E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

দেখা হবে

যেন ঘোরের ভেতরে ছেঁড়া ছেঁড়া স্বপ্ন দেখছিল শিবু। সত্যিই কি কোনও দিন এক বুড়োমানুষ মোহনদিঘির পাড়ে দাঁড়িয়ে তাকে এ-সব বলেছিল!

বিপুল দাস

শেষ আপডেট: ০২ অগস্ট ২০২৬ ০৬:৪৫
ছবি: কুনাল বর্মণ।

ছবি: কুনাল বর্মণ।

দিঘির পাড় লোকে লোকারণ্য। আজ জমিদারমশাই দিঘির মঙ্গলেষ্টক করবেন। যজ্ঞ হয়েছে। চৌধুরীমশাইয়ের কপালে যজ্ঞের ছাইয়ের টিকা। ছোট একটা ডিঙিনৌকোয় সুন্দরী কালোশশীকে নিয়ে উঠলেন জমিদারবাবু। তিনি বোধহয় গান শুনতে চেয়েছিলেন। কারণ সবাই নাকি দেখতে পেয়েছিল যেন গানের তালে মাথা নাড়ছেন। মাথুরই হবে। গ্রামেগঞ্জে তো কথা মিনিবাসের আগে ছোটে। কালোশশীর বিত্তান্ত রটে গিয়েছিল সব মহল্লায়। অনাচার তো বটেই। এখন দেশে কোন অমঙ্গল ঘনায়, সেটাই দেখার। ঘাটে-মাঠে কান পাতলে ছিঃ ছিঃ শোনা যেত।”

“অতদূর থেকেও সব বোঝা গেল? মাথুরও?”

“লোকে বলে। তারাই হয়তো বানিয়ে নিয়েছে। আবার হতেও পারে। আপনিই এই গল্প হয়তো একদিন নিজের মনের মতো করে বানিয়ে নেবেন। তখন হয়তো আপনি বলবেন, কালোশশী সেদিন কুঞ্জবিলাস গেয়েছিল। এ-সব কিছু শিয়োর করে বলা যায় না।”

“বলো, আরও বলো। খুব ইন্টারেস্টিং গল্প।”

“দিঘির জলের নরম একটা ঢেউ, তিরতির করে এগিয়ে যাচ্ছে ঠিক মাঝখানে। সেখানে জল ঘুরপাক খাচ্ছে। আস্তে আস্তে সেদিকে ডিঙি নিয়ে গেল মাঝি। একটু দূরে নৌকো থামিয়ে দিল। আরও কাছে যাওয়ায় বিপদ আছে। সবাই দেখল, ডিঙির ওপর চৌধুরীবাবু আর কালোশশী উঠে দাঁড়িয়েছে। ডিঙি এপাশ-ওপাশ করছে। লোকজন লজ্জায় কেউ চোখ বুজে ফেলল, কেউ ‘ছিঃ’ বলে উঠল। অবিকল যেন রাধামাধবের যুগলমূর্তি। দু’জন দু’জনকে জাপটে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। যেন টাল সামলাচ্ছে। তার পর সবাই চোখ বড় বড় করে দেখল, চৌধুরীমশাই আচমকা ধাক্কা দিলেন কালোশশীকে। মাঝি তাড়াতাড়ি তার নাও সরিয়ে নিল পাড়ের দিকে। অমনি দিঘির জল যেন খেপে উঠল মাতাল হাতির মতো। শুধু মাঝে নয়, দিঘি জুড়েই ঘুর্ণি উঠল। কালোশশী একবার ডুবছে, একবার ভাসছে। হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে তার চৌধুরীমশাইয়ের দিকে। আবার ডুবে যাচ্ছে।”

“আর জমিদারবাবু?”

“আশ্চর্য! তিনি যেন মুগ্ধ হয়ে দেখছিলেন কালোশশীর ডুবে যাওয়া। একটু বাতাসের জন্য খাবি খাচ্ছে কালোশশী। তার চোখ বড় বড় হয়ে উঠেছে। মরে যেতে যেতেও অবিশ্বাস্য চোখে দেখছে চৌধুরীমশাইকে। আস্তে আস্তে ঘূর্ণির মাঝখানে গিয়ে পড়ল মেয়েটা। মুহূর্তে তাকে টেনে নিল পাতালঘূর্ণি। কোন অতলে তলিয়ে গেল কালোশশী। তখনও দিঘি জুড়ে জলের টান রয়েছে। তিরতিরে স্রোত সব কিছু টেনে নিচ্ছে জলের চোখ...”

যেন ঘোরের ভেতরে ছেঁড়া ছেঁড়া স্বপ্ন দেখছিল শিবু। সত্যিই কি কোনও দিন এক বুড়োমানুষ মোহনদিঘির পাড়ে দাঁড়িয়ে তাকে এ-সব বলেছিল! কই, মনে তো পড়ে না! কালই তো সে মোহনপুরের দিঘিতে মাছ ধরতে গিয়েছিল। ঘাটে একটা বেদিতে জমিদার নৃসিংহ চৌধুরীর নাম লেখা আছে। বিশাল দিঘির ও-পারে বসা মানুষগুলোকে ছোট ছোট দেখাচ্ছিল। দিঘির জলে চোরাস্রোতের টান মনে তো পড়ে না! সে কি গল্পটা এখনই স্বপ্নে পেল! উফ্‌, এখনও মাথার ভিতরে সে ঘূর্ণি টের পাচ্ছে।

“ওঠো, রুটি ঠান্ডা হলে আর খেতে পারবে না। বেগুনভাজা, আচার আর তোমার জন্য চিকেন স্যুপ করলাম। গুডবয়ের মতো খেয়ে নাও তো!”

কথা বলতে ইচ্ছে করছিল না শিবুর। বমির ভাবটা এখনও সামান্য রয়েছে। যন্ত্রণাও আছে। নন্দা জানে না, কোনও দিনও জানবে না তার রক্তক্ষরণের কথা। পৃথিবীসুদ্ধ লোক জানে মেয়েদের অভিমানের কথা, তাদের চোখের জলের কথা। কেউ কোনও দিন পুরুষের অভিমানের কথা বলে না, তাদের চোখের জল ফেলতে নেই। যে নন্দা চিরকাল তার কাছে সততার কথা বলে এসেছে, যে নন্দাকে স্বভাবের জন্য সে শুধু ভালই বাসেনি— সত্যি বলতে, শিবু তাকে শ্রদ্ধাও করত— সে এমন কাজ করল! শিবু বিশ্বাস করতে পারছিল না। এর মধ্যে অনেক বার ওদের ভালবাসাবাসি হয়েছে। আবার ঘূর্ণির অতলে তলিয়ে যাচ্ছে নন্দা, রুটি, বেগুনভাজা, আচার, চিকেন স্যুপ।

“কী হল তোমার? শরীর খুব খারাপ লাগছে?”

কোনও মতে মাথা নাড়ল শিবু। ক্রমশ তলিয়ে যেতে লাগল বিশাল দিঘিতে। গভীর জলের নীচে সে আর মন্টু ঘুরে বেড়াচ্ছে। তার মুখে ডুবুরিদের মুখোশ, মন্টু কানকো দিয়ে জল টানছে, মুখ দিয়ে বুদ্বুদ ছাড়ছে। নন্দা তাদের সঙ্গে সাঁতার কাটছে। নন্দার শরীর উপরের দিকটা মেয়েদের মতো, নীচের দিকটা মাছের মতো। চকচকে সোনালি আঁশ। হঠাৎ জলজ লতায় হাত-পা জড়িয়ে গেল শিবুর। সেগুলো আসলে কোনও সামুদ্রিক প্রাণীর লম্বা লম্বা শুঁড়। সেগুলো তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নিচ্ছে। ক্রমশ টেনে নিয়ে যাচ্ছে আরও অতলে। মৎস্যকন্যা নন্দার পিঠে বসে আছে মন্টু। নন্দা হঠাৎ একটা ডিঙিনৌকো হয়ে গেল। ওরা দু’জন অনেক দূরে চলে যাচ্ছে।

ধড়ফড় করে উঠে বসল শিবু। নন্দা পাশে বসে আছে। এতক্ষণ বোধহয় তার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ মরামানুষের গন্ধ নাকে এল তার। সেই কতকাল আগে তাদের আমবাগানে একজন গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে পড়েছিল। সেদিন সে মরামানুষের গন্ধ পেয়েছিল। আজ আবার পেল।

“এক কাজ করি, তুমি একটু উঠে বোসো, আমি খাইয়ে দিচ্ছি। তোমার জন্মদিন কিন্তু এসে গেল। সামনের মাসেই। কী নেবে বলো? তোমার ঘড়ি তো কোন পুকুরের পাড়ে হারিয়ে এসেছ, এবার একটা ভাল ঘড়ি কিনে দেব।”

“তুমি যাও, আমি একটু পরে খেয়ে নেব।”

দু’-এক সেকেন্ড শিবুর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে মাথা নিচু করে বেরিয়ে গেল নন্দা।

১৬

রুপোলি জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছিল জগৎসংসার। বাংলোর বারান্দায় বসে অপার্থিব এই আলো দেখছিলেন রামপ্রিয় সান্যাল। আসলে তো সূর্যের আলোই, আয়না হয়ে চাঁদ ফিরিয়ে দিয়েছে। সূর্যের মতো চাঁদের নিজের আলো নেই। তবু তার এই ধার-করা আলো নিয়ে কত গল্প, কত কবিতা, কত গান। চাঁদ যদি আর না-ই ওঠে কোনও দিন, তবে কি এত সুর, এত গান সব মিথ্যে হয়ে যাবে! সূর্য অনেক বড়, অনেক দূরের। তাকে নিয়ে গান হয় না; পুজো করে সবাই, ভক্তি করে; ভালবাসে না।

সামনের টিপয়ের উপরে হুইস্কির গ্লাস। পাশে একটা বাটিতে কয়েকটা কাজুবাদাম। মদে তাঁর আসক্তি আছে, কিন্তু একটা নির্দিষ্ট মাপের বেশি কোনও দিন খাননি। খেয়ে একদম পুরো বেহুঁশ হয়েছেন, এমন কোনও দিনের কথা মনে পড়ে না। তবে তো আমেজটাই বরবাদ। ওটা পেঁচো মাতালদের লক্ষণ।

সামনের উঠোনে মনমায়া হেঁটে বেড়াচ্ছে। এতক্ষণ এখানেই তাঁর পাশে বসে গল্প করছিল। তাঁর সঙ্গে এখানেই জীবনটা কাটিয়ে দিল মনমায়া। তাঁরও জীবন এখানেই কেটে গেল। আফসোস নেই তাঁর। তিনি তো নিজেই চেয়েছিলেন এই নির্জনবাস। এক সময়ে সংসারের উপর তীব্র অভিমান ছিল। এখন আর কী হলে কী হতে পারত, সে-সব নিয়ে কোনও অভিমান বা সংশয় নেই। খারাপ তো কিছু হয়নি। নিজের মতো করেই জীবন কাটালেন। নিয়মমাফিক দাম্পত্যসুখের চেয়ে অনেক বেশি সুখ তাঁকে শরীরে, মনে মনমায়া দিয়েছে। প্রতিবারই তিনি অবৈধ সঙ্গমের উত্তেজনা পেয়েছেন। মনমায়ার সঙ্গে তাঁর অদ্ভুত সম্পর্ক জগতের নিয়মে অবৈধ তো বটেই। বাঁধাধরা গতের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক নয়। তাঁর বৈধ স্ত্রী এখনও বেঁচে আছেন। মনমায়াকে তিনি অনেক আগেই বলেছিলেন, মনমায়ার যেদিন আর এই থাকা ভাল লাগবে না, সে নির্দ্বিধায় তাঁকে ছেড়ে যেতে পারে। জোর করে তিনি আটকে রাখবেন না। স্বেচ্ছায় সে ডাক্তারসাবের সঙ্গিনী হয়েছে, স্বেচ্ছায় যেদিন খুশি চলে যেতে পারে। কষ্ট হবে তাঁর। পৃথিবীতে এই একটা মানুষের ভালবাসাই শুধু পেয়েছেন। নিঃস্বার্থ ভাবেই পেয়েছেন। মনমায়াও কি তাঁকে ছেড়ে যেতে পারবে! লোভ নেই তার। সে শুধু চায় ডাক্তারসাব তাকে আরও ভালবাসুক। কোনও উপহারই সে নিতে চায় না। তবু জোর করেই তাকে একটা ঘড়ি তিনি দিয়েছেন।

এক রাতে, মনমায়া জানত সেদিন ডাক্তারসাবের জন্মদিন। সকালে উঠেই বলেছিল “হ্যাপি বার্থডে সাব!” এক গোছা রজনীগন্ধা তুলে দিল ডাক্তারবাবুর হাতে।

“শোন মনু, তুই কি চিরকাল আমাকে ‘সাব’ বলেই ডেকে যাবি?”

“আর কী বলব তা হলে? ডাক্তারসাব, ডাক্তারবাবুও তো বলি।”

“মনমায়া, একবার আমায় ‘ওগো, শুনছ’বলে ডাকবি?”

“অসম্ভব, ম ভন্‌নু সগদি ন।”

কিশোরীর লজ্জায় লাল হয়ে দু’হাতে মুখ ঢেকে ফেলেছিল মনমায়া। ডাক্তারবাবু মুগ্ধ হয়ে সেই দৃশ্য দেখলেন কিছুক্ষণ।

“কেন অসম্ভব! কেন বলতে পারবি না?”

“না, আমি পারবই না।”

সে রাতে রামপ্রিয় সান্যাল দেখলেন, মনমায়া অনেক রান্না করেছে। এমনকি একটা বাটিতে পায়েস পর্যন্ত সাজিয়ে দিয়েছে। রাতে তিনি অনেক আদর করলেন মনমায়াকে। বিছানার পাশে টেবিলে একটা সুন্দর ফ্লাওয়ার ভাসে রজনীগন্ধা সাজিয়ে রেখেছিল মনমায়া। সেগুলো থেকে গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে ঘরের বাতাসে।

“কী দিবি আমাকে, আজ রাতে?”

নিচু হল মনমায়া। ডাক্তারবাবুর চোখের পাতায় খুব ভালবাসা নিয়ে দুটো চুমু এঁকে দিল। ডাক্তারবাবুর মনে হল ঘুমের আদর। তার পর একটা ফুল নিয়ে তার দু’চোখের পাতায় বুলিয়ে দিতে লাগল। ঘুম পাচ্ছিল ডাক্তারবাবুর।

কোনও কোনও রাতে তিনি আর মনমায়া বেরিয়ে পড়েন। কুলি-লাইন শেষ হলে ফ্যাক্টরির পাশ দিয়ে যে সরু পথটা ফরেস্টের দিকে চলে গেছে, হাঁটতে হাঁটতে সেদিকে চলে যান। ভুটান থেকে পাহাড়ি ঝোরার জল এসে সরু একটা নদী হয়েছে এখানে। মে ঝু নদী। দূর থেকে দেখতে পান, একা একটা হরিণ নদীতে সতর্ক ভঙ্গিতে জল খাচ্ছে। নিঃশব্দে তাঁরা দু’জন দাঁড়িয়ে এই সুন্দর দৃশ্য দেখেন। মনমায়াকে জড়িয়ে ধরেন বুকের মাঝে। কোনও দিন মাথার উপর দিয়ে উড়ে যায় একঝাঁক পাহাড়ি ময়না। হাতি দেখেছেন অনেক বার। অন্ধকারে আরও অন্ধকার হয়ে একটা শালগাছের নীচে দাঁড়িয়ে থাকে। কখনও দূর থেকে তার গজেন্দ্রগমন দেখতে পান। মনমায়া সঙ্গে থাকলে তাঁকে জড়িয়ে ধরে। জঙ্গলের গাঢ় সবুজ গন্ধ, প্রকৃতির অন্তর্গত এই সব প্রাণী, নদী— এ-সবের মাঝে তাঁরাও যেন প্রকৃতির অংশ হয়ে যান। অবশ্যম্ভাবী, অনিবার্য, অবিচ্ছেদ্য। সব সুন্দর মিছে হয়ে যেত, যদি ডাক্তারসাব আর মনমায়া এই জঙ্গলে আজ না আসত।

এদিকে কোনও ট্যুরিস্টকে তিনি আসতে দেখেননি। কোর এরিয়ায় ঢোকার পারমিশন ট্যুরিস্টদের দেওয়া হয় না।

ক্রমশ

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Novel Bengali Novel

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy