পূর্বানুবৃত্তি: তোরিও-কাপোন গ্যাং শিকাগোয় আসার পরের দু’-তিন বছর শহরটি ছিল অপরাধচক্রগুলির মৃগয়াভূমি। মেয়র ‘বিগ বিল’ থম্পসনকে হারিয়ে উইলিয়াম ডেভার ক্ষমতায় আসার পর মাফিয়াদের উপর চাপ বাড়ে। ফলে তোরিও-কাপোন কার্টেল তাদের কালো ধান্দা সিসেরোতে সরিয়ে নেয়। এর পর সিসিলিতে ছুটি কাটাতে যায় তোরিও। তার অনুপস্থিতিতে গ্যাংয়ের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয় আল কাপোন। ভাইদের দায়িত্ব ভাগ করে দিয়ে সে ক্যাসিনো, জুয়া ও ঘোড়দৌড়ের ব্যবসায় আধিপত্য বিস্তার করে। সাংবাদিক রবার্ট সেন্ট জন কাপোনের দুর্নীতি প্রকাশ করলে কাপোনের বড় ভাই ফ্র্যাঙ্ক পুলিশের গুলিতে নিহত হয়। প্রতিশোধে কাপোন সরকারি কর্মচারী ও সাক্ষীদের হত্যা করে। বন্ধু জ্যাক গুজিকের হত্যার বদলা নিতে জো হাওয়ার্ডকেও খুন করে। এর পর কাপোন শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে এবং ‘গদি পাতা’ কৌশলে হত্যাকাণ্ড চালায়। ১৯২৪ সালের ১০ নভেম্বর ডিওন ও’ব্যানিয়ন নিহত হয়। তার সাম্রাজ্য দখল নিয়ে কাপোনের সঙ্গে জিমি ওয়েইস ও ‘বাগস’ মোরানের সংঘর্ষ শুরু হয়। ১৯২৫ সালের জানুয়ারিতে তাদের হামলায় তোরিও গুরুতর আহত হয়। পরে জেল থেকে মুক্ত হয়ে তোরিও অপরাধ জগৎ ছেড়ে দেয় এবং নিজের সাম্রাজ্য কাপোনের হাতে তুলে দেয়।
অতঃপর আক্ষরিক অর্থেই কার্টেলের একচ্ছত্র সম্রাটের নাম আল ‘স্কারফেস’ কাপোন! মার্কিন মুলুকের কালো দুনিয়া থেকে বরাবরের জন্য হারিয়ে যায় জনি তোরিও নামটা।
প্রথমে গুজিকের হত্যা, পরবর্তী সময়ে তোরিওর উপর ভয়াবহ হামলা। বদলার আঁচে ফুটছিল কাপোন। কার্টেলের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ হাতে আসা মাত্র সর্বশক্তি নিয়ে বিপক্ষের উপর হিংস্র বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল সে। প্রবল দাপটে সিসেরো ছেড়ে ফিরে এল শিকাগোয়। খোলাখুলি যুদ্ধ ঘোষণা করল নর্থ রিভারসাইড গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে। ১৯২৫-১৯২৬। আইরিশ বাহিনীর কমসে কম ৫০ জন গ্যাংস্টার খুন হয়ে গেল কাপোনের দলবলের হাতে। তবে সে সাফল্য দীর্ঘস্থায়ী হল না। কারণ, উইলিয়াম ম্যাক্স উইগিন। আপাদমস্তক সৎ এবং নির্ভীক এক তুখোড় সরকারি আইনজীবী। কাপোনের বিরুদ্ধে একাধিক মামলার দায়িত্বে ছিলেন এই উইগিন। হঠাৎই এক দিন নিহত হলেন ভয়াবহ পথদুর্ঘটনায়। কিন্তু এ মৃত্যু যে নিছক দুর্ঘটনার ফলে নয়, কাপোনের কালো হাত কাজ করেছে এর পিছনে— এ সন্দেহ ক্রমেই দৃঢ় হতে শুরু করল শিকাগো পুলিশের তদন্তকারী অফিসারদের মনে। বিপদ বুঝে আত্মগোপন করল কাপোন। ফিরে এল প্রায় এক বছর পর। ‘বাগস’ মোরানদের আইরিশ গ্যাংকে খোলাখুলি আহ্বান জানাল আলোচনার টেবিলে বসার জন্য। সেখানে তার বার্তা খুব পরিষ্কার। এই নিরন্তর গ্যাং ওয়ার আর খুনোখুনিতে রীতিমতো ক্লান্ত হয়ে গেছে সে। এখন তার একমাত্র লক্ষ্য, শান্তি। এর জন্য পুরনো শত্রুতা, বদলা… সব কিছু ভুলে যেতে রাজি সে। সব কিছু ঠিকঠাক চললে অদূর ভবিষ্যতে অপরাধজগৎ থেকে অবসরও নিয়ে নেবে। সভায় উভয়পক্ষই মতৈক্যে পৌঁছলেও এই শান্তি চুক্তি টিকেছিল মাস দুয়েক। জুয়ার ধান্দায় ছোট ভাই রালফের ডান হাত ব্রুনো স্পালুসি আইরিশ গ্যাংয়ের হাতে খুন হয়ে গেল এক দিন। কিন্তু তার পরও খুব আশ্চর্যজনক ও স্বভাববিরুদ্ধ ভাবে চুপ করে রইল কাপোন। কোনও প্ররোচনাতেই পা দিতে রাজি নয় সে। শান্তিই তার একমাত্র কাম্য। যেন এ রকমই একটা বার্তা আমেরিকান আন্ডারওয়ার্ল্ড আর পুলিশকে দিতে চাইল কাপোন। কিন্তু অন্ধকার জগতে যারা ওকে খুব ভাল ভাবে চিনত, তারা সবাই জানত এই ‘শান্তি’ আর ‘স্থিতাবস্থা’ বজায় রাখতে চাওয়ার নামে আসলে সময় কিনছে কাপোন। শিকারের উপর ঝাঁপানোর সেরা মুহূর্তটার জন্য অপেক্ষা করছে বাঘ!
১৯২৭ সালের মে মাস। শেষতক কাপোনের বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ দিল মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট। কাপোন খুব ভাল করেই জানত, এই নির্দেশ কার্যকর হতে বেশ কিছুটা সময় লাগবে। সেই অবসরে ফের এক বার শিকাগো ছেড়ে মিয়ামিতে তার সদর দফতর সরিয়ে নিয়ে এল কাপোন। শ’দুয়েক একর জমি-সহ বিশাল এক হাভেলি কিনল অভিজাত এলাকা পাম আইল্যান্ডে। স্থানীয় পাঁচতারা হোটেল লেক্সিংটন হল তার হেড কোয়ার্টার্স। আধুনিকতম এই সরাইখানা থেকেই পরিচালিত হতে লাগল শিকাগো, ব্রুকলিন, নিউ ইয়র্ক, নিউ জার্সি-ব্যাপী কাপোনের বিশাল অন্ধকার সাম্রাজ্য।
শিকাগোয় কাপোনের চরম শত্রু ‘বাগস’ মোরান। তবে শুধু কাপোন একা নয়, আর এক জনের সঙ্গেও সাপে-নেউলে সম্পর্ক ছিল মোরানের। তুলনামূলক ভাবে কম শক্তিশালী আর একটি আইরিশ অপরাধগোষ্ঠী, ‘সেভেন্টিনথ স্ট্রিট’ গ্যাংয়ের প্রধান জ্যাক ম্যাক’গার্ন। জ্যাকের উপর খুব স্বল্প সময়ের ব্যবধানে পর পর দু’বার প্রাণঘাতী হামলা চালিয়েছিল মোরান। দু’বারই অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যায় জ্যাক। এই জ্যাক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিল কাপোনের। উপর্যুপরি দু’-দু’বার হামলায় আতঙ্কিত হয়ে তার গুরুর শরণাপন্ন হয় সে। খুব তাড়াতাড়ি শিকাগোর বুক থেকে উপড়ে ফেলা হবে ‘বাগস’ মোরান নামক পথের কাঁটা— চেলা জ্যাককে আশ্বস্ত করে তার মেন্টর কাপোন।
অতঃপর সেই ‘ভ্যালেন্টাইন ডে ম্যাসাকার’— যার কথা আগেই সবিস্তার বলেছি। আজ অবধি যা চিহ্নিত হয়ে আছে পৃথিবীর অপরাধ ইতিহাসে নৃশংসতম গণহত্যাগুলির অন্যতম হিসেবে।
কাপোনের কাছে নিশ্চিত খবর ছিল, লিঙ্কইন স্ট্রিটের ওই ওয়্যার হাউসে সে দিন মোরানও আসবে। বাস্তবে খবরটা ঠিকই ছিল। কিন্তু ডেরা থেকে বেরোতে একটু দেরি হয়ে যায় মোরানের। সে দিন ওর সঙ্গে ছিল জিমি ওয়েইসও। খানিকটা দূর থেকেই ওদের চোখে পড়ে ওয়্যারহাউসের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশের কালো গাড়িটাকে। ‘বাগস’ আর ওয়েইস, দু’জনে ধরেই নেয় গোডাউনে পুলিশ রেড হয়ে গেছে। ওদের লাইনে এ-সব খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। পুলিশ হানা দেবে, গ্রেফতার করবে, মামলা সাজাবে, গ্যাংয়ের পেশাদার ভাড়াটে দুঁদে উকিলরা সে মামলা লড়বে, জামিনে ছাড়াবে, এ-সবই তো নিয়ম এই অন্ধকার জগতে। ফলে মোরান বা ওয়েইস, দু’জনের কেউই এতটুকু বিচলিত না হয়ে ড্রাইভারকে গাড়ি ঘোরাতে বলে খানিকটা পিছিয়ে এসে অপেক্ষা করতে থাকে একটা পানশালার মধ্যে। মিনিট দশেক বাদে পানশালার কাচের জানলার সামনে দিয়ে পুলিশ ভ্যানটাকে চলে যেতে দেখে ওরা। কিন্তু গাড়ির মধ্যে দলের লোকজনদের কাউকে না দেখে কেমন যেন একটা খটকা লাগে মনে। দ্রুত গিয়ে গুদামের দরজা খুলেই চক্ষুস্থির! নিজেদের রক্তে স্নান করে মেঝেয় শুয়ে আছে নিথর সাত-সাতখানা লাশ! প্রভু জনের প্রাণহীন শরীরের চার পাশে ঘুরে ঘুরে টানা কুঁইকুঁই শব্দে কেঁদেই চলেছে পোষ্য হাইবল।
ভ্যালেন্টাইন ডে ম্যাসাকার সাফল্যের পর এ বার নিজের দলের ভিতরে ফুটোফাটাগুলো মেরামতের দিকে বিশেষ নজর দেয় কাপোন। ওর বহু দিনের বিশ্বস্ত এক ইনফর্মারের সূত্রে খবর পায়, দলের দুই গুরুত্বপূর্ণ ‘কাপো’ (সৈনিক) স্ক্যালেসি আর আলসিইমি অনেক দিন ধরেই তলে তলে কার্টেলের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পৌঁছে দিচ্ছে মোরানের কাছে, যা মাফিয়া সিন্ডিকেটের ‘কোসা নস্ত্রা’ বা ‘ওমেত্রা’-র মতো গোপনীয়তা বজায় রাখার কঠোর শর্তের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। সিসিলিয়ান মাফিয়াতন্ত্রের নিয়ম অনুযায়ী, এ ধরনের বিশ্বাসঘাতকতার একমাত্র শাস্তি মৃত্যু। তবে সেটাও প্রাচীন সিসিলিয়ান প্রথা অনুযায়ী— ‘আতিথেয়তার পরে হত্যা’। সেই নিয়ম মেনে তার সদর দফতরে স্ক্যালেসি ও আলসিইমির সম্মানে এক বিলাসবহুল পার্টি দেয় কাপোন। আর পার্টি শেষ হওয়ার পর ব্যাঙ্কোয়েট হলের মধ্যেই অতিথিদের চোখের সামনে বেসবল ব্যাট দিয়ে পিটিয়ে নৃশংস ভাবে হত্যা করে দু’জনকে।
ইতিমধ্যে কাপোনকে ‘দেশের এক নম্বর শত্রু’ হিসেবে ঘোষণা করে উচ্চতম ন্যায়ালয়। আদালতের নির্দেশ অনুসারে এক বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করা হয় প্রশাসনের তরফে। দলের নেতৃত্বে এলিয়ট নেস। ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টের সৎ ও অসমসাহসী এক অফিসার। দল গঠনের ক্ষেত্রে নেসের প্রধান নির্বাচন ছিল সেই সব সরকারি কর্মী, যারা ওর মতোই উপরোক্ত দু’টি গুণের অধিকারী, এবং কাপোন তথা মাফিয়ারাজের উপর যাদের ক্রোধ ও ঘৃণা অপরিসীম।
অতঃপর নিজের বাহিনী সাজিয়ে কাপোনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামে নেস। প্রাথমিক স্তরে কাজ করতে নেমে অসংখ্য দুর্বিষহ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয় তাকে। চরম দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসন, অধিকাংশ কর্মচারীই কাপোনের কাছে মাথা বিকিয়ে বসে আছে, কাপোনের গুন্ডাবাহিনীর হুমকি আর হামলা— কোনও রকম চাপ, ব্যর্থতা বা প্রলোভনের মুখে দমে না গিয়ে এই চরম দুর্নীতিবাজ, দানবিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যায় নেস। কাপোন বাহিনীর আক্রমণে খুন হয়ে যায় তার দুই বিশ্বস্ত সহকর্মী। তবুও টলানো যায়নি অদম্য, অবিচল, অকুতোভয় এই সরকারি আধিকারিককে।
অবশেষে ১৯৩১ সালের মে মাস। জয়যুক্ত হল দুর্নীতি আর পৈশাচিক পেশিশক্তির বিরুদ্ধে নেস ও তার টিমের দীর্ঘ আপসহীন সংগ্রাম। বিচারপতি এবং জুরিদের উৎকোচের বিনিময়ে খরিদের চেষ্টা, খুনের হুমকি, কাজ হয়নি কিছুতেই। বিপুল পরিমাণ কর ফাঁকির দায়ে কাপোনকে ১১ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করল উচ্চতম আদালত।
জেলে থাকাকালীন মস্তিষ্কের জটিল সিফিলিসে আক্রান্ত হয়ে কারাবাসের বেশির ভাগ সময়টাই জেল হাসপাতালে কাটাতে হয় কাপোনকে। যৌবনের শুরুতেই বহু নারীসঙ্গের ফলে এই ব্যাধিতে আক্রান্ত হয় সে। পরবর্তী সময়ে জটিল আকার ধারণ করে মস্তিষ্কে পৌঁছে যায় সেই রোগ। ১৯৩৯ সালে মুক্তি পাওয়ার পরও প্রায় এক বছর বাল্টিমোরের হাসপাতালে চিকিৎসা হয় কাপোনের। তবে এর পরবর্তী জীবনটা মোটামুটি শান্তিতেই কেটেছিল তার। অবসর জীবনের বেশির ভাগটাই কাটত নিজের খামারবাড়ির পুকুরে মাছ ধরে। অপরাধ জগতের সঙ্গে সম্পর্ক বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না প্রায়।
১৯৪৭ সালের ২৫ জানুয়ারি হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় এই দুর্ধর্ষ মাফিয়া ডনের। আন্তর্জাতিক অন্ধকার জগতের ইতিহাসে অন্যতম সেরার আসনে চিরস্থায়ী হয়ে থেকে যায় নামটা। ‘দ্য আনক্রাউনড কিং অব গ্লোবাল আন্ডারবেলি’— আল ‘স্কারফেস’ কাপোন!
অন্য দিকে জর্জ ‘বাগস’ মোরান। একদা আল কাপোনের মতো দুর্ধর্ষ মাফিয়া বাহুবলীর সঙ্গে চোখে চোখ রেখে, ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে টক্কর দেওয়া দাপুটে আইরিশ মবস্টার। ভ্যালেন্টাইন’স ডে-র হামলার পর এক সঙ্গে এত জন বিশ্বস্ত সঙ্গীকে হারিয়ে আক্ষরিক অর্থেই হীনবল হয়ে পড়ে সে। আর্থিক অবস্থা খারাপের দিকে যেতে থাকে ক্রমাগত। বেগতিক বুঝে বাকি সাঙ্গোপাঙ্গরাও একে একে দল ছেড়ে চলে যেতে থাকে। শেষ দিকে নেহাতই কিছু ছিঁচকে অপরাধীর সঙ্গে মিলে ছোটখাটো চুরিডাকাতি করে দিন গুজরান করত। এ ভাবেই এক দিন একটা গয়নার দোকানে ডাকাতির সময় বমাল ধরা পড়ে দীর্ঘমেয়াদি কারাবাসে যেতে হয়। ১৯৫৭ সালে জেলে থাকাকালীনই ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় মোরানের। জেলখানার গায়ে জীর্ণ এক কবরখানায় চরম অবহেলিত ভাবে দীনদরিদ্রের মতো সমাহিত করা হয় একদা বিলিয়নেয়ার এই আইরিশ মবস্টারকে।
অলওয়েজ় ‘লাকি’
চার্লস লুসিয়ানো। নিজের দুনিয়ায় পরিচিত ছিল চার্লি ‘লাকি’ লুসিয়ানো নামে। জন্ম ১৮৯৭ সালে সিসিলির প্রত্যন্ত লারকার্দিয়া অঞ্চলে, অত্যন্ত দরিদ্র এক পরিবারে। কঠোর পরিশ্রমী চার্লির বাপ-মা, পরিবারের অন্ন সংস্থানের জন্য উদয়াস্ত খাটত। তার পরও সিসিলির চরম দারিদ্রপূর্ণ পরিবেশে বেঁচে থাকাটা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল লুসিয়ানো পরিবারের পক্ষে। তাদের চোখে তখন একটাই স্বপ্ন। আমেরিকায় পাড়ি দেওয়া। সে নাকি এক মায়ানগরী। এক সব পেয়েছির দেশ। জীবনের সব স্বপ্নপূরণের চাবিকাঠি রয়েছে ওখানেই।
সেই মায়ামৃগের হাতছানিতে এক দিন বাপ-পিতেমোর জন্মভিটে ছেড়ে সমুদ্রপথে আমেরিকার উদ্দেশে পাড়ি জমায় লুসিয়ানো পরিবার। নিউ ইয়র্কের এক দরিদ্র উদ্বাস্তু ইটালীয় এলাকায় ঠাঁই হয় তাদের। সব পেয়েছির দেশের মায়াকাজল মাখানো ঘোর তত দিনে উধাও লুসিয়ানো দম্পতির চোখ থেকে। ফলে ফের শুরু হয়ে যায় দারিদ্রের সঙ্গে চোয়ালচাপা নাছোড় সংগ্রাম। চার্লি তখন সবে দশ।
ছেলেবেলা থেকেই বিভিন্ন ধরনের অপরাধকর্মে জড়িয়ে পড়তে শুরু করে চার্লি। নিউ ইয়র্কে পা দেওয়ার মাত্র এক বছরের মধ্যে এক ডিপার্টমেন্ট স্টোরে চুরির অপরাধে গ্রেফতার হয়ে ছ’মাসের জন্য যেতে হয় জুভেনাইল হোমে।
সংশোধনাগার থেকে ছাড়া পেয়ে এলাকায় ফিরে এসে রোজগারের এক অভিনব পন্থা আবিষ্কার করে চার্লি। সম্পন্ন ইহুদি পরিবারের ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে নিয়মিত দু’পেনি করে তোলা আদায়ের বিনিময়ে স্কুলে যাওয়ার পথে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। চার্লিকে তোলা না দিলে কপালে জুটবে বেধড়ক মার। আর দিলে চার্লির নিরাপত্তার ছত্রছায়ায় নিশ্চিন্তে পৌঁছে যাওয়া যাবে স্কুলে। আবার পথেঘাটে মাঝেসাঝেই হামলা চালানো ইয়াংকি (স্থানীয় আমেরিকান) বখাটে ছেলেছোকরাগুলোও জ্বালানোর সাহস পাবে না চার্লিকে দেখলে।
চার্লির এই ‘প্রোটেকশন’-ধান্দায় প্রথম আঘাতটা লাগল, যেদিন এক পোলিশ ইহুদি পরিবারের সন্তান মায়ার ল্যানস্কি সরাসরি তোলা দিতে অস্বীকার করল তাকে। ফলে খুব স্বাভাবিকভাবেই ধুন্ধুমার লড়াই বেধে গেল দু’জনের মধ্যে। এবং চার্লিকে চরম বিস্মিত করে ওর সঙ্গে সমানে সমানে টক্কর দিয়ে গেল ল্যানস্কি। সেই মুহূর্ত থেকেই এমন এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠল দু’জনের মধ্যে, যা অটুট ছিল আজীবন। পরে ওই একই এলাকার আর এক ইহুদি কিশোর, নাম বেঞ্জামিন সেগাল, আগামী দিনে যে খ্যাত হয়েছিল ‘বাগসি’ সেগাল নামে, যোগ দিল চার্লি আর ল্যানস্কির সঙ্গে। আর অনতিবিলম্বেই তিন জনে মিলে গড়ে তুলল কুখ্যাত ‘ফাইভ পয়েন্ট গ্যাং’ যা দীর্ঘকাল ধরে পুলিশের মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছিল।
শৈশব থেকেই নানা অপরাধে হাত পাকিয়েছিল লুসিয়ানো, যার মধ্যে অন্যতম ড্রাগের ধান্দা। সেই কারণেই হেরোইন পেডলিংয়ের মামলায় ফের জেলে যেতে হয় তাকে। কিন্তু এই কারাবাস তাকে দমাতে তো পারলই না, উল্টে অন্ধকার জগতে তার দাপট বেড়ে গেল বহুগুণ। দুই ঘনিষ্ঠ সহযোগী সেগাল আর ল্যানস্কির সঙ্গে নিউ ইয়র্ক আন্ডারওয়ার্ল্ড দাপিয়ে বেড়াতে লাগল লুসিয়ানো। এই রাস্তায় তার আলাপ হল কালো কারবারের মহারথী, ইটালিয়ান মাফিয়া ডন ভিটো জেনেভিস, জো অ্যাডোনিস, জো ‘দ্য বস’ মাসেরিয়া, ফ্র্যাঙ্ক কস্টেলোর সঙ্গে। এই কস্টেলোই লুসিয়ানোর পরিচয় করিয়ে দিল ডাচ শ্যুলজ়, আর্নল্ড রথস্টেইন, ‘ড্যান্ডি’ ফিল কাস্টেল, ‘বিগ’ বিল ডায়ারের মতো কুখ্যাত ইহুদি আর আইরিশ মবস্টারদের সঙ্গে।
ক্রমশ