পূর্বানুবৃত্তি: রামপ্রিয় ডাক্তারের সংগৃহীত সমস্ত বইপত্র এবং গানের রেকর্ডগুলো যে তাঁর স্ত্রী চন্দ্রা আক্রোশবশত নষ্ট করে দিয়েছেন, সে কথা নন্দা জানায় রামপ্রিয় সান্যালকে। রামপ্রিয় তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে গেলে চন্দ্রা কুৎসিত ভাষায় তাঁকে অপমান করেন। রামপ্রিয় তাঁর চেনা মনোবিদের নাম বলে দেন, যাতে তাঁর কাছে চন্দ্রাকে দেখানো হয়। অন্য দিকে, মনোতোষ সেরে উঠেও স্কুটার চালাতে সাহস করছিল না। নন্দা তাকে সাহস দেয়। পারস্পরিক কথোপকথনের সময় মুহূর্তের দুর্বলতায় নন্দার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয় মনোতোষের। অপরাধবোধ ঘিরে ধরে মনোতোষকে। বৃদ্ধ মন্তেশ্বর ফুলের বাগানওয়ালা যে জমিটা বিক্রি করবে বলে আগে দেখিয়েছিল, সেইটা আবার নন্দার সঙ্গে দেখতে যায় মনোতোষ।
নদী, ডুবে যাওয়া— এ-সব শব্দে ভিতরে ভিতরে কেঁপে ওঠে মনোতোষ। মৃত্যুর কথা মনে পড়ে। জলের নীচে রহস্যময় সবুজ জগতের কথা। তীর্থর মরণ-আলিঙ্গন, নাকি যমের মরণ-আলিঙ্গন থেকে ফিরে এসেছিল মনোতোষ! ভেসে গিয়েছিল তীর্থপাগল।
দূর থেকে নন্দাকে দেখতে খুব ভাল লাগছিল মনোতোষের। আজ সালোয়ার-কামিজ পরেছে নন্দা। শাড়ি ছাড়া অন্য পোশাকে নন্দাকে দেখেছে বলে মনে করতে পারল না সে। গাঢ় নীল কামিজ, সাদা সুতোর কাজ করা, সাদা সালোয়ার। নন্দার ভারী গড়ন, একটা ওড়না ব্যবহার করা উচিত ছিল। প্রত্যেকটা গোলাপগাছের সামনে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে নন্দা। মুগ্ধ হয়ে ফুলগুলো দেখছে। সাদা, কমলা, মেরুন, হলুদ। তেমনই সাইজ়।
“মন্তেশ্বর, তোমার স্ত্রী কোথায়? তাকে তো দেখছি না। আলুর চপ বানাচ্ছে না কি? আমাদের খাওয়াবে না?”
“খাড়ান, অহনই চায়ের লগে দিতাছি। আপনি নিজের মুখে কইলেন, আমার পরম সৌভাগ্য। আমার বৌ ঘর থিক্যা বেশি বারায় না। শরিলে একটা খুঁত আছে। বাইরের লুকের কাছে লজ্জা পায়।”
“ও আচ্ছা, স্যরি। কিছু মনে কোরো না। না, তুমি এর আগের দিন বললে না, বাগান তোমার বৌ-ই দেখাশোনা করে...”
“তাইলে কই, অর বাঁ-ও হাতটা খারাপ। কুনুই থিক্যা বাঁশের কঞ্চির লাহান দুলে। কিন্তু মুখটা এক্কেরে লক্ষ্মীঠাকুর। ওই মুখ দেইখ্যাই আমি বিয়া করছি। সইত্য কমু, ঠকি নাই। এক হাতেই দশ হাতের কাম সারে। আমারে পুরা সাপোট দেয়, হেল্পার দেয়। আমার একার কী সাধ্য ছিল বাগান, চাষবাস,দুকান সামলানো।”
“আবার চাষবাসও করো?”
“কী কন? চাউল কিনা ভাত খামু নাকি? ওই, খোরাকিটা হইয়া যায়। এই দিকে আপনের জমির কাজের মুনিশ-মাইন্দরের বড় অভাব। এদেশি যারা আছে, না পারে কোদাল মারতে, না পারে হাল ঠেলতে। অগো দিয়াই কাজ চালাই।”
এতক্ষণে মনোতোষ পিছন ফিরে মন্তেশ্বরের ঘরবাড়ির দিকে তাকাল। দক্ষিণ, পশ্চিম আর পুবদুয়ারি, তিন ভিতেই ঘর রয়েছে। তার ভিতরে দক্ষিণদুয়ারি ঘর ছাদঢালাই। অন্যগুলো একটা চারচালা, একটা দোচালা। একটা কাঠের বেড়া, অন্যটা দরমার। উত্তরে একটু দূরে বাঁশঝাড় দেখা যাচ্ছে। একটা ধানের মরাই, একটা খড়গাদার মরাই। মরাই ঘেঁষে একটা কালো কুকুর তিন-চারটে বাচ্চা নিয়ে শুয়ে আছে।
“মন্তেশ্বর, একটা কথা বলো তো, তোমার এত সাধের বাগান-সহ এতটা জমি বিক্রি করে দিতে চাইছ, জমিতে কোনও গন্ডগোল নেই তো?”
“সে আপনি আমিন দিয়া সার্চিং করাইয়া নিয়েন। সন্দেহ থাকলে নিয়েন না। আপনারে তো জোর কইরা জমি গছামু না। আসলে তাইলে আপনারে কই, তাপুর মারে নিয়া ভেলোর যামু। এই রকম অসুখের নাকি ওইখানে ভাল চিকিৎসা হয়। এক বার দেইখা তো আসি। তিন জনের আসা-যাওয়া, থাকা-খাওয়া, চিকিৎসার খরচা— তাপুর মা আপত্তি করতাছে। কয় ‘আমার জন্য তুমি ফুলের বাগান বেচবা? আমারে দিয়া যদি কারঅ দুঃখ দূর হয়, মাইনষের মুখে যদি হাসি ফুটাইতে পারি, সেই হাসি কি ফুলের মত না, কন? আমার তো মনে কয় ফুলের চায়্যাও বেশি সুন্দর।’”
স্তব্ধ হয়ে কিছুক্ষণ বসে রইল মনোতোষ। প্রিয় মানুষের মুখে হাসি দেখবে বলে, তাকে নীরোগ করে তুলবে বলে, মানুষ তিলে তিলে গড়ে তোলা সম্পদ ছেড়ে যায়! লোভ, স্বার্থপরতা, হিংস্রতার দুনিয়ায় এমন মানুষ দেখলে মনে হয়, এই মাটির পৃথিবীতেই কোথাও এক টুকরো স্বর্গ নেমে আসে কখনও। সেই মানুষের পায়ের কাছে বসে আরও জীবনের পাঠ নিতে ইচ্ছে করে। বলো মন্তেশ্বর, আরও বলো। ভালবাসার কথা বলো। তোমার পায়ের কাছে একটি প্রণতি রাখলাম হে কৃষক। মন্তেশ্বর ঘরের দিকে গেছে। বোধহয় চা আর আলুর চপ আনতে।
সেদিন নন্দার সঙ্গে ঘটনাটা ঘটে যাওয়ার পর ভাল হল, না মন্দ— বুঝে উঠতে পারেনি মনোতোষ। ওই মুহূর্তের আনন্দ লহমায় ফুরিয়ে গিয়েছিল। স্বীকার করতে লজ্জা নেই, বুঝতে পারছিল তার পুরুষশরীর ক্রমশ জেগে উঠছে। শেষের দিকে তার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। শরীরকে অগ্রাহ্য করে মৃত্যুভয় তাকে ফিরিয়ে এনেছিল স্বাভাবিকতায়। নইলে নন্দার সঙ্গে সেদিন যেটুকু বাকি ছিল, হয়ে যেত। তার পর? শিবুকাকার সামনে সে কী ভাবে দাঁড়াত! একটা খুব বড় সাদা গোলাপের সামনে দাঁড়িয়ে আছে নন্দা। দৃশ্যটা মস্তিষ্কে ধরে রাখতে চাইল মনোতোষ। ইচ্ছে হল না মোবাইলে ছবিটা তুলে রাখতে। মোবাইলে সে ছবি খুব কম তোলে। মগজের অসংখ্য স্মৃতিকোষের অ্যালবামে তার প্রিয় ছবিগুলো জমা থাকে। আর্কাইভের মতো। স্কুলের পিকনিকে তিস্তার পাড়ে গিয়ে একটাও ছবি তোলেনি সে। দু’পাশের পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে গিরিখাত বয়ে তিস্তার চঞ্চল নেমে আসা, তার পর দু’পাশে পাহাড়ের বাঁধন ছেড়ে সমতলে ঝাঁপ দিয়ে নিজেকে অনেকটা ছড়িয়ে দিয়েছে। তখন আর সেই স্রোতের লীলাচঞ্চলতা নেই। চলন হয়ে গেছে প্রশান্ত, মুহূর্তেই যেন চঞ্চলা কিশোরী থেকে নারীতে বদলে যায় তিস্তা।
তাসপার্টি থেকে, লুকিয়ে নেশা থেকে, বাচ্চাদের ব্যাডমিন্টন থেকে দূরে গিয়ে পাহাড় আর তিস্তা দেখছিল মনোতোষ। পাহাড় সে অনেক দেখেছে। কিন্তু তিস্তার পারে দাঁড়িয়ে এভাবে নদী, অরণ্য আর পাহাড়ের সৌন্দর্য এর আগে কখনও এনজয় করেনি। উত্তরের নদী আর দক্ষিণের নদী, সেই একই তিস্তা। অথচ চরিত্রে কী আকাশপাতাল তফাত হয়ে গেছে সামান্য দূরত্বেই। বড় ক্যামেরা আর মোবাইলে সবাই খুব ছবি তুলছিল। দিদিমণিরা খুব হাসাহাসি করছে, সলমন শব্দটা কানে এল মনোতোষের। ভূগোলের নতুন মেয়েটি ক্যামেরা নিয়ে উঠে গেল।
সে আড়ালে চলে গিয়েছিল। শীতের নদী, স্বচ্ছ সবুজ জলের দিকে তাকিয়েই কেমন যেন শরীর শিরশির করে ওঠে। বালুচরে শুকনো কাশ রয়েছে এদিক-ওদিক। পুবে আর পশ্চিমে পাহাড়ি রাস্তায় গাড়ি চলাচল দেখা যাচ্ছে। খেলনা-গাড়ি মনে হয় ওগুলো। নদীর একদম ধারে একটা পাথরের উপর বসে জুতো-মোজা খুলে জলে পা ছোঁয়াল মনোতোষ। জল থেকে শীত উঠে এসে তার সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। বিশাল বড় বড় পাথরের চাঁই, জঙ্গলের ঘন সবুজ, আর তিস্তার প্রবাহের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ঘোর ধরে গেল মনোতোষের।
হলুদ-কালো ডোরা একটা প্রাণী পুবের জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এগিয়ে আসছে তিস্তার দিকে। তার চলন দেখে মনে হয়, গভীর জঙ্গলে তার প্রাচীন রাজধানী থেকে বেরিয়ে রাজামশাই পরগনার তালুক-মুলুক দেখতে বেরিয়েছেন। হয়তো জলপাইগুড়ির রাজবাড়ির খবর নিতে বেরিয়েছেন কোচবিহারের রাজার ছোট ভাই। দেখি না, কী হয়... নিশ্চুপ হয়ে ভয়ঙ্কর সুন্দরের দিকে তাকিয়ে রইল মনোতোষ। তখনই সুবীর এসে তার পাশে দাঁড়াল।
“লাহিড়ি, তোমার একটা দারুণ ছবি নিয়েছি। পাথরের উপর বসে আছ। চরণদু’টি ধুয়ে দিচ্ছে পাহাড়ি নদীর জল। তুমি উদাস হয়ে পুবের জঙ্গলে তাকিয়ে কী যেন দেখছ। তোমাকে ওয়টস্যাপে পাঠিয়ে দেব।” পলকে বৈকুণ্ঠপুরের বাঘ যেন বাতাসে মিশে গেল। ছবিতে কি শিষ্য সিংহ এসেছে— ভাবল জিজ্ঞেস করবে। নিশ্চয়ই আসেনি। তার পাশে আর এক জন মানুষ দেখে নিশ্চয় রায়কত সরে পড়েছিল।
ফেরার পথে, সেদিন যেখানে অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল, সে জায়গাটা পার হওয়ার সময় নন্দা হঠাৎ পিছন থেকে মনোতোষকে জড়িয়ে ধরল। আশ্চর্য সমাপতন! নন্দা তো জানে না, এখানেই সে প্রায় মরতে বসেছিল। সেদিন পিছনে ছিল ক্লার্ক নৃপেন। আজ রয়েছে নন্দা। তার শিবুকাকার বৌ। আজ আর কুয়াশা নেই, অনেক দূর পর্যন্ত স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে মনোতোষ। তবু মনে হচ্ছে, একটা সাদা গাড়ি কুয়াশার ভিতর থেকে নিয়তির মতো তার দিকে বিপজ্জনক ভাবে এগিয়ে আসছে। গ্রিপ-কভারে মুঠো শক্ত করে ধরে রইল মনোতোষ। নন্দার শরীরের তীক্ষ্ণ স্পর্শ পাচ্ছিল মনোতোষ। আজও কি নন্দা কালো ব্রা পরেছে?
১৪
অচেনা নম্বরের ফোন দেখে প্রথম দু’বার বিভু ধরেনি। একই নম্বর থেকে তৃতীয় বার ফোনটা এল রাত এগারোটার পর। বিভু লুঙ্গি পরে শুতে যাচ্ছিল। এবার ধরল। বার বার করছে, কোনও ইমার্জেন্সি ফোন হতে পারে। তার সঙ্গে কেউ কথা বলার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে। ফোন নিয়ে বারান্দায় এল বিভু।
“হ্যালো, কে বলছেন?”
“হুঁ, এবার তা হলে আপনার শুভবুদ্ধি হল। আমাকে চিনবেন না। আমি আপনাকে চিনি বাব্ল বয়। তারাকান্ত মজুমদারের ‘পদপল্লব’ নামে জুতোর দোকানও চিনি। একটু কথা বলার সময় হবে স্যর? আপনার মঙ্গলের জন্যই বলছি।”
বিভু বুঝল, পরিস্থিতি বিপজ্জনক। এই মুহূর্তেই সাত নম্বর বাব্ল বয় রয়েছে দোকানে। বাইরের কারও জানার কথাই নয়। এটা ভুজঙ্গই ম্যানেজ করত। সুইসাইড করার পর ওখানে ভূষণকে রেখেছে বিভু। ভূষণও পুরনো ক্যারিয়ার। নেপালি ভূষণ গুরুং অসম্ভব বিশ্বাসী। কিছু বলা যায় না, হয়তো টাকার টোপে বা তার মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে কেউ গোপন কথা তার পেট থেকে বার করে নিয়েছে। কিন্তু জুতোর বাক্সে কী আছে, কে আসে নিতে, কোথায় যায় সেই মাল— সেটা ভূষণেরও জানার কথা নয়। কিন্তু, যতদূর জেনেছে, সেটাই যথেষ্ট মারাত্মক তার কাছে। এই ব্যবসায় তার ইনকাম পেট্রল পাম্পের ইনকামের অনেক বেশি। ঝুঁকিও সেই অনুপাতে বেশি। পাম্পে দাদার শেয়ার রয়েছে। তার মদতেই পাম্পের পারমিট হয়েছিল। দাদা নেই বটে, কিন্তু বৌদি আর ভাইপোরা রয়েছে। তারা হিসাব বুঝে নিতে বেশ দড়।
“বলুন, কী বলতে চান। কে তারাকান্ত মজুমদার? জুতোর দোকানের সঙ্গে আমার কিসের সম্পর্ক? আমাকে কি কোনও ষড়যন্ত্রের শিকার করতে চাইছেন?”
“যা বলতে চাইছি, শুনলে আপনার বিশেষ প্রত্যঙ্গ দু’টি মাথায় উঠে যাবে। আমি সাত নম্বর বাব্ল বয়ের কথা বলছি।”
বিভুর গলা শুকিয়ে গেল। বাব্ল বয়ের কথা জানল কী করে! ওটা একেবারেই গোপন কোড। কতদূর জানে এরা? বাক্সে কী থাকে, সেটা কি জানতে পেরেছে! সে তো স্মাগ্লিং-এর জগতে মেঘনাদের মতো আড়ালে থেকে কাজ করে। এ লাইনের হাতে-গোনা কয়েক জন মাত্র জানে বিভু সমাদ্দারের নাম।
ক্রমশ