উত্তমকুমার বলের এই একটিই নাম। কেবলমাত্র গাত্রবর্ণের উপর ভরসা রেখে ছোটপিসি তার এই নামকরণ করেছিল। এটা উচ্চাকাঙ্ক্ষা, না নিদারুণ রসিকতা— মধ্য-পঞ্চাশে এসে উত্তম আর ভেবে পায় না। ভেবে পায় না, কেউ তাকে তার নাম ধরে ডাকলে এখন তার হেসে ওঠা উচিত কি না। ক্ষয়িত, বিকৃত জীবনে নামটা তার কাছে রসিকতা থেকে আজ বিদ্রুপের আকার ধারণ করেছে। আজকাল এমন সন্দেহও তার হয়, এ বুঝি তার আসল নাম নয়। কোথাও কখনও অরুণকুমার বল বলে কেউ জন্মেছিল, যাকে নিজের অজানতেই এই নাম গছিয়ে দেওয়া হয়েছে, অনেকটা যেভাবে খুঁত গোপন করে সে মহিলাদের খুঁতেল শাড়ি গছায়। অনেক বছর অবধি সে নাম বদলানোর পরিকল্পনা করেছে। তার পর হাল ছেড়ে দিয়ে এক সময় হয়ে উঠেছে উত্তমকুমার বল। ছোটপিসির উপর তার আর ক্ষোভ নেই, নামের প্রতি এখন তার যা আছে, তা হল নিখাদ খেদ। দুধ-চা’র দাগ লাগা জামা গায়ে উত্তমকুমার বল সন্ধেবেলা বসে থাকে মা ভবানী বস্ত্রালয়ে। আর শাস্তিস্বরূপ ছোটপিসির মৃত্যুদিন সে হেলায় ভুলে যায়।
অবশ্য সই করার সময় সে ‘কুমার’ বাদ রাখে। এতে তার নামের মাহাত্ম্য হ্রাস পেয়ে সে রক্তমাংসের মানুষ হয়ে উঠতে পারে। বিদ্রুপও যেন কয়েক পা পিছু হঠে। নাম বলার সময় ‘কুমার’ গোপন করলে ছাপোষা মানুষকে যেরকম মানায় তেমন কাজ, যেমন— বিদ্যুতের বিল অথবা মেয়ের স্কুলের বেতন জমা দেওয়া, পুজোয় সপরিবার ডিমের রোলে সমবেত কামড় দেওয়া, ক্বচিৎ বকখালি এসে পড়লে মদে পেট ভরে বঙ্গোপসাগরের ঢেউয়ের সঙ্গে সমঝোতা করা, রাস্তায় টোটোওয়ালা ও বাইকারোহীর মধ্যে ঝামেলায় মধ্যস্থতা করা ইত্যাদি সহজতর হয়। তেরো হাত কাঁকুড়ের বারো হাত বীজের মতো নিজের খোলসের ভিতর ঢলঢল করে উত্তম বল। সে কখনও কোনও ঝর্না কলম হাতে তোলেনি। কলা বাদে আর কোনও ফল সে খেতে পায় না। তার সই কেজো কারণ ছাড়া কেউ সংগ্রহ করেনি। তার ছবিও কখনও অকারণে সে তোলায়নি। বকখালি গিয়ে সে জল দেখেছে, রোদ দেখেছে, রাতের তারা দেখার আগেই সে অস্ত গিয়েছে হোটেলের বাসি বিছানায়। বস্তুত সে বহুদিন তারা দেখেনি। সেই যবে থেকে তার নাম কৌতুকের পরিবর্তে মশকরা হয়ে উঠতে শুরু করল, সেই থেকে যেন সে একটি বারও মাথা তুলে আকাশের তারা দেখার অধিকার হারিয়েছে। তার অলক্ষ্যে এখন জোছনা ফোটে, ভ্রমরেরা মধু খায়, পৃথিবীর সব সুন্দর যেন তাকে পাশ কাটিয়ে ভেসে থাকে। কী যে বিবাদ তাদের মাঝে, উত্তম জানে না।
গোঁফের রেখা ওঠার আগে অবধি উত্তমের নিজেকে সুন্দর মনে হত। তার গায়ের রঙের জন্য আশপাশের মা মাসি দিদি বোনেরাও তা-ই মনে করতেন। চামড়ার রং আর লিঙ্গের উপর ভিত্তি করে ঠাকুমা হাতে পাঁচ পয়সা বেশি দিত, মেয়েরা মহিলা আসনে বসতে দিত ভিড় বাসে। তার পর একদিন উত্তম দেখল তার হাতের রেখাগুলো কেমন গাঢ় হয়ে উঠেছে, ত্বক হচ্ছে খসখসে, দৃষ্টি থেকে সারল্য ঝরে যাচ্ছে। বৌদিদের সে লজ্জা পেতে শুরু করেছে, ভাইবোনেদের সে করছে অবজ্ঞা। সে সকলের কেজো হয়ে উঠেছে, আর তার সৌন্দর্য খসে পড়ে গেছে ভীত টিকটিকির বাতিল লেজের মতো। একটা ভয়… সেই থেকে তাকে তাড়িয়ে নিয়ে এসেছে মধ্য-পঞ্চাশে। যা সে অগ্রাহ্য করতে চেয়েছে সর্বদা। এখন সে এক জন কোঁচকানো তামাটে চামড়ার মানুষ, যাকে দেখলে মনে হবে তার প্রৌঢ়ত্ব আজন্মের, সে— আয়না দিয়ে উত্তমের দিকে ফিরে তাকায়। আর নিজেকে তার সুন্দর বলে মনে হয় না, নিজেকে তার ভীত মনে হয়, তাই নিজেকে তার শক্তিশালী লাগে। তাই শাড়ির দরদাম করতে চাওয়া মহিলাদের প্রতি অবলীলায় সে বলে উঠতে পারে, “না পোষালে অন্য দোকানে যান।” নিজের মর্জিমতো মিলিত হতে পারে তার স্ত্রীর সঙ্গে, নিজের অভ্যন্তরে ভয়ের প্রকোপে সে অন্যের চোখে ভীতিসঞ্চার করে। তাকে দেখে দোকানে আসা মহিলারা আঁচল ঠিক করে নেয়, শিশুরা চুপ হয়ে যায়। অন্য বহু কিছুর মতো খুব ছোটবেলায় পিসিদের সঙ্গে টকিজ়ে যাওয়ার স্মৃতি সে ভুলে গেছে। তার মনে নেই পর্দার ভিতর থেকে চেয়ে থাকা মহানায়কের সঙ্গে তার দৃষ্টি একবার মিলিত হয়েছিল অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে, আর মহানায়ক অমলিন হেসেছিলেন।
আর কাউকে কখনও সেভাবে হাসতে সে দেখবে না কোনও দিন। অমলিন সব কিছু উত্তম বলের অনাত্মীয়। উত্তমকুমার বল এমন মানুষ, যার কাছ থেকে সহজে চাঁদা আদায় করা যায় না। যে দশটা কথার জবাব দেয় একটা কথায়। ত্রিশ বছর হয়ে গেল সে এমন কোনও কারণে হাসেনি, যাতে অর্থলাভ নেই। শাস্তিস্বরূপ ছোটপিসির আত্মা শান্তি পায় না, উত্তম বলের বাড়ির বারান্দার আলোয় সে বাসা বাঁধে। সন্ধ্যায় সেই আলো জ্বালাতে চাইলে কখনও একবারে জ্বলে না। আর রাতে এক-এক দিন নিজে থেকেই নিভে যায়। ভোল্টেজের ওঠানামায় নেচে চলে অনেকটা সময় ধরে আর ভয় দেখায় উত্তম বলের কিশোরী কন্যাকে, উত্তম যার নাম রেখেছে— ঝুমা। এতে কোনও উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই। নেই মশকরা। নেই কোনও গোপন অভিসন্ধি।
জ্ঞানত মহানায়কের ছায়াছবি এড়িয়ে এড়িয়ে চলেছে উত্তম বল। কারণ পর্দায় লোকটা এলেই নিজেকে তার তুচ্ছ বলে মনে হয়। মনে হয়, তার বয়স এখনও পনেরো, ওজন অন্তত বিশ কিলো কম, উচ্চতা পাঁচ-দুই আর ভয় হয় লোকটা তাকে মুগ্ধ করে ফেলবে তার জাদুটোনা দিয়ে। পনেরো বছর বয়স থেকে মুগ্ধতাকে সে দুর্বলতা বলে মনে করে এসেছে। সে মনে করেছে— পুরুষমানুষের জীবনে মুগ্ধতার কোনও জায়গা নেই, মুগ্ধতা নিতান্তই মেয়েলি এক আবেগ। মহানায়কের চোখে চোখ রাখতে সে ভয় পেয়েছে। অন্যমনস্কতায় সে গুনগুন করে গেয়ে উঠতে পারেনি ছায়াছবির গান। এমন অভিশপ্ত জীবনে উত্তম বল ডেকে এনেছে উচ্চ রক্তচাপ, মধুমেহ ইত্যাদি নানাবিধ অসুখ, যার সঙ্গে আপাতভাবে জীবনের সামান্য মুগ্ধতা, রাতের তারা অথবা মহানায়কের হাসির কোনও যোগাযোগ নেই। অথবা জটিল কার্যকারণসূত্রে এ-সব পরস্পরের সঙ্গে ওতপ্রোত জড়িত। অবস্থা সে এমনই ঘোরতর করে রেখেছে যে, তাকে কেউ ‘উত্তম’ বলে ডেকে উঠলে ঘুণাক্ষরেও পর্দার সেই অমলিন হাসি, ছোটপিসির আত্মা বাদে আর কারও মনে পড়ে না। সারা রাত বারান্দায় জ্বলে থাকা আলো সকালে নেবালে মাটিতে খানকতক আলোভুক পতঙ্গের মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া যায়।
উত্তমের চশমার কাচ সর্বদা অপরিষ্কার থাকে। উত্তমের ভ্রুতে বিরক্তি লেগেই থাকে আবছা। এই দুইয়ের মধ্যে সে সংযোগ স্থাপন করার ফুরসত পায় না। পৃথিবীতে দ্রুততম যে কাজটি সে করতে পারে, তা হল দাঁতে দাঁত চেপে শাড়ি ভাঁজ করা। এই কাজটি দোকানের চৌহদ্দির বাইরে সে কক্ষনও করে না। সে বিশ্বাস করে, ওতে তার গুরুত্ব হ্রাস পাবে। নায়কোচিত নাম নিয়ে উত্তম ভাঁজ করা শাড়ি কখনও দোকানের তাকে ফিরিয়ে রাখে, কখনও পলিথিন ব্যাগে ভরে টাকার অপেক্ষা করে। “একবার বিক্রীত শাড়ি ফেরত লওয়া হয় না”— মা ভবানী বস্ত্রালয়ের রসিদে এমন হুমকি দেওয়া হয়। মনে হয় যেন, পনেরো বছর বয়সের পর উত্তম সরাসরি পা রেখেছে পঞ্চান্নতে। ভুল করা সে কমিয়ে দিয়েছে অনেক। বলতে গেলে তার জীবনে জ্ঞানত কোনও ভুল নেই। অজ্ঞানতও সে ঠিক কাজই করে থাকে। অথবা সে যা করে থাকে, তা-ই ঠিক— এমনটাই তার বদ্ধ ধারণা। পনেরো বছর বয়সের পর থেকে একমাত্র নিজের চেয়ে অধিক ক্ষমতাবান মানুষের সামনে সে নত হয়। পনেরো বছর বয়সের পর থেকে উত্তম বল এক সমান্তরাল ছবির নায়ক। এমন ছায়াছবিতে সে অভিনয় করে চলেছে, যা কখনও কোনও প্রেক্ষাগৃহে দেখানো হবে না। যদি হয়, অধিকাংশ দর্শক বিরতিতে আসনে ছেড়ে চলে যাবে। বিরক্তি তুমুল হলে, টিকিটের মূল্য ফেরত চাইবে টিকিট বিক্রেতার কাছ থেকে। অথবা ছায়াছবি না দেখে প্রেক্ষাগৃহের অন্ধকার এবং ছায়াছবির আবহসঙ্গীতের সদ্ব্যবহার করে ঘনিষ্ঠ হবে সঙ্গীর। উত্তম বলের ধারণা— মহানায়ক কোনও দিন সমান্তরাল কোনও ছায়াছবিতে অভিনয় করেননি। এই বিশ্বাসটুকু তার একমাত্র অর্জন। এ ছাড়া উত্তমের সংগ্রহে আছে আকাশি, ঘিয়ে এবং সাদা রঙের তিনখানা হাফশার্ট। কালো, ঘন নীল দু’খানা প্যান্ট। একটা শক্ত চামড়ার চটি। আর চুল আঁচড়ানোর জন্য হলুদ পকেট-চিরুনি। উত্তম তাই দিয়ে তার কাঁচাপাকা চুল এদিক থেকে ওদিক আর ওদিক থেকে এদিক করে। শাড়িতে ভুল থাকলে চেপে যায়। বারান্দার আলো খারাপ হলে বদলাতে সময় নেয়। ছোটপিসিকে তার এখন আর মনেও পড়ে না। এখন সে থুতু দিয়ে নোট গোনায় পারদর্শী।
তবু সেই ভয় উত্তমের পিছু ছাড়ে না। বাড়িতে, দোকানে, পাইকারি বাজারে, শাড়ির কারখানায়, ছায়ার মতো লেপ্টে থাকে তামাটে চামড়ার সঙ্গে। মেয়ের অঙ্কবইতে, টিউশনির মাইনেয়, বিদ্যুৎ বিল আর স্ত্রীর শুকনো কাশিতে ওত পেতে থাকে ভয়টা। উত্তমের বাড়ি ফেরার অপেক্ষা করে। উত্তমকে বাধ্য করে দিনে দু’বার দোকানে ধূপকাঠি জ্বালাতে। উত্তমকে বাধ্য করে ভিখারিকে দু’টাকা দিতে অথবা স্ত্রীর সঙ্গে কালেভদ্রে নরম স্বরে কথা বলতে। ভয়টাকে উত্তম যতটা না ভয় পায়, তার চেয়ে অনেক বেশি ঘৃণা করে। কলঘরে হাত সে তিনবার করে ধোয়। ভয়টা তাকে মনে করায় তার পনেরো বছর বয়সের কথা, যখন তার গোঁফের রেখা স্পষ্ট হচ্ছিল আর তার নজর পড়ছিল বন্ধুর বোনদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গে। যেন গতকালও তার ভাল লেগেছিল ফুলের গন্ধ, তার ভাল লাগছিল গত সন্ধ্যার আকাশ আর তার ভাল লাগছিল পর্দার মহানায়কের হাসি। জীবন সম্পর্কে তার ভিতর জন্মাচ্ছিল মুগ্ধতা। তার পরই কী উপায়ে যেন সে কুৎসিত হতে শুরু করল, আর রাতারাতি নষ্ট হয়ে গেল। সে হল ভীতিপ্রদ, সে কেজো হয়ে উঠল। ফ্যানের মতো, বারান্দার আলোর মতো। হয়ে উঠল আকাশি অথবা ঘিয়ে অথবা সাদা। ভয়টা তাকে পুরুষ করে তুলল, ভয়টাই জন্ম দিল তার সন্তানের, ভয় বাধ্য করল শাড়ির ব্যবসা দাঁড় করাতে, ক্রেতাদের ত্রুটিপূর্ণ শাড়ি গছাতে আর রাতে বারান্দার আলো জ্বালাতে। ভয়টা তাকে পরিণত করল উত্তমকুমার বল- এ।
তার আর নাম বদলানো হল না।