E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

মাফিয়া সমাচার

বড় ভাই ফ্র্যাঙ্কের মৃত্যুতে ক্রোধ আর প্রতিশোধস্পৃহায় উন্মত্ত হয়ে ওঠে আল কাপোন। অপেক্ষা ছিল শুধু ফ্র্যাঙ্কের অন্ত্যেষ্টিটুকু সম্পন্ন করার।

সুপ্রিয় চৌধুরী

শেষ আপডেট: ০৪ অক্টোবর ২০২৬ ০৮:৩৭
ছবি: অমিতাভ চন্দ্র।

ছবি: অমিতাভ চন্দ্র।

পূর্বানুবৃত্তি: উর্দিধারী দু’জন মোরান গ্যাংয়ের সাত সদস্যকে দেওয়ালের দিকে মুখ করে দাঁড় করিয়ে, ওদের থেকে আগ্নেয়াস্ত্র কেড়ে নেয়। এর পর দুই মেশিনগানধারী ভিতরে ঢুকে চারটি অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র থেকে গুলি চালিয়ে সাত জনকেই হত্যা করে। ফ্র্যাঙ্ক গুজেনবার্গ শরীরে ১৪টি বুলেট নিয়েও কিছুক্ষণ বেঁচে ছিল। মৃত্যুকালীন জবানবন্দিতে ঘাতকদের কাউকে চিনতে পারেনি বলে জানায়। একমাত্র বেঁচে যায় জন মে-র পোষ্য সারমেয় ‘হাইবল’। সেন্ট ভ্যালেন্টাইন’স দিবসে সংঘটিত এই গণহত্যাকাণ্ড ‘ভ্যালেন্টাইন’স ডে ম্যাসাকার’ নামে পরিচিত হয়ে থাকে। তদন্তে স্পষ্ট হয়, ঘাতকেরা পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত নয়। এর পর উঠে আসে আলফানসো কাপোন, সংক্ষেপে আল কাপোনের নাম। ১৮৯৫ সালে নেপলস থেকে আমেরিকার ব্রুকলিনে আসে কাপোনের পরিবার। পার্ক অ্যাভিনিউয়ের দারিদ্রময় ও অপরাধপ্রবণ পরিবেশে বড় হতে থাকে আল। জনি তোরিওর গ্যাংয়ে কাজ শুরু করে তার উত্থান ঘটে। পরে ফ্র্যাঙ্কি ইয়েলের পানশালায় কাজ এবং গালুচিওর সঙ্গে সংঘর্ষের পর ‘স্কারফেস’ নামটি জুড়ে যায় তার সঙ্গে। মে কাফলিনকে বিয়ে করে কিছু দিন অপরাধজগৎ ছাড়লেও ফের তোরিওর কার্টেলে যোগ দেয়। ১৯২০ সালে তোরিওর হাত ধরে শিকাগোয় আসে কাপোন।



তোরিও-কাপোন গ্যাং শিকাগোয় পা রাখার পরবর্তী দু’-তিন বছর এ শহরটা ছিল সব অপরাধচক্রের মৃগয়াভূমি। আগেই বলেছি সে কথা। আইন প্রশাসনের প্রতিটি বিভাগের উপর থেকে নিচুতলা অবধি ছিল মাফিয়াদের কেনা গোলাম। কিন্তু পরিস্থিতি খুব দ্রুত বদলাতে শুরু করল শিকাগো শহরের চূড়ান্ত দুর্নীতিগ্রস্ত মেয়র ‘বিগ বিল’ থম্পসনকে নির্বাচনে হারিয়ে উইলিয়াম ডেভারের ক্ষমতায় আসার পর। ডেভার। মেয়রের আসনে বসার আগে থেকেই পরিচিত ছিলেন আদ্যন্ত সৎ ও সাহসী রাজনীতিক হিসাবে। এহেন ডেভারের ‘আয়রন ফিস্ট’ বা লৌহমুষ্টি শাসনের দাপটে প্রবল চাপের মুখে পড়ে গেল মাফিয়ারা। তাদের বেশ্যালয়, জুয়ার আড্ডা আর চোরাই মালের গুদামগুলোয় হানা দেওয়া শুরু হল নিয়মিত।

বিপদ বুঝে তাদের কালো ধান্দার বেশির ভাগটাই মূল শিকাগোর বাইরে শহরতলি সিসেরোতে সরিয়ে নিয়ে গেল তোরিও-কাপোন কার্টেল। সেখানে আইন-প্রশাসনের অবস্থা পুরনো শিকাগোর মতোই চরম ঢিলেঢালা। অসৎ আর দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মচারীতে ছেয়ে আছে প্রতিটি সরকারি দফতর। অন্য দিকে শিকাগোর বাইরে প্রচারের শ্যেনদৃষ্টি এড়িয়ে কাজ করাও অনেক সহজ। এহেন মৃগয়াভূমিতে তরতরিয়ে ছুটতে লাগল তোরিও-কাপোন অপরাধ-সাম্রাজ্যের রথের চাকা।

সিসেরোয় পা রাখার পর তোরিও আর কাপোনের কালো ধান্দার সূচনা হয় শহরের সবচেয়ে বড় বেশ্যালয়টি গড়ে তোলার মধ্যে দিয়ে। এর বছরখানেক পর ফেলে আসা আদি বসতভিটে সিসিলিতে, নিজেদের গ্রামে দীর্ঘ ছুটিতে বেড়াতে যায় তোরিও। সঙ্গে বৃদ্ধা মা। তোরিওর অনুপস্থিতিতে গ্যাংয়ের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চলে আসে কাপোনের হাতে।

দায়িত্ব নিয়ে প্রথমেই কার্টেলের কার্যকলাপ পরিষ্কার তিন ভাগে ভাগ করে ফেলল আল কাপোন। আইন, প্রশাসন, রাজনীতিবিদ, সমাজের গণ্যমান্যদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা, লেনদেন আর বোঝাপড়ার দায়িত্ব ন্যস্ত হল তাঁর বড় ভাই ফ্র্যাঙ্কের হাতে। অন্য দিকে শহরে নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্তদের জন্য বেশ কয়েকটা সস্তার বেশ্যালয় গড়ে তোলার ভার পড়ল ছোট ভাই রালফের উপর। আর আল নিজে মন দিল জুয়ার আড্ডাগুলোর দিকে। যার নিট ফল, কিছু দিনের মধ্যেই সিসেরোর বুকে গড়ে উঠলো ‘শিপ’ নামে এক বিলাসবহুল অত্যাধুনিক ক্যাসিনো। সিসেরোর সীমা ছাড়িয়ে ব্রুকলিন, নিউ ইয়র্ক, নিউ অর্লিয়েন্স অবধি ছড়িয়ে পড়লো ‘শিপ’-এর নাম। সমাজের উচ্চকোটির মান্যগণ্যদের আনাগোনা শুরু হল এই আধুনিক মধুশালা তথা ভাগ্যক্রীড়ার আঙিনায়। পাশাপাশি ঘোড়দৌড় আর গ্রে-হাউন্ড রেসের বুকমেকার জয়েন্টগুলোর দখলও নিতে শুরু করল আল।

সিসেরো জুড়ে আলের পেশি বা অসিশক্তির এই বিজয়রথ প্রথম বাধাপ্রাপ্ত হল রবার্টের মসির সামনে পড়ে। রবার্ট সেন্ট জন। স্থানীয় জনপ্রিয় সংবাদপত্র ‘সিসেরো ট্রিবিউন’-এর এক সৎ ও নির্ভীক সাংবাদিক। পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগে একের পর এক দুঃসাহসী কলামে প্রশ্ন তুলতে শুরু করল সে। সিসেরো শহরটা আসলে চালাচ্ছে কে? জনগণ-নির্বাচিত সরকারি প্রতিনিধিরা, না আল কাপোনের মতো কুখ্যাত দুর্বৃত্ত? ক্রমাগত অকাট্য সব প্রমাণ-সহ একাধিক লেখায় উঠে আসতে থাকল বিস্ফোরক সব তথ্য— দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিক তথা ভোটপ্রার্থীদের থেকে বিপুল অর্থ নিয়ে কী ভাবে প্রতিটি নির্বাচনের দিনগুলিতে বুথ দখল, ব্যালট লুঠ, বিরোধী প্রার্থী-সহ ভোটদাতাদের সন্ত্রস্ত করে রাখে কাপোন ও তার পেশাদার গুন্ডাবাহিনী।

রবার্টের খবরের জেরে শহরতলির ছোট জনপদ সিসেরো ছাড়িয়ে গোটা শিকাগোয় ছড়িয়ে পড়ল কাপোনের কুকীর্তির কথা। উঁচুমহলের ক্রমাগত চাপে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হল সিসেরো-প্রশাসন।

এর দিনকয়েক পরের কথা। স্থানীয় এক ধনকুবের ব্যবসায়ীর বাড়িতে ব্যবসা-সংক্রান্ত কিছু আলোচনা সেরে ফেরার সময় আলের বড় ভাই ফ্র্যাঙ্কের গাড়িকে চার দিক থেকে ঘিরে ফেলল সিসেরো পুলিশের এক বিশাল সশস্ত্র বাহিনী। কিছু বুঝে ওঠার আগেই গাড়ির মধ্যেই বুলেটে বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে যায় ফ্র্যাঙ্ক, তার দেহরক্ষী ও গাড়ির চালক। এই হত্যার পক্ষে যথারীতি সেই প্রথমে বিপক্ষের আক্রমণ আর আত্মরক্ষার্থে বাধ্য হয়ে গুলি চালানোর তত্ত্ব খাড়া করার চেষ্টা করে পুলিশ। কিন্তু তা বিশ্বাসযোগ্য হয়নি।

বড় ভাই ফ্র্যাঙ্কের মৃত্যুতে ক্রোধ আর প্রতিশোধস্পৃহায় উন্মত্ত হয়ে ওঠে আল কাপোন। অপেক্ষা ছিল শুধু ফ্র্যাঙ্কের অন্ত্যেষ্টিটুকু সম্পন্ন করার। স্থানীয় সেন্ট জর্জ কবরখানায় রাজকীয় মর্যাদায় ভাইকে সমাহিত করে আল। তার পর সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রত্যাঘাতে।
ফ্র্যাঙ্ক-হত্যার সঙ্গে জড়িত একের পর এক সরকারি কর্মচারী আর সাক্ষীরা খুন হয়ে যেতে থাকে কাপোন-বাহিনীর আক্রমণে।

আলের প্রতিশোধস্পৃহার আগুনে ঘৃতাহুতি পড়ে, যখন ওর চিরবিশ্বস্ত বন্ধু জ্যাক গুজিককে খুন করে জো হাওয়ার্ড নামে শহরের এক ছোটখাটো গুন্ডা। গুজিকের কাছে মোটা অঙ্কের টাকা ধার নিয়ে ফেরত না দেওয়ার ফলে বিবাদ, আর তার পরিণতিতেই এই খুন।

ঘটনার দিন সাতেক বাদে নর্থ সিসেরোর এক পানশালায় নিজের হাতে হাওয়ার্ডকে গুলি করে মারে কাপোন। সে সময় বারে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, আলের থম্পসন সাব মেশিনগানের প্রথম দু’-একটা বুলেটেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে হাওয়ার্ড। কিন্তু তাতেও শান্ত না হয়ে হাওয়ার্ডের লাশের উপরেই মেশিনগানের পুরো ম্যাগাজ়িন খালি করে দেয় আল।

আলের এই ভয়াবহ, নৃশংস আক্রমণের তেজ দেখে স্তম্ভিত হয়ে যায় প্রশাসনিক মহল আর ওর প্রতিদ্বন্দ্বী গ্যাংগুলো। শিকাগোয় পা রাখার চার বছরের মধ্যে গোটা মার্কিন মুলুকের অপরাধজগতে পাকাপাকি ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় আল ‘স্কারফেস’ কাপোন নামটা। তার বয়েস তখন মাত্র পঁচিশ বছর।

নিজে কার্টেলের শীর্ষে থাকার সময় শিকাগোর অন্য সব গ্যাংয়ের সঙ্গে একটা সমঝোতা চুক্তি করেছিল ডন তোরিও। একে অপরের প্রতি চরম অবিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে থাকা, ভঙ্গুর এই সমঝোতার উপর কোনও কালেই বিশ্বাস ছিল না নতুন ডন কাপোনের। এই সমঝোতায় বিশ্বাস করার অর্থ যে খুব তাড়াতাড়ি নিজের নামটাও কবরখানার ফলকে খোদাই করে ফেলা, বুঝতে অসুবিধ হয়নি কাপোনের। অতএব তোরিওর অনুপস্থিতিতে নিজের পছন্দ অনুযায়ী ঘুঁটি সাজিয়ে পূর্ণশক্তি নিয়ে শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামল কাপোন। শুধু বিপক্ষ গ্যাংয়ের সদস্যই নয়, প্রশাসনের মধ্যে কাপোন-বিরোধী আধিকারিক, কেউই বাদ গেল না ওর হিটলিস্ট থেকে।

আন্ডারওয়ার্ল্ডের আলো-আঁধারি অলিগলিতে ঘোরাফেরার সময় খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় খেয়াল করেছিল কাপোন। শত্রু সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত থাকে তার নিজস্ব ঘাঁটি এলাকার মধ্যেই। পাহারা বা নজরদারির ব্যাপারটাও হয়ে পড়ে বেশ ঢিলেঢালা। এই সুযোগটাকেই কাজে লাগাতে শুরু করল ও। কৌশলটা হল, শত্রুপক্ষের যাকে নিকেশ করতে হবে, তার বাড়ির খুব কাছাকাছি নিরীহ ভাড়াটে সেজে (বড়জোর দু’-তিন জন) কোনও একটা বাড়ি বা ফ্ল্যাট ভাড়া নেওয়া, যেখান থেকে শত্রুর আস্তানার দিকে ২৪ ঘণ্টা নজর রাখা যায়। শত্রু বাইরে বেরোনোমাত্র তাকে খতম করে দ্রুতগামী গাড়িতে ঘটনাস্থল থেকে মূহূর্তে উধাও হওয়া। কাপোন গ্যাংয়ের নিজস্ব সাঙ্কেতিক ভাষায় এই কৌশলকে বলা হত ‘লেয়িং দ্য পিলো’, সোজা বাংলায় গদি পাতা। পরবর্তী সময়ে ওই কৌশল খুব জনপ্রিয় হয়েছিল গোটা মার্কিন মুলুকের কালো দুনিয়া জুড়ে।

অন্য দিকে কাপোনের উপর একাধিক বার হামলার প্রচেষ্টা কখনওই সফল হয়নি মূলত দু’টি কারণে। প্রথমত পুলিশ বিভাগ আর বিরোধী গ্যাংগুলোয় কাপোনের বিশাল ইনফর্মার নেটওয়ার্ক, উপর থেকে নিচুতলা অবধি ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য আড়কাঠি। ফলে খবর ফাঁস হয়ে যেত হামলার অনেক আগেই। দ্বিতীয়ত ‘গদি পাতা’ কৌশলের আবিষ্কর্তা যে-হেতু কাপোন নিজেই, ফলে ঘরে-বাইরে সর্বত্র ওর সুরক্ষা বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকত লৌহদৃঢ়, অটুট। সেই নিশ্ছিদ্র লৌহবাসর ভেঙে কোনও কালনাগিনীর সেখানে প্রবেশের সাধ্য হয়নি কোনও দিন।

তবে, কাপোন বা তার দলের হাতে যত লোক মারা পড়ত, খুনের অভিযোগ জমা পড়ত তার চেয়ে অনেক বেশি। যার সিংহভাগই সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ভাবে কাপোনের নামে। অনেক দিন ধরেই ব্যাপারটা ভাবাচ্ছিল ওকে। তত দিনে সিসিলিতে দীর্ঘ ছুটি কাটিয়ে ফিরে এসেছে জনি তোরিও। বিষয়টা নিয়ে আলোচনায় বসল দু’জন। এই সময় একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে এল এক বিশ্বস্ত ‘সোর্স’। একাধিক ঘটনাস্থলে খুনের পর খুব উচ্চকিত ভাবে কাপোনের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের কথা জানান দিয়ে যাচ্ছে খুনিরা, যাতে পুলিশের পক্ষে কাপোনের নামে কেস সাজাতে সুবিধে হয়। আর এই পুরো চালটাই এক জনের মস্তিষ্কপ্রসূত। ডিওন ও’ব্যানিয়ন। ফ্লাওয়ার ব্যারন ডিওন। গোটা শিকাগো জুড়ে ফুলের ব্যবসার বাজার নিয়ন্ত্রণকারী দুর্ধর্ষ এক আইরিশ বাহুবলী। আপাতদৃষ্টিতে কাপোনের সঙ্গে মোটামুটি ভাল সম্পর্ক। কাপোনের অভিন্নহৃদয় বন্ধু ফ্র্যাঙ্ক গুজিকের হত্যার পর ওর শবদেহের কফিন ২০,০০০ ডলার খরচ করে সাজিয়ে দিয়েছিল ব্যানিয়নই। অথচ তলায় তলায় আস্তিনের নীচে লুকিয়ে থাকা সাপের ভূমিকা পালন করে চলেছে দীর্ঘদিন ধরে। খবরটা পাওয়ামাত্র সিদ্ধান্ত হল, ব্যানিয়নকে আর এ ধরাধামে থাকতে দেওয়া যাবে না।

তারিখটা ছিল ১৯২৪ সালের ১০ নভেম্বর। বিকেল নাগাদ নিজের ফুলের দোকানে বসেছিল ও’ব্যানিয়ন। এমন সময় কয়েক জন অজ্ঞাতপরিচয় আততায়ী, প্রত্যেকের হাতে উদ্যত সাব-মেশিনগান, ঝটিতি দোকানের মধ্যে ঢুকে বুলেটে বুলেটে ঝাঁঝরা করে দেয় ও’ব্যানিয়নকে। পরমূহূর্তেই দোকানের সামনে এসে দাঁড়ায় একটা কালো ফোর্ড। কাজ সেরেই দ্রুত সেই গাড়িতে চড়ে ঘটনাস্থল থেকে চম্পট দেয় দুষ্কৃতীরা। ঘটনায় কাউকে গ্রেফতার করা যায়নি। কিন্তু অন্ধকার জগতের বিশ্বস্ত সূত্র অনুযায়ী, তার জিগরি দোস্ত, সদ্য জেল-খালাস ফ্র্যাঙ্কি ইয়েলকে এই খুনের সুপারি দিয়েছিল কাপোন।

ও’ব্যানিয়নকে তাদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর কাপোন আর মোরান উল্লসিত হয়েছিল এই ভেবে যে, এ বার ব্যানিয়নের ধান্দার পুরো এলাকাটাই তাদের দখলে চলে আসবে। ফুলের বাজার তো বটেই, তবে তার চেয়েও অনেক বেশি আকর্ষণীয় বুটলেগিং। চোরাপথে সীমান্তবর্তী রাষ্ট্র কানাডা থেকে চোরাপথে হুইস্কি আমদানির ব্যবসা।

১৯২০ সালে মার্কিন সরকারের নিজেদের দেশে মদ নিষিদ্ধ করার এই অবিমৃশ্যকারী সিদ্ধান্ত মাফিয়াদের সামনে বিপুল আয়ের রাস্তা খুলে দেয়। বেআইনি পথে আনা সেই মদ বিপণনে যে গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে যত বেশি এলাকা থাকবে, সে তত বেশি ধনী এবং শক্তিশালী। ফলে এলাকার দখল নিয়ে অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ লেগেই থাকত নিয়মিত। একই ভাবে কাপোন-তোরিও কার্টেলের ব্যানিয়ন সাম্রাজ্য দখলের স্বপ্নও বাধাপ্রাপ্ত হল মূলত দু’জনের পাল্টা প্রতিরোধের সামনে পড়ে।

জিমি ওয়েইস আর জর্জ ‘বাগস’ মোরান। ও’ব্যানিয়নের নর্থ রিভারসাইড আইরিশ গ্যাংয়ের দুই দুর্ধর্ষ সেকেন্ড-ইন-কম্যান্ড বা আন্ডারবস। গ্যাং লিডারের মৃত্যুতে ভয় পেয়ে দমে যাওয়ার বদলে প্রবল প্রত্যাঘাতে দু’জন ঝাঁপিয়ে পড়ল, তোরিও-কাপোন কার্টেলের উপরে। পরবর্তী এক বছরে কাপোন আর তোরিওর উপরে এক ডজনেরও বেশি হামলা চালিয়েছিল নর্থ রিভারসাইড গ্যাং। কিন্তু সব হামলাই ব্যর্থ হচ্ছিল কাপোনের সর্বদা সতর্ক থাকার মানসিকতা আর সোর্স নেটওয়ার্কের জন্য। কড়া সশস্ত্র প্রহরা ছাড়া কখনওই বাইরে বেরোত না কাপোন, সে যত কাছাকাছিই হোক না কেন। দূরে কোথাও যেতে হলে গাড়িতে দু’পাশে দুই সশস্ত্র দেহরক্ষী। ড্রাইভারের পাশের সিটেও এক জন। এমনকি ড্রাইভার নিজেও সশস্ত্র। আর এ ধরনের আসা-যাওয়ার ব্যাপারটা ঘটত সব সময় রাতের অন্ধকারে। লক্ষ্যবস্তুকে চিহ্নিত করাটা তুলনামূলক ভাবে অনেক বেশি কঠিন সেই সময়ে। এ নিয়ম তোরিওকেও সর্বদা মেনে চলার পরামর্শ দিত কাপোন। কিন্তু মাঝেসাঝেই কেমন একটা যেন গা-ছাড়া মনোভাব দেখা যেত তোরিওর মধ্যে। আর সেটাই শেষ অবধি বিপদ ডেকে আনল ওর।

১৯২৫ সালের জানুয়ারি মাস। সকাল থেকেই অবিরাম তুষারপাত। পথঘাট ঢেকে গেছে তুষারে। রাস্তায় লোকজন নেই বললেই চলে। স্ত্রী অ্যানকে নিয়ে বাড়ির অদূরেই শপিং মল থেকে কিছু কেনাকাটা সেরে ফিরছিল তোরিও। গাড়িতে সঙ্গী বলতে একমাত্র ড্রাইভার। নিজের অ্যাপার্টমেন্টের দরজায় পা রাখার মুখে ঝড়ের গতিতে সামনে এসে দাঁড়ায় একটা কালো জাগুয়ার। গাড়ি থেকে লাফ দিয়ে নামে ‘বাগস’ মোরান আর জিমি ওয়েইস। হাতে উদ্যত সাব মেশিনগান। গাড়ির চালককে বুলেটে বুলেটে ঝাঁঝরা করে দেয় জিমি। গুলি চালাতে চালাতে তোরিওর পিছু ধাওয়া করে মোরান। ডান হাতে, কাঁধে, ঘাড়ে আর কুঁচকিতে বুলেটবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে তোরিও। দৌড়ে গিয়ে ওর কপালে মেশিনগানের নল তাক করে মোরান। কিন্তু ভাগ্য নামক শব্দটাকে একশো শতাংশ সঠিক প্রমাণ করে ‘ক্লিক’ করে নল থেকে ফাঁকা আওয়াজ বেরোয় একটা। ম্যাগাজ়িনে বুলেট শেষ!

ইতিমধ্যে গুলির আওয়াজ শুনে বাড়ির ভিতর থেকে ছুটে বেরিয়ে এসেছে তোরিওর দলের লোকজন। দ্বিতীয় ম্যাগাজ়িন লোড করার সময় নেই। বিপদ বুঝে গাড়িতে চড়ে ঘটনাস্থল থেকে চম্পট দেয় মোরান আর ওয়েইস। ‘বেড়ালের ন’টা জান’— এই প্রবাদবাক্য আক্ষরিক ভাবেই সত্যি করে বেঁচে যায় তোরিও।

খবর পাওয়ামাত্র ঘটনাস্থলে ছুটে আসে কাপোন। গোটা হাসপাতাল মুড়ে ফেলে নিশ্ছিদ্র প্রহরার চাদরে। বহুকালের সহযোদ্ধা, বন্ধু, পথপ্রদর্শককে সুরক্ষিত রাখতে নিজেই থাকতে শুরু করে তোরিওর কেবিনে। নিয়মিত সাহস আর ভরসা জোগাতে থাকে বন্ধুকে। এ ব্যবস্থা বলবৎ ছিল তোরিও হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার দিন পর্যন্ত। কিন্তু তোরিওর মনোবল আর ফেরেনি। কপালের এক ইঞ্চি দূরে ওই মৃদু ‘ক্লিক’ শব্দটা ত্রাস আর আতঙ্কে প্রায় পঙ্গু করে ফেলেছিল ওকে।

হাসপাতাল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তোরিওকে গ্রেফতার করে পুলিশ। বছরখানেক কারাবাসের সাজা হয়। তখন তোরিওকে এমন একটা সেলে রাখার ব্যবস্থা করে কাপোন, যেখানে সব সহবন্দিই তোরিও-কাপোন কার্টেলের সদস্য। আর জেলরক্ষীদের সিংহভাগও কাপোনের পাঠানো নিয়মিত মাসোহারার তালিকাভুক্ত। এহেন নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার বলয় ভেদ করে তোরিওর উপর হামলা চালানোর ক্ষমতা হয়নি আইরিশ গ্যাংয়ের।

জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর আন্ডারওয়ার্ল্ড থেকে অবসরের সিদ্ধান্ত নেয় তোরিও। নিজের ধান্দার পুরোটাই কাপোনের হাতে সঁপে দিয়ে সস্ত্রীক বাকি অবসরজীবন কাটাতে চলে যায় ইওরোপে, স্ক্যান্ডিনেভিয়ান অঞ্চলের অজ্ঞাত কোন শৈলশহরে।

ক্রমশ

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
digital essay

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy