E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

আকাশ জুড়ে ঘুড়ির খেলা

মনোময় হেসে বলল, “তোমাকে যদি পরির মতো দেখতে হত, তবে না-হয় কথা ছিল। চপের জন্য তো শুধু আসবে না। আমি বলেই তোমাকে বিয়ে করে এত বছর…”

সুতপন চট্টোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৪ অক্টোবর ২০২৬ ০৮:২৮
ছবি: মহেশ্বর মণ্ডল।

ছবি: মহেশ্বর মণ্ডল।

পূর্বানুবৃত্তি: ট্রেনে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার পর শিয়ালদহ স্টেশনে ফেরে অনুপম। মেসে মনোময় তার অসুস্থতার খোঁজ নিয়ে শরবত পাঠায়। এই সামান্য যত্নেই অনুপমের মনে নিজের মা ও আপনজনের কথা মনে পড়ে। এর পর আমহার্স্ট স্ট্রিটে অমরেন্দ্র সান্যালের মেয়ে তিয়াসাকে পড়ানোর কাজ পায় সে। প্রাণবন্ত ও কল্পনাপ্রবণ তিয়াসার সঙ্গে দ্রুত তার সহজ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। অনুপম বুঝতে পারে, তাকে পড়ানোর জন্য শুধু বিষয়জ্ঞান নয়, সঠিক কৌশলও দরকার। এই পর্বে মনোময়ের অতীতও সামনে আসে। আরামবাগ থেকে কলকাতায় এসে প্রথমে বসন্তকাকার আশ্রয়ে থেকে সে ফার্নিচারের দোকানে দিনমজুরের কাজ করত। শহুরে মানুষের বিলাসিতা দেখে তার বিস্ময় ও সংশয় তৈরি হয়। এক ক্রেতার সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগে অপমানিত হয়ে সে কাজ ছাড়ার কথা ভাবে। পরে এক প্রকাশকের সঙ্গে পরিচয় হয় এবং সেখানে তুলনামূলক ভাল চাকরির সুযোগ পায়। এ ভাবেই কলকাতায় তার নিজের জায়গা করে নেওয়ার সংগ্রাম শুরু হয়।


মনোময়ের ভাল লেগে যায় প্রকাশকের কথাটা। মানুষটা সম্মান দিয়ে কথা বলেন। সেই থেকে মনোময়ের আস্তানা এই পটুয়াটোলা লেনের বাড়িতে।

৭

বহু প্রাচীন এই বাড়িটির মালিক ছিলেন মনোময়ের শ্বশুর। তিনি কিছু দিন কলকাতায় থাকতেন, কিছু দিন দেওঘরে। এক দিন আস্তানা খুঁজতে খুঁজতে মনোময় এই বাড়িটির মধ্যে ঢুকে দেখে, চন্দনবাবু একটি চেয়ারে বসে আছেন। তাঁর দু’পাশে দু’জন মানুষ, তারা চন্দনবাবুর হাতে আর পায়ে তেল মালিশ করছে। এ বাড়িতে দুপুরে রোদ পড়ে না। জিজ্ঞেস করেছিলেন, “কী চাই?”

করুণ গলায় মনোময় বলেছিল, “আমার একটা থাকার জায়গা চাই।”

“কী করো?”

“এই বইয়ের দোকানে কাজ করি।”

“তোমার সঙ্গে কে আছে?”

“কেউ নেই।”

মিনিট দুয়েক তাকিয়েছিলেন চন্দনবাবু। তার পর দশ-বারোটা প্রশ্ন করে দু’পাশে দু’জন লোককে সরিয়ে বলেছিলেন, “তুমি আমার বাড়িতে থাকতে পারো, তবে বাড়ির কেয়ারটেকার হয়ে থাকতে হবে। বাড়িটা দেখাশোনা করো। তোমাকে আমি একটা ঘরে থাকতে দেব। আমি দেওঘরে থাকি। সেখান থেকে আমার পরিবার যখন আসবে, তখন তোমার জন্য অন্য ব্যবস্থা করে দেব।”

সেই থেকে মনোময় এই বাড়িতে। কিছু দিনেই মনোময়ের বোধোদয় হল, একার পরিশ্রমে এখানে চলবে না। সে অচিরেই বিয়ে করে বসল। বাড়ির সামনের রাস্তার কোণে সে চপের দোকান করেছিল, তাতে স্ত্রী স্নেহলতাকে বসিয়ে দিল। খুব অল্প দিনেই সেটা জমে উঠল। দূরের কাস্টমারকে দেবে কী করে? বৌ বলল, “একটা থার্মোকলের বাক্সে মাথায় করে নিয়ে গেলে চপ, বেগুনি ঠান্ডা হবে না।”

মনোময়ের ধারণা, কাগজের ঠোঙায় তেলেভাজা ঠিক থাকে, কিছুটা তেল কাগজ শুষে নেয়, থার্মোকলের বাক্সে হয় না। এতে তেলেভাজার স্বাদ বাড়ে। বৌ বললে, “তা হলে তুমি ওদের দোকানে এসে নিয়ে যেতে বলো।”

মনোময় হেসে বলল, “তোমাকে যদি পরির মতো দেখতে হত, তবে না-হয় কথা ছিল। চপের জন্য তো শুধু আসবে না। আমি বলেই তোমাকে বিয়ে করে এত বছর…”

মনোময়ের স্ত্রীর হালকা রসিকতা খারাপ লাগে না। তাকে খুবই সাদামাটা দেখতে ছোটবেলা থেকেই। প্রসাধনে কোনও দিনই তেমন আগ্রহ ছিল না। গ্রামের মাঠ-খামারে, বনজঙ্গলের মধ্যে মানুষ হওয়া স্নেহলতার প্রথমে ভালই লাগেনি শহর কলকাতা। দিদার কাছে শুনেছিল, তার বিয়ে হবে, পাত্রের কলকাতায় তেলেভাজার ব্যবসা। তেলেভাজার ব্যবসা? তার ধারণা গ্রামের লোকই তেলেভাজা খায়। শহরের লোক খায় না। তা হলে সেটা জুতসই ব্যবসা নয়। তখন থেকেই বেঁকে বসেছিল। বাবাকে বলেছিল, “আমাকে গ্রামের কোথাও বিয়ে দাও, আমি কলকাতা শহরে থাকতে পারব না, আমি তো শহরের কিছুই জানি না।”

পরিবারে‌ আত্মীয়স্বজন অবাক হয়েছিল তার কথা শুনে। গ্রাম থেকে শহরে বাস করার জন্য গ্রামের মানুষের বুকভর্তি ব্যাকুলতা এই মেয়েটির মধ্যে প্রসারিত হয়নি দেখে অনেকে তাকে বুঝিয়েছিল, “তোর ধারণা ভুল। কলকাতায় গেলে তোর ভাগ্য ফিরে যাবে।”

মানুষ যেমন ভাগ্যের কাছে অসহায়, তেমনই গ্রামের সহজ-সরল মেয়ে তার নতুন ভাগ্যের লোভে মনোময়ের সঙ্গে বিয়েতে শেষে রাজি হয়ে যায়। আপত্তি করলেও কিছু করার ছিল না, সেটা সে অবশ্য ভাল করেই জানত। তবে মনোময়কে দেখে তার মনটা ভরে গিয়েছিল। চওড়া কাঁধ, লম্বা লম্বা হাত-পায়ের গড়ন, মোটা গোঁফ, নির্মল হাসিতে ভরা মনোময়ের মুখ দেখে সে ওর প্রেমে পড়ে গিয়েছিল।

স্নেহলতা যে গ্রামে মানুষ হয়েছিল, সেই গ্রামের নাম শ্বেতচন্দনপুর। খুব ছোটবেলায় মাকে হারিয়ে সে বড় হয়েছে তার মামার বাড়ি শ্বেতচন্দনপুরে। নিজের জন্মভিটে জ্ঞান হওয়ার পর থেকে কোনও দিন ছেড়ে যায়নি স্নেহলতা। মামার বাড়িতে থাকতে থাকতে সেখানকারই প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হয়েছিল। বেশি দূর পড়তে পারেনি সে। সেজমামা তাকে খুব অল্প বয়সেই বাড়ির ফাইফরমাশ খাটানোয় এমন ভাবে লাগিয়ে দিয়েছিল যে, তার পক্ষে আর স্কুল, পড়াশোনা, খেলাধুলা, পাড়ায় সই পাতানো, বর্ষায় জলে ভিজে ঝড়ে আম কুড়োনো— কোনও কিছুই হয়ে ওঠেনি। স্নেহলতার মনে তা নিয়ে দুঃখ ছিল।

কিন্তু কলকাতায় তার বিবাহিত জীবনে আজ আর ছোটবেলার ছোট ছোট দুঃখগুলো মনে পড়ে না। খুব ভোরে ওঠে স্নেহলতা। তখন কলকাতা শহরের প্রথম ট্রামটি হাওড়া স্টেশন থেকে ঝমঝম শব্দে শিয়ালদা স্টেশনের দিকে কয়েক জন যাত্রী নিয়ে চলে যায়। চার দিকে নিঝুম নিঝুম জনপদ, ফুটপাতের উপর নেড়ি কুকুরগুলো গোল হয়ে শুয়ে থাকে, পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের ব্যাগগুলো রাস্তার হালকা হাওয়ায় ঘোরাঘুরি করে।

পুলিশের একটি কালো গাড়ি হর্ন বাজিয়ে শ্যামবাজারের দিকে চলে গেলে, স্নেহলতা রাস্তা পেরিয়ে গিয়ে প্রথম কিংবা দ্বিতীয় হিসেবে দাঁড়ায় দুধের ডিপোটিতে। এই জায়গায় তার চোখে পড়ে শ্বেতচন্দনপুর গ্রাম। যে মানুষগুলো এখানে বিভিন্ন পরিবারের জন্য আসে, তাদের মধ্যে সে যেন স্পষ্ট শ্বেতচন্দনপুরের মানুষগুলোকে দেখতে পায়। চিকিৎসাহীন, প্রাণহীন চেহারা, পোশাক অপরিচ্ছন্ন, মুখে হতাশা কিংবা বিষাদের ছায়া, পরিশ্রমী কিছু মানুষ। তাদের সে কখনও হাসতে দেখেনি।

এখানেই তার সঙ্গে আলাপ হয় আলপনার। বয়সে তার থেকে ছোটই হবে। কিন্তু তার মুখে গ্রামীণ সারল্য প্রতিদিনই প্রায় দেখে স্নেহলতা। অবিবাহিত একটি মেয়ে, গাছকোমর বেঁধে দু’হাতে দুটো দুধের ক্যান নিয়ে সে যখন তার মনিবের বাড়ির দিকে যায়, তখন পিছন থেকে শ্বেতচন্দনপুরের একমাত্র বন্ধু কল্পনার কথা মনে পড়ে যায়। দেখা হলে একমুখ হেসে লাইনে নিজেকে ঠিকঠাক জায়গায় নিয়ে আসে। কেউ আগে ঢুকতে চাইলে আলপনা প্রথমেই তার প্রতিবাদ করে এবং তাকে বার বার সতর্ক করে বোঝায়, লাইন ভাঙা আসলে অন্যায়।

স্নেহলতা তো কোনও দিন এমন প্রতিবাদ করার কথা ভাবেনি। ভেবেছে, কী আর হবে, তার তো দুধে কম পড়বে না। সে কোনও দিন প্রতিবাদ করার চেষ্টা করেনি, কিন্তু আলপনা সেটা মানে না। আর মানে না বলেই প্রতিবাদের সময় বদলে যায় তার চোখমুখের চেহারা। চোখ ঝলসে ওঠে, কথা বলার সময় তার হাতের অঙ্গভঙ্গি দেখলে মনে হয় না যে সে খুব শান্ত ও সংযত মেয়ে। আলপনা এই বঙ্গের মেয়ে নয়। পূর্ব বাংলা থেকে আসা পরিবারের মেয়ে। জন্মেছে এখানে। সামান্য অন্যায়ের বিরুদ্ধেও কী তীব্র তার প্রতিবাদের ভাষা! এমন ভাষা কি গ্রামে শোনেনি স্নেহলতা? শুনেছে। কিন্তু তার তীব্রতা আলাদা, ঝাঁঝ অনেক কম। স্নেহলতার মনে হয়েছিল, এই জীবনের তীব্রতার রকমফেরই শহর আর গ্রামের আসল তফাত। মানুষ কিন্তু সব একই।

স্নেহলতা এটাও বুঝেছে, এই শহরে বেঁচে থাকতে গেলে আলপনার মতো মেয়ের দরকার, তার মতো নয়। ভবিষ্যতে ছেলের সে বিয়ে দেবে এমনই এক মেয়ের সঙ্গে। সেই পরিকল্পনার অনেক আগেই তিন দিনের জ্বরে স্নেহলতা মারা গেল। মনোময় চাকরি ছেড়ে দোকানেই বসে গেল চিরদিনের জন্য।

বছর পাঁচেক পরে চন্দনবাবু তার পরিবার নিয়ে দেওঘর থেকে এই বাড়িতে এসে উঠলেন। তার দুই মেয়ে। বড়টির বিয়ে দিয়েছিলেন, আর ছোট মেয়েটিকে নিয়ে তিনি থাকতেন একটি ঘরে। কলকাতাকে ভালবাসতে বাসতে চন্দনবাবুর ছোট মেয়েকে ভালবেসে ফেলেছিল মনোময়। কালক্রমে চন্দনবাবুর একমাত্র সম্বল হয়ে এই গোটা বাড়িটা নিজের হাতে চিরদিনের জন্য বাগিয়ে নিয়েছিল। এই বাড়িটার একতলায় থাকার অবস্থার পরিবর্তন করে দোতলায় পর পর চারটি ঘর বানিয়ে ফেলেছিল অচিরেই। চন্দনের ছোট মেয়ে বলেছিল, “এত বড় বাড়িটা তুলছ, যখন ভাগ হবে তখন দিদিও পাবে।”

“এ বাড়ি থেকে আমি আর যাচ্ছি না। দিদি যদি টাকাপয়সা দেয়, তখন দেখা যাবে।”

একটা সময় সেই দিদিও মারা গেছে। বাড়ির সামনে চপ ও বেগুনির দোকান। বড়বাজার, বৌবাজার বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ যখন এই হ্যারিসন রোড বা মহাত্মা গান্ধী রোড ধরে শিয়ালদা স্টেশনের দিকে যায়, তখন তারা এক বার না এক বার, কোনও না কোনও দিন এই দোকান থেকে ছোলা-বাদাম-ঝুরিভাজা দিয়ে মাখা চপ-মুড়ি, চানাচুর-মুড়ি খেয়েছে নিশ্চয়ই। বার বার তার স্মৃতি বলেছে, বাড়ির সামনে লক্ষ্মী বসে, বাইরে কেন কপাল খুঁজিস? এই লাইনটা সে কলকাতায় শেখেনি, এ লাইন ছোটবেলায় এক বোষ্টমির কাছে শিখেছিল, আরামবাগ শহরের একটু দূরে তাদের শান্ত নিরিবিলি গ্রামে এক বোষ্টমি এসেছিল। সে খঞ্জনি বাজিয়ে ছোট ছোট গান গাইত। নানা ভাবে গাইতে গাইতে বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়াত।

বার বার গাইত, ‘যে আসে তারে ফিরায়ে দিতে নাই’। তাই তার বৌকে সে বলেছিল, “আমি ব্যবসা করব বলে শুরু করিনি। ব্যবসা আমার কাছে এসেছে। এ-সব বোঝার বয়স হয়নি তোমার।”

দু’টি সন্তানের জন্ম দিয়েছে মনোময়ের বৌ। একটি ছেলে, একটি মেয়ে। মনোময় মনের গোপন কথাটি অকপটে বলেছিল, “জানো, রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে ব্যবসা করছি। কত দিন পারব জানি না। ছেলে দেখবে কি না, তার কোনও ঠিক-ঠিকানা নেই, সে ব্যবসায় হাত দেবে কি না, সেটাও জানি না। মেয়ে চলে যাবে তার শ্বশুরবাড়ি। আমি তো সারা জীবন রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারব না। দোতলায় তিনটে থেকে চারটে ঘর যদি করে ফেলতে পারি, আর সেই মেসে প্রতিটি ঘরে চার জন করে যদি আমি বোর্ডার রাখি, আমার জীবন অনায়াসে চলে যাবে। তোমাকে রান্নাঘর ছেড়ে দিতে হবে না। এটা থেকেই তুমি খাওয়াদাওয়ার সব ব্যবস্থা করে দিতে পারবে। এর থেকে আরামের জীবন আমার মতো লোকের আর কী হতে পারে?”

সেদিন মনোময়ের স্ত্রী মনে মনে বুঝতে পেরেছিল, লোকটাকে যতটা বোকা মনে হয়েছিল, ততটা বোকা সে নয়। যদিও তার লেখাপড়া খুব একটা বেশি নেই, স্কুলের গণ্ডিও পেরোয়নি, তবু জীবন এবং ব্যবসা দু’টি সুতলির মতো টেনে আনতে পারছে, এটাই তার পরম স্বস্তি।

মনোময় যে দিন উপরের তিনটি ঘর তৈরি করে ফেলল, সেই দিনই তার বহির্জগৎ আস্তে আস্তে ছোট হতে লাগল। সে জানত, অনেক ভেবেচিন্তেই সে কাজটি করেছে। তার ছেলে পলাশকে অন্তত রাস্তায় দাঁড়িয়ে জীবন কাটাতে হবে না। সেই থেকে এই বাড়ির নামটি দোকানের নামের সঙ্গে যুক্ত হয়েই বিখ্যাত হয়েছে ‘চপের মেসবাড়ি’। একটা ব্যবসা ভিতরে, আর একটা বাইরে। বাইরের জীবনের আর ভিতরের জীবনের আবর্তনের চেহারা, গতি, সাজসজ্জা আলাদা। এও জীবনধর্মেরই এক বৈচিত্র।

৮

বৈচিত্রই বলতে হবে। কলকাতার উপর অঝোরে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি পড়েছে। পর পর দু’দিন মাঝে মাঝে ঝেঁপে এসেছে নিম্নচাপের বৃষ্টি, রাস্তাঘাটের ছন্নছাড়া অবস্থা। বাড়ি থেকে খুব একটা বাইরে বেরোয়নি অনুপম। নেহাত না গেলে নয় বলে নিত্যযাত্রীর দল শিয়ালদা থেকে আসা-যাওয়া করছে মহাত্মা গান্ধী রোড বরাবর। আগের এক দিন যেতে পারেনি। আজ না গেলে দু’দিন কামাই হবে। ছাতা মাথায় সন্ধেবেলা তিয়াসাদের বাড়ি এল অনুপম।

গলিতে তখন জল। কোনওক্রমে এদিক-সেদিক করে পৌঁছে শুনল, তিয়াসার প্রবল জ্বর। সে তিন দিন আগে ছাতা না নিয়েই স্কুলে গেছে। অণিমা বারণ করেছিল, শোনেনি। ফেরার পথে কাকভেজা হয়ে বাড়ি ফিরেছে। রাত থেকেই প্রবল জ্বর। এই আবহাওয়ায় ডাক্তারের চেম্বার বন্ধ। বাড়িতে যা ছিল সেই দিয়েই চিকিৎসা চলছে দু’দিন। অণিমা বললেন, “কী করি বলো তো! মেয়ে বড় হয়েছে, ধরে ধরে তো মারতেও পারি না। এত করে বললাম, শুনল না। ঝামেলা তো মাকেই সামলাতে হবে!”

অনুপম বলল, “কী ওষুধ দিয়েছেন?”

অণিমা বললেন, “ওই প্যারাসিটামল।”

ঘরের ভিতর পা দিয়েই দেখল, সারা শরীরে চাদর মুড়ে চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে তিয়াসা। মায়ের গলার স্বরে চোখ মেলে তাকাল সে। সারা মুখে যন্ত্রণার চিহ্ন। চোখ খুলে রাখতে পারল না, জুড়ে এল। অনুপম বিছানার পাশটিতে বসল। অণিমা বললেন, “এমন জ্বর আগে কখনও দেখিনি। ইস্কুল থেকে ফিরে জামাকাপড় বদলে চুল মুছিয়ে দিচ্ছি, চেয়ারে বসে থাকতে পারল না। আমকে জড়িয়ে ধরে বলল শুইয়ে দিতে। সেই যে শুয়েছে, আর ওঠেনি। বাথরুমে নিয়ে যাচ্ছে পিয়াসা। ধরে ধরে। কিছুই প্রায় খাচ্ছে না। জ্বর ট্যাবলেট দেওয়ার পর কিছুটা কমেছিল, আবার যে কে সেই।”

“রক্ত পরীক্ষা করিয়েছেন?”

অণিমা বললেন, “আজ নিয়ে গেছে। রাতে রিপোর্ট দিতে আসবে।”

রিপোর্ট দেখেই বাড়ি ফিরবে, ঠিক করল অনুপম। তিয়াসার বাবার আজ রাতে কলকাতা ফেরার কথা। অণিমা একা যে ঝামেলা ছোট মেয়েকে নিয়ে সামলাচ্ছেন, সেটা ভেবে অনুপম বলল, “এক বার খবর পাঠাতে পারতেন। আমি তো কিছুই জানি না। আপনার উপর চাপটা কিছুটা কম হত।”

“পিয়াসা এক বার বলল, তোমাকে খবর দিতে। আমিই বারণ করলাম। এতটা যে বেড়ে যাবে বুঝতেই পারিনি।”

অনুপম অণিমার দিকে তাকাল। তার পর বলল, “আজ রিপোর্ট আসুক, ততক্ষণ আমি আছি। আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন।”

ক্রমশ

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Bengali Novel Novel

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy