E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

দেখা হবে

“বাবা, আপনার ঘরে গিয়ে বসুন। আমি চা-জলখাবারের ব্যবস্থা করি। বিকেলের মধ্যে আপনার ছেলে চলে আসবে।”

বিপুল দাস

শেষ আপডেট: ০৫ জুলাই ২০২৬ ০৬:২৬
ছবি: কুনাল বর্মণ।

ছবি: কুনাল বর্মণ।

পূর্বানুবৃত্তি: প্রিয়তোষকে ওর বাবা বলেছিলেন গান-বাজনা এক আশ্চর্য নেশার মতো। রক্তের সঙ্গে মিশে ছুটে চলে এক প্রজন্ম থেকে আর এক প্রজন্মে। নীলিমাকে দেখলেই প্রিয়তোষের মনে হয়, সে এই পৃথিবীর কেউ নয়। তার চোখে যেন হাজার হাজার বছরের অভিমান মেঘের মতো ঘনীভূত হয়ে আছে। বহু দিন পর চা-বাগান থেকে পলাশগুড়ি ফিরলেন রামপ্রিয় ডাক্তার। বকুলডাঙায় ফিরলেন নিজের বাড়িতে। ইচ্ছে ছিল তাঁর জ্যোতির্বিজ্ঞানের বইপত্র এবং পুরনো গানের রেকর্ডগুলো নিয়ে যাবেন চা বাগানে। বাড়ি ফিরে নন্দার সঙ্গে দেখা হল তাঁর। শুনলেন মন্টুর অ্যাক্সিডেন্ট-এর কথা। ওদিকে শ্বশুরমশাই বই এবং গানের রেকর্ড ফিরিয়ে নিয়ে যেতে এসেছেন শুনে বুক কেঁপে উঠল নন্দার। কারণ রাগের মাথায় তার শাশুড়ি চন্দ্রা তো সমস্ত নষ্ট করে ফেলেছেন। শশুরমশাইকে দেখে খারাপই লাগল ওর। মনে হল, এমন একজন উদার ভাবনাচিন্তার আধুনিক মানুষের সঙ্গে কী করে মিল হবে তার শাশুড়ির মতো মানুষের।


চা-বাগানে তার শ্বশুরের দ্বিতীয় সংসারের কথা শুনেছে নন্দা। ঠিক করেছেন ডাক্তারবাবু। বছরের পর বছর চা-বাগানের নির্জনতায় কেন একা থাকবেন! জীবন একটাই মানুষের। অপূর্ণ ইচ্ছেগুলো নিয়ে কেন মরে যাবে মানুষ? মনের মানুষ যদি পেয়ে থাকেন, তবে কার কী আসে যায়? আর সন্তান তাঁদের একটা হয়েছে বটে, নিতান্ত জৈবিক কারণেই হয়েছে। নন্দা শিয়োর, শিবু তাঁদের ভালবাসাহীন মিলনের ফল। তা ছাড়া, নন্দা বুঝেছে কোনও কালেই ওঁদের দু’জনের মধ্যে ভালবাসা ছিল না। আইনত এখনও তাঁকে এই শুকনো সম্পর্কের মৃতদেহ বয়ে যেতে হচ্ছে।

“বাবা, আপনার ঘরে গিয়ে বসুন। আমি চা-জলখাবারের ব্যবস্থা করি। বিকেলের মধ্যে আপনার ছেলে চলে আসবে।”

“ঠিক আছে, ব্যস্ত হোয়ো না। এবার কিছু দরকারি কাজ করে যেতে হবে। থাকব দু’-চার দিন।”

“একটা কথা, এক জন প্রোমোটার বার বার জানতে চাইছে এ বাড়ি বিক্রি করার কথা কিছু ভাবছি নাকি আমরা। বলেছে আপনি এলে খবর দিতে। যত দূর জানি, লোকটার পলিটিক্যাল কানেকশন ভাল। কথার সুরে মনে হল যেন চাপ দিচ্ছে। দুটো ফ্ল্যাট আর ভাল ক্যাশ দেবে বলছে। আমার কিন্তু ভাল লাগেনি ব্যাপারটা। ফোন নম্বর দিয়ে গেছে। আপনি নিজে কথা বলুন তো ওর সঙ্গে। বাড়িতে এখন লোকজন অল্প, কিছু করার বলভরসা পাই না। আপনি কিন্তু এবার মাকে এক জন ভালডাক্তার দেখাবেন।”

নন্দার কথা শুনে ভুরু কুঁচকে তার দিকে তাকালেন রামপ্রিয়। চন্দ্রার কি কোনও বড় অসুখ করল নাকি! সাধারণ কিছু হলে তিনিই ওষুধ বলে দিতে পারবেন, কিন্তু তেমন কিছু হলে স্পেশালিস্ট দেখানোই ভাল।

“কেন, তার আবার কী হল? মাথার গোলমাল কি বেড়েছে?”

“সে আপনি কথা বললেই বুঝবেন। আমার মনে হচ্ছে সাইকিক প্রব্লেম। আঁচলে সব সময় একটা কালো পাথরের গোপাল বেঁধে রাখেন। বিছানায় তাঁর পাশেই গোপালের বালিশ, চাদর। আরও একটা সমস্যা... পরে বলব, আপনার চা করে আনি।”

“শোনো, আমার বইয়ের ঘরের চাবিটা এনো তো। কিছু বই এবার নিয়ে যাব ভাবছি।”

“ঘর খোলা আছে।”

“সে কী! কে খুলল ওই ঘর?”

রীতিমতো ভয় পেল নন্দা। থমথম করে বাজল শ্বশুরমশাইয়ের গলা। বাজখাঁই চিৎকার নয়, কিন্তু চাপা গলাতেই রাগ শুনতে পেল নন্দা। সত্যি কথাই বলা ভাল। লুকিয়ে কী লাভ! অন্য কেউ কেন এই দায় ঘাড়ে নেবে? যে পাগলামি করেছে, সে বুঝুক। মহিলা কোনও দিন এই লোকটাকে বোঝার চেষ্টাই করেনি। সংসারের দুই প্রান্তে দু’জন অপরিচিতের মতো থেকে গেছে। লোকটার কী দুর্ভাগ্য!

“এক দিন মা খুলেছিলেন। আমি বারণ করেছিলাম, মনুমাসিও না করেছিল। রেকর্ড, বই… সব উনি নষ্ট করে ফেলেছেন। মাথা গরম করবেন না। অসুস্থ মানুষ, মানসিক পেশেন্ট। বুঝতেই পারছেন, হঠাৎ হঠাৎ ভায়োলেন্ট হয়ে ওঠে এরা। আপনি আমার থেকে ভালই জানেন। তখন থামাতে গেলে একটা বিশ্রী কাণ্ড ঘটে যায়।”

“সে কোথায়?”

“সারা দিন তো ঠাকুরঘরেই বসে থাকেন। ওঁকে ডেকে দেব?”

“না, আমিই যাচ্ছি। বইগুলো সব কি একদম নষ্ট হয়ে গেছে?”

“কেরোসিন ছড়িয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছেন। রেকর্ডগুলো চাকতির মতো বাতাসে ছুড়ে দিয়েছেন। আর, তখন তো সামনে যাওয়া যায় না...”

রামপ্রিয় ঠাকুরঘরের সামনে গিয়ে চাপা গলায় ডাকলেন, “চন্দ্রা...”

ভিতরে ঘণ্টা বাজছিল, ডাক শুনেই থেমে গেল। তার পরই ভয়ঙ্কর একটা চিৎকার শোনা গেল ভিতর থেকে, “মনু, আমার ঝ্যাঁটাটা দে তো! লম্পটটার এত সাহস, আমার ঠাকুরঘরের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। শয়তানের বাচ্চার আজ ঝেঁটিয়ে বিষ নামিয়ে দেব। কুত্তার বাচ্চা, হারামি, রস কমেনি এখনও! শালা ভাদ্রমাসের কুত্তা। যা না, বাগানে গিয়ে রাসলীলা কর! কী চাই এখানে!”

স্তম্ভিত হয়ে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইলেন রামপ্রিয়। একটু দূরে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে নন্দা। এ লক্ষণ তাঁর চেনা। এ রকম পেশেন্ট তিনি দেখেছেন। চা-বাগানের অনেক জোয়ান পুরুষ তাদের যুবতী বৌদের রেখে কাজের খোঁজে বাইরে চলে যায়। প্রথম প্রথম বছরে এক-দু’বার আসে। তার পর আর আসে না। সে রকম দু’টি বৌকে তিনি দেখেছিলেন। ওরা ওঝা ডেকে আনে। সবাই জানে ওই সময় অশুভ আত্মা ভর করে মেয়েটার উপর। তাকে দিয়ে নোংরা কথা বলায়। শোনার জন্য লোকজন ভিড় করে থাকে। শাড়ি-ব্লাউজ়ের কোনও হুঁশ থাকে না।

ডাক্তারবাবু জানেন, অবদমিত যৌনকামনার বিকৃত প্রকাশ এই ভর ওঠা। পৃথিবীর সমস্ত মানুষের উপর, সফল মানুষের উপর, সুখী মানুষের উপর, সংহত সিস্টেমের উপর যে অসহায় রাগ জমে থাকে ভিতরে, সেটাই আসলে রিলিজ় হয় ওই অশ্রাব্য নোংরা কথার ভিতর দিয়ে। তখন সে নিয়মের দুনিয়ার বাইরের মানুষ। অপূর্ণ বাসনা তাকে পাগল করে দিয়েছে।

শিথিল পায়ে ঘরে ফিরে এলেন রামপ্রিয় ডাক্তার। পুরনো ঘরে আর ঢুকতে ইচ্ছে হল না। কী হবে আর ও ঘরে গিয়ে? তাঁর প্রিয় বইগুলো, সৃষ্টিরহস্যের কথা, রেকর্ডে ধরে রাখা গানের আখরে সুরের মায়া— সব শেষ হয়ে গেছে। কী শাস্তি দেবেন তিনি চন্দ্রাকে! শাস্তি দিয়েই বা কী লাভ এখন!

“নন্দা, আমি প্রেসক্রিপশন করে দিয়ে যাচ্ছি। শিবুকে বোলো ওষুধগুলো এনে ঠিকঠাক খাওয়াতে। না খেতে চাইলেও জোর করেই খাওয়াবে। কাউন্সেলিং করাতে পারলে ভাল হত। সে তোমরা যদি পারো, শিলিগুড়িতে গিয়ে করাতে পারো। আমার চেনা সাইকায়াট্রিস্ট আছে, সোমা বোস, আমি না-হয় ফোন করে বলে দেব। কয়েকটা সিটিং দিয়ে দেখো। দরকার মনে হলে উনি ওষুধ পাল্টেও দিতে পারেন। মন্টুকে খবর দাও, কালই যেন এক বার আসে। আমি কাজ সেরে পরশুই ফিরব। আমি থাকলে চন্দ্রা এক্সাইটেড হয়ে পড়বে, হয়তো আরও বাজে সিন ক্রিয়েট করবে।”

দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নিচু করে বসে রইলেন রামপ্রিয়। দুঃখী মানুষটার দিকে তাকিয়ে রইল নন্দা। শ্বশুর না হলে লোকটাকে বুকে জড়িয়ে সান্ত্বনা দিত সে। খাটে বসে আছেন রামপ্রিয়। নন্দা গিয়ে পাশে বসল। তার দিকে ফিরে তাকালেন ডাক্তার। বড় ভাল এই মেয়েটা। শিবু মনে হয় মেয়েটাকে তেমন বুঝতে পারেনি। কে জানে ওদের মিলমিশ কেমন হয়েছে! দুঃখ না পায় মেয়েটা!

নন্দার মাথায় হাত রাখলেন তিনি। তার কাঁধে মাথা রাখল নন্দা। কেন যেন তার চোখে জল আসছিল। কই, ‘বাবা’ ছাড়া আর কিছু তো মনে হচ্ছে না। তারও ইচ্ছে করছে বাবার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে, চুলে বিলি কেটে দিতে। শরীর নয়, তার বুকের ভিতরে মায়া উপচে উঠছিল।

“বাবা!” ফিসফিস করে বলল নন্দা।

তার বার বার ‘বাবা’ বলে ডাকতে ইচ্ছে করছিল। টনটন করছিল বুকের ভিতর। তার বুকের মাঝে বুড়োমানুষটার মাথাটা নিয়ে চেপে ধরতে ইচ্ছে করছিল।

১৩

“বুজ্জেননি, আমার ফেমিলি না থাকলে এই বাগান হইত না। তার উপরে বৈকালে পিঁয়াজি আর আলুর চপ বানায়। খুব চলে। চায়ের লগে, বুজ্জেননি, যেমুন ঠান্ডা পড়ছে, কাস্টমাররে দিয়া সারতে পারি না।”

“মালতী কি তোমার বৌয়ের নাম? বাগানে ঢোকার মুখে গোল গেটের সামনে লেখা রয়েছে ‘মালতী-নিকুঞ্জ’। তাই ভাবলাম...”

“আমার মা আর বাবা। ওই পারে যুদ্ধ লাগল, আমাগো আর লক্ষ্মী থাকল না। পালে পালে লক্ষ্মীছাড়ার দল আপনাগো দ্যাশে আইস্যা পড়ছি। তার ঘট, তার আসন ফালাইয়া বাবা-মারে নিয়া এই পারে আসলাম। মন মানে না, ঠাকুরের আসন পাতল আমার মায়ে। আসল লক্ষ্মী হইল গিয়া ধানের গোলা। সেইটি গেল গিয়া। আপনারে কইতে আর কিসের লজ্জা, অপমানের ভয়, ইজ্জত যাওনের ভয়। যারা কুনোদিন চোখের দিকে তাকাইয়া কথা কওনের সাহস পায় নাই, তারা সিধা আইস্যা বারান্দায় উইঠ্যা মোড়ায় বসে। চালের টিন কয় সালের পুরানা তালাশ করে। পুষ্কর্নির মাছ কেমুন জিগায়। ঘাড় উঁচাইয়া ঘরের ভিতর দেখবার চায়। দাড়ি ধইরা মোচড় দ্যায় আর ফিচিক ফিচিক হাসে। আমার বাবায় হাসে, দেইখা আমিও হাসি। অরা আরো জুরে হাসে। শ্যাষে আমরাই চুপ মাইরা যাই। হাসতে গেলে তো বুক ভইরা বাতাস নেওন লাগে। হিন্দুরা অত বাতাস কই পাইব। হিন্দুগো লাইগ্যা বাতাস কম আছিল। শ্বাসকষ্ট। সেই ব্যাদ্‌না আপনারা বুঝবেন না। অরা আমাগো ঘরদুয়ার বাগান দ্যাখে আর দুর্যোধনের মতো উরুতের উপর থাপড় মারে। লুঙির উপর দিয়াই। বুকের ভিতর কেমুন য্যান করত। বিশ্বাস করেন, ভয় করত। শ্যাষের দিকে ‘আল্লাহু আকবর’ শুনলেই শরিলটা কাঁইপ্যা উঠত। মনে হইত জ্বর আসতাছে বুঝি। বুক ভইরা বাতাস নিতে গেলে মনে হইত, এই বাতাস আর আমাগো নাই। ধানখ্যাতের দিকে আর তাকাইতে পারতাম না। চক্ষুতে আপনিই জল অ্যায়া পড়ত। নাইরহল, সুপারি, পুষ্কর্নির জল— সব ঝাপসা দেখতাম।”

“আমার জন্ম অবশ্য এ দেশে, কিন্তু আমাদেরও শিকড় ও-পারেই। পূর্বপুরুষেরা অনেক আগেই চলে এসেছিলেন। আমিও রিফিউজি কলোনিতে বড় হয়েছি। শিকড় ছেঁড়ার কষ্ট কিছুটা বুঝি।”

“জঙ্গল নিকাশি দিয়া চাষের জমি হাসিল করলাম আমরা। এদেশি রাজবংশী বসতি ছিল এইহানে। অরা আমাগো দেইখ্যা হাসে, কয় যে এই জমিন নাকি ব্রহ্মডাঙা। একগাছি শেয়ালকাঁটাও গজায় না। তার পর যখন সেই জমিনে ফসল ফলল, অরা তো অবাক। কয়, আমাগো হালবলদে জাদু আছে। আসলে এরা অলস। খাটবার চায় না। বাবা-মায়ে দেহ রাখল। আমি আরও জমিন খরিদ করলাম। পরে জমির পাট্টা দিল সরকার। বিয়াশাদি করলাম। দুঃখ একটাই, বাবা পোলার বৌয়ের মুখ দেইখা যাইতে পারল না।”

মন্তেশ্বরের বাগানে চমৎকার রোদ এসে পড়েছে। বেতের চেয়ারে বসে আছে মনোতোষ। গোলাপ গাছের গোড়া খুরপি দিয়ে মাটি আলগা করে দিচ্ছিল মন্তেশ্বর। কথা বলছিল মনোতোষের সঙ্গে। নন্দা ঘুরে ঘুরে ফুলগাছ দেখে বেড়াচ্ছে।

সেরে ওঠার পর ক’দিন স্কুটার চালাতে ভরসা পায়নি মনোতোষ। মনে হত তার রিফ্লেক্স কমে গেছে বোধহয়। ভিড়ের ভিতর চালাতেই পারবে না। সামনে হঠাৎ বড় গাড়ি এসে পড়লে স্কুটার কন্ট্রোল করতে পারবে না। শেষে ভাবল— না, এই ভয় জয় করতে হবে। সাহস করে গাড়ি নিয়ে বেরোতে হবে। এর মাঝে এক দিন নন্দা এল।

“চল নন্দা, এক দিন তোকে নিয়ে স্কুটারে করে পালিয়ে যাই।”

“ক’ঘণ্টার জন্য? তোদের মুরোদ তো দশ মিনিট। সত্যি যাবি? সবাই দেখ কী সুন্দর হইহই করে পিকনিকে যাচ্ছে। তোর শিবুকাকা নিজের শখ মিটিয়ে বেড়াচ্ছে। আমাকে বিয়ে না করে বেশ একটা চকচকে আঁশের পেটমোটা ইলিশমাছ বিয়ে করলে পারত। মৎস্যকন্যা নিয়ে সংসার করত। বল, আমার কি কোনও সাধ-আহ্লাদ থাকতে নেই? নেই নেই করেও সংসারে লোক এখনও কম নয়। তাদের সবার দেখাশোনা, এক পাগল শাশুড়ি, ঘরবাড়ি, বাজারঘাট— কেন, সব কেন আমাকেই দেখাশোনা করতে হবে! আমি কি রক্তমাংসের মানুষ নই, আমার মন কি পাষাণ হয়ে গেছে?”

“ভাল কথা, আমি সেই সাইকায়াট্রিস্টের খবর নিয়েছি। হাকিমপাড়ায় চেম্বার। কিন্তু, তুই কি তোর শাশুড়িকে সেখানে নিয়ে যেতে পারবি? জেঠিমা কি রাজি হবে? কাউন্সেলিং-এর জন্য তো সিটিংদিতেই হবে।”

“জানি না। বলে দেখব। আমার আর কিচ্ছু ভাল লাগছে না। আমারও বোধহয় কাউন্সেলিং দরকার। উফ, মাইরি বলছি পাগল হয়ে যাব আমি। তুই বুঝতে পারছিস না মন্টু, আমারও ডিপ্রেশন শুরু হয়েছে।”

“বাজে কথা বলিস না বেশি। চল, সামনের রোববারে কোথাও ঘুরে আসি। তুই সংযুক্তার মতো আমার পিছনে সওয়ার হবি, আমি পৃথ্বীরাজের মতো অ্যাক্সিলারেটর চাপব। নতুন বাইপাসে একটা চমৎকার জায়গা আবিষ্কার করেছি। তোর ভাল লাগবে। এ কী, কাঁদছিস! বোকা মেয়ে, দেখি দেখি...”

আর পারল না নন্দা। মনোতোষের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। অনেকক্ষণ ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদল নন্দা। তাকে এক হাতে বুকের ভিতরে জড়িয়ে রেখে কাঁদতে দিল মনোতোষ। তার বুকে মাথা ঘষল নন্দা। মনোতোষও আর পারল না। দু’হাতে নন্দার মুখ তুলে ধরল। তার পর, কালো আকাশ দেখলে যেমন মনে হয় এই বার আকাশ নেমে আসবে, সমস্ত মেঘপুঞ্জ প্রথমে স্তম্ভাকারে, তার পর শঙ্কুর মতো সূচ্যগ্র হয়ে নেমে আসে পৃথিবীর দিকে, তেমনই মনোতোষের ঠোঁট নেমে এল। নন্দা তৃষিত চাতকের মতো ঠোঁটদুটো উপরে মেলে ধরল।

“আরও, আরও আদর করো আমাকে।”

এবার হাজার বছরের তৃষ্ণা নিয়ে মরুভূমির মতো প্রবল হিংস্রতায় মনোতোষকে শুষে নিল নন্দা।

মনোতোষ টের পেল অবিশ্বাস্য দ্রুততায় তার পুরুষশরীর জেগে উঠছে। কোনও একটা চূড়ান্ত বিন্দুতে পৌঁছনোর জন্য শরীর জুড়ে হাহাকার শুরু হয়েছে। বিছানায় তার বুকের উপর শুয়ে অসম্ভব ধবল একজোড়া তীক্ষ্ণতা নিয়ে তাকে ঢেউয়ে ভাসাতে চাইছে নন্দা। ডুবে যাচ্ছে মনোতোষ। একফোঁটা বাতাসের জন্য বুকের ভিতরে হাঁসফাঁস করে উঠল। নন্দার উন্মুক্ত দুই ধবল স্তনভার ক্রমশ অচেনা এক সবুজ রহস্যময় জগৎ হয়ে যাচ্ছে। এক বিন্দু বাতাসের জন্য ফুসফুস ফেটে পড়তে চাইছে। জলজ লতাগুল্মের মতো নন্দার হাত-পা তাকে মৃত্যুর দিকে টেনে নিচ্ছে। মাথার কোথাও একটা আপৎকালীন সতর্কবার্তা বেজে উঠল— ‘এই বেলা উঠে আয়, নইলে তোর মরণ।’ এক ধাক্কায় তীর্থকে বিচ্ছিন্ন করে জলের উপরে ভেসে উঠল মনোতোষ। দেখল, তীর্থ নয়, নন্দা শুয়ে আছে। অবাক চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে।

“শোন, পাঞ্জাবিটা কাজের মেয়েকে কাচতে দিস না যেন। নিজে ধুয়ে দিস।”

মনোতোষকে বোকার মতো তাকাতে দেখে নন্দা হাসল, “বোকারাম, সাদা পাঞ্জাবিটার কী অবস্থা হয়েছে, তাকিয়ে দেখ। না, কাচিস না। এটা আমি প্রমাণ হিসেবে রেখে দেব। আর শোন, ঠোঁটে কিছু লাগাস। বেশ ফুলে উঠেছে এখনই। তোর কোলিগরা জিজ্ঞেস করলে কী বলবি?”

“নন্দা, স্যরি, যা হয়ে গেল, মানে হঠাৎ...”

“পাপবোধে ভুগছিস? কেন, ওই মুহূর্তটুকু কি ভাল লাগেনি তোর? আমি জানি, তুইও জানিস ওইটুকু স্পর্শ ভালবাসাহীন। ভালবাসা মুহূর্তে তৈরি হয় না। সময় লাগে। মুহূর্তে ক্ষণিকের একটা মোহ তৈরি হয়। তোর আর আমার মধ্যে তো ভালবাসার চেয়েও বেশি কিছু সম্পর্ক রয়েছে। তুই চাইলে আমি এখনই তোকে সব দিতে পারি। জানি, তুই নিতে পারবি না। সত্যি করে বল তো, আমার উপর তোর কি দুর্বলতা আছে? আমি তোর চোখের দিকে তাকালে তুই সরাসরি আমার চোখের দিকে তাকাতে পারিস না। চোখ সরিয়ে নিস। আমাকে নিয়ে তোর কোথাও একটা জড়তা আছে, ভয় আছে। আমি কি নদী নাকি যে, ডুবে যাওয়ার ভয় পাস?” নন্দার চোখের তারায় রহস্য।

ক্রমশ

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Bengali Novel Novel

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy