পূর্বানুবৃত্তি: অচেনা লোকটির কাছ থেকে ফোনে হুমকি পেয়ে ঘাবড়ে গেল বিভু সমাদ্দার। প্রথমে মনে হল বিভূতি লস্কর আর তারক শীল তাকে প্যাঁচে ফেলতে চাইছে। বিভুকে রাজনীতিতে যোগ দিয়ে সমাজসেবা করতে বলল সেই লোকটি, জানাল তার হাতে দলীয় পতাকাও তুলে দেওয়া হবে, কিন্তু কোন দল, তা বলল না। বিভু তাদের দলনেতা বাদল ঘোষকে ফোন করে সব কথা জানাল, কিন্তু তিনি এ ব্যাপারে কিছু জানেন না বলে জানালেন। বিভু কিন্তু নিশ্চিন্ত হতে পারল না, কারণ ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই খবর এল, ‘পদপল্লব’ জুতোর দোকানে পুলিশ এসেছিল। দোকান সিল করে দেওয়া হয়েছে। বিভুর কাছেও পুলিশ এল তল্লাশির পরোয়ানা-সহ। সতর্ক হওয়ারও সময় পেল না সে। অন্য দিকে মোহনপুরের বড়দিঘিতে সারাদিন ভাল মাছ ধরে বাড়ি ফিরেছে শিবু। বর্ষার আবহাওয়ায় ভিজে গিয়ে তার জ্বর-জ্বর বোধ হচ্ছে। কিন্তু সে কথা সে ভয়ে নন্দাকে বলতে পারছে না।
কাল একটা ঘোরের মধ্যে মাছ ধরেছে শিবু। অন্য মেছুড়েদের ঈর্ষাকাতর দৃষ্টি সে বুঝতে পারছিল। আজ তার দিন। তার চারেই সব মাছ আজ ঘুরঘুর করছে। কিছুক্ষণ ছায়া-ছায়া দেখে আকাশের দিকে তাকিয়ে শিবু দেখল, পশ্চিম থেকে মেঘ উঠে এসে আকাশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। হাওয়া দিলে পুকুরের জলে সরসর ঢেউ উঠছে। পাড়ে এসে মিলিয়ে যাচ্ছে সেগুলো। পুকুরের জলে বৃষ্টিফোঁটা পড়ার শব্দ শুরু হল। ছাতার কথা শিবুর মনে রইল না। মাছরাঙার মতো তার দৃষ্টি শুধু ফাতনা দেখছে তখন। রোদে পুড়ে, জলে ভিজে অন্ধকার নামলে, যখন ফাতনা অস্পষ্ট হয়ে এসেছে, তখন যেন অনিচ্ছা সত্ত্বেও শিবু পুকুর ছেড়ে উঠল। পাঁচটা বাজার পর মালিকের লোক অবশ্য তাড়া দিচ্ছিল ছিপ-হুইল তোলার জন্য। উঠছি-উঠছি করেও সবাই আরও কিছু সময় কাটিয়ে দেয়।
মিনিট দশেক জোর জল ঝরার পর বৃষ্টি থেমে গিয়েছিল। শেষ বর্ষা, শরৎ আসি-আসি করছে। কোথাও কাশ ফুটতে শুরু করেছে, কোথাও শিউলি। এ সময়ের জল এরকমই। ঝপ করে নামে, ঝপ করে থেমে যায়। কালো মেঘের ফাঁক দিয়ে নীল আকাশ খুব ঘন দেখায়। ভারী খুশি ছিল শিবুর মন। এত মাছ সে এর আগে কোনও দিন পায়নি। নন্দার সামনে আজ মাছের ব্যাগ খুলবে সে। তার আগে বাড়ি ফেরার পথে মাছবুড়োকে দেখিয়ে যাবে। তার মাছ ধরার গুরু কালীপ্রসাদকে। চার বানানোর ঘাঁতঘোঁত সব কালীদার কাছেই শেখা। টের পাচ্ছিল, শরীর ঠিক জুতের লাগছে না।
“তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে? কী ফর্সা ছিলে তুমি! আজকালের মধ্যে এক বার আয়নায় নিজের মুখটা দেখেছ? পুড়ে ঝামা হয়ে গেছে। মেছোভূতেই এক দিন তোমার ঘাড় মটকাবে।”
চুপ করে রইল শিবু। কথা বলতেও ইচ্ছে করছিল না। মাছ ধরা নিয়ে প্রথম-প্রথম খুব অশান্তি হয়েছে শিবুর সঙ্গে। দামি ফাইবারের ছিপ আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছে। হুইল লুকিয়ে রেখেছে। পিঁপড়ের ডিম ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। কোনও লাভ হয়নি, বরং আরও অশান্তি হয়েছে। তুমুল ঝগড়া, কথা বন্ধ। হিসাব করে দেখলে তাদের বিবাহিত জীবনের প্রথম কিছু দিন বাদ দিয়ে বাকি বেশির ভাগ সময় তাদের ঝগড়া করেই কাটল। এখন আর ঝগড়া করে না নন্দা। আবেগের উপর একটা আবরণ দিয়ে নিয়েছে। তার এই নিস্পৃহতা শিবুকে ভাবায় না। সে মনে করেছে, নন্দা বুঝি হাল ছেড়ে দিয়ে তার শখ মেনে নিয়েছে। কিন্তু ইদানীং একটা ব্যাপারে তার মনে একটা সংশয় উঁকি দেয় বার বার।
“মনে হচ্ছে কাল একটু ঠান্ডা লেগেছে। মাথা ধরেছে খুব। মাছগুলো দেখেছ?”
“দাঁড়াও, থার্মোমিটার দিয়ে দেখি। তুমি কিন্তু মাঝে মাঝেই বলছ মাথা ধরার কথা। মাথার আর দোষ কী, রোদবৃষ্টির কোনও হুঁশ আছে তোমার! মাছ ধরার নামে উন্মাদ হয়ে যাও। বিশ্বসংসার ভুলে... থাক, আবার সেই ঝগড়া শুরু হবে। তোমার শরীর, অন্য কেউ সেটা রক্ষা করবে না। কী এক মরণ-নেশা, এর চেয়ে তুমি তাস খেলতে যেতে, ঘরে বসে ড্রিঙ্ক করতে, সিগারেট খেতে— অনেক ভাল ছিল। বাধা দিতাম না আমি। কিছু বলব না, ঠিক করেছিলাম। থাকতে পারলাম না। সংসারে তুমি একা নও, আমরা সবাই জড়িয়ে আছি। তুমি একা মানুষ হলে, তুমি জাহান্নামে গেলেও আমার কিছু যেত আসত না।”
নন্দা থার্মোমিটার আনতে গেল। শিবু ভেবেছিল, নন্দা হয়তো তার কপালে হাত দিয়ে জ্বর দেখবে। হয়তো মাথা ধরার কথা শুনে কপাল টিপে দেবে। না, আর কোনও দিন বোধহয় দেবে না। নন্দাকে কি সে হারিয়ে ফেলছে! ভয় করে উঠল শিবুর। নন্দা ঠিকই বলেছে। আজকাল তার মাঝে মাঝেই মাথায় অদ্ভুত একটা যন্ত্রণা হচ্ছে। ঠিক মাথাব্যথা বলতে যা বোঝায়, তেমন নয়। কপালের দু’পাশে নয়, ঠিক কোথায় যে ব্যথাটা হচ্ছে, বুঝতে পারে না শিবু। দু’-এক দিন যন্ত্রণার বাড়াবাড়িও হয়েছে। তখন মনে হয়, ভিতরে সব গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। ঠিকঠাক কিছু চিন্তা করতে পারছে না। বমি হয় না, কিন্তু মনে হয় বমি হতে পারে। এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে সব। মনে হচ্ছে, নার্ভের কোনও সমস্যা হয়েছে। ভয় করে ওঠে তখন। একা থাকতে পারে না। মনে হয়, নন্দা এসে তাকে জড়িয়ে ধরুক।
“কত দেখলে?”
নন্দার হাতের দিকে তাকিয়ে টেম্পারেচার জানতে চাইল শিবু। আজকাল আর তার মাছ ধরা নিয়ে নন্দার কোনও অভিযোগ নেই, এই ব্যাপারটা শিবুর একটা অস্বস্তির কারণ হয়েছে। খুব নির্বিকার, উদাসীন হয়ে গেছে নন্দা। সেও আজকাল কেমন যেন একটা অপরাধবোধ নিয়ে ছিপ-হুইল হাতে বেরোয়। আগে কোনও দিন এমন হয়নি তার। বরং নন্দা তার সঙ্গে ঝগড়া করুক, ছিপ ভেঙে দিক, তবে স্বাভাবিক হত সব। আজ তার মাছের ব্যাগ কি নন্দা দেখেছে! এই ব্যাপার নিয়ে ইদানীং আর নন্দা কিছু বলে না।
“একশো। রাতে কি রুটি দেব?”
“দিয়ো। নন্দা, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”
চমকে নন্দা শিবুর দিকে তাকাল। তার এই চমকে ওঠা লক্ষ করল শিবু। ইদানীং নন্দা খুব অন্যমনস্ক থাকছে। রাতে সে ঘুমিয়ে পড়ার পর বিছানায় আসছে। অনেক রাতে কখনও ঘুম ভাঙলে দেখেছে, নন্দা উল্টো দিকে মুখ করে মোবাইল দেখছে। এক দিন ঘুম-ঘুম চোখে দেখল, নন্দা মোবাইল নিয়েই বাথরুমে গেল। বেশ কিছু ক্ষণ বাদে বেরিয়ে এল। ঘরে মৃদু সবুজ আলো জ্বলছিল। শিবুর মনে হল, নন্দার চোখে কোনও ঘুমের জড়তা নেই। ক্লান্তি নেই। বরং তার চোখদুটো যেন উজ্জ্বল। শিবু কিছু ক্ষণ বাদে ঘুমিয়ে পড়েছিল। ব্যাপারটা নিয়ে আর ভাবেনি।
“শুনলাম মন্টুর নাকি সিরিয়াস অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল। তুমি ওকে দেখতে গিয়েছিলে? আমার তো সময় হয়নি। ওকে কিন্তু এক বার তোমার দেখে আসা উচিত। তোমার সঙ্গে তো ওর খুব ভাল রিলেশন। যাও না এক দিন, দেখে এসো কেমন আছে।”
নন্দা বুঝতে পারছিল না কী উত্তর দেবে। মনোতোষ এখন ভাল আছে, তার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে, এক দিন তার স্কুটারে পিলিয়ন-রাইডার হয়ে নতুন রাস্তায় চুমুকপুরে গিয়েছিল। এ-সব শুনলে শিবুর কী প্রতিক্রিয়া হবে— বুঝতে পারছিল না নন্দা। তার রাত জেগে মন্টুর সঙ্গে ইনবক্সে আড্ডা হয়তো শিবু জানে না। কয়েক দিন বলেছে অত রাত পর্যন্ত ফোন না দেখতে। চোখে চাপ পড়ে। নন্দা বলেছে, “গেম খেলছি, এই আর একটু। আর একটা রাউন্ড।” শিবুর জানার কথা নয় সে কোন গেম খেলছে। মুখে তীক্ষ্ণ একটা বঁড়শি নিয়ে, ঠোঁটে ব্যথা নিয়ে গভীর জলে ঘুরে মরছে মন্টু। সে মাছ ধরছে। মন্টু এক দিন বলছিল, তার জলে বড় ভয়। অথচ মন্টু জানেই না সে কেমন জলের ভিতরে মুখে কাঁটা ছাড়ানোর জন্য যতই ঝাপট মারছে, ততই আরও গভীরে চলে যাচ্ছে বঁড়শি।
“চলো, এক দিন দু’জনেই ঘুরে আসি। দেখি তোমার কপাল? না, জ্বর নেই। শরীর ভাল নেই যখন, তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও। মাথায় কি এখনও যন্ত্রণা হচ্ছে? কাল-পরশুই ডাক্তার দেখাবে।”
“দেখাব। এমন কিছু ইমার্জেন্সি নয়। পরে এক সময় ধীরেসুস্থে...”
“দেখাব নয়, ইমিডিয়েট দেখাতে হবে। বাবা ডাক্তার বলে মনে কোরো না, তুমিও সব বুঝে গেছ। যাই, তোমার রুটি-তরকারি নিয়ে আসি। নাকি পরোটা করে দেব? বেগুনভাজা আর আচার দিয়ে খেয়ে নিয়ো। জ্বরের মুখে ভাল লাগবে।”
“যা হয় করো। মণিমা কি মাছগুলো কেটে ফ্রিজে তুলে রেখেছে?”
নন্দা বেরিয়ে গেলে ম্লান হাসল শিবু। মুহূর্তেই নন্দা কেমন পাল্টে গেল। একটু আগের নিরাসক্ত নন্দা কত সহানুভূতি নিয়ে তার জন্য ভাবছে। নন্দা ঘুমিয়ে পড়ার পর তার মোবাইল খুলে এক দিন দেখেছিল শিবু। ওয়টস্যাপ, চ্যাটরুম— সবই দেখেছে। কাঙালের মতো মন্টুকে চেয়েছে নন্দা। মন্টুকে সব দিতে চেয়েছে। ওদের শারীরিক ঘনিষ্ঠতার কথা জেনেছে। আচ্ছা, মন্টুর সন্তান কি নন্দা গর্ভে নিতে পারে না!
দেওয়ালে ছায়া ফেলে আঙুলের কারসাজিতে একটা মাছ তৈরির চেষ্টা করতে লাগল শিবু। কিছুতেই পারছিল না। হরিণ বানাল, খরগোশ বানাল, প্রজাপতি বানাল। কিন্তু প্রথম অবতার, মৎস্য, বিশ্বাসযোগ্য কোনও ছায়া তৈরি করতে পারছিল না শিবু। অসহিষ্ণু হয়ে উঠতে উঠতে টের পেল, মাথার ভিতরে সেই আক্রমণটা আবার আসছে। ভয়ঙ্কর ভাবে আসছে। ‘আমার সোনা’— এক জায়গায় মন্টুকে লিখেছে নন্দা— ‘তোর আদর পেতে এত ভাল লাগে আমার! এত আড়ষ্ট থাকিস কেন? আমার আদর কি তোকে জাগায় না? মুয়াহহ! যা ঘুমোতে যা।’
মাথার ভিতর সব যেন কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। উফ্, বমি পাচ্ছে ভীষণ! ঘরের মেঝেয় প্রবল জল। বিশাল দিঘির মাঝখানে একটা ঘূর্ণি পাক খাচ্ছে। অনেক দূরের কচুরিপানা টেনে আনছে কেন্দ্রে, মুহূর্তে অতলে টেনে নিচ্ছে প্রবল ঘূর্ণির বেগ। অদ্ভুত সব কথা ভেসে বেড়াতে লাগল তার মনের আধো-চেতন, আধো-অচেতনে—
“এ দিঘির কিন্তু আরও একটা নাম আছে বাবু। সে নাম এদানি আর কেউ জানে না। সবাই জানে মোহনপুরের দিঘি। আর, মোহনপুর নামই বা এল কোত্থেকে! সেও আর এক গল্প! গ্রামেগঞ্জে তো গল্পের শেষ নেই বাবু। গল্পগুলো নদীর মতো গড়াতে থাকে। পারের লোকজন জানে। কেউ আঁজলা ভরে, কেউ কলস ভরে গল্পের জল ঘরে বয়ে নিয়ে যায়। আসলে তো এক বংশ থেকে অন্য বংশে গল্পটাকেই তারা বয়ে নিয়ে চলে। চায়ের দোকানে বসে চায়ে চুমুক দেওয়ার সময়, মাঠে নিড়ানির সময়, সন্তানকে ঘুম পাড়ানোর সময় জলের মতো গল্পগুলো বা ধরেন, সেই জলের ধারা সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। রক্তের সঙ্গে ঘোরাফেরা করে। তার পর ভিতরে ভিতরে সাজানো-গোছানো চলতে থাকে। মানুষের স্বভাবই তো তাই। বলেন, তাই না? আসলে কী জানেন তো— হাত-পায়ের মতো আমাদের মাথার ভিতরেও কতগুলো আঙুল আছে। সব সময়ে কিছু একটা আঁকড়ে ধরে সেটাকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে নতুন কিছু বানাতে চায়।”
“অন্য কী নাম এই দিঘির?”
“সবাই তো মোহনপুরের দিঘিই বলে। পাড়ে লেখা আছে নিশিঙ্গো চৌধুরীর নাম। তবে গোপনে আরও একটা নাম আছে এ দিঘির। পুরনো মানুষজনের মনে আছে হয়তো। সে নাম লোকে ভয়ে মুখে আনত না। কালোশশীর সায়র। লোকজন কয়েক দিন ফিসফাস করেছিল। চৌধুরীমশাই শুনতে পেলে আর বেঁচে থাকার উপায় থাকবে না। কালোশশীর নাম তিনি জগৎ থেকেই মুছেদিতে চেয়েছিলেন।”
গল্পের নদী গড়াতে গড়াতে অনেক দূরের জনপদে পৌঁছলে গল্পের গায়ে নতুন মাটি, নতুন রং লাগে। কোনও এক জন কথক হাটচালায় বসে তার ঝুলি খুলে গল্প শুরু করলে চার পাশে লোকজন জমাট বাঁধতে শুরু করে। সবাই যেন সমস্ত শরীর দিয়ে গল্পটা শুষে নিতে থাকে। কথকঠাকুর গল্পের সুতো ছড়িয়ে দেয়, বাতাসে দোল-খাওয়া সুতো ধরে মনের মতো নকশা তৈরি করে নেয়। গল্পের যে অংশ তার মনের মতো হয়নি, তার ইচ্ছেপূরণের মতো হয়নি, সেই অংশ সে তার নিজের ভাবনা দিয়ে আবার তৈরি করে নেয়।
এ ভাবেই হয়তো কোনও এক হাটচালায় বিশুঠাকুর নামের কোনও এক কথকের চার পাশে সবাই গোল হয়ে বসে। গল্প এগোয় তার মতো—
“বলো বিশুভাই, তার পর? চৌধুরীবংশ কি ফৌত হয়ে গেল? বংশে বাতি দেবে কে? কার্তিক মাসে পূর্বপুরুষদের জন্য আকাশপ্রদীপ জ্বালবে কে? গল্প বলো কথকঠাকুর। তোমার গল্প যেন নদীর জলের ধারা। আমাদের বারোমেসে শরীরে মিশে যায়। আমাদের মাথার ভিতরে জমা থাকে। আমাদের ছেলেপুলেদের তো গল্প বলতে হবে। গল্প ছাড়া মানুষ বাঁচে না। অনেক কথা ভুলে যাব, অনেক কথা আমরা নিজেরাই তৈরি করে নেব। এক দাপুটে জমিদারের গল্প, গোপন কামনাবাসনার গল্প, কালোশশীর কথা...”
পুরনো গল্প কিন্তু মরে না। বাঁক নেয়, তার ধারায় নতুন গল্পের জল এসে মিশতে থাকে। নদীর মতো তালুক, মহাল, গঞ্জ, পরগনার ভিতর দিয়ে বইতে থাকে গল্পের নদী। তা সে কেমন করে জরাসন্ধ বধ হল, নলরাজার শরীরে কলি প্রবেশ করল বা কেমন করে স্বপ্নে পাওয়া গেল আশ্চর্য প্রদীপ… যা-ই হোক না কেন! গল্প তো নদীর জলের ধারা। সে ধারায় কত নতুন নতুন গল্প এসে মেশে! কত গল্প নতুন বৌয়ের মুখে তার শ্বশুরবাড়ির দেশে চলে যায়। তার সঙ্গে হয়তো অন্য গল্প জুড়ে যায়। ছেলেপুলেদের তো গল্প বলতে হবে। গল্প ছাড়া কি মানুষ বাঁচতে পারে। নৃসিংহ চৌধুরীর কালো ঘোড়া পূর্ণিমার রাতে কেমন সোনার হয়ে যায়!
শিবুর মনে হল, এ-সব কিছু লোকটা বলেনি। সে আসলে গল্পের ভিতরে ঢুকে পড়েছে। মানুষের স্বভাবে সেও শোনা কথা নিয়ে নিজের মতো গল্প তৈরি করছিল। শিবুর মনে হচ্ছিল, তাপ্পি-মারা ঝোলায় কথা ফিরি করে বেড়ায় যে লোকটা— পুরনো দিঘি, পুরনো মন্দির, কথক বিশুঠাকুরের গল্প বলে, জমিদার বাড়ির কেচ্ছা গেয়ে বেড়ায় হাটে মাঠে— এই বোধহয় সেই ছদ্মবেশী বিশুঠাকুর।
লোকটা বলে চলে, “এ কিন্তু নদী নয়, আবার নদীও বলতে পারেন। জলের দিকে কিছুক্ষণ ভাল করে তাকিয়ে থাকেন বাবু... চোরাস্রোত টের পাচ্ছেন? কোথাকার জল যে কোথায় গড়ায়! কে জানত কালোশশী কেওটের ঘরের মেয়ে। কেওট মানে জানেন তো? কৈবর্ত। আমরা বলি কেওট। নিশিঙ্গো চৌধুরী আর একটা কালো ঘোড়ার গল্প বলত বিশুঠাকুর। ঘোড়ার পিঠে জমিদারের কোলে কালোশশী। কখনও পুন্নিমার আলোয়, কখনও অন্ধকারে একটা ঘোড়া ছুটে যেত। ঘোড়ার পিঠে লম্বাচওড়া এক পুরুষ। তার হাতে বন্দুক আর কোলে নাকি এক সুন্দরী নারী বসে থাকে। ঘোড়া ছুটে যাওয়া পথের দু’পাশ জুড়ে উড়ত ধুলোর মেঘ। ধুলোর বিন্দুর ভিতরে নাকি গল্প খুঁজে পেত বিশুঠাকুর। বলত, ধুলোর ভিতরে কান পাতলে নাকি গল্প শোনা যায়। সেই গল্প কাঁধের ঝোলায় তুলে নিত কথকঠাকুর। গাঁ-গঞ্জের হাটেমাঠে, সিদলমাখা গরম ভাতের সঙ্গে, পালাটিয়ার আসরে সেই গল্প শুনত ইছুপ মণ্ডল, পূর্ণিমা বর্মন।”
“সত্যি তো, দিঘির জলে মনে হচ্ছে একটা হালকা টান রয়েছে। বলো, কালোশশীর কথা, ঘোড়ার গল্প।”
“শোনা যায়, জমিদারের সেই কালো ঘোড়া প্রচণ্ড গতিতে গল্পের ভিতর দিয়ে ছুটে যেত। কুয়াশার ভিতরে ক্লপ ক্লপ শব্দের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে কোনও নারীর শীৎকার। ঘোড়ার গল্প কালে কালে ইচ্ছাপূরণের গল্প হয়ে গেলে হাটচালার নীচে আরও কত গল্প তৈরি হয়! সেই ঘোড়া নিয়ে কত মানুষ কত গল্প বলত। কথক বলত, নদীর পাড় ধরে যখন সেই ঘোড়া ছুটে যেত, তার শরীরের বর্ণ পাল্টে যেত। নীল আগুনের ফুলকি ছিটকে বেরোত তার খুর থেকে। বাতাস গরম হয়ে উঠত। বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের দোলাচলে রঙিন হয়ে যেত সেই ঘোড়া। চাঁদের আলো পিছলে পড়ে তার রেশমি ত্বকের উপর।”
“দিঘি? তার পর, মেয়েটার কী হল?”
“খুব ভাল পদাবলি গাইত মেয়েটা। প্রায়ই তাকে ডেকে পাঠিয়ে গান শুনতেন। আসরে নয়, তার খাস কামরায় বসে গান শুনতেন। মাথুর শুনে তার চোখ দিয়ে জল গড়াত। ওদের ভিতরে বোধহয় ভালবাসা হয়েছিল। মেয়েটা নাকি নিশিঙ্গো চৌধুরীর চোখের জল তার আঁচল দিয়ে মুছিয়ে দিত। জানি না বাবু, কবেকার কথা, হতেও পারে। কালোশশীকে ঘরে তুলতে চেয়েছিল জমিদারবাবু। পরে তো জানাজানি হল আসলে সে কেওটের ঘরের বিধবা। ততদিনে তিনি ঠিক করে ফেলেছেন কালোশশীর নাম অক্ষয় করে রাখবেন বলে, তার নামে দিঘি উচ্ছুগ্য করবেন। এমনিতেও তিনি ঠিক করেছিলেন, খেতাব পাওয়া উপলক্ষে একটা অক্ষয় কীর্তি করে রাখবেন। বিশাল জায়গা জুড়ে পুজো দিয়ে মাটি খোঁড়া শুরু হয়ে গেছে। দূর দূর গ্রাম থেকে লোকজন এসে দিঘি খোঁড়া দেখত। এদিকে জল আর ওঠে না! ওঠে না তো ওঠেই না। পুরোহিতমশাই বললেন, বংশে নিশ্চয়ই কেউ কোনও অনাচার করেছে, তার মূলে রয়েছে কোনও মেয়েছেলে। তাকে এই পুকুরের জলে ভাসিয়ে দিতে হবে। নইলে বংশই লোপ পেয়ে যাবে। মহা অনাচার বলে কথা।”
“তার মানে জল তবে উঠেছিল?”
“শোনেন না। জল যখন আর ওঠে না, কোন জমিদারের লোক এসে বেলদারদের বুদ্ধি দিল পুকুরের মাঝখানে কুয়ো খুঁড়তে। সে কুয়োও প্রায় পাতালে পৌঁছে গেল।”
“তার পর?”
“তার পর হঠাৎ যেন বাঁধ ভেঙে গেল। কোথাকার কোন দরজা ধড়াম করে খুলে পড়ল। আর সে কী জল! ঘুর্ণির মতো পাক খেয়ে খেয়ে উপরে উঠে আসছে। কুয়ো যেন দিঘির নীচে মস্ত এক পাইপ। সমুদ্দুরের অন্য জল এসে পড়ল চৌধুরীবাড়ির উঠোনে। দেখতে দেখতে জল থইথই দিঘি। ঠাকুমার কাছে শুনেছি প্রথম প্রথম পুকুরের জলে নোনাস্বাদ পেত সবাই। যেন লবণগোলা জল। পরে পুজো দিয়ে দোষ কাটানো গেছে। এখন আর বোঝা যায় না।”
এক গাং-এর জল অন্য গাং-এ গিয়ে পড়া তা হলে এমন কোনও বড় ব্যাপার নয়। হতেই পারে। দোষ কাটান দেওয়ার জন্য পুজো-আচ্চা, মন্ত্রতন্ত্র আছে। মা তো মাঝে মাঝে বলে, কোথাকার জল কোথায় গড়ায়। কৈবর্ত ঘরের বালবিধবা আসতে চেয়েছিল জমিদারের ঘরে।
দিঘির মাঝখানে তাকিয়ে রইল শিবু।
ক্রমশ