E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

আকাশ জুড়ে ঘুড়ির খেলা

অনুপম বলল, “১০৯ হেক্টর বিশাল এলাকা জুড়ে এর পত্তন করেছিলেন ব্রিটিশ আর্মি অফিসার কর্নেল রবার্ট কিড।”

সুতপন চট্টোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১৮ অক্টোবর ২০২৬ ০৯:৪৪
ছবি: মহেশ্বর মণ্ডল।

ছবি: মহেশ্বর মণ্ডল।

পূর্বানুবৃত্তি: তিয়াসার রক্তপরীক্ষায় ম্যালেরিয়া ধরা পড়ে। ডাক্তার সেন পূর্ণ বিশ্রাম ও ওষুধের পরামর্শ দেন। অসুস্থ তিয়াসা অনুপমকে পড়ানোর দিনগুলিতে আসতে বলে। অনুপম দিদিমাকে চিঠিতে তিয়াসার সরলতা ও খামখেয়ালিপনার কথা জানায়। কলকাতার একঘেয়ে পরিবেশে তার মনে পড়ে দ্বারবাসিনীর প্রকৃতি ও দিদিমার স্নেহের কথা। চপের মেসবাড়ির সদস্য প্রতাপনারায়ণ মজুমদার ভোরে সংস্কৃত স্তোত্রপাঠ করেন। বসিরহাটের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান প্রতাপনারায়ণ ইংরেজিতে এমএ পাস করে বিদেশে অধ্যাপনা করেছিলেন। কলকাতায় ফিরে প্রায় দু’বছর ধরে মেসবাড়িতে থাকছেন। অনুপমের প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, একটি বস্তিতে তিরিশটি শিশুকে বাংলা, ইংরেজি ও অঙ্ক পড়ান। তিনি আরও জানান, গোপন বামপন্থী দলের সদস্য হওয়ার খবর জানতে পেরে তাঁর বাবা তাঁকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। শিয়ালদহে এসে বৈঠকখানা বাজারে সর্ষের তেলের ঘানির হিসাব রাখার কাজ দিয়ে তাঁর কলকাতার জীবন শুরু হয়।


একটু থেমে প্রতাপনারায়ণ বললেন, “যদিও আমার কোনও ঠিকানা ছিল না, এক ভদ্রলোক এসে আমাকে ভোটার কার্ড করিয়ে দেন। সেখান থেকে কলেজ, কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিদেশ— এই দীর্ঘ জীবন। যদি আমি তোমাকে বলতে চাই, তা হলে তোমার জীবনের অর্ধেক সময় চলে যাবে। তাই ওই অংশটুকু সংক্ষেপে থাক।”

এতটা শোনার পর অনুপম প্রশ্ন করেছিল, “আপনার পুরনো দলে আর ফিরে যাননি?”

প্রতাপনারায়ণ শ্বাস ফেলে বললেন, “এ দেশটায় সবচেয়ে বড় মুশকিল কী জানো? এ দেশের প্রতিবাদ করার মতো সত্যিকারের কোনও ভাষা নেই। যে ভাষায় প্রতিবাদ হয়, তার জোর খুব কম ও একই শব্দের প্রতিধ্বনি। আর সেই প্রতিবাদ দীর্ঘ ও বিস্তৃত নয়। ছোট ছোট কারণে ছোট ছোট বিষয় নিয়ে প্রতিবাদ হয়। সামগ্রিক পরিবর্তন করতে গেলে মানুষের পরিবর্তন দরকার।”

“কেন সে কথা বলছেন?”

“বুঝতে পারবে। ধীরে ধীরে বুঝতে পারবে।”

আরও অবাক হওয়ার পালা এ বার অনুপমের। প্রতিবাদের কথাটা প্রতাপনারায়ণ আলটপকা বললেন কি? আর বললেন, তো কেন বললেন?

সেদিন রাতে দিদিমাকে আবার চিঠি লিখতে বসল। লিখল, “কলকাতার লোকজন বড় বিচিত্র। এরা ঠিক আমাদের মতো সমাজে বাস করে না; লেন, বাইলেন, বড় রাস্তার আশপাশে গায়ে-গায়ে লাগানো বাড়িতে বাস করে। তাদের কোনটা সমাজ, সেটাই এত দিনে দেখতে পেলাম না— কিন্তু তারা সমাজ বদলানোর কথা বলে বা ভাবে। আর এমন গায়ে-গায়ে বাড়িতে থাকে কী করে, দেখলে তুমি হাসতে। যাই হোক, আমি এক দিন না এক দিন এখানেই নিজের পায়ে দাঁড়াব। দেখে নিয়ো।”

অনুপম জানে, এই ক’টা লাইনই দিদিমাকে উৎকণ্ঠা থেকে মুক্তির পক্ষে অনেক।

১০

মঞ্চটা গলির উল্টো দিকের মাঠে। পার্কের পাশের রাস্তার গা ঘেঁষে মঞ্চ, সবুজ-মেরুন রঙের মিশ্রণে তৈরি। তিনটি ধাপ পেরিয়ে উঁচু মঞ্চে রবীন্দ্রজয়ন্তীর আয়োজন চলছে। সিগারেটের শেষটুকু চটির নীচে চেপে ধরতেই অনুপম দেখল, মঞ্চের দিক থেকে আসছে তিয়াসা। সঙ্গে তার গানের শিক্ষক। এখানে অনুষ্ঠান আছে নাকি তিয়াসার? কই, বলেনি তো!

বাড়ির গলির মুখে তিয়াসাকে ছেড়ে শিক্ষক চলে গেলেন। অনুপম কিছুটা সময় নিল। বিকেলের আলো মরে এসেছে। পলস্তারা খসা শতাধিক বছরের পুরনো বাড়ির নীচে দাঁড়াল অনুপম। কোনও এক অজ্ঞাত কুঠুরি থেকে শাঁখের শব্দ ভেসে আসছে। একটি দোকানের নীচে যে তেলেভাজার দোকান, সেও আলো জ্বেলে দিয়ে জানাল, সন্ধ্যা হয়-হয়। গলির ভিতরে আবছা অন্ধকারের ছায়া জমতে শুরু করেছে। লাইট পোস্টে বাল্‌বটা এখনও জ্বলে ওঠেনি। যেন সেটা জ্বলে উঠলেই এই গলিতে দিনের সমাপ্তি ঘোষিত হবে। অনুপম ধীরে ধীরে তিয়াসাদের বাড়িতে ঢুকেই দেখল, হারমোনিয়ামের শব্দ নেমে আসছে উপর থেকে। এসেই গান নিয়ে বসেছে তিয়াসা। পড়বে তো আজ?

অনুপম পড়ার ঘরে পা দিতেই তিয়াসার মুখ ঝলমল করে উঠল। বলল, “জানেন, আমাদের কাউন্সিলার আমাকে গান গাইতে বলেছে। আজ স্টেজ দেখে এলাম।”

অনুপম মনে-মনে বলল, ‘ঠিক করেছিস। কিন্তু একা যাসনি কেন? ওই গানের মাস্টারকে তোর পাশে মানায় না।’

আসলে মানায় কিন্তু খুবই। সুদর্শন, লম্বা, একমাথা চুল, উজ্জ্বল শ্যাম গায়ের রং। তিয়াসার পাশে অপূর্ব লাগে। কিন্তু অনুপম মানতে পারে না। দেখার পর থেকেই মনটা কেমন বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে। মুখে কিছু বলল না অনুপম। বৈশাখের গরমে, ঘামে ও মনের চাপে সে তখন কিছুটা বিধ্বস্ত। চেয়ারে বসতে বসতে বলল, “গান ঠিক হয়ে গেছে?”

তিয়াসা বলল, “প্রায়। আপনাকে পরের সপ্তাহে শোনাব। আপনি বললে, সেই দুটোই গাইব।”

অনুপম বলল, “আমি কেন? তোর মাস্টারমশাই-ই তো বলে...”

কথাটা কেড়ে নিয়ে তিয়াসা বলল, “আমি ওঁর কাছে গান শিখি। তরুদা খুব ভাল শেখান।”

“তরু? সে আবার কী নাম?”

“পুরো নাম শ্যামলতরু সেন। আমি তরুদা বলে ডাকি। আমাকে বলেছেন, সিলেক্ট করতে। যেটা ভাল পারব সেটা গাইব। বলুন, খুব ভাল না?”

অনুপম বলল, “খুব ভাল। আজ দেখলাম।”

“কোথায়?” বলে লাফিয়ে উঠল তিয়াসা।

অনুপম বলল, “প্যান্ডেল থেকে ফিরছিলি।”

“ডাকলেন না কেন? আলাপ করিয়ে দিতাম।”

কী করে বলবে, আলাপ করার জন্য এক মিনিটও সময় দিতে রাজি নয় অনুপম! সে কথা তো বলা যায় না! তাই বলল, “হবে এক দিন।”

অনুপমের মুডটা বোঝার চেষ্টা করল তিয়াসা। ঠিক নেই বোধ হয়। হয়তো কোনও কারণে বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে। শান্ত গলায় বলল, “বাবা কফি এনেছে। খাবেন? আমরা ঠিক করেছি আপনার সঙ্গে আমরা সবাই আজ কফি খাব। আপত্তি নেই তো?”

অনুপম ঘাড় নাড়ল। তার মনের মধ্যে ওই শিক্ষকের ছায়া ঘুরছে। বলতে বলতে পিয়াসা একটা ট্রে হাতে ঘরে ঢুকল। বলল, “অনুদা, আজ আমাদের কফি পার্টি। চিনি আপনি মেপে নেবেন। সব কফি চিনি ছাড়া।” বলে সব কিছু টেবিলে নামিয়ে রাখল পিয়াসা। তিয়াসা নিজের কাপে চিনি না মিশিয়ে অনুপমের কাপে চিনি মেশাতে লাগল ধীরে, একমনে, অপূর্ব একাগ্রতায়। রক্তিম মুখমণ্ডল তিয়াসার। যত্নে, আদরে, কাপের কফির মধ্যে চামচ গোল হয়ে ঘুরছে। সুডৌল চাঁপাফুলের মতো আঙুল ফুলে ফুলে উঠছে। তার চোখ কাপের চার ধারে। সে যেন সমস্ত উত্তাপ ধরে রেখে কফির কাপে মিষ্টি মিশিয়ে দিচ্ছে একান্তমনে। চুপ করে দেখছিল অনুপম। এক সময় কাপটা তিয়াসা তার দিকে এগিয়ে দিলে তার চমক ভাঙল। তিয়াসা বলল, “দেখুন তো, ঠিক হয়েছে কি না?”

অনুপম আস্তে চুমুক দিয়ে কফির স্বাদের সঙ্গে তিয়াসারও স্বাদ পেল। উষ্ণতায়। ভাল লাগল। পিয়াসা আবার ঘরে এসে বলল, “অনুদা, আমরা ভাবছি বোটানিক্যাল গার্ডেন বেড়াতে যাব সামনের রবিবার। আপনি আমাদের নিয়ে যাবেন?”

অনুপম বলল, “কে কে যাবে?”

“আমরা দুই বোন আর আর আমার দুই বন্ধু।”

এক বার ভাবল অনুপম। কোনও কাজ আছে কি? না, নেই। বলল, “যাব। কিন্তু কী ভাবে যাবি?”

“ট্যাক্সিতে। বাবা বলেছে টাকা দেবে। চার জনে শেয়ার করে নেব।”

মনে মনে ভাবল অনুপম, তা হলে কেবল সঙ্গ দিতে হবে। পকেটে চাপ পড়বে না। বাঁচা গেছে। পকেটের যা অবস্থা!


এই প্রথম শতকপ্রাচীন বটবৃক্ষের ঠান্ডা ছায়ায় চার তরুণীর সঙ্গে অনুপমের এক অনন্য সময়। কোনও দিন সে শহরের মেয়েদের সঙ্গে ভ্রমণে আসেনি। কী ভাবে যে সমতা রাখতে হয়, তার অভ্যন্তরীণ নির্মাণ নেই ওর মনের। শুধু নিজেকে মনে হচ্ছে একটি শিক্ষিত রাখাল। এখানে গ্রামের মাঠ নেই, কিন্তু রাখাল যেন ভিতরে বার বার জেগে উঠেছে। দু’মিনিট পর পরই সে বলে বসছে, “এই শোনো, ঝোপঝাড়ের দিকে যাবে না। রাস্তা দেখে হাঁটো, সবাই এক সঙ্গে চলো।”

এমন কেন বলছে সে? ঠিক বুঝতে পারছে না অনুপম। তবে সে লক্ষ করছে, পিয়াসা তার বন্ধুদের নিয়ে প্রায়ই এগিয়ে যাচ্ছে। দু’বার সবাইকে সাবধান করার পর তিয়াসা চুপি চুপি বলল, “ওদের ইচ্ছেমতো ঘুরতে দিন না। এখানে তো কেউ হারিয়ে যাবে না!” বলে চোরা হাসি হাসল তিয়াসা। অনুদা যে এত বোকা, সেটা সে কল্পনাই করেনি। পিয়াসা যে তাদের দু’জনেকে একটু নিরিবিলি করে দিতে চাইছে, সেটা অনুদা বুঝতে পারছে না কেন?

এখন পাশাপাশি হাঁটছে অনুপম। হঠাৎ তাকিয়ে দেখল, পিয়াসা দিদির দিকে পিছন ফিরে তাকিয়ে রহস্যময় হাসি হাসল। তিয়াসা চোখ ঘুরিয়ে দূরের দিকে তাকিয়ে বলল, “আচ্ছা, এই গার্ডেন প্রথমে কত বড় জায়গা নিয়ে ছিল?”

অনুপম বলল, “১০৯ হেক্টর বিশাল এলাকা জুড়ে এর পত্তন করেছিলেন ব্রিটিশ আর্মি অফিসার কর্নেল রবার্ট কিড।”

তিয়াসা বলল, “আপনি আগে কোনও দিন এখানে এসেছেন?”

অনুপম বলল, “না। আসার সুযোগ হয়নি। তবে তোদের সঙ্গে এখানে এসে দারুণ লাগছে।”

তিয়াসা গভীর চোখ তুলে বলল, “আমাদের সঙ্গে? না আমার সঙ্গে?”

হেসে ফেলল অনুপম। প্রশ্নের সরাসরি উত্তর এড়িয়ে বলল, “দুটোই। দেখ, বিশাল বটগাছটার কত ঝুরি মাটিতে নেমে এসেছে! কোনটা আসল গুঁড়ি তা আজ আর বোঝাই যায় না। শোনা যায়, প্রায় ১৯ হাজার বর্গমিটার জায়গা জুড়ে ঝুরি নেমেছে। ৩৭৭২টি ঝুরি আছে এই বটগাছের।”

তিয়াসা বলল, “আপনি এত জানেন কী করে বলুন তো?”

অনুপম বলল, “বই থেকে। না জেনে এলে তোর বোনের বন্ধুদের কাছে বোকা টিচার হয়ে যাব না?”

“মোটেই না। আপনাকে এখানে মাস্টারি করতে কেউ বলেনি। মাস্টার হতেও বলেনি। আপনি কি শুধু বোনের বন্ধুদের সঙ্গে এসেছেন?”

অনুপম বলল, “না। তা অবশ্য নয়।”

তিয়াসা কপট রাগ দেখিয়ে বলল, “ঠিক আছে, আমি আর কিছু প্রশ্ন করব না। চলুন, হাঁটতে হাটতে গঙ্গার দিকে যাই।” তার পর পিয়াসাকে চিৎকার করে বলল, “যেখানেই যাস, এই বটগাছের নীচে ফিরে আসবি। এখান থেকে বাড়ি ফিরব।”

এখান থেকে গঙ্গার ধার কত দূরে, দু’জনেই জানে না। তবু আন্দাজে দু’জনে পাশাপাশি হাঁটতে লাগল। সুবিশাল বনানী সমারোহে হাঁটতে হাঁটতে তিয়াসা বলল, “আপনার ভাল লাগছে না অনুদা?”

“দারুণ! কী সুন্দর হাওয়া লাগছে, ঠান্ডা হাওয়া!”

তিয়াসা বলল, “ও, শুধু হাওয়া লাগছে! আমি যে পাশে চলেছি, তার কোনও মূল্য নেই?”

অনুপম বলল, “কী যে বলিস! আচ্ছা, তোর মনে আছে, তোকে একটা গল্প বলেছিলাম, এক বিশাল পাখি এসে এক রাজকন্যাকে শক্ত ঠোঁটে তুলে নিয়ে নিরুদ্দেশ হয়েছিল?”

“মনে আছে।”

“আমার মনে হচ্ছে, এই বিশাল শহর থেকে যেন তোকে আমি তুলে এনে ফেলেছি এই অরণ্যে।”

তিয়াসা যেন এই কথাটাই শুনতে চাইছিল। সাগ্রহে বলল, “তার পর? কোথায় উড়িয়ে নিয়ে যাবেন, ঠিক করেছেন?”

অনুপম হেসে ফেলল, তার পর বলল, “কোথায় আর? টাক্সি করে আমহার্স্ট স্ট্রিট।”

ক্রমশ

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Bengali Novel Novel

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy