E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

দেয়া নেয়া

“চুপ করো! সে-সব জায়গায় তোমাকে পাঠানো হয়েছিল যাতে তুমি ভাল শিক্ষালাভ করো, গুরুজনদের মুখে মুখে কথা বলার তালিম নেওয়ার জন্য নয়।”

অভিনন্দন সরকার

শেষ আপডেট: ৩০ অগস্ট ২০২৬ ০৮:৪২
ছবি: প্রসেনজিৎ নাথ।

ছবি: প্রসেনজিৎ নাথ।

নীহারিকার সামনে বিরাট বিপদ। একটা নয়, একজোড়া বিপদ। একেবারে উভয়সঙ্কটে পড়ে গেছে নীহারিকা।

একটু আগে, হেমন্তের এই নিরিবিলি দুপুরে সে গৃহত্যাগ করেছে। নীহারিকার বয়স উনিশ। উনিশ বছরের অনেক মেয়ে ঝোঁকের বশে বাড়ি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়। নীহারিকা তা করেনি। সে আটঘাট বেঁধে এগিয়েছে। এখান থেকে সে যাবে ধানবাদ, সেখানে আছে তার বান্ধবী শ্রাবণীর দিদি-জামাইবাবু। সেখানে গিয়েই আপাতত কিছু দিন গা-ঢাকা দেবে, তার পর সেখানেই চাকরি-বাকরির চেষ্টা দেখবে।

বাড়ি ছাড়ার কারণ বিবাহ। নীহারিকার অমতে তার বিয়ে প্রায় ঠিক করে ফেলেছেন তার বাবা সদাশিব চ্যাটার্জি। পাত্র জনৈক অরুণোদয় গাঙ্গুলি, রিসার্চ স্কলার, সরকারি অফিসারের শাঁসালো চাকরি বাগিয়ে মোটামুটি জাঁকিয়ে বসেছে।

নামকরা হোমিয়োপ্যাথ সদাশিবের মতে, নীহারিকার জন্য অরুণোদয়ের থেকে যোগ্য পাত্র আর কেউ হতে পারে না। নীহারিকা বেঁকে বসেছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে প্রায় ষোলো বছর কেটে গেছে, এখনও মেয়েরা স্বাধীনতা পাবে না? পাবে না নিজের মনের মতো জীবনসঙ্গী নির্বাচনের অধিকার?

নীহারিকা নেকুপুষু মেয়ে নয় যে, বাবার সব সিদ্ধান্ত মাথা নিচু করে মেনে নেবে। বাবার সঙ্গে তাই এই নিয়ে রীতিমতো লড়ে গেছে সে।

সদাশিব বলেছেন, “তোমার অপছন্দের তো কোনও কারণ দেখছি না। ছেলে অত বড় সরকারি চাকরি করে, নেশাভাঙ থেকে শতহস্ত দূরে, সচ্চরিত্র, পাল্টি ঘর...”

“শুধু সেটুকুই যথেষ্ট নয় বাবা।”

“বটে! তা আর কী গুণাবলি থাকলে সে তোমার যোগ্য হবে বলে মনে করছ, জানাবে কি?”

“বয়সের পার্থক্যও অনেক।”

“তাই নাকি? সে তোমার থেকে বয়সে মোটে আট-ন’বছরের বড়, স্বামী-স্ত্রীতে এটুকু বয়সের পার্থক্য না থাকলে সংসারে সাম্যাবস্থা থাকবে কী করে? স্ত্রী স্বামীর মাথায় চড়ে নাচবে, সেইটেই বুঝি ফ্যাশন?”

“এ-সব বস্তাপচা ধারণা নিয়েই যদি বসে থাকবে, তা হলে লেখাপড়া শিখিয়েছিলে কেন? বেথুন, স্কটিশ… এ-সবের তো প্রয়োজন ছিল না...”

“চুপ করো! সে-সব জায়গায় তোমাকে পাঠানো হয়েছিল যাতে তুমি ভাল শিক্ষালাভ করো, গুরুজনদের মুখে মুখে কথা বলার তালিম নেওয়ার জন্য নয়।”

এর পরে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকিয়ে সদাশিব বলেন, “ঝেড়ে কাশো দেখি... ওই ছেলেটা... ওই উত্তম না কী নাম? তার একটা বায়োস্কোপও দেখতে যে তোমার বাকি নেই তা আমি জানি। রুপোলি পর্দায় রং মেখে যে সং সাজে, তার মতো বর চাইছ নাকি?”

তর্কের এই পর্যায়ে এসে থমকে যায় নীহারিকা। বাবার কথা ভুল নয়। সত্যিই তো, নীহারিকার শয়নে, স্বপনে, জাগরণে শুধুই একজন। তার হাঁটা, কথা বলা, তার ঢেউ-খেলানো চুল, তার ভুবন-ভোলানো হাসি, ওই আশ্চর্য কেতাদুরস্ত হাবভাব... নিজের জীবনসঙ্গীর মধ্যে যদি তেমন গুণাবলি সে চেয়েও থাকে, তবে এমন কী অন্যায় করেছে নীহারিকা?

সেখানে অরুণোদয় গাঙ্গুলি? সিঁথি করে চুল আঁচড়ানো, চৌকো ফ্রেমের চশমা, মাঝারি হাইট, নিপাট নিরীহ একটা লোক... তার মধ্যে সেই ব্যাপারটা কোথায়?

মেয়েকে নীরব দেখে যা বোঝার বোঝা হয়ে যায় সদাশিবের। হোমিয়োপ্যাথির লোকেরা হন ধীরস্থির, শান্ত; উগ্রচণ্ড মেজাজের হোমিয়োপ্যাথ বড় একটা দেখা যায় না। সদাশিব ব্যতিক্রম, তাঁর হুঙ্কারে বড় বড় লোকের হাড় হিম হয়ে যায়৷

রোগী-ঠাসা চেম্বারে যাওয়ার আগে তিনি মেয়েকে বলে গেছিলেন, “ও-সব খেয়াল মন থেকে ঝেড়ে ফেলে বিয়ের জন্যে প্রস্তুত হও, না হলে অন্য উপায়ও আমি জানি।”

“যেমন?” উদ্ধত ভাবে জানতে চায় নীহারিকা।

“তোমার ডানা ছাঁটতে আমাকে বাধ্য কোরো না খুকু। এর পর ঘরে বন্দি করে রাখা হবে, শখ-আহ্লাদ-সিনেমা-থিয়েটার সব বন্ধ করে দিলে ভাল হবে? যাও, দূর হয়ে যাও আমার চোখের সামনে থেকে।”

রাগে কাঁপতে কাঁপতে নিজের ঘরে ফিরে এসেছে নীহারিকা। সেদিনই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল, এই বাড়ি তাকে ছাড়তে হবে।

প্রাণের বন্ধু শ্রাবণী একটু বেসুরে বেজেছিল। আমতা আমতা করে বলেছে, “আমি ধানবাদে ব্যবস্থা করে দিচ্ছি, কিন্তু কাজটা কি ঠিক হচ্ছে? অমন ছেলে পেলে আমি কোনও দিকে না তাকিয়ে ঝুলে পড়তাম, বলিহারি মেজাজ তোর, খুকু।”

সেই মেজাজ নিয়েই নীহারিকা আজ ভরদুপুরে বাড়ি ছেড়েছে। কিন্তু বাড়ি ছাড়ার পর থেকেই ভয়ানকদর্শন দুটো লোক তার পিছু নিয়েছে, একটা বাসে যে উঠে পড়বে তারও জো নেই, ভরদুপুরে কোনও বাসের দেখা পাওয়া যাচ্ছে না।

লোকদুটো বেশ বেপরোয়া, নীহারিকা যেদিকে যাচ্ছে সেদিকেই চলে আসছে পিছু-পিছু, খুব খারাপ কিছু ঘটানোর প্ল্যান ভাঁজছে মনে হয়। দুপুরের নির্জন পথে ক্রমশ দূরত্ব কমাচ্ছে লোক দুটো, কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না নীহারিকা।

তখনই কালো রঙের একটা অ্যাম্বাসাডর গাড়ি ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষল তার সামনে এসে। চালকের আসন থেকে মুখ বার করে এক যুবক বলল, “উঠে এসো, জলদি!”

*****

উত্তমকুমার বললেন, “উঁহু, শুধু নামে নয়, আর একটা ব্যাপারেও আমাদের মিল আছে।”

অরুণোদয়ের এই এক দোষ, মাঝে মাঝে বিনা কারণে হেসে ফেলে। মহানায়কের কথা শুনেও সে একগাল হেসে বলল, “সেটা কী, গুরুদেব?”

“বলছি, আগে তোমার সমস্যাটার সমাধান বাতলে দিই, এসো।”

অরুণোদয় কান পাতল, তার দিকে খানিক ঝুঁকে পড়ে বলতে শুরু করলেন উত্তমকুমার।

অরুণোদয়ের সমস্যা জটিল। প্রথম দিন বিয়ের জন্য সম্বন্ধ দেখতে গিয়ে সে হুড়মুড়িয়ে প্রেমে পড়ে গিয়েছে। সমস্যা হল, মেয়েটি তাকে তেমন পছন্দ করেনি, হয়তো বিয়েটাও ভেস্তে দিতে পারে।

কলকাঠি যে অরুণোদয় একদম নাড়েনি এমন নয়। মেয়েটির প্রিয় বান্ধবীর সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ করেছে, তার কাছ থেকে মেয়েটির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার যে তথ্য পেয়েছে, তাতে চোখ কপালে উঠে গেছে অরুণোদয়ের। অতটুকু মেয়ে... বিয়ের হাত থেকে বাঁচতে একেবারে বাড়ি ছেড়ে পালানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে! তার পর থেকেই অরুণোদয় মনমরা হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বড় ডিগ্রি, মাসে সাড়ে পাঁচশো টাকা বেতনের চাকরি, সব কিছু অর্থহীন মনে হচ্ছে।

রাতে শুয়ে শুয়েও মনপ্রাণ দিয়ে সে ভাবছিল, উচ্চশিক্ষা, চাকরি এ-সব না পেয়ে বরং নীহারিকার প্রিয় পুরুষ উত্তমকুমারের মতো ব্যক্তিত্ব পেলেই আর চিন্তা থাকত না। খুব মন দিয়ে মহানায়কের কথা ভাবার ফলেই হয়তো আশ্চর্য ঘটনা ঘটেছে। তার স্বপ্নে এসেছেন স্বয়ং উত্তমকুমার।

অরুণোদয়ের সমস্যা তিনি মন দিয়ে শুনেছেন এবং বর্তমানে খুব নিচু স্বরে সেই সমস্যার সমাধান বলে দিচ্ছেন অরুণোদয়কে।

কথা শেষ করে উত্তমকুমার বললেন, “বলো সানরাইজ়, প্ল্যানটা পছন্দ হয়েছে?”

অরুণোদয় দ্বিধাজড়িত ভাবে বলল, “ইয়ে, মানে গুরুদেব, এটুকুতেই কাজ হবে বলছেন?”

“হবে না মানে? আলবাত হবে! প্রেম-ভালবাসার ব্যাপারে গোটা ইন্ডাস্ট্রি আমাকে অথরিটি বলে মানে, সেই আমাকেই কিনা সন্দেহ করছ?”

অরুণোদয় লজ্জিতভাবে বলে, “না না গুরুদেব, আসলে একটু খটোমটো লাগছে কিনা!”

অরুণোদয়ের থুতনি নেড়ে দিয়ে উত্তমকুমার বললেন, “তোমার নীহারিকার জন্যে ওই খটোমটো প্ল্যানেরই প্রয়োজন। নারীচরিত্র বেজায় জটিল, বুঝলে? কেন তাদের ললনা বলে জানো সানরাইজ়, কারণ ওরা কোনও ল’ই মানে না।”

নিজের কথা সম্ভবত নিজেরই পছন্দ হয়েছে উত্তমকুমারের, “কী দারুণ একখানা কথা বলে ফেললাম, অ্যাঁ! দেখি আগামী দিনে কোনও ছবিতে যদি এটা সংলাপ হিসেবে ঢোকাতে পারি।”

“কিন্তু গুরুদেব, আমার সঙ্গে আপনার নাম ছাড়া আর কী মিল আছে সেটা তো বললেন না।”

“হ্যাঁ, সেইটেই বলব ভাবছিলাম। আমার যে হাসির নেশায় গোটা বাংলাদেশ কাবু, লক্ষ করে দেখেছি আর কিছুতে না হোক, তোমার হাসির মধ্যে একটা ‘আমি আমি’ ভাব আছে হে সানরাইজ়।”

এই কথা শোনামাত্র, সম্ভবত আনন্দের অভিঘাতেই, প্রায় তৎক্ষণাৎ ঘুম ভেঙে গেল অরুণোদয়ের।

ঘরময় ভোরের আলো খেলা করছে। মহানায়ক কোথাও নেই। জোড়হাত কপালে ঠেকাল অরুণোদয়, “গুরুদেব! গুরুদেব!”

*****

ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকিয়ে আতঙ্কিত ভাবে নীহারিকা বলল, “লোকগুলো আসছে এখনও?”

চালকের আসনে বসা অরুণোদয় রিয়ারভিউ মিরর দেখে নিয়ে বলল, “হ্যাঁ, পিছু নিয়েছে, ট্যাক্সিতে আছে।”

কঠোর হয় নীহারিকার গলা, “শুনুন অরুণোদয়বাবু, আপনি হঠাৎ এসে পড়ায় খুব ভাল হয়েছে, এখন দয়া করে আমাকে হাওড়া স্টেশনে নামিয়ে দিন, বড় উপকার হয়।”

বিস্ময়ে ভুরু তুলে অরুণোদয় বলে, “খেপেছ নাকি, নীহারিকা? ওদের সঙ্গে আর্মস থাকতে পারে। ওদের মুখোমুখি হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। একা ট্রেনে চেপে কোথাও যাওয়াটা এই মুহূর্তে একেবারে সেফ নয়। যদি ওরা তোমাকে ফলো করে ট্রেনেওউঠে পড়ে?”

শাড়ির আঁচল আঙুলে পেঁচাতে পেঁচাতে নীহারিকা চিন্তিত মুখে বলল, “তা হলে উপায়?”

“উপায় একটা আছে, ওদের চোখে ধুলো দিয়ে এমন একটা জায়গায় চলে যেতে হবে যে, ওরা আমাদের খুঁজেও পাবে না।”

নীহারিকা দেখল, সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ ছেড়ে পূর্ব দিকে ঘুরে কর্নওয়ালিস স্ট্রিটে এসে পড়েছে অরুণোদয়ের গাড়ি। অবশেষে ঠনঠনে কালীবাড়ির কাছাকাছি একটা গলিতে নিজের কালো অ্যাম্বাসাডর গাড়ি পার্ক করে সে বলল, “নেমে এসো নীহারিকা।”

বীণা সিনেমার ভিতরে সেঁধিয়ে যাওয়ার আগে ওই ছুটোছুটিতেও নীহারিকা দেখতে পেল, সিনেমাহলের বাইরে প্রকাণ্ড পোস্টার, হাসিমুখে মহানায়কের বিশাল কাট-আউট।

পরবর্তী আড়াই ঘণ্টা যেন এক লহমায় কেটে গেল। কোন এক জাদুকর অজানা মন্ত্রে মোহিত করে রাখল নীহারিকাকে।

একই সঙ্গে ড্রাইভার আর ডাকসাইটে গায়কের পার্ট করে মহানায়ক একেবারে মাতিয়ে দিলেন দর্শকবৃন্দকে। সারাটা সময় হাসি-কান্না-আবেগের দোলাচলে ভেসে গেল নীহারিকাও। তার পিছনে যে একটু আগে দু’জন বিপজ্জনক গুন্ডা তাড়া করেছিল, সেটা যেন তার আর মনেই রইল না।

সে জানল না, তার পাশে বসা যুবক ছবি প্রায় দেখছিলই না। পর্দার আলো ছিটকে এসে পড়েছিল নীহারিকার মুখে, সেই আলো মেখে কী অপার্থিব সুন্দর যে দেখাচ্ছিল নীহারিকাকে— আড়চোখে নীহারিকার দিকে চেয়ে চেয়েই সময় কেটে গেল তার।

হল থেকে বেরিয়ে ঘোর কাটছিল না নীহারিকার। টাউন স্কুলের কাছাকাছি একটা কেবিন-হোটেলে কফি আর ফিশফ্রাই খেতে খেতে যখন অরুণোদয় ঘর ছাড়ার কুপ্রভাব আলোচনা করতে লাগল, তখন মুখে কোনও ভাবান্তর না দেখালেও মনে মনে ধানবাদ যাওয়ার পরিকল্পনাটা বাতিল করে দিল নীহারিকা।

বিল মেটানোর জন্য হাত তুলে বেয়ারাকে ডাকল অরুণোদয়।

নিজের ব্যাগ খুলতে খুলতে নীহারিকা বলল, “খবরদার, যদি খাবারের দাম দিয়েছেন! সিনেমার টিকিটের দাম আপনার, কফি-ফিশফ্রাই আমার তরফ থেকে।”

চোখ সরু করে অরুণোদয় বলল, “দেয়া নেয়া?”

হেসে ফেলল নীহারিকা, “হ্যাঁ, দেয়া নেয়া।”

*****

নীহারিকাকে বাড়ির গেট পর্যন্ত ছেড়ে দিয়ে গেল অরুণোদয়। দেরি বেশি হয়নি, বাড়িতে যেমন-তেমন একটা অজুহাত দিয়ে দিলেই হবে।

“আর এমন পাগলামি নয়, বাড়ি ছাড়ার প্ল্যান পুরোপুরি ক্যানসেল করে ফেলো, বিয়ে যে করতেই হবে এমন মাথার দিব্যি তো কেউ দেয়নি। বাবাকে বুঝিয়ে বলো, ঠিক বুঝবেন।”

নীহারিকা অরুণোদয়ের দিকে তাকাল। আজ দীর্ঘ সময় সে এই ছেলের সঙ্গে কাটিয়েছে। সময় যে কোথা দিয়ে চলে গেল বোঝাও গেল না। একটু সবজান্তা ভাব আছে, আর গোমড়ামুখো এটাও ঠিক, তবু একটা অদ্ভুত শান্তির বলয় ঘিরে থাকে ছেলেটাকে, নির্ভর করা যায় এমন একটা মানুষ।

ঘাড় নেড়ে নীহারিকা বলল, “ভিতরে আসবেন না? বাবা আপনাকে দেখলে খুশি হবেন।”

অরুণোদয় স্বগতোক্তির মতো করে বলল, “বাবা খুশি হলে আর আমার কী! অন্য কেউ খুশি হলে না-হয়...”

“কিছু বললেন?”

“ইয়ে, বলছিলাম আজ থাক, একটু তাড়া আছে। চলি তা হলে?”

“ধন্যবাদ। সাবধানে যাবেন, যদিও বলার দরকার নেই, আপনি খুব ভাল গাড়ি চালান।”

“কী লাভ বলো, পার্মানেন্ট ড্রাইভারি তো আর জুটল না।”

“মানে?”

“না কিছু না, চললাম।”

নীহারিকা দেখল, ধীরপায়ে হেঁটে চলে যাচ্ছে ছেলেটা। সে বুঝল, খুব সূক্ষ্ম একটা মনখারাপ হচ্ছে তার।

আফসোসে মাথা নাড়ল অরুণোদয়। স্বপ্নে মহানায়ক যা-যা বলেছিলেন, পরপর তেমনই ব্যবস্থা করেছিল সে।

শ্রাবণীর থেকে নীহারিকার বাড়ি ছেড়ে বেরোনোর সময়টা জেনে আশপাশে অপেক্ষা করা, যাত্রা কোম্পানির দুটো ষণ্ডামার্কা লোক ভাড়া করে নীহারিকাকে ভয় দেখানো, মোক্ষম সময়ে গাড়ি নিয়ে হাজির হওয়া, গা-ঢাকা দেওয়ার অছিলায় প্রিয় নায়কের সিনেমা দেখতে ঢুকিয়ে দেওয়া… সব কিছু করেও কোনও লাভ হল না!

নাহ্‌, যতই মহানায়কের আশীর্বাদ মাথায় থাক, আসলে তো অরুণোদয় ফ্লপমাস্টার-জেনারেল। তার গল্প সুপারহিট হবে কী করে?

গাড়িতে ওঠার আগে অরুণোদয় ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল, নীহারিকা তখনও চলে যায়নি, ঠায় দাঁড়িয়ে আছে গেটের সামনে।

কী করা উচিত বুঝতে না পারলে অরুণোদয় যা করে, তা-ই করল। অসহায়ের মতো হেসে ফেলল।

চলে যেতে গিয়েও যেতে পারল না নীহারিকা। থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।

তার সামনে দাঁড়ানো ছেলেটা অকারণেই তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। গোমড়ামুখো, বোকা বোকা একটা ছেলে অকারণে হাসছে... তাকিয়ে দেখার মতো দৃশ্য নয়।

তার পরেও সেই হাসি থেকে চোখ ফিরিয়ে নিতে পারছে না নীহারিকা। তার চোখের পলক পর্যন্ত পড়ছে না।

তাকিয়ে আছে, তাকিয়েই আছে!


এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Uttam Kumar Bengali Short Story Short story

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy