E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

আকাশ জুড়ে ঘুড়ির খেলা

সুতপন চট্টোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০১ নভেম্বর ২০২৬ ০৭:৪৩
ছবি: মহেশ্বর মণ্ডল।

ছবি: মহেশ্বর মণ্ডল।

পূর্বানুবৃত্তি: বোটানিক্যাল গার্ডেনে তিয়াসার সঙ্গে সময় কাটানোর পর অনুপমের মনে নানা ভাবনা আসে। মেসে ফিরে নীলাঞ্জনের জীবনযাপন দেখে তার নিজের চাকরি না পাওয়ার হতাশা আরও বাড়ে। মনোময়ের দোকানে কাজ করে অরুণ ও বরুণ নামে দুই যমজ ভাই। তাদের মা শিয়ালদহ স্টেশনে তাদের ফেলে রেখে চলে গিয়েছিল। মনোময় তাদের আশ্রয় দিয়ে পরে দোকানের কাজে লাগায়। অনুপমের মুখে তাদের কষ্টের কথা শুনে তিয়াসা ওর টিফিনের পয়সা থেকে প্রতিদিন কিছুটা ওদের জন্য দিতে চায়। অনুপমকে সেই টাকা ছেলেদুটির হাতে পৌঁছে দেওয়ার অনুরোধ করে। প্রথমে দ্বিধা থাকলেও অনুপম রাজি হয়। তিয়াসার এই সদ্ভাবনা তাকে নতুন করে ভাবায়। তবে অনুপমের মনে প্রশ্ন জাগে, অন্যের দেওয়া টাকা গ্রহণ করলে ছেলেদুটির আত্মসম্মানে আঘাত লাগবে কি না। নিজের জীবনের সংগ্রামের সঙ্গে তাদের সংগ্রামের মিল খুঁজে পেয়ে সে সাহায্য গ্রহণের বিষয়টি নিয়ে দ্বিধায় পড়ে।

দু’টি বাচ্চা ছেলের জীবনযুদ্ধকে অসম্মান করা হতে পারে— কথাটা মনে হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই একটা গিরগিটির মতো ট্রাম ঘড়ঘড় শব্দে চিন্তার সব যোগসূত্রছিঁড়েখুঁড়ে এলোমেলো করে দিল অনুপমের মাথার ভিতর। রাস্তা দিয়ে হেঁটে আসতে আসতে মনে হল, যে দিন ভাল একটা চাকরি পাবে, সে দিন ওই দু’জনের জন্য কিছু একটা চেষ্টা করবে। কিছু না হলে ইস্কুলে ভর্তি করে মাসের মাইনে দেবে। এই মেসে পড়ে পড়ে দিন কাটানো যে কী কষ্টের! অনেক দিন হল, কোনও চাকরির ডাক আসেনি। বাঙালি বেকার যুবকের কাছে চাকরির ডাক অনেকটাই ঈশ্বরের ডাকের মতো। বাঁচার বীজমন্ত্র, জিলিপির মতো জটিলতায় ও মিষ্টতায় মিলেমিশে থাকে। কবে যে সেই দিন আসবে!

১৩

হাওড়া দাশনগরের শিল্পাঞ্চলে হিন্দুস্তান কাস্টিং কর্পোরেশন নামের একটি ছোট্ট কোম্পানিতে অ্যাপ্রেন্টিসের চাকরি পেল অনুপম। ছোট্ট কারখানা, ছোট্ট চাকরি, সামান্য মাইনে। মাসে দেড়শো টাকা। কামাই করলে কাটা যাবে টাকা। পটুয়াটোলা লেন থেকে বাসে করে হাওড়া, হাওড়া থেকে ট্রেনে দাশনগর, প্রায় দেড় কিলোমিটার হেঁটে ফ্যাক্টরি। একটি লম্বা শেড, তার সামনে দু’পাশে অফিস। ফ্যাক্টরি ম্যানেজার প্রশান্ত সাহা তাকে প্রথম বসাল নিজের অফিসে। খুব বেশি দিন হয়নি কারখানাটি। প্রশান্ত এখানে সর্বেসর্বা। অনুপমের সঙ্গে কাজের বিষয় নিয়ে আলোচনা করল সে। বলল, “তোমাকে একটা কাজ করতে হবে প্রতিদিন। আমাদের এই কারখানাটি রেলওয়ের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ সরবরাহ করে। আর আমাদের দু’জন এজেন্ট আছে, তারা রেলে সেগুলো সাপ্লাই করে। ওরাই অর্ডার ধরে আমাদের দেয়, আর আমরা লোহা গলিয়ে ফাউন্ড্রিতে কাস্টিং করে তাদের হাতে দিই। এটাই আমাদের ব্যবসা। চলো, ফ্যাক্টরিটা দেখিয়ে দিই।”

অফিসের শেষ আর ফ্যাক্টরির শুরু। অনুপম দেখল, এক দিকে একটা মাঝারি মাপের ব্লাস্ট ফার্নেস, আর তার কিছুটা দূরে সমস্ত কারখানার মেঝেতে শুধু বালি। প্রশান্ত সাহা বোঝাল, “এই ব্লাস্ট ফার্নেসে আমরা লোহা গলাই। রেলওয়ে থেকে মেশিনের ড্রয়িং পেলেই কাঠের মোল্ড তৈরি হতে চলে যায়। মোল্ড এলে বালির মধ্যে তাকে স্থাপন করে জায়গা তৈরি হয়। তার পর মোল্ডটা তুলে ফেললেই বিচিত্র রকমের গর্ত। তার পর ওই গরম ফার্নেস থেকে গলা লোহা ঢেলে দেওয়া হয় বালির গর্তে। ঠান্ডা হলে সেগুলো বার করে পাঠিয়ে দিই লেদ মেশিনে। তারাই চেঁছেছুলে যন্ত্র তৈরি করে।”

অনুপম প্রশ্ন করল, “তা হলে আমার কাজ কী?”

প্রশান্ত বলল, “তোমার কাজটাই আসল। এসো, তোমার ল্যাবরেটরিটা দেখিয়ে দিই।”

বলে সে পিছনের ছোট্ট ঘরে নিয়ে এল অনুপমকে। অনুপম দেখল, পাশাপাশি দুটো র‌্যাক। তাতে তিনটে করে শেলফ। প্রতি শেলফে নানা রঙের কেমিক্যাল।

অনুপম বলল, “এখানে টেস্ট করতে হবে?”

প্রশান্ত বলল, “ঠিক তাই। ফার্নেসে আমরা লোহার সঙ্গে অনেক কিছু মেশাই। আমি তোমায় স্যাম্পেল এনে দেব। তোমাকে সেই স্যাম্পেল থেকে অ্যানালিসিস করে রেকর্ড করতে হবে, কতটা লোহা, কতটা নিকেল, কতটা ক্রোমিয়াম।”

অনুপম ভিতরে ভিতরে খানিকটা বিব্রত হয়ে বলল, “কিন্তু আমার কাছে তো এই সব এস্টিমেশনের পদ্ধতি নেই।”

“আমার কাছে আছে। তোমায় দিয়ে দেব। তুমি শুধু কাজ করে যাবে।”

অনুপম আশ্বস্ত হয়ে বলল, “এটা কি স্টিল তৈরির ব্লাস্ট ফার্নেস?”

প্রশান্ত বলল, “ঠিক ধরেছ। তবে মিনি।”

অনুপম বলল, “লোহা কোথা থেকে আসে?”

“গেস্ট-কিন-উইলিয়াম মানে জি কে ডবলিউ নামের বিখ্যাত কারখানা থেকে আসে লোহার ছাঁট। শুধু আমাদের নয়। আরও তিনটে কারখানা আছে এখানে। সবই ফাউন্ড্রি ইউনিট। তোমাকে সব কিছু দেখতে হবে না। ক্রোমিয়াম, নিকেলটা ঠিক থাকলেই হবে।”

কথাটা ভাল লাগল অনুপমের। নিকেল আর ক্রোমিয়াম ঠিক থাকলে এই কারখানায় যা তৈরি হয়, অন্য পরীক্ষায়ও পাশ করে যাবে, তাতে আর সন্দেহ রইল না অনুপমের।

বেলা আড়াইটের সময় কারখানার সামনে একটা গাড়ি এসে দাঁড়াল। অনুপম দেখল, গাড়ি থেকে নামলেন দু’জন ভদ্রলোক। তাদের দেখামাত্রই প্রশান্ত চেয়ার ছেড়ে দৌড়ে বাইরে এসে হাতজোড় করে নমস্কার করল। অফিসের ভিতরে আসতে অনুপমকে ডেকে পাঠাল প্রশান্ত, তার পর কারখানার দুই মালিক ভ্রাতৃদ্বয়ের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়ে বলল, “ছেলেটা খুব ট্যালেন্টেড। সকাল থেকে যেটুকু বুঝেছি স্যর, একে দিয়ে আমাদের কাজ খুব সুন্দর করে হয়ে যাবে। আপনারা নিশ্চিন্ত থাকুন। চতুর্বেদী সাহেব যদি ফোন করেন তো বলবেন, পরশু তাঁর চারটে আইটেম টেস্ট রিপোর্টসুদ্ধ রেডি থাকবে, আশা করি অসুবিধে হবে না।”

অনুপম দুই মালিকের দিকে তাকিয়ে হাতজোড় করে নমস্কার করল। এই প্রথম সে কারখানার মালিক দেখল। প্রশান্তর ইশারায় অনুপম নিজের ল্যাবে চলে এল। সে কারখানার পিছনের দিকে তাকিয়ে একটু অবাক হল। হওয়ারই কথা, একটা জায়গায় অনেকগুলো যন্ত্র পড়ে আছে, যেগুলো সম্ভবত বাতিল হয়ে ফিরে এসেছে। এটা নেহাতই আন্দাজ অনুপমের। সে প্রথম দিন নিজের ল্যাবরেটরির জিনিসপত্র সরেজমিনে দেখে নিল, তার যা যা দরকার সেগুলো ঠিক ঠিক আছে কি না।

দু’জন সাপ্লায়ারের মধ্যে চতুর্বেদী এক জন মাঝবয়সি ভদ্রলোক, কপালে তিলক, স্কুটার নিয়ে তিন দিন পর কারখানায় এসে হাজির হলেন।

চতুর্বেদীকে দেখে অনুপমের মনে হল, এই মানুষটিকে কোথাও যেন দেখেছে, কিংবা তার কোনও পরিচিত মানুষের মুখের সঙ্গে সাদৃশ্য আছে। কে হতে পারে, অনেক ক্ষণ ধরে বিষয়টা মাথার ভিতরে ঘুরতে ঘুরতে অনুপম আবিষ্কার করল, একে অনেকটা ওর ছোট পিসেমশাইয়ের মতো দেখতে।

কারখানায় কাজ করতে করতে এক দিন ভেবেছিল অনুপম, চতুর্বেদীর দেশ কোথায়, তার বাড়িতে কে কে আছে, সে কত দূর পড়াশোনা করেছে, কত দিন ব্যবসা করছে, এ-সব জিজ্ঞাসা করবে। তার পরে ভেবেছে, এতগুলো জিনিস একটা অচেনা মানুষকে জিজ্ঞেস করাটা শোভন নয়। তাই সে সুযোগের অপেক্ষায় ছিল।

সেদিন প্রশান্ত অফিসে নেই, চতুর্বেদী এসেছে কয়েকটা আইটেমের অর্ডারের স্টেটাস জানতে। ফ্যাক্টরি ফ্লোরে ঘুরতে ঘুরতে অনুপমের কাছে এসে হাজির। সাধারণত তার ল্যাবে কেউ ঢোকে না, চতুর্বেদীকে ল্যাবের মধ্যে দেখে সে সতর্ক হয় ভিতরে ভিতরে। মানুষটাকে সে বিশেষ চেনে না। ল্যাবের ভিতরের কাজকর্ম সব জানার অধিকার নেই তার। রেজ়াল্ট দেখে মাল কেনার জন্য আসে। আজ প্রশান্তকে না দেখে চতুর্বেদী তার ল্যাবে এসে হাজির। অনুপম একটা পরীক্ষার জন্য তৈরি হচ্ছে, এমন সময় চতুর্বেদী তাকে প্রশ্ন করল, “আপনি কোথা থেকে এ চাকরির নিউজ়টা পেলেন?”

অনুপম এ রকম একটা প্রশ্ন আশা করেনি। উত্তরটা কি চতুর্বেদীকে দেওয়া উচিত? এই প্রশ্নের মধ্যে চতুর্বেদীর কি অন্য কোনও ছলচাতুরি আছে? সেটাও অনুপমের পক্ষে মাপা সহজ নয়।

অনুপম বলল, “খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে গেছি।”

চতুর্বেদী কপালে তিলক কাটলেও তার চোখ বিদ্যুতের মতো ধারালো ও চকচকে। টুলের উপর বসে বলল, “আরে দাদাবাবু, খুঁজতে খুঁজতেই সোব কিছু মিলে যায়। সুযোগ কি আর আসমান থেকে পড়ে? তা বলছিলম কী, ডিস্ট্রিক্ট ইন্ডাস্ট্রিয়াল অফিসে জান-পহেচান আছে নাকি?”

অবাক হয় অনুপম, তাঁর দূরসম্পর্কের এক পরিচিত হাওড়া ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভলপমেন্ট অফিসের বড়কর্তা, তারই মারফত এই খবরটা সে পেয়েছিল। ভিতরে ভিতরে সতর্ক হয় অনুপম। তার পর বুদ্ধি করে বলে, “এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ কার্ড ছিল তো।” এটা একটা মোক্ষম উত্তর, এবং উত্তরে অন্যদের কিছু বলার থাকে না।

“আচ্ছা আচ্ছা, খুব ভাল খবর। আপনি এসেছেন বলেই আমাদের কাজের কিছুটা সুবিধে হোবে। দেখবেন, রেজ়াল্টগুলো যেন ঠিকঠাক থাকে, কুছু গড়বড়ি না হয়।”

“এই প্রশ্নটা আপনি করলেন কেন?”

“না। আমার ভি এক ক্যান্ডিডেট ছিল... সে যা-ই হোক, আমার বেওসার সব কিছু রেজ়াল্টের উপর ডিপেন্ড করে। দেখবেন, রিজেক্ট না হয়।”

তখনই অনুপমের কারখানার পিছনে জমানো অনেকগুলো যন্ত্রের বাতিল স্তূপের কথা মনে পড়ল।

চতুর্বেদী বলে চলল, “ধরুন, আমার একটা আইটেম অর্ডার যদি বাতিল হয়, তা হলে একশোটা নাম্বার বাতিল হয়ে যায়। যদি অর্ডারটা এক বার দিতে পারি তো, আমি সাপ্লাই দিয়ে পায়ের উপর পা তুলে বসে থাকি আর যদি রিজেক্ট হয় তো জিনা হারাম হয়ে যায়।”

“আপনার কোথায় বাড়ি?”

“দেশের বাড়ি বলছেন? উত্তরপ্রদেশ। সে এক আজব কাহিনি! জিন্দেগি মে কী করতে চেয়েছিলাম, আর এখন কী করছি, এটা ভাবলে দুখ লাগে। আপনার মতো আমারও খুব পড়ালেখার শখ ছিল। স্কুল থেকে ফার্স্ট ডিভিশনে পাশ করে আমি কানপুরের কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম। কিন্তু কপালে নেই! এক রেল অ্যাক্সিডেন্টে আমার মা মারা গেল। অল্প বয়স, শোক সহ্য করতে পারলম না। ঠিক করলাম, যে চাকা আমার মায়ের চেহারার উপর দিয়ে চলে গেছে, আমি সেই রেলে এমন মেশিন সাপ্লাই করব, যার জন্য কোনও দিন আ্যাক্সিডেন্ট হোবে না! আমার এক দূরসম্পর্কের রিশতেদার ছিল হাওড়ার বেলিলিয়াস রোড়ে। সেই আঙ্কল আমাকে এক দিন নিয়ে এল এই লোহালক্কড়ের দুনিয়ায়। একটা ছোট কারখানায় কাজ করতে করতে বেওসা ধরে ফেললাম। ছোটা ক্যাপিটাল লিয়ে শুরু করলাম। ব্যস সংসারটা চলে যায়, পর উসসে জাদা কিছু হয় না। তার পর এক দিন এই প্রশান্তবাবুর সঙ্গে আমার মোলাকাত হয়ে গেল। ব্যস, তার পর থেকে আমি এখানেই জুড়ে আছি আজ প্রায় পাঁচ বরস। এই প্রশান্তবাবুর সঙ্গেই আমার ব্যবসা।”

“তাই? আপনি আমাদের কোম্পানির মালিকদের চেনেন না?”

“চিনি, তবে আচ্ছি তরাসে নেহি। আমি তাদের কাছে এক জন কাস্টমার সে জাদা কুছ নেহি। লেকিন প্রশান্তর কাছে আমি তার চাকরির সারভাইভার। আমি মাসে মাসে ওকে অর্ডার না দিলে প্রশান্তর চাকরি নিয়ে টানাটানি হবে। তাই প্রশান্ত আমাকে হর তরহাসে সাহায্য করে। আর আমার বেওসার উন্নতি হলে, প্রশান্তরও মুনাফা।”

গ্রামের নিম্নমধ্যবিত্ত একটি পরিবারের ছেলে অনুপম, তার সাত কুলে কখনও কেউ ব্যবসা করেনি, তাই ব্যবসার এসব মারপ্যাঁচ অনুপমের কাছে এখনও রহস্যাবৃত।

চতুর্বেদীর একটা লেদ মেশিন আছে বেলিলিয়াস রোডে। এখানকার কাস্টিং করা যন্ত্রগুলো সে ভ্যানরিকশা-ভর্তি করে বেলিলিয়াস রোডের লেদ মেশিনের কারখানায় নিয়ে ফেলে। তাকে ড্রয়িং অনুসারে নিখুঁত করে তৈরি করে তার কারখানার লোকেরা। লেদ মেশিন থেকে কখনও ভালভ, কখনও জোড়, কখনও ব্যান্ড এমন ভাবে নিখুঁত কেটে বেরিয়ে আসে, তখন আর তাকেই চেনাই যায় না। তার চেহারা ঝলমল করে। নাম্বারিং হয়। তার পর এক-একটি যন্ত্রকে এক-একটি বিশেষ চিহ্ন দেওয়া হয়, যাতে এই যন্ত্রগুলি কোন সেকশনে ব্যবহার করা হবে, তা আলাদা করা যায়।

এই কাজটি যখন চতুর্বেদীর কারখানায় হয়, তখন চতুর্বেদীর রাত-দিনের হিসাব থাকে না। এই কাজটি করার জন্য তার নিজস্ব একটি দল আছে, সেই দলটিকে অন্য কারও সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করতে দেয় না সে। সেই দলটির কাজ শুধু এই নাম্বারিং করা। এ-সব চতুর্বেদীর কাছেই শুনেছিল অনুপম। চতুর্বেদীও অকপটে বলেছিল। যা বলেছিল তা কি সব সত্যি?

সেদিন রাতে আবার দিদিমাকে চিঠি লেখে অনুপম— “ডাঁসা চাকরি পাইনি, তবে আপাতত নিজেকে চালাবার মতো একটা হাতে এসেছে। এই চাকরিতে মাইনে কম, কিন্তু বিচিত্র মানুষের দেখা পেয়েছি। এরা কোনও পরিবর্তনের কথা বলে না, খালি নিজেদের লাভের কথা ভাবে। যেন জন্মেছে শুধু ব্যবসায় লাভ করার জন্য। যা-ই হোক, এ-সব দেখা হলে বলব। হয়তো বুঝতে পারবে। আমার চশমা বদলাতে হবে। তা ছাড়া ভাল আছি।”

১৪

এক বর্ষাস্নাত দ্বিপ্রহরে প্রশান্তর সঙ্গে চতুর্বেদী গভীর আলোচনায় মগ্ন। অফিসে ভিতর থেকে দরজা বন্ধ ছিল, তা সত্ত্বেও ডোরবেল বাজিয়েছিল অনুপম।

প্রশান্ত ভিতর থেকে উত্তর দিয়েছিল, “এখন ব্যস্ত, পরে এসো।”

তবুও অনুপম বেল বাজাতে অত্যন্ত বিরক্ত মুখে প্রশান্ত দরজার কাছে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করেছিল, “কী ব্যাপার? আর্জেন্ট?”

অনুপম শান্ত গলায় বলেছিল, “হ্যাঁ, সেইজন্যই তো দু’বার বেল বাজিয়েছি। যদি পাঁচ মিনিট সময় দেন।”

“বলো, কী হয়েছে?”

“আপনাকে এক বার ল্যাবে আসতে হবে।”

“ল্যাবে? কেন?”

“তিনটে ব্যাচের স্যাম্পেলে নিকেল কনটেন্ট অনেকটা কম। আমার পক্ষে এই ব্যাচ ক্লিয়ার করা সম্ভব নয়।”

প্রশান্ত ঠান্ডা গলায় বলল, “তুমি এক কাজ করো। তুমি স্ট্যান্ডার্ড রিপোর্ট ইস্যু করো। এইটুকু হেরফের কারও চোখে পড়বে না।”

ক্রমশ

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Bengali Novel Novel

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy