ততক্ষণে গোডাউনের ভিতরে সাত জনকেই দেওয়ালের দিকে মুখ করে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে উর্দিধারী দু’জন। হাত পিছমোড়া করে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে দেওয়া হয়েছে সবাইকে। বার করে নেওয়া হয়েছে প্রত্যেকের আগ্নেয়াস্ত্র। হুবহু কোনও পুলিশের রুটিন রেড-এর কায়দায়। মোরান গ্যাংয়ের সদস্যদের প্রত্যেকেই এ ধরনের প্রক্রিয়ার সঙ্গে সবিশেষ পরিচিত এবং অভ্যস্ত। ফলে দুই উর্দিধারীর কাজে তেমন বাধা দেয়নি কেউ। এর পরেই শুরু হল আসল নাটক। উর্দিধারীদের এক জন দরজার সামনে এগিয়ে গিয়ে ইশারা করতেই ভিতরে ঢুকে এলেন দুই মেশিনগানধারী। সোজা গিয়ে সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে পড়লেন বাকি দুই উর্দিধারীর পাশে। পরমুহূর্তেই চার-চারটে অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র থেকে ছুটে বেরোল ঝাঁকে ঝাঁকে বুলেট। ব্যাপারটা কী ঘটছে, বুঝে ওঠার আগেই গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল মোরান গ্যাংয়ের সাত দুষ্কৃতী। এদের মধ্যে ফ্র্যাঙ্ক গুজেনবার্গ, শরীরে ১৪টা বুলেট নিয়েও মৃত্যুর সঙ্গে যুঝেছিল বেশ কিছুক্ষণ। ঘাতকদের কাউকে সে চিনতে পারেনি, হাসপাতালে তদন্তকারী পুলিশ অফিসারদের জেরার সামনে মৃত্যুকালীন জবানবন্দিতে বারংবার ওই একই কথা বলেছিল সে। এর ঘণ্টা তিনেক বাদে মৃত্যু হয় ফ্র্যাঙ্কের। সেদিনের ঘটনায় বেঁচে যাওয়া একমাত্র প্রাণীটির নাম ‘হাইবল’, জন মে-র পোষ্য সারমেয়। ঘাতকরা কোনও ক্ষতি করেনি তার। পরবর্তী কালে একটি পশুপ্রেমী সংস্থা নিজেদের আশ্রয়ে নিয়ে যায় সারমেয়টিকে। যে-হেতু এই গণহত্যাকাণ্ডটি ঘটেছিল সেন্ট ভ্যালেন্টাইন’স দিবসে, সে কারণেই আন্তর্জাতিক অপরাধের ইতিহাসে দিনটি ‘ভ্যালেন্টাইন’স ডে ম্যাসাকার’ নামে কুখ্যাত, একই সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে রয়েছে আজও।
ঘাতকরা কেউই যে কোনও ভাবেই পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত নয়, সেটা জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল প্রাথমিক তদন্তের পরেই। এ বার প্রশ্ন, এই নৃশংস ও একই সঙ্গে ভয়াবহ গণহত্যাটি ঘটিয়েছিল কারা? তদন্তে উঠে এসেছিল, মার্কিন মুলুক তো বটেই, এমনকি সর্বকালীন আন্তর্জাতিক অপরাধের ইতিহাসে অন্যতম কুখ্যাত এবং অবশ্যই সর্বাধিক পরিচিত এক ব্যক্তির নাম। তার এবং তাকে ঘিরে আবর্তিত হওয়া একাধিক সব কুশীলবের সম্পর্কে দু’-চার কথা বলার চেষ্টা করব এ বার।
স্কারফেস এবং কয়েকজন
আলফানসো কাপোন। সংক্ষেপে আল কাপোন। ১৮৯৫ সালে ইটালির নেপলস থেকে ভাগ্যান্বেষণে আমেরিকার ব্রুকলিনে পাড়ি জমায় কাপোনের পরিবার। ব্রুকলিন বন্দর এলাকায় খুব সস্তায় এক কামরার একটা খুপরি ঘর ভাড়া নেয় পরিবারের কর্তা গ্যাব্রিয়েল কাপোন। বারোমেসে ভয়ঙ্কর ঠান্ডা, স্যাঁতসেতে জোলো হাওয়া। ঘর গরম রাখার ব্যবস্থা তো দূরস্থান, কোনও আসবাবপত্র পর্যন্ত নেই এক চিলতে ওই আস্তানায়। সকাল থেকে এজমালি পায়খানায় লাইন, জলের লাইনে মারামারি, সব নিত্যনৈমিত্তিক গা-সওয়া ব্যাপার সেখানে।
এ রকম এক কঠিন প্রতিকূল পরিবেশে, ১৮৯৫ সালের জানুয়ারি মাসে হাড়-কাঁপানো এক শীত-রাতে জন্ম হয় ভবিষ্যৎ অপরাধজগতের সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য নাম, আলফানসো কাপোনের। পরিবারের গ্রাসাচ্ছাদনের তাগিদে নিকটবর্তী পার্ক অ্যাভিনিউ অঞ্চলে একটা সেলুন খোলে তার বাবা গ্যাব্রিয়েল। ব্যবসা কিছুটা জমে ওঠার পর, দোকানের কাছেই তুলনামূলক ভাবে ভাল একটা বাড়িতে উঠে আসে কাপোন পরিবার।
পার্ক অ্যাভিনিউ আক্ষরিক অর্থেই ছিল কসমোপলিটান। উদ্বাস্তু ইটালিয়ান, জার্মান, আইরিশ, চিনা, সুইডিশ, সব মিলিয়ে এক মিশ্র এলাকার চরিত্র। ঘনবসতিপূর্ণ এই এলাকার নিত্যসঙ্গী দারিদ্র, একই সঙ্গে অপরাধপ্রবণতাও। এখানেই আলফানসো খুঁজে পেয়েছিল তার কৈশোর প্রেম আর ভবিষ্যৎ জীবনসঙ্গিনী মে-কে। আর হ্যাঁ, এমন আর এক জনকে, যে ভবিষ্যতে ঘুরিয়ে দেবে কিশোর আলফানসোর জীবনের মোড়। পারিবারিক ক্ষৌরকার-বৃত্তির নিরীহ, সাদামাটা, নিরাপদ জগৎ থেকে এক ঝটকায় তুলে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে দেবে অন্ধকারজগতের চূড়ায়, যার বাঁকে বাঁকে লেগে থাকবে রক্তের ছিটে, বন্দুক আর বুলেটই যেখানে শেষ কথা বলে।
জনি তোরিও। সে সময় ব্রুকলিন আন্ডারওয়ার্ল্ডের বেতাজ বাদশা। একটা চূড়ান্ত সংগঠিত, আধুনিকতম ক্রাইম কার্টেলের অবিসংবাদিত ডন। ব্রুকলিনের অধিকাংশ ক্যাসিনো, অন্যান্য জুয়ার আড্ডা আর বেশ্যালয়ের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের রাশ যার হাতে। এ ছাড়াও আরও বহু কালো কারবারের কারবারি। নিজের জগতে খ্যাত ছিল সুভদ্র ব্যবহার আর স্বভাবগত সৌজন্যের কারণে। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই এলাকার অল্পবয়সি ছেলেপুলেদের কাছে নায়কের সম্মান পেত তোরিও। যাদের মধ্যে অনেকেই এলাকায় তোরিওর জুয়ার ঠেকগুলোয় ছোটখাটো কাজ করত।
ছেলেবেলা থেকেই ডাকাবুকো স্বভাবের আল খুব সহজেই নেকনজরে পড়ে যায় তোরিওর। প্রথমে জুয়ার ঠেকে পাতি হ্যান্ডলারের কাজকর্ম দিয়ে জীবন শুরু করলেও নিজের কর্মদক্ষতা ও বিশ্বস্ততার জন্য গ্যাংয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নেয় খুব অল্প সময়ের মধ্যেই। আলের জন্য আরও বড় কিছু ভাবতে শুরু করে তোরিও।
ডাকাবুকো হলেও, পড়াশোনায় ভাল ছিল আল। কিন্তু কিশোর আলের জীবনের চেনা ছকটা ওলটপালট হয়ে যায় এক দিন ছোট একটা ঘটনায়। ছোটখাটো কোনও অবাধ্যতার কারণে স্কুলের এক শিক্ষিকা ক্লাসে বেদম প্রহার করতে শুরু করেন আলকে। পাল্টা মেজাজ হারিয়ে ওই শিক্ষিকাকেও বেধড়ক ঠ্যাঙায় আল। তার পর বাকি সহপাঠীদের স্তম্ভিত চোখের সামনে দিয়ে গটগটিয়ে বেরিয়ে যায় ক্লাস ছেড়ে। আর কোনও দিন ফিরে যায়নি স্কুলে।
এখানে একটা কথা জানিয়ে রাখা ভাল, অপরাধজগতে তোরিওর দাপুটে, নায়কোচিত পদচারণা, তার সুভদ্র ভাবমূর্তি আলকে আকর্ষণ করলেও প্রথমেই কিন্তু তোরিওর দলে যোগ দেয়নি সে। স্কুল ছেড়ে দেওয়ার পর চেষ্টা করেছিল সৎপথে উপার্জন করে জীবনধারণ করার। কেক-পেস্ট্রির দোকানের হিসাবরক্ষক থেকে বই-বাঁধাই কারখানার কর্মী, কিন্তু কোনও পেশাই তাকে তার কাঙ্ক্ষিত সচ্ছলতা দেয়নি। অবশেষে তোরিওর দলে যোগ দিয়ে সেই সচ্ছলতা আর সাফল্য করায়ত্ত হয় তার। তোরিওর নেকনজরে পড়ে দ্রুত উত্থান ঘটছিল আন্ডারওয়ার্ল্ডে। এই সময় ফ্র্যাঙ্কি ইয়েল, ব্রুকলিনের আর এক বাহুবলী, তোরিওর অতি ঘনিষ্ঠ সহচর, আলেরও পূর্বপরিচিত— ‘হার্ভার্ড ইন’ নামে এক বিলাসবহুল পানশালা খোলে অদূরেই কনি আইল্যান্ডে। মধুশালার ব্যবসা সামলানোর জন্য আলের মতোই ডাকাবুকো কাউকে চাইছিল সে। মূলত তোরিওর সুপারিশেই ফ্র্যাঙ্কির পানশালায় চাকরিটা হয় আলের।
হার্ভার্ড ইনে আলের কাজটা ছিল বলতে গেলে জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠের। একই সঙ্গে বারটেন্ডার, ওয়েটার কাম বাউন্সার। বার কাউন্টারের পিছনে দাঁড়িয়ে বিক্রিবাটার হিসেব রাখা, সপ্তাহান্ত আর ছুটিছাটার দিনে খদ্দেরের ভিড় বাড়লে টেবিলে গিয়ে ওয়েটারদের সঙ্গে হাত লাগানো। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল বাউন্সারের কাজটা। কাউন্টারের পিছনে দাঁড়িয়ে তীক্ষ্ণ নজর রাখতে হত চার দিকে। কোনও মাতাল কাস্টমার বেগড়বাইয়ের মাত্রা ছাড়ালেই অর্ধচন্দ্র দিয়ে সোজা দরজার বাইরে।
বারের এই কাজটাও আল করছিল একই রকম সততা আর বিশ্বস্ততার সঙ্গে। মালিক ফ্র্যাঙ্কি আর খদ্দেররা, দু’পক্ষই বেজায় খুশি ওর কাজে। রোজগারের অঙ্ক লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছিল। কিন্তু গোলমালটা বেধে গেল বছরদুয়েক বাদে এক দিন।
গালুচিও নামে ওই কনি আইল্যান্ড এলাকারই এক দাপুটে যুবক, তার অপরূপা সুন্দরী বোনকে নিয়ে এসেছিল পানশালায়। মেয়েটির রূপে মোহিত হয়ে টেবিলের সামনে এগিয়ে এসে কিছু মন্তব্য করে আল, যা পছন্দ হয়নি গালুচিওর। চেয়ার ছেড়ে লাফ দিয়ে উঠে আলের উপর হাত চালিয়ে দেয় সে। পাল্টা হাত চালায় আলও। দু’পক্ষে বেধে যায় ধুন্ধুমার লড়াই। গায়ের জোরে এঁটে না উঠতে পেরে শেষমেশ পকেট থেকে ক্ষুর বের করে আলের গালে চালিয়ে দেয় গালুচিও। তার পর বোনের হাত ধরে বেরিয়ে যায় বার থেকে।
এখানেই থেমে থাকেনি ব্যাপারটা। বোনের এহেন অপমানের ঘটনায় যারপরনাই ক্ষুব্ধ ও ক্রুদ্ধ গালুচিও আলের বিরুদ্ধে নালিশ জানায় আর এক প্রবাদপ্রতিম ইটালিয়ান মাফিয়া ডন চার্লি ‘লাকি’ লুসিয়ানোর কাছে। লুসিয়ানো তার বাছা বাছা চার জন গ্যাংস্টারকে পাঠায় ফ্র্যাঙ্কি ইয়েলের আড্ডায়। ফ্র্যাঙ্কির উপস্থিতি এবং মধ্যস্থতায় গালুচিওর কাছে ক্ষমা চেয়ে নেয় আল। আর একই সঙ্গে একটা অমোঘ শিক্ষাও লাভ করে জীবনে। ধৈর্য না হারিয়ে, মাথা ঠান্ডা রেখে সর্বদা পরিস্থিতির গুরুত্বকে মেনে নিতে হয়। তা হলেই সাফল্য আসে।
তবে এই ঘটনার অন্য দিকও আছে। স্থানীয় যুবক গালুচিওর সঙ্গে মারামারির সময় আলের শক্তি, সাহস আর দাপটের ব্যাপারটা নজর কেড়েছিল ফ্র্যাঙ্কি ইয়েলের। বারের কাজ থেকে ছাড়িয়ে এনে সরাসরি নিজের গ্যাংয়ে সামিল করে নেয় আলকে। চড়া সুদে টাকা খাটানো, জুয়ার ঠেক, ব্যবসাদার আর বেশ্যালয়ের দালালদের থেকে তোলাবাজি-সহ আরও হরেক কিসিমের কালো ধান্দার মালিক ছিল ফ্র্যাঙ্কি। এই বিশাল ধান্দা সামলাতে ওর প্রয়োজন ছিল এমন এক জনের, যে দরকারে মানুষ মারতে পারে নির্দ্বিধায়। আলের মধ্যে সেই ‘প্রতিভা’ দেখেছিল ফ্র্যাঙ্কি। মাথার উপর খোদ বসের হাত, ফলে খুব স্বাভাবিক ভাবেই গ্যাংয়ে আলের উত্থান ঘটতে থাকে উল্কার গতিতে। নামের মাঝখানে জুড়ে যায় ‘স্কারফেস’ (গাল কাটা) উপমা। আন্ধেরি দুনিয়া কা নয়া উভরতা হুয়া সিতারা কওন? আল ‘স্কারফেস’ কাপোন!
এই সময় ফের এক বার সুস্থ, স্বাভাবিক জীবনের আহ্বান আসে কাপোনের কাছে। স্থানীয় যুবতী, মে কাফলিন। সচ্ছল, ভদ্র এক আইরিশ পরিবারের কন্যা। উথালপাথাল প্রেমে পড়ে যায় সে কাপোনের। খুব স্বাভাবিক ভাবেই কাফলিন পরিবার এক কুখ্যাত গ্যাংস্টারের সঙ্গে তাদের বিদুষী কন্যার এই প্রেমের ব্যাপারটা মেনে নিতে পারেনি। ফলে এক দিন বাড়ি থেকে পালিয়ে, পরিবারের সবার অমতে কাপোনকে বিয়ে করে মে কাফলিন।
বিয়ের পর স্ত্রীর প্রভাবে অপরাধ-দুনিয়া ত্যাগ করে কাপোন। যোগ দেয় একটি নির্মাণ সংস্থার কার্যকরী অংশীদার হিসেবে। কিন্তু রক্তের স্বাদ পেয়ে যাওয়া বাঘের মতো আবার ফিরে আসে অন্ধকারজগতে। তবে এ বার আর ফ্র্যাঙ্কি ইয়েল নয়, ফ্র্যাঙ্কির সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কটা রেখেই যোগ দেয় পুরনো ‘ফ্রেন্ড, ফিলসফার অ্যান্ড গাইড’ জনি তোরিওর কার্টেলে। কারণ তত দিনে ব্রুকলিনের সীমানা ছাড়িয়ে শিকাগো অবধি ছড়িয়ে পড়েছে তোরিওর অপরাধ-সাম্রাজ্য। শিকাগো। নিউ ডেস্টিনেশন অব তোরিও-কাপোন নেক্সাস!
১৯২০ সালে তোরিওর হাত ধরে কাপোনের শিকাগোয় পা রাখার অনেক আগে থেকেই অপরাধের স্বর্গরাজ্য ছিল এই শহর। অসংখ্য ছোট বড় বেশ্যালয়, নাইট ক্লাব, ক্যাসিনো, অন্য ধরনের জুয়ার আড্ডা আর সে-সব ঘিরে গড়ে ওঠা একাধিক সংগঠিত অপরাধচক্র। তার মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য একটি নাম, ‘বিগ জিম’ কলোসিমো। সে সময় শিকাগোর বিখ্যাত বা কুখ্যাত নাইট ক্লাব ‘কলোসিমো কাফে’-সহ আরও একাধিক নাইট ক্লাব, ক্যাসিনো আর বেশ্যালয়ের মালিক। ছোটখাটো বেশ্যালয়ের দালাল থেকে অপরাধজগতের শীর্ষে উত্থান এই আইরিশ বাহুবলীর। শিকাগোব্যাপী কালো ধান্দার সাম্রাজ্যে বিগ জিমের অংশীদার ছিল তার স্ত্রী ভিক্টোরিয়া মোরেস্কো। শিকাগোর প্রায় ৭০ শতাংশ বেশ্যালয়ের দাপুটে মালকিন। সেই বিশের দশকে কালো ধান্দা থেকে জিম-ভিক্টোরিয়া সিন্ডিকেটের আনুমানিক মাসিক আয় ছিল কমবেশি ৫০,০০০ ডলার।
এ রকম একটা অতীত ও বর্তমান সত্ত্বেও জিম আর ভিক্টোরিয়া, দু’জনেরই প্রবেশ অবাধ ছিল শিকাগোর অভিজাত মহলে। তাদের ক্যাসিনো, মধুশালা আর মধুচক্রগুলোয় নিয়মিত আনাগোনা ছিল সমাজের গণ্যমান্য সব কুশীলবের। জিম নিজেও ব্যক্তিগত স্তরে ছিল অত্যন্ত সহৃদয়, সুভদ্র ও মার্জিত। হুবহু তোরিওর মতো। এ রকম দু’জনের মধ্যে যে সখ্য গড়ে উঠবে, সেটাই তো খুব স্বাভাবিক। বাস্তবে হয়েছিলও তা-ই। এ দিকে দাপট, পেশিশক্তি, সাহস ও বিশ্বস্ততার কারণে তত দিনে তোরিওর গ্যাংয়ে ম্যানেজার থেকে প্রায় পার্টনার হয়ে উঠেছে আল কাপোন। ফলে খুব দ্রুত সমগ্র শিকাগো, ব্রুকলিন জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল জিম-তোরিও-কাপোন কার্টেলের কালো হাত। কিন্তু দুর্যোগ এল অন্য দিক থেকে।
দক্ষতার সঙ্গে গ্যাং চালানোর পাশাপাশি মহিলা-আসক্তিও চরমে ছিল জিমের। নিজের অর্ধেক বয়সি লাস্যময়ী এক নাইট ক্লাব-গায়িকার প্রেমে পড়ে দীর্ঘকালের বিশ্বস্ত সহচরী ভিক্টোরিয়ার সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটিয়ে সেই সুন্দরীর পাণিগ্রহণ করে জিম। কিন্তু সে সম্পর্ক টেকেনি বেশি দিন। চিরবিশ্বস্ত স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটানোর অনুতাপ আর ঠিকঠাক গড়ে ওঠার আগেই ভেঙে যাওয়া নতুন সম্পর্ক, এই দুইয়ের টানাপড়েন বিভ্রান্ত আর প্রায়োন্মাদ করে দেয় এই আইরিশ মব বসকে, যার প্রভাব পড়ে গ্যাংয়ের ওপর। মওকা বুঝে জিমের ধান্দার দখল নিতে আসরে নামে ফ্র্যাঙ্কি ইয়েল। বেধে যায় দু’পক্ষের মধ্যে ধুন্ধুমার গ্যাং ওয়ার। এ ভাবে চলতে চলতে এক দিন নিজের কলোসিমো কাফের মধ্যেই খুন হয়ে যায় বিগ জিম।
এ ক্ষেত্রে একটা ব্যাপার সবিশেষ উল্লেখযোগ্য, জিম-ফ্র্যাঙ্কি গ্যাং ওয়ারে খুব আশ্চর্যজনক ভাবে নিস্পৃহ, নিরাসক্ত এবং নিরপেক্ষ ছিল তোরিও এবং কাপোন। ‘দু’টি বলশালী বলীবর্দর মধ্যে যুদ্ধ বাধিলে যে সর্বদা সিংহই লাভবান হয়’— ইশপের গল্পের এই আপ্তবাক্য সম্ভবত মনে রেখেছিল ওরা।
ঘটনার কিছু দিন বাদে জিম-খুনের পিছনে তার হাত আছে, এই অভিযোগের ভিত্তিতে গ্রেফতার হয় ফ্র্যাঙ্কি ইয়েল। বিচারে বেশ কয়েক বছরের সাজা হয়। এই সুযোগে জিমের পুরো অপরাধ-সাম্রাজ্যের দখল নেয় তোরিও-কাপোন গ্যাং। সেই সময় মার্কিন অপরাধজগতে কানাঘুষো, ফ্র্যাঙ্কিকে জেলে পাঠানোর পিছনেও কাজ করেছিল তোরিওর মস্তিষ্ক। তবে গুজব গুজবই, বাস্তবে প্রমাণিত হয়নি কিছুই।
এই সময় কাপোনের সঙ্গে আলাপ হয় গুজিকের। ক্রমশ সেই পরিচয় পরিণত হয় ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বে। জ্যাক গুজিক। শিকাগোর অত্যন্ত রক্ষণশীল ও ধর্মভীরু ইহুদি পরিবারের সন্তান। এহেন গুজিক পরিবারের আয়ের মূল উৎস ছিল শহরের বেশ কিছু বেশ্যালয়ের মালিকানা। এর বাইরেও অসংখ্য কালো কারবারে টাকা খাটত গুজিকদের।
আজ গলায় গলায় বন্ধুত্ব, কালকেই হয়তো সেই সখ্য বদলে গেল চরম শত্রুতায়, রোজগারের ভাগ বাঁটোয়ারা, গ্যাংয়ে শীর্ষস্থানটা ধরে রাখা, নয়তো সেখানে পৌঁছাতে চাওয়ার কারণে— এটাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের স্বাভাবিক নিয়ম। এরকম একটা চরম অবিশ্বাসের জগতে কিন্তু খুব আশ্চর্যজনকভাবে গুজিক আর কাপোনের বন্ধুত্বটা টিকে ছিল আজীবন।
গুজিকের হাত ধরে ওর চড়া সুদে টাকা খাটানোর কারবারে ঢুকে পড়ে কাপোন। যেখানে সোজা পথে টাকা আদায় হত না, সেখানে কাজে লাগত কাপোনের পেশিশক্তি। অন্য দিকে গুজিকের মাথাটা ছিল শসার মতো ঠান্ডা। সে কারণে অন্ধকার জগতে তার পরিচিতি ছিল জ্যাক ‘কিউকাম্বার’ গুজিক নামে। জ্যাকের ঠান্ডা মাথা, ক্ষুরধার বুদ্ধি আর কাপোনের দাপট ও পেশিশক্তি, এই দুয়ের জোরে ধান্দা বাড়তে লাগল তরতরিয়ে। টাকা আসতে লাগল জলের স্রোতের মতো। খুব দ্রুত শহরের অন্যতম অভিজাত এলাকা প্রায়েরে অ্যাভেনিউয়ে আলিশান, বিলাসবহুল এক অ্যাপার্টমেন্ট কিনে সপরিবার সেখানে উঠে এল কাপোন। শুধু স্ত্রী বা সন্তান নয়, বাবা মা, দুই ভাই রালফ আর ফ্র্যাঙ্ক-কেও নিয়ে এল সেই নতুন বাড়িতে। বহুকাঙ্ক্ষিত আর্থিক সাফল্য এতদিনে পুরোপুরি করায়ত্ত হলো কাপোনের। যদিও কার্টেলের বেতাজ বাদশা হয়ে ওঠাটা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি তখনও। দলে কাজ করতে হচ্ছিল তোরিওর ‘আন্ডারবস’ হিসেবেই।
তার অপরাধ জগতের শীর্ষে ওঠার সেই স্বপ্ন সফল হয়েছিল বেশ কয়েকটি ঘটনার মধ্যে দিয়ে।
ক্রমশ