E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

আকাশ জুড়ে ঘুড়ির খেলা

একদিন শ্রাবণ মাসের বৃষ্টি, সারা আকাশ কালো মেঘে ঢাকা। লক্ষ লক্ষ জলকণা কলেজ স্ট্রিটের দিক থেকে এসে আছড়ে পড়ছে সেকেন্ডে সেকেন্ডে।

সুতপন চট্টোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ২৫ অক্টোবর ২০২৬ ০৭:৫০
ছবি: মহেশ্বর মণ্ডল।

ছবি: মহেশ্বর মণ্ডল।

পূর্বানুবৃত্তি: প্রতাপনারায়ণ অনুপমকে জানান, গোপন বামপন্থী দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কারণে তাঁর বাবা তাঁকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। নিজের অতীতের কথা সংক্ষেপে জানিয়ে তিনি প্রতিবাদ ও মানুষের পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে মত প্রকাশ করেন। অনুপম দিদিমাকে চিঠিতে কলকাতার জীবনযাত্রা ও নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সংকল্পের কথা লেখে। রবীন্দ্রজয়ন্তীর অনুষ্ঠানের জন্য তিয়াসাকে গানের শিক্ষক শ্যামলতরু সেনের সঙ্গে ফিরতে দেখে অনুপমের মন বিক্ষিপ্ত হয়। পরে তিয়াসাদের বাড়িতে কফি খাওয়ার সময় পিয়াসা বোটানিক্যাল গার্ডেন বেড়াতে যাওয়ার প্রস্তাব দেয়। পরের রবিবার অনুপম চার তরুণীকে নিয়ে সেখানে যায়। পিয়াসা ও তার বন্ধুরা আলাদা হয়ে ঘুরতে থাকলে অনুপম ও তিয়াসা পাশাপাশি হাঁটে। অনুপম বিশাল পাখির গল্প টেনে বলে, যেন সে তিয়াসাকে শহর থেকে তুলে এনে অরণ্যে ফেলেছে। সে তিয়াসাকে কোথায় নিয়ে জানতে চাইলে অনুপম আমহার্স্ট স্ট্রিটেই ফেরার কথা বলে।

অনুপমের উত্তর শুনে হতাশ হল তিয়াসা, বলল, “ধ্যাত! আপনি যেন একটা কী!”

অনুপম বলল, “কেন? তুই যাবি না?”

তিয়াসা বলল, “দেখুন দেখুন, এই গাছটার ডালে একটা পাখি। পাখিটার কী নাম? জানেন?”

অনুপম দেখল, সামনের একটি গাছে লেজ ঝুলিয়ে বসে আছে একটি হলুদ পাখি। জিজ্ঞেস করল, “ওটা তো? দেখ, চোখ তুলে আমাদের দু’জনকে গোল গোল চোখে দেখছে অধীর আগ্রহে!”

তিয়াসা আবার বলল, “পাখিটার নাম জানেন অনুদা? টিয়াপাখি কি?”

অনুপম বলল, “না। ঠোঁট দেখেছিস? অন্য রকম। টিয়ার মতো নয়। কী সুন্দর ঠোঁট পাখিটার।”

তিয়াসা বলল, “সত্যি!” তার পর দুষ্টু হেসে বলল, “আপনার ঠোঁটদুটোও খুব সুন্দর।” বলে দৌড়ে কিছুটা এগিয়ে গেল। অনুপমের নাগালের হাতের বাইরে।

অনুপম মিথ্যে ধমকের গলায় বলল, “আবার পাকা পাকা কথা?”

১১

একটি ঘরের চার দিকে চারটি বিছানা। তার একটিতে অনুপম। তার বিপরীতে নীলাঞ্জনের খাট। দেওয়ালে সে ছোট্ট ছোট্ট করে নাম লিখে রাখত তার পরিচিত আত্মীয়স্বজনের, বন্ধুবান্ধবের আর সেই সবের পাশে লিখে রাখত তাদের টেলিফোন নাম্বার।

একদিন শ্রাবণ মাসের বৃষ্টি, সারা আকাশ কালো মেঘে ঢাকা। লক্ষ লক্ষ জলকণা কলেজ স্ট্রিটের দিক থেকে এসে আছড়ে পড়ছে সেকেন্ডে সেকেন্ডে। মহাত্মা গান্ধী রোডের কালো রং বদলে গিয়ে রুপোলি। এমনটাই সে গ্রামের রাস্তায় দেখেছে। বৃষ্টিতে রাস্তার রং বদলায়, বৃষ্টি ছেড়ে গেলে ফের আগের মতো। কিন্তু সেখানে রাস্তার ধারে কোনও ছাতার দোকান নেই। এখানে কাছাকাছি একটা ছাতার দোকানের নীচে দাঁড়িয়ে গেল অনুপম।

নীলাঞ্জন তার চৌকির পাশে যে মানুষগুলির নাম এবং টেলিফোন নাম্বার লিখে রাখে, তাদের সঙ্গে নীলাঞ্জনকে কখনও কথা বলতে দেখেনি সে। তাদের মেসের এজমালি টেলিফোন আছে, সেখান থেকে ফোন করলে ফোন নম্বরটা খাতায় লিখে রাখতে হয়। সেই খাতায় তার করা কোনও নম্বর নেই। টেলিফোন থেকে ফোন করে না, তা হলে সে কেন লিখে রাখে? ভেবেছে, কথাটা নীলাঞ্জনকে সে এক দিন জিজ্ঞেস করবে, কিন্তু প্রতিবারই মনে হয়েছে নীলাঞ্জন অসম্মানিত বোধ করবে, বিব্রত হবে কিংবা প্রশ্ন করবে, ‘তোমার তাতে কী?’ তখন অনুপমের সত্যি সত্যি কোনও জবাব থাকবে না।

ঠিক যেমন তার ডান দিকে থাকে প্রলয়, শিলিগুড়ির ছেলে। কলকাতায় টেলিকম ডিপার্টমেন্টের একটা ট্রেনিংয়ে এসেছে। সে প্রতিদিন অফিস থেকে ফিরে ছাদে চলে যায়। কেন যায়, প্রশ্ন করলে বলে, “আকাশ দেখতে যাই। আকাশ না দেখলে আমার মন ভাল থাকে না। আমাদের শিলিগুড়ির বাড়ি থেকে আকাশ খুব কাছে। আমাদের বাড়িটা এমন একটা জায়গায়, যেখান থেকে নদী, আকাশ, জল এসব খুবই কম দূরত্বের মধ্যে পড়ে।”

তখনই অনুপমের ভিতরে ভিতরে একটা অদ্ভুত চাপা রাগ হয়। তারও তো গ্রাম দ্বারবাসিনী! সুন্দর গ্রাম, যেখানে নদী, মাঠ, ঘাট, আকাশ সারাক্ষণ মিলে মিশে আছে। তার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে কেদারমতী নদী। সেখান থেকে এসে সে এখনও কেন চাকরির মুখ দেখল না? আর প্রলয় টেলিফোন বিভাগে পার্মানেন্ট চাকরি নিয়ে ট্রেনিংয়ে চলে এল কলকাতায়? কোথায় যেন একটা দূরত্ব, ভিন্ন দলের সদস্যের মতো মনে হল নিজেকে।

বৃষ্টি ছেড়ে গেলে অনুপম মেসে ফিরে আসে। নিজের ঘরে ঢুকে দেখে, কেউ আসেনি এখনও। তখন রাত আটটা, তিন তিনটে খাট একলা পড়ে আছে, একমাত্র তারই তখন কোনও কাজ নেই। তিয়াসাকে পড়িয়ে ফিরে এসে পরীক্ষার জন্য তৈরি হতে হবে, এটুকুই কাজ। জামাকাপড় বদলে নিজের খাটে বসতে বসতে দেখতে পেল, নীলাঞ্জন সম্পূর্ণ ভিজে ঘরের ভিতরে ঢুকল। অনুপম তাকে মাথা মোছার তোয়ালে দিলে নীলাঞ্জন বলল, “তুমি খুব ভাগ্যবান, এই বৃষ্টির মধ্যে তোমাকে ভিজতে হয়নি। আজকে আমি পুরো ভিজে গেছি।”

অনুপম বলল, “কোথাও দাঁড়িয়ে গেলে পারতে। আমি দাঁড়িয়ে গিয়েছিলাম একটা ছাতার দোকানে।”

নীলাঞ্জন বলল, “ঠিকই বলেছ, কিন্তু পৃথিবীটা ঠিক ভাবে চলে না সব সময়। তুমি চাকরি পেলে বুঝতে পারবে।”

মাঝে মাঝে অনুপমের মনে হয়, এ এক অদ্ভুত রহস্য। চাকরি পেলেও জীবনটা যেমন, আবার না পেলেও জীবনটা কি তেমনই! তা হলে জীবন আসলে কী? কেবলই প্রচেষ্টা?

মাথা মুছে নীলাঞ্জন জানলা দিয়ে নীচের চায়ের দোকানে বলল, “দুটো চা পাঠাও তো।”

অনুপম বলল, “তুমি ভিজে এসেছ, চা খুব ভাল লাগবে। আমি খাব না। তুমি তোমার জন্য একটা আনতে বলো।”

অনুপম দেখেছে, দু’জনের জন্য চায়ের কথা বললেও সে শুধু নিজের দামটাই দেবে। নীলাঞ্জন খুব কৃপণ। কেন কে জানে!

১২

মনোময়ের দোকানে দুটো বাচ্চা ছেলে কাজ করে। ওদের মনোময় দেখেছিল শিয়ালদা স্টেশনে। যমজ ভাই। ভোরবেলা কোনও কাজে মনোময় কলকাতার বাইরে থেকে শিয়ালদা স্টেশনে নেমে পটুয়াটোলা ফেরার পথে এক জনের পা মাড়িয়ে ফেলেছিল আচমকা। বাচ্চাটা চিৎকার করে উঠলে মনোময় প্রশ্ন করেছিল, “তোদের সঙ্গে কেউ নেই? তোরা কোথা থেকে এসেছিস?”

“জানি না, আমার মা কাল রাতে এখানে রেখে কোথায় চলে গেছে। আর রাতে ফেরেনি।”

মনোময় অবাক হয়ে তাকিয়েছিল তাদের দিকে। তার পর বলেছিল, “তোরা দিনের বেলায় এখানে থাক, আমি সন্ধেবেলা আবার আসব।”

সন্ধেবেলা শিয়ালদা স্টেশনে গিয়ে দেখে দু’জনেই করুণ মুখ করে বসে আছে। মনোময় জিজ্ঞেস করেছিল, “মা আসেনি?”

একজন বলল, “না।”

সেদিনই মনোময় দু’জনকে নিয়ে এসেছিল। আশপাশের লোককে বলে এসেছিল, “ওদের মা এলে বোলো, বাচ্চারা পটুয়াটোলা লেনে ‘চপের মেস’-এ আছে।”

তাদের মা আর আসেনি। সেই থেকে অরুণ আর বরুণ থেকে গেছে মনোময়ের বাড়িতে। একটু বড় হলে তাদের সে দোকানের কাজেই লাগিয়ে দিয়েছে। বাড়ির খায়, দোকানে কাজ করে, এর চেয়ে ভাল পুনর্বাসন আর কী হতে পারে?

এই অঞ্চলে প্রায় কুড়িটি ছোট-বড় মেসবাড়ি আছে। প্রতিদিন সকালে অফিসে যাওয়ার সময় সবাই একটা চিরকুট গেঁথে দিয়ে যায় মনোময়ের দোকানের ঝোলানো তারে। বিকেল তিনটের পর মনোময় সেই সব স্লিপ আলাদা করে। চপ, বেগুনি, চপ ও বেগুনি, ঘুগনি, মুড়ি মাখা।

সাড়ে পাঁচটা থেকে ডেলিভারি লাইন পড়ে। অরুণ আর বরুণের উপর সেই মহাদায়িত্ব।

মনোময়ের চপের দোকানের সুখ্যাতি প্রায় কলেজ স্ট্রিট অবধি। সেখান থেকেও ফোনে অর্ডার আসে। দিয়ে কূলকিনারা করতে পারে না দুই ভাই। তাদের একটাই সমস্যা। এক একটি মেসের ডেলিভারিতে সাত-আট জনের ঠোঙা। যেতে যেতে ঠান্ডা হয়। মিইয়ে যায়। খুব ইচ্ছে করে দু’-একটা বেগুনি কি তেলেভাজা মুখে পুরে দেয়। মুখরোচক ঝালমুড়ির গন্ধ আসে নাকে। কিন্তু উপায় নেই। মনোময় কি সেটা বোঝে না?

তিয়াসাকে কথাটা বলেছিল অনুপম, “ছেলেদুটো ইচ্ছে করলেও খেতে পারে না। মাঝে মাঝে চোখে পড়লে খুব কষ্ট হয়। মনোময় দু’বেলা খেতে দেয়, তার বাইরে আর তাদের খাবার জোটে না। সারাদিন প্রচুর পরিশ্রম করে।”

তিয়াসা চুপ করে শুনে ছিল। তার পর বলেছিল, “আচ্ছা, ছেলে দুটো কোথায় থাকে?”

“আমাদের মেসের সিঁড়ির নীচে একটা ছোট্ট জায়গা আছে। সেখানেই রাতে ঘুমোয়।”

“ওদের মা-বাবা?”

“জানি না। শুনেছি ওদের মা শিয়ালদা স্টেশনে ফেলে দিয়ে চলে গিয়েছিল।”

অবাক হয়ে তাকাল তিয়াসা তার পর বললে, “তারাও হয়তো খেতে পেত না। তাই।”

অনুপম কথাটা শুনে প্রথমে চমকে উঠেছিল। তার পর বলল, “তোর একথা মনে হল কেন?”

তিয়াসা বলল, “একটা গল্পে এমনই পড়েছিলাম। তাই বললাম। না-ও হতে পারে। আমার আন্দাজ।”

অনুপম কী যেন একটা বলতে যাচ্ছিল, তিয়াসা থামিয়ে দিয়ে বলল, “আচ্ছা অনুদা, আমি একটা কথা বলব, যদি কিছু মনে না করেন?”

অনুপম বলল, “বল। মনে করব কেন?”

“আপনিও বা আপনারা তো ওদের রোজ এক টাকা করে দিতে পারেন। ওরা ইচ্ছে হলে বা খিদে পেলে মুড়ি, তেলেভাজা খেতে পারে?”

অনুপম বলল, “আমি? আমার কাছে অত টাকা কোথায়? অন্যরা দেবে কি না জানি না। তা ছাড়া মেসের মালিক জানতে পারলে আমকেই হয়তো তাড়িয়ে দেবে।”

তিয়াসা বলল, “সেই ভয়েই আপনি দেন না, তাই না?”

অনুপম চুপ করে রইল। তিয়াসা কী যেন কাগজে আঁকিবুঁকি করছিল। হঠাৎ থামিয়ে বলল, “আচ্ছা, আমি যদি দিই?”

“তুই দিবি? চিনিস না, জানিস না, তুই তাদের দিবি কেন? আর কী করেই বা দিবি?”

আবার একটু চুপ করে রইল তিয়াসা। তার পর বলল, “আছে, রাস্তা আছে। আমি আমার টিফিনের পয়সা থেকে বাঁচিয়ে দেব। কেউ জানতে পারবে না আপনি ছাড়া।”

“তোর টিফিনের পয়সা থেকে? তা হলে তুই কি খাবি, শুনি?”

“কেন? মা যা টিফিনবক্সে দেয় তাই। একটু না হয় কম খাব। ভাবব আমার ভাইকে দিচ্ছি। আমাদের তো নিজের কোনও ভাই নেই অনুদা। না হয় দিদি হিসেবে ভাইকে দেব।”

অনুপম কেমন অন্যমনস্ক হয়ে গেল। সে মাথা নিচু করে বলল, “ব্যাপারটা মন্দ নয়। তবে কত দিন পারবি? বেশি দিন তো পারবি না। আর কী ভাবেই বা দিবি?”

উৎসাহে নড়েচড়ে বসল তিয়াসা, “কেন? আপনাকে দেব। আপনি ওদের দিয়ে দেবেন? পারবেন না?” বলে গভীর চোখে তাকাল তিয়াসা।

“দেখি...” বলে সে পড়ানোর মুডে ফিরে গিয়ে বলল, “আজ কিসের রিভিশন করব বলেছিলাম?”

অঙ্কের বই নামাতে নামাতে ভাবল তিয়াসা, অনুদা দিলে ছেলে দুটো তাকেই মহান মানুষ ভাববে। সুনাম হবে অনুদার। সেটাই তার তো গোপন ইচ্ছে। অনুদা বড় হবে, বিখ্যাত হবে, অনুদার একদিন খুব নামযশ হবে। আর ও পিছনে থেকে সারাজীবন ছায়ার মতো সঙ্গী হবে। সেটা কি বোঝে অনুদা?

এক নতুন তিয়াসাকে আবিষ্কার করেছে অনুপম। তিয়াসাকে সে যত ছোট ভাবছিল, সে কিন্তু তা নয়। তার ভিতরে আছে সদ্ভাবনার বীজ। তা না হলে শুধু তার কাছে দু’টি অনাথ ছেলের কষ্টের কথা শুনে এমন কথা বলতে পারে? সেও তো এমন কথা ভাবতে পারত। পারেনি তো! রিভিশনের মাঝে মাঝে সে তিয়াসার দিকে তাকাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল এত দিন সে যে তিয়াসাকে জেনে এসেছে, এ সে তিয়াসা নয়। তার ভিতরে এক অমলিন তিয়াসা আছে। যা কেবল পড়াশোনা দিয়ে অর্জন করা যায় না।

কোথা থেকে তার ভিতরে এমন ইচ্ছের জন্ম হয়েছে? সে কি সঙ্গীতচর্চার ফল? সঙ্গীত কি মানুষকে সরল, সৎ ও সমব্যথী হতে সাহায্য করে? গান কি মনের সব মলিনতা সরিয়ে তাকে এক স্বার্থহীন মানুষে পরিণত করে? আজ অনেকটা সময় অঙ্ক ও রসায়নের পিছনে চলে গেছে। অন্য বিষয়ের দিকে তাকানোর সময় হয়নি। অনেক দিন পদার্থবিদ্যার দিকে তাকানো হয়নি। অনুপম বলল, “পরের দিন ফিজ়িক্সটা দেখব।”

তিয়াসা বলল, “ফিজ়িক্সে আমার তেমন কোনও অসুবিধে নেই।”

অনুপম এবার উঠবে। যাওয়ার আগে সহজ চালে বলল, “নতুন কি গান তুললি?”

তিয়াসার মুখ আনন্দে ঝলমল করে উঠল। বলল, “দারুণ গান তুলিয়েছে তরুদা। ‘জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে/ বন্ধু হে আমার রয়েছ দাঁড়ায়ে।’ শুনেছেন গানটা?”

অনুপম বলল, “আমার খুব প্রিয় গান। অনেক বার শুনেছি।”

তিয়াসা বলল, “গানটার দ্বিতীয় স্ট্যাঞ্জাটা কী দারুণ না?” বলে গেয়ে উঠল, “এ মোর হৃদয়ের বিজন আকাশে/ তোমার মহাসন আলোতে ঢাকা সে/ গভীর কী আশায় নিবিড় পুলকে/ তাহার পানে চাই দু বাহু বাড়ায়ে।”

এক মুহূর্ত ভাবল অনুপম। এটা কি তরুদার কথা ভেবে গাইল তিয়াসা?

আর তখনই তিয়াসা প্রশ্ন করল, “কী ঠিক করলেন? আমি টাকা দিলে ওই ভাইদের দেবেন তো? কিছু তো বললেন না?”

অনুপম বলল, “দেব।” বলে সে বাইরের দিকে পা বাড়াল। সে বুঝতে পারল, তিয়াসা তার পিছন পিছন সিঁড়ির মুখ পর্যন্ত আসছে। অন্য দিন যা সে করে না।

এক অনির্বচনীয় আনন্দে মন ভরে আছে অনুপমের। অনেক দিন পর তার মাথার মধ্যে একদল সাদা পায়রা যেন আকাশে দল বেঁধে উড়ে বেড়াচ্ছে। সারা আকাশ জুড়ে সকালের আলো। অন্ধকার রাস্তা ছেড়ে সে এক আলো ভরা রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে।

নিজেকেই প্রশ্ন করল অনুপম। তিয়াসা তাকে প্রস্তাব দিলে এক কথায় রাজি হতে কি সংশয় ছিল তার? কেন সে উত্তর দিতে পারছিল না? কী ভেবে সে পিছিয়ে যাচ্ছিল? না রাজি হয়ে কি তিয়াসার কাছে ছোট হয়ে যাচ্ছিল? না, তা নয়। সে রাজি হয়নি, কারণ তার অত্মসম্মানে লেগেছিল। এই ভেবে যে, তিয়াসা রোজগার করে না, তার হাত থেকে টাকা নিয়ে অন্যকে দিতে তার সম্ভ্রমে বাধছে। তাই কী?

না। তাও নয়। তবে কি সে অন্যের টাকা দিয়ে সুনাম কিনতে চায়নি? তাতেই তার প্রবল অনীহা? নিজের কাছে তারও উত্তর পেল না অনুপম। তার পর তার মাথায় বিদ্যুতের মতো ভেসে এল, তার নিজের প্রতিনিয়ত বাঁচার প্রবলতর সংগ্রামের কথা। এর মধ্যে কেউ যদি সহানুভূতি দেখিয়ে টাকা দিতে চাইত, সে কি নিত? না। নিতে পারত না।

তেমনই ওই দুটো ছেলে যে বাঁচার সংগ্রাম করছে প্রতিদিন, অযাচিত সাহায্যের টাকা তাদের সংগ্রামকে অসম্মান করবে না তো? এই যুক্তির কাছে মাথা নত করল অনুপম।

ক্রমশ

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Bengali Novel Novel

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy