁষবেন না, দূর থেকে দেখবেন‌, দেখতে খুব ভাল লাগবে। এ নেড়েচেড়ে দেখার জিনিস নয় বুঝলেন!”

মনে-মনে হেসেছিল অনুপম। দারুণ কথা বলে তো লোকটা! তা অনুপমের কী এমন দায় যে, সে তার মনিবের কাছে যাবে? সে মাথা নেড়েছিল। সাবধান করেছিল শিউচরণ, “আমার সঙ্গে আড়ালে কথা বলবেন, সামনাসামনি আমি আপনার শত্রু।”

একদিন মফস্সল থেকে কলেজ স্ট্রিটে কম্পিটিটিভ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র কিনতে আসার পথে হাওড়া স্টেশনে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছিল সে। কুড়ি বছরের যুবক অনুপম নিজের চোখে বিশ্বাস করতে পারছিল না, একটি শহরে এত মানুষ কেন সকাল ন’টার মধ্যে ঢুকে পড়ে? এত লোক কোথায় যায়? দারুণ এক গতি অনুভব করেছিল সে। কী কাজ করে ওই কোটি কোটি লোক এই শহরে? অনুভব শুধু নয়, নিজেকেই স্রোতের মধ্যে মিশিয়ে দেওয়ার তাগিদও টের পেয়েছিল। যে করেই হোক এই শহরে চলে আসতে হবে। একদিন আনন্দদার সঙ্গে দেখা। মনের কথা লুকিয়ে রাখেনি অনুপম। আনন্দদা বলেছিল, “থাকতে পারলে থাকো, তবে চাকরি পেলেই ছেড়ে দিতে হবে।”

রাজি, এক কথায় রাজি। একদিন ছোট্ট একটা বেডিং হাতে সোজা চলে এসেছিল এই গোলকধাঁধায়। সে দিনটা ছিল রবিবার। সমস্ত বাড়িটা ঘুমন্ত মনে হয়েছিল। দু’-এক জনকে সিঁড়িতে দেখেছিল। তার পর সোজা আনন্দদার ঘরে।

একদিন আনন্দদা অফিস থেকে ফিরে জিজ্ঞেস করল, “কী, রাতে শুতে কোনও অসুবিধে হচ্ছেনা তো?”

“না, না কোনও অসুবিধে নেই,” বলে অনুপম কৃতজ্ঞতায় মাথা নিচু করেছিল।

“কষ্ট হলে একটু মানিয়ে নিয়ো…” বলতে বলতে তাস খেলতে চলে যায়।

মনে মনে ভাবে অনুপম, অসুবিধে আর কী! সাত ফুট বাই চার ফুট ঘর। এই ঘরেই স্টোভ জ্বেলে রান্না করে খাওয়ার পর একটা মাদুর পেতে দু’জনে অনায়াসে ঘুমিয়ে পড়া যায়। ফুটবল খেলার অভ্যেস থাকলে অন্য কথা। অনুপমের তা নেই, আর নেই বলেই সে চিত হয়ে শুয়ে পড়েছিল মাদুরের উপর। আনন্দদা শোবে একটু দেরিতে।

অগণিত নক্ষত্র চোখে পড়ে দরজার ফাঁক দিয়ে, উন্মুক্ত আকাশে। অনেক উপরে নক্ষত্রের মধ্য দিয়ে পেরিয়ে যায় উড়োজাহাজ, অজানা কোনও গন্তব্যের দিকে। আকাশের ঘন কালো রঙের প্রেক্ষাপটে অচেনা নক্ষত্রের পতন হয় নিঃশব্দে। অনুপম চিত হয়ে শুয়ে নিজেকেই প্রশ্ন করে। এত দূর কেন এসেছে সে, আর এখান থেকে কোথায়ই বা যেতে চায়? সুদূর দ্বারবাসিনী গ্রাম থেকে তার দৌড়টা সে দেখতে পায়। কিন্তু কী হতে চায়, তার কোনও দিকনির্দেশ তার চোখে সামনে ফুটে উঠল না।

ঝড়ের কোনও দিকনির্দেশ থাকে কি? এই সময়টা তো জীবনের ঝড়ের বয়স। একবার ভেবেছিল, পুলিশের চাকরি নিয়ে অন্যায়ের মোকাবিলা করবে সারাজীবন। হয়নি। হরেন সরকারের ছেলে মাস্টার হয়েছে মালদহ শহরে। মল্লিকদের ছেলে খেলার কোটায় রেলে চাকরি পেয়েছে। মুখুজ্জেবাড়ির বড় ছেলে মিলিটারিতে জয়েন করে সীমান্ত সামলায়। তার সে সব কিছু হয়নি। ঝড় তার কোন দিকে উঠবে, সে কিছুই জানে না। অন্ধকারের ভিতর কোনও এক নক্ষত্রের আলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সে মনের ভিতর গেঁথে নিয়েছিল উড়োজাহাজের পিছনের দুটো আলোর দপদপানি। তার পর কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল সে, বুঝতে পারেনি। সেই রাতে ঝড় এলঅন্য পথে।

ঘুম ভাঙার মুহূর্তে কারই বা নিজের উপর পূর্ণ কর্তৃ্ত্ব থাকে? অনুপমেরও ছিল না। সেদিন হঠাৎ মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেল। মাদুরের উপর উঠে বসতে গিয়ে কপালে খেল প্রচণ্ড জোরে এক ধাক্কা। হঠাৎ আঘাতে ঘুম ছিঁড়ে তাকিয়ে দেখল তাদের বিছানার উপরে একটা ক্যাম্প খাট। তার উপর একজন মানুষ। গভীর ঘুমে তার নাক ডাকছে। পাশে দেখল কপালের উপর হাত রেখে ঘুমিয়ে আছে আনন্দদা, আবছা আলোয় তার ঠোঁটদুটো ফাঁক, নাকের বদলে মুখে শ্বাস নেওয়ার শব্দ। উঠতে গিয়েও পারল না। আবার শুয়ে পড়ল অনুপম। ততক্ষণে ভিতরে অন্ধকার কিছুটা ফিকে হয়ে এসেছে। মানুষটার পুরো শরীর ক্যাম্প খাটের উপর। খুব বড়সড় মানুষ নয়, তবে ভারী। খাটের মাঝখান ঝুলে তার নাকের কাছাকাছি নেমেছে। অনুপম জোরে শ্বাস নিল একবার। মানুষটির পিঠের গন্ধ নাকে এসে লাগল। ভদ্রলোক আনন্দদার আত্মীয় নয়তো? ট্রেন ফেল করে হঠাৎ এসে পড়েছে গভীর রাতে? এ সব ভাবতে ভাবতে ফের ঘুমে ঢলে পড়ল।

সকালে ঘুম ভাঙলে সে দেখল ক্যাম্প খাটটা ঘরের এক পাশে লাগানো। আনন্দদা কলের সামনে আপনমনে দাঁত মাজছে। যে মানুষটা কাল রাতে নাকের একটু উপরে শুয়ে ছিল তার কোনও চিহ্ন নেই ঘরের কোথাও। কথাটা জিজ্ঞেস করেনি অনুপম। গ্রামে আনন্দদার তো দারুণ খ্যাতি, কলকাতায় সে একটা বাসার মালিক। এর চেয়ে বড় সম্পত্তির অধিকারী দ্বারবাসিনী গ্রামে আর আছে কে? মাঝে মাঝে সে যখন পাতলা পাঞ্জাবি গায়ে দেশে যায়, তখন মানুষ সম্ভ্রমের চোখে দেখে। কলকাতার গল্প সে অনর্গল বলে যায়। এমন ভাবে বলে যে, সে ইচ্ছে করলেই শহরটাকে শাসন করতে পারে। নেহাত সময় নেই, তাই করে না।

চাকরি করে সে একটা অফিসে। সেখানে সাহেবদের সঙ্গে সর্বক্ষণ ওঠা-বসা। কাজের চাপ এত বেশি যে, কোনও দিনই ঠিক সময় বাসায় ফেরা হয় না। তাই দেশ থেকে কলকাতায় এসে তার সঙ্গে দেখা করতে চাইলে সে নানা অছিলায় এড়িয়ে যায়। এমন এক একটা অসুবিধের গল্প ফাঁদে যে, মানুষ লাজলজ্জার মাথা খেয়ে তার কাছে আর আসার প্রস্তাব করে না। এ সত্ত্বেও অনুপম করেছিল। কেন যেন এড়িয়ে যেতে পারেনি আনন্দদা, বাড়তি আগ্রহের রাশ টেনে ধরেছিল অনুপম নিজেই।

একটু একটু করে চারপাশ ধীরে ধীরে চিনতে থাকে অনুপম। সকালে আনন্দদা রান্না করে অফিস বেরিয়ে গেলে করোগেটেড ছাদ রোদে আগুন হয়। একতলার বড় বড় দোকানগুলো শক্ত লোহার দরজার তালা খোলে। দোতলার এক দিকে লম্বা কাঁসার বাসনের আড়তে ঝনঝন শব্দে বাসন নামায়। অন্য দিকে ঝাঁটাকাঠির পাইকারি ব্যবসাদার মাদ্রাজ উপকূল থেকে আসা ঝাঁটাকাঠির কোয়ালিটি পরীক্ষা করে। ওজন মিলিয়ে নেয়। বিশাল বান্ডিল থেকে দু’-একটা ঝাঁটাকাটি ফসকে মাটিতে পড়লে মুটেকে গালাগাল করে, “হারামজাদে, ইয়াদ রাখনা, ইয়ে তেরা জান সে ভি ভ্যালুয়েবল চিজ হ্যায়।”

মনে মনে হাসে অনুপম। জীবনের থেকে মূল্যবান এই ঝাঁটাকাঠি? পাউরুটি কিনে নীচ থেকে উপরে উঠে আসতে আসতে ভাবে অনুপম, লোকটি রসিক বেশ।

তিনতলার মুখে শিউচরণ। গুড়াখু মুখের মধ্যে ঠেলতে ঠেলতে এক গাল হাসে। তার পর দেওয়ালের গায়ে দু’বার পিক ফেলে প্রায় কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিসিয়ে বলে, “আপনার ঘরের নাড়ুবাবু চলে গেছে?”

“কে নাড়ুবাবু?”

“ওই যে অনেক রাতে এসেছিল?”

“তার সঙ্গে দেখা হয়নি তো। ভোরে উঠেইচলে গেছে।”

কথাটা বলতেই শিউচরণের মুখের রেখার পরিবর্তন লক্ষ করে অনুপম। শিউচরণ আবার পিক ফেলে। তারপর বলে, “কিছু মনে করবেন না দাদাবাবু। আপনার বাবু লোকটাকে আট আনার ফারাকে আমার কাছ থেকে ভাগিয়ে নিল। আমি দিনে দশ টাকা নিচ্ছি, আনন্দবাবু সাড়ে ন’টাকায় ফুসলে নিল। তা আপনার কাছে কত নিচ্ছে?”

অবাক হয় অনুপম। তা হলে ভদ্রলোক আনন্দদার কেউ নয়?

মাথার মধ্যে রাতের দৃশ্যটা টানটান ভেসে ওঠে। শিউচরণ একটু হেসে আবার জিজ্ঞাসা করে, “কী, বলতে বারণ আছে নাকি দাদাবাবু?”

বিরক্ত হল অনুপম। একটু গম্ভীর গলায় বলল, “তা জেনে তোমার কী লাভ?”

“আছে বইকি। বাজারের দরের ওঠানামা জানতে হবে না?”

বাজার! কিসের বাজার? বুঝতে পারে না। সে শিউচরণকে আড়চোখে দেখে এক বার। তার পর ধীরে উপরে উঠে আসে।

২

ছাদের উপরে ছোট ছোট কুঠুরি। সেখানে বেশিরভাগ ওড়িশার লোক। তারা শিউচরণের কথা অমান্য করে না। শিউচরণ ঠিক কোথায় থাকে, জানে না অনুপম। তবে সে শ্যামলালজির কাছে এক অদ্ভুত চাকরি করে। ঠিক এগারোটা নাগাদ শ্যামলালজি খালি গায়ে এক বোতল তেল সামনে রেখে বসে। শিউচরণ তার পিছনে বসে দু’হাতে তেল নিয়ে শ্যামলালজির ঘাড়ে ও কাঁধে থাবড়ে থাবড়ে তেল মাখায়। তেলের বাটিটা সামনে রাখে শ্যামলাল, যাতে শিউচরণ বেশি তেল একবারে না নেয়। কথাটা বলতে বলতে শিউচরণ চোখ টিপে হেসে ছিল একদিন, “জানেন, সবটুকু তেল চামড়ায় ঢোকাতে ঘড়ি ধরে দু’ঘণ্টার মালিশ।” তবে তার দিনের প্রথম কাজ শেষ হয়। এ খাটনি কি কম? আর ওই তেলা শরীরে রোজ রোজ তেল ঢোকানো কি চাট্টিখানি কাজ? মাইনে দেয় দুশো টাকা। শিউচরণের তাতে কোনও ক্ষোভ নেই।

ক্রমশ

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Bengali Literature Bengali Novel

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy