E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

দেখা হবে

নেহাত কম দিন হল না তার শিলিগুড়িতে। হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করে এ শহরে এসেছে। তখনকার শহর আর এখনকার শহরে আকাশ-পাতাল তফাত।

বিপুল দাস

শেষ আপডেট: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৮:৪৬
ছবি: কুনাল বর্মণ।

ছবি: কুনাল বর্মণ।

পূর্বানুবৃত্তি: নন্দর মুখে শিবুকাকার স্মৃতিবিভ্রমের কথা শুনে আশ্চর্য হয় মনোতোষ। শিবুর উদাসীনতা এবং সে কারণে নন্দার অসুখী বিবাহিত জীবনের জন্য নন্দা আঙুল তুলে মনোতোষদের দিকে। নন্দা মনঃস্থির করেছে, সে শিবুর সঙ্গে বিবাহের সম্পর্ক আর রাখবে না। কিন্তু মনোতোষ তার সঙ্গী হতে দ্বিধাগ্রস্ত হয়। সে বুঝে উঠতে পারে না, নন্দা সত্যিই তাকে ভালবাসে না শিবুকাকার উপরে প্রতিশোধ নিতে চায়। মনোতোষের প্রত্যাখ্যান বুঝতে পারে নন্দা। একটা সময় মনোতোষের এর সঙ্গে যোগাযোগ কমিয়ে দেয়। শেষবার নন্দা ফোনে বলেছিল শিবু চিকিৎসার ফলে আগের চেয়ে অনেকটা ভাল আছে। সে বলেছে, মাছ ধরা ছেড়ে দেবে। নন্দাকে তৈরি করিয়ে দেবে একটা শিশুকাঠের সিংহাসন। তাতে লক্ষ্মীর আসন পাতবে নন্দা।

অনেক ক্ষণ চুপ করে বসে রইল মনোতোষ। নিজেকে প্রশমিত হতে দিচ্ছিল। মনে মনে বলল, ‘ওদের ভাল হোক।’ কিন্তু বুকের ভিতরে একটা অস্পষ্ট কান্না, অবুঝ একটা চিনচিনে ব্যথা কেন রয়ে যায়! মনোতোষ জানে, এ হল লীনতাপের মতো, জ্বর-জ্বর মনে হয়, কিন্তু থার্মোমিটারে দেখা যায় না। এই কষ্ট পৃথিবীর কোনও এক্স-রে, এমআরআই, স্ক্যান খুঁজে পায় না। অপমান আর অভিমানের সঙ্গে লীন হয়ে থাকে সমস্ত জীবন।

১৯

কত বছর বাদে নতুন রাস্তায় আজ আবার এসেছে মনোতোষ। চিনতেই পারছিল না প্রথমে। শিলিগুড়ি শহর হাইব্রিড মাগুরমাছের মতো খুব তাড়াতাড়ি বেড়ে উঠছে। পুব পশ্চিম উত্তর দক্ষিণ— চারদিক দিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। ক’দিন আগেই মেডিক্যাল কলেজে যেতে হয়েছিল। বাংলার পৌলোমীর একটা অপারেশন হয়েছে, কয়েক জন মিলে দেখতে গিয়েছিল। নৌকাঘাট মোড়ে এসে সে হতভম্ব হয়ে গেল। ওদিকে নেপাল থেকে ফুলবাড়িতে বাংলাদেশ সীমান্ত পর্যন্ত এশিয়ান হাইওয়ে চালু হতেই ফুলবাড়ি মোড় যেন ঊর্বশীর মতো ঝলমলে মোহময়ী হয়ে উঠল। কোনও কোনও জায়গায় গিয়ে মনে হয়, সে নিজে চিনে আর তার পাড়ায় ফিরতে পারবে না। উত্তরে গুলমা রেলস্টেশন পর্যন্ত বসতি। কুমারী নির্জনতা বলে এখানে আর কিছু নেই। উন্নয়নের ধ্বজা শহরের কুমারিত্ব কবেই ছিন্ন করেছে ইস্পাত, সিমেন্ট, বালি, পাথর দিয়ে। গ্রাম থেকে আসে আনাজপাতি, শহর গিলে খায়। উগরে দেয় প্লাস্টিক, স্যানিটারি ন্যাপকিন, অজস্র শূন্য বোতল, আরও কত বর্জ্য। সে-সব নিয়ে ম্লান, দুঃখী মেয়ের মতো বয়ে যায় মহানন্দা। শহর শুষে নেয় মফস্‌সলের স্টার-পাওয়া ছাত্র, ফিরিয়ে দেয় জমির দালাল।

নেহাত কম দিন হল না তার শিলিগুড়িতে। হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করে এ শহরে এসেছে। তখনকার শহর আর এখনকার শহরে আকাশ-পাতাল তফাত। আশপাশের সমস্ত ছোট ছোট মফস্‌সল শহরের মানুষজন রোজ এ শহরে ছুটে আসছে রুটিরুজির তাগিদে। সবার লক্ষ্য একটাই, কোনও মতে এই নবীনা শহরে এক টুকরো জমি কিনতে পারা। পলাশগুড়ি ছিল গঞ্জ, অনেক পুরনো ছিল সামাজিক কাঠামো। আনাজপাতি উৎপাদক অঞ্চল হিসেবে তার দীর্ঘ দিনের সুনাম। ক্রমে মফস্‌সল থেকে শহর হয়ে উঠেছে। নতুন রাস্তা শিলিগুড়ির সঙ্গে এই ছোট শহরকে যুক্ত করতেই পলাশগুড়ি পাল্টে যেতে শুরু করেছে। তবুও পলাশগুড়ির ঘরবাড়িতে পুরনো গন্ধ, এখনও পুরনো ধাঁচের নিচু কাঠের বাড়ি রয়েছে, বাজার অঞ্চল ছাড়িয়ে একটু বেরোলেই পুকুর, বাঁশঝাড়, ধানখেত। এখনও শনি-মঙ্গলে হাট বসে।

আজ এ পথে আসার সময় মনোতোষ লক্ষ করে দেখল, পথের দু’পাশের পুরনো গাছগুলো আর নেই। পিচঢালা পথের দু’পাশ দিয়ে সরু সরু পথ বেরিয়ে গেছে। কে জানে কোথায় গেছে! আগে তো ঘন জঙ্গল ছিল পথের দু’পাশেই। নিশ্চয়ই বসতি গড়ে উঠেছে। দ্রুত এই যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে ওঠার ফলে জমিখোর মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছে চুমুকপুরে। সেই সবুজ বন আর নেই। বাতাস থেকে গাঢ় সবুজ গন্ধ উধাও হয়ে গেছে। ধুলো আর পেট্রল-ডিজ়েলের গন্ধ বেশি। মানুষের শরীরেও এক রকম ঘেমো গন্ধ থাকে। সুগন্ধি ছড়ালেও সে গন্ধ চাপা পড়ে না। বাজারঘাটে, সিনেমা হলে, শপিং মলে, ঘন জনবসতির মাঝে এই গন্ধ টের পাওয়া যায়। এখানেও গাছের চেয়ে মানুষের গন্ধ, লোভের গন্ধ, রক্তের গন্ধ, বিদ্বেষের গন্ধ বেশি।

শিলিগুড়ি-পলাশগুড়ির মাঝে এক আদিম অরণ্য ছিল। নিবিড় সেই অরণ্যে ঘুরে বেড়াত হস্তিযূথ, নির্ভয়ে খেলে বেড়াত চিত্রল হরিণ, শম্বর। সেই পথে আসা-যাওয়া করেছে ভুটানের টাঙন ঘোড়া নিয়ে ব্যবসায়ীর দল। এই জঙ্গলে লুকিয়ে থাকত বিদ্রোহী সন্ন্যাসীর দল, ভবানী পাঠকের দল ঘুরে বেড়াত শাল-সেগুনের আড়াল নিয়ে। তিস্তা-তোর্সা-কালজানি-ধরলার অববাহিকায় হাতে দোতারা নিয়ে ডোল-ডোং বোল তুলত গিদাল আকুল বর্মন। বড় শহর গিলে খায় সব। বাইপাস নামের এক ধমনী জুড়ে দিচ্ছে এক প্রাচীন আর অর্বাচীন শহরকে।

এ-সব মনে পড়ছিল মনোতোষের। এর আগের বারও যে-সব মাঠ খালি দেখেছে সে, এবার দেখল অনেক বাড়ি উঠে গেছে। বেশ বড় বড় সুন্দর বাড়ি। সামনে ছোট্ট ফুলের বাগান প্রায় সবার বাড়ির সামনেই। শিলিগুড়ি শহরে এমন বাড়ি ক্বচিৎ দেখা যায়। তবু বুকের ভিতর ফাঁকা-ফাঁকা লাগছিল মনোতোষের। অরণ্য নেই। শিলিগুড়ি আর পলাশগুড়ির মাঝে বিস্তৃত সবুজ, সতেজ সটান শাল, শিমুল, খয়ের, গামার আর চিকরাশির সঙ্ঘ। আরও গভীরে, ফরেস্টের কোর এরিয়ায় একলা দাঁতাল ঘুরে বেড়ায়। আধো-অন্ধকার সে-সব জঙ্গলে আলোর প্রবেশ ছিল নিষিদ্ধ। প্রসবযন্ত্রণায় কাতর মাদি হাতিকে ঘিরে রাখে আরও কুড়ি-পঁচিশটি হাতি। চোরাশিকারির গুলিতে মরণযন্ত্রণায় চিৎকার করে ওঠে দাঁতাল। জঙ্গলের গভীরে মৃত গন্ডারের শরীর পড়ে থাকে। তার খড়্গ কেউ কেটে নিয়ে গেছে। মশাল জ্বলে, তার চারপাশে গোল হয়ে বসে চিতল হরিণের মাংসে ভোজ সারে বনবস্তির অবিমৃশ্যকারী মানুষ।

কখন যেন চুমুকপুরে মন্তেশ্বরের দোকান পেরিয়ে গেছে, খেয়ালই করেনি। থাক, ফেরার পথে এক বার দেখা করে যাবে। আজ যে খবরের খোঁজে যাচ্ছে, সেটা আগে সারতে হবে।

তার সঙ্গে নন্দার শেষ বার কথা হওয়ার পর তার ভিতরে কিছু একটা পরিবর্তন ঘটেছিল। নন্দা নিশ্চয়ই তার ভীরুতা বুঝতে পেরেছিল। তার আগে নন্দা অদ্ভুত কথা বলেছিল। শিবুকাকার সঙ্গে সে বিচ্ছেদ চায়। সেটা অস্বাভাবিক মনে হয়নি তার কাছে। সংসার সম্পর্কে ওরকম উদাসীন মানুষের সঙ্গে নন্দার মতো প্রাণোচ্ছল কোনও মেয়ের একসঙ্গে থাকা সত্যিই অসম্ভব। কিন্তু তার বরকে ছেড়ে দিয়ে সে মনোতোষের সঙ্গে থাকতে চায়, শুনেই তার মনে হয়েছিল, সে এটা কোনও দিন পারবে না। সত্যি সে ভয় পেয়েছিল। নন্দার সঙ্গে তার সত্যিকারের ভালবাসার সম্পর্ক তৈরি হয়নি।

শেষ বার নন্দা বলেছিল, শিবুকে নিয়ে সে ব্যস্ত। শিবু তাকে শিশুকাঠের সিংহাসন বানিয়ে দেবে, সে লক্ষ্মীর আসন পাতবে। পাতুক, লক্ষ্মী বসত করুক তার সংসারে। মনোতোষের চেয়ে বেশি খুশি আর কেউ হবে না। তবু তার থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিল নন্দা— এটা বুঝতে পেরে তার কি অভিমান হয়েছিল? পুরুষের অস্মিতায় আঘাত লেগেছিল? হয়তো। তার পর সে আর নন্দার সঙ্গে কথা বলেনি। অনেক দিন। নন্দাও তাকে ফোন করেনি। এর মাঝে তাদের এক টিচার তার প্রাইভেট ছাত্রীর সঙ্গে মলেস্টেশনের ঝামেলায় পড়ল। ছেলেটি অন্য কমিউনিটির হওয়ায় জল অনেক দূর গড়িয়েছিল। থানা-পুলিশ, জনরোষ, মিডিয়া, মহিলা সংগঠন— যাচ্ছেতাই ব্যাপার।

নন্দাকে ফোন করার ব্যাপারে তার আড়ষ্টতা ছিল। যদি এমন হয় যে, নন্দার সব কথা মিথ্যে! এখনও সে ওই দুঃসহ যাপন করে চলেছে! আর সে নিষ্ঠুরের মতো ফিরিয়ে দিয়েছে নন্দাকে। গোপনে সেই ভয় ছিল তার মনে। তবু মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয়েছে নন্দার সঙ্গে কথা বলতে। পারেনি। নন্দাও আর ফোন করেনি। সে ভেবেছিল— করুক, ওরা নিশ্চিন্তে সংসার করুক। শেষ পর্যন্ত ঠিক করেছিল, সে এক বার নিজেই পলাশগুড়ি যাবে। পথে এক বার মন্তেশ্বরের ‘মাধবীকুঞ্জ’-এ বসবে।

বকুলডাঙায় ঢুকে দেখল, এদিকটাও অনেক বদলে গেছে। নন্দাদের সান্যাল-কুটিরের দু’পাশে দুটো উঁচু ফ্ল্যাট। মাঝে তাদের পুরনো বাড়িটা কেমন দীনদরিদ্রের মতো দাঁড়িয়ে আছে। বহুকাল এ-বাড়ির সংস্কার হয়নি। শিবুকাকা কোনও দিনই সংসারী মানুষ ছিল না। তার ছিল মাছের সংসার। ছিপ-বঁড়শি, চার টোপ, পিঁপড়ের ডিম— এ-সব নিয়ে তার দিন কেটেছে। খাল, নদী, পুকুর, দিঘি— এ-সব নিয়ে ছিল তার জীবন। নন্দাও যে এক ভরন্ত নদী, তার গভীরেও যে কত মাছ খেলে বেড়ায়, সে খবর রাখেনি। যাক, এখন তা হলে ওরা ভাল আছে।

শিবু বিছানায় শুয়ে ছিল। মনোতোষ দেখল, কঙ্কালের মতো কাঠামো নিয়ে বিছানায় প্রায় মিশে আছে শিবু। চোখদুটো শুধু যেন আরও উজ্জ্বল হয়েছে। খাটের পাশে একটা চেয়ার, সেখানে একটা খালি চায়ের কাপ পড়ে আছে। তাকে দেখে হাসল শিবু।

“এ কী, তোমার এমন চেহারা হল কী করে? কী হয়েছে তোমার? নন্দা কোথায়?”

আবার হাসল শিবু। মনোতোষের মনে হল, হাসির সঙ্গে হলুদ বিষাদবিন্দু গড়িয়ে পড়ল বিছানার ওপর।

“কিছু হয়নি আমার। মাঝে মাঝে মাথায় খুব যন্ত্রণা হয়। নন্দা? আমি তো ভাবলাম তোর পিছনে নন্দাও এসেছে বোধহয়।”

শিবুর মুখের দিকে কিছুক্ষণ বোকার মতো তাকিয়ে রইল মনোতোষ। এ কথার মানে তার কাছে পরিষ্কার হয়নি। নন্দা তার সঙ্গে আসবে কেন? নন্দার তো এখন এ-বাড়িতে থাকার কথা।

“ইয়ার্কি মারছ। ডাক্তার দেখিয়েছ? হয়েছে কী তোমার, বলবে তো! মাথার যন্ত্রণায় কারও চেহারা এ রকম হয়? নন্দাকে ডাকো, ওর সঙ্গে কথা বলব।”

মনোতোষের চোখের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল শিবু। হঠাৎ অস্বস্তি হল মনোতোষের। শিবু কি তার মনের কথাগুলো পড়ে নিতে চাইছে! শিবু কি দেখতে পাচ্ছে, সে আর নন্দা একসঙ্গে বিছানায় শুয়ে আছে! উদ্দাম প্রণয়লীলা, শরীরের খেলায় ধ্বস্ত হচ্ছে দু’জনের শরীর! তার পর মনোতোষের দায় নেওয়ার ভয়। নন্দার সুখের কথা, লক্ষ্মীর আসনের কথা। সব কি পড়তে
পারছে শিবুকাকা!

“নন্দা নেই। সে আমাকে ছেড়ে চলে গেছে অনেক দিন আগে। জানিস, আমার মাথার নার্ভগুলোয় শর্ট-সার্কিট হয়ে গেছে। ওষুধ খাচ্ছি, শুধু ঘুম পায়।”

“চলে গেছে! কোথায় গেছে, কার সঙ্গে গেছে?”

অবিশ্বাসের চোখে শিবুর দিকে তাকাল মনোতোষ। তার বুকের ভিতরে যেন সহস্র জলপ্রপাত একসঙ্গে আছড়ে পড়ল। নন্দা কি কারও সঙ্গে পালিয়ে গেছে, না কি বাপের বাড়ি চলে গেছে?

“হয়তো প্রোমোটার তপন নস্করের সঙ্গে চলে গেছে। এ বাড়ি-জমি নেবে বলে তপন আসত খুব। নন্দার সঙ্গে গল্প করত। আবার মোড়ের জগৎ সাহার সঙ্গেও হতে পারে। শেষের দিকে জগতের দোকান থেকেই বাকি মাল আসত আমাদের। আমি জানি, ওরা নন্দাকে মিথ্যে ভালবাসার কথা বলে, ‘আমার সোনা’ বলে যা করার করে শূন্য বোতলের মতো ছুড়ে ফেলে দেবে। বাতাসে উড়িয়ে দেবে চানাচুরের খালি প্যাকেটের মতো। আমারই ভুল রে মন্টু! নন্দাও তো একটা চকচকে আঁশের মাছ ছিল। আমি কোনও দিন সে মাছের খোঁজ রাখিনি। ছিপ-বঁড়শি নিয়ে পাগলের মতো ঘুরেছি কত দূরের দিঘিতে। মন্টু, ভাই একটা কাজ করে দিবি?”

“কী কাজের কথা বলছ? তুমি বললে আমি সব পারি শিবুকা।”

“জানি, তোকে খুব পছন্দ করত নন্দা। তোরা কত দিন একসঙ্গে লুডো খেলেছিস, গান-কবিতা নিয়ে গল্প করেছিস। আমি নিশ্চিন্তে মোহনপুরের দিঘিতে গেছি মাছ ধরতে। আচ্ছা মন্টু, তুই কোনও দিন শুনেছিস, দিঘির মাঝখানে একটা প্রকাণ্ড হাঁ-করা গর্ত থাকে। দিঘির জলেও ঘূর্ণি ওঠে। তখন সব কিছু গিলে খায় ওই চোরাস্রোত।”

“কী কাজের কথা বলছিলে তুমি...”

“শোন ভাই, নতুন যে পথটা হয়েছে, তুই তো সেই রাস্তা দিয়েই এলি, পলাশগুড়ি থেকে শিলিগুড়ি যাওয়ার মুখে বাইপাসের মোড়ে অনেকগুলো ধাবা হয়েছে। কত দূর দূর থেকে ট্রাকগুলো এসে দাঁড়ায়। ঔরঙ্গাবাদ, পাটনা, দিল্লি, গোরখপুর।”

“হ্যাঁ, জানি তো। ওই সমাদ্দারের পেট্রল পাম্পের পাশেই।”

“ওখানে একটু রাত নামলেই খারাপ মেয়েরা এসে দাঁড়ায়। লাইনের মেয়ে, ড্রাইভারদের সঙ্গে ট্রাকে ওঠে। তুই একটু আড়ালে দাঁড়িয়ে লক্ষ রাখবি, নন্দাকে দেখতে পাস কি না? দেখলে ওকে ফিরিয়ে আনিস। বলিস— আমি মাছ ধরা ছেড়ে দিয়েছি। বলিস— আমি রাগ করিনি, আমি এখন থেকে ওকে খুব ভালবাসব। প্লিজ় মন্টু, দেখিস নন্দা এলেই আমি ভাল হয়ে যাব...”

নতুন পথ জুড়ে দিয়েছে দুটো শহরকে। মহাধমনীর মতো সেই পথের কাছাকাছি কোনও প্রাচীন অরণ্য নেই। ছোট ছোট সুখ-দুঃখের কথাগুলো সরে গেছে আরও গভীরে। ঝরে-পড়া শুকনো খয়েরি পাতার উপর শুয়ে থাকে ময়াল। আড়মোড়া ভেঙে নিঃশব্দে এগিয়ে যায় চিতল হরিণের দিকে। চিলোনির ঝিরঝিরে পাতার ফাঁক দিয়ে ওর শরীরে আলো এসে পড়লে হয়তো কোনও দিন সেই সুন্দরের সঙ্গে কারও দেখা হয়ে যায়। মুগ্ধ হয়ে সে দেখে সুন্দরকে। সে স্থবির হয়ে যায়। সবাই বলে ‘বোকা’। মৃত্যুর অত কাছে কি যেতে হয়!

শেষ

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Bengali Novel Novel

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy