E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

অশ্রুকুমার

কনকনে ঠান্ডা পড়েছে আজ, সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হু-হু হাওয়া। মাঠের উত্তর দিকটা একেবারে ফাঁকা, সেই রেললাইন পর্যন্ত।

বিশ্বজিৎ অধিকারী

শেষ আপডেট: ২৩ অগস্ট ২০২৬ ০৭:১১
ছবি: রৌদ্র মিত্র।

ছবি: রৌদ্র মিত্র।

পৌষ-সংক্রান্তির পরের দিন। সন্ধেবেলা। মাঠে বসে সাঁওতালি যাত্রার একটা গান শোনাচ্ছিল খোঁড়াদা, অভিনয় সহকারে। পরব উপলক্ষে গলা পর্যন্ত মদ গিলে তার পা টলছে।

আমরা কেউ সাঁওতালি জানি না। তাই দু’-এক কলি গাওয়ার পর থেমে গানের ভাবটা আমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছিল খোঁড়াদা। বিরহের গান, গাইছে যাত্রাপালার নায়ক। ছোটবেলার প্রেম, উপযুক্ত বয়সে পৌঁছে যখন সে-প্রেম পরিণতি পাওয়ার কথা, তখনই শহর থেকে আসা একটি ছেলের টাকাপয়সার মোহে পড়ে দয়িতা সরে গিয়েছে নায়কের জীবন থেকে। সরে গিয়েছে আচমকা, কোনও রকম পূর্বাভাস ছাড়া। নায়কের জীবন সেই আঘাতে তছনছ হয়ে যেতে বসেছে। ঝকঝকে দায়িত্ববান যুবকটির পাগল-পাগল অবস্থা। সে এখন সারা দিনই নেশায় ডুবে থাকে। বনবাদাড়ে মাঠে-ঘাটে একা একা ঘুরে বেড়ায়, প্রলাপ বকে, আর গান গায়।

কনকনে ঠান্ডা পড়েছে আজ, সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হু-হু হাওয়া। মাঠের উত্তর দিকটা একেবারে ফাঁকা, সেই রেললাইন পর্যন্ত। দক্ষিণ দিকের গোলপোস্টের পিছনে ক্লাবঘর, ক্লাবঘরের ওদিক দিয়ে মোরাম বিছানো রাস্তা সোজা গিয়ে ঢুকে পড়েছে গ্রামের ভিতর। আমরা বসে আছি মাঠের উত্তর দিকে, খড়ের আগুন জ্বালিয়ে। এখান থেকে সরু একটা রাস্তা চলে গেছে ফাঁকা ধানমাঠের দিকে। আমরা বলতে আমি, উল্লাস, পরান, বিক্রম, ধিরু আর বিষ্টু। ধিরু আর বিষ্টু থাকে গ্রামে, বাকি চার জন বাইরে থাকি। যে-যার সুযোগ মতো গ্রামে আসি। আমাদের বন্ধুত্ব সেই ন্যাংটো-বেলা থেকে, এখনও সম্পর্কে মরচে পড়েনি। সবাই একসঙ্গে মিলিত হলে হইহই করি, আড্ডা হয়, তাস খেলা হয়। আমাদের বন্ধুবৃত্তে আরও ক’জন আছে, তারা কেউ বাইরে, কেউ বা গ্রামে থেকেও কাজের জন্য আসতে পারেনি আজ। শীতকালে মাঠের ধারে বসে আগুন জ্বালিয়ে আড্ডা দেওয়ার নেশা আমাদের ছোটবেলা থেকেই।

আমরা ছাড়া এখন এদিকে আর কেউ নেই। ভূতুড়ে চেহারা নিয়ে মাঠের চার পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে ইউক্যালিপটাস আর আকাশমণির সারি। সাড়ে সাতটা নাগাদ শুনতে পেলাম জড়ানো গলায় গান গাইতে গাইতে কেউ আসছে এদিকে। আসছে ধানমাঠের দিক থেকে।

ধিরু বলল, “খোঁড়া সরেন।”

এই কনকনে সন্ধেবেলা খোঁড়া সরেন এদিকে কেন? সাঁওতালপাড়া তো গ্রামের ওপ্রান্তে!

ধিরু বলল, “খোঁড়াদার কি আর মাথার ঠিক আছে। সারা দিন এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ায়, কাজেকম্মে মতি নাই। আর রাতে তো ক্লাবঘরের বারান্দাতেই ঘুমোয়।”

আমি গ্রামে আসি কয়েক মাস ছাড়া-ছাড়া। আজ আড্ডায় বসেছি প্রায় সাত-আট মাস বাদে। গ্রামের অনেক কথাই আমার অজানা।

গান গাইতে গাইতে এসে পড়েছে খোঁড়া সরেন, বসল আগুনের এক পাশে। খোঁড়াদার গলায় সুর আছে, আমি সে-কথা প্রায়ই বলি তাকে। তাই খোঁড়াদাও আমাকে বেশ পছন্দ করে, ডাকে বিশুভাই বলে। আজও সে-কথা শুরু করল আমারই সঙ্গে। বলল, “কেমন আছু রে ভাই?”

কিছুক্ষণ পর কথা থামিয়ে শুরু হয়ে গেল তার গান।

খোঁড়া সরেনের বয়স পঞ্চাশ-বাহান্ন। এককালে তার চেহারা ছিল দেখার মতো, সারা শরীর জুড়ে অরণ্যদেবের মতো থাক-থাক পেশি। ভারী ভারী ধান-চালের বস্তা বয়ে নিয়ে যেত অনায়াসে। আগে সে দত্তদের কাঠগোলায় কাজ করত। বড়-বড় গাছের গুঁড়ি তার কুরেটের ঘায়ে ফালা-ফালা হয়ে যেত চোখের নিমেষে। কাজ করার সময় তার হাত-পা-বুকের পেশির সঞ্চালনও দেখার মতো ছিল। বিবেকানন্দ ব্যায়ামাগারের মলয়দা একবার বলেছিল, “মন দিয়ে যদি ট্রেনিং করিস খোঁড়া, বডি বিল্ডিংয়ে তোর চ্যাম্পিয়ন হওয়া বাঁধা।”

খোঁড়া হেসে জবাব দিয়েছিল, “দু’বেলা খাটলে তবে দুটো খাতি পাই। আমার অত সময় কুথা?”

ইদানীং অবশ্য অযত্নে সেই শরীর কিছুটা দুর্বল।

খোঁড়া সরেনের সম্পর্কে সবচেয়ে জরুরি তথ্য হল, বিয়ের এক বছরের মধ্যে তার বৌ তাকে ছেড়ে পালিয়ে যায়। এবং এই বিষয়ে রগড় করা যায় বলেই খোঁড়াকে আড্ডায় চায় সবাই। পুরুষমানুষের পক্ষে বৌ পালিয়ে যাওয়া খুব গৌরবের কথা নয়। এক রকম নিজেই পছন্দ করে বিয়ে করেছিল সে। এক দাদার বিয়েতে একটি মেয়েকে চোখে লেগেছিল তার। যেমন হয় বিয়ের জমায়েতে, উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েদের মধ্যে চোখাচুখি, কটাক্ষপাত, সমবয়সিদের মারফত ভাব বিনিময়, সলজ্জ দু’-এক টুকরো কথাবার্তা। তার পর থেকে দাদার শ্বশুরবাড়ির গ্রামে ঘন-ঘন যাতায়াত শুরু হল খোঁড়ার। ফুলমণিকে সঙ্গে নিয়ে মেলা-ঘাটে যাওয়া হল, ফুলুরি-পাঁপড়ভাজা খাওয়া হল।

তার নতুন বৌদি অবশ্য তাকে বারবার সাবধান করেছিল। বলেছিল, “ফুলমণিকে আমি খুব ভাল করে চিনি ভাই, উ কিন্তুক খুব সুবিধার মেয়া লয়। আমি তুমাকে ভালো মেয়া দেখে দুব। ক’টা দিন সবুর করো তুমি।” বৌদির কথায় কান দেয়নি খোঁড়া, বছর ঘোরার আগেই ফুলমণিকে বিয়ে করে ঘরে এনে তুলেছিল।

বিয়ের পর কয়েকটা মাস চোখের নিমেষে পেরিয়ে গিয়েছিল। কাজে যাতায়াতের পথে জং-ধরা সাইকেলটা প্যাডেল করতে করতে খোঁড়া ভাবত, জীবনে এত সুখ এত ভালবাসা একজন মানুষ পেতে পারে! কিন্তু তাল কেটে গেল কিছু দিনের মধ্যেই। গোলায় কাঠ কাটতে গিয়ে কুরেটের কোপ পড়ে গেল তার পায়ে। গভীর ক্ষত, ডাক্তার সেলাই করে, ব্যান্ডেজ বেঁধে, ওষুধ-ইঞ্জেকশন দিয়ে বলল, সারতে সময় লাগবে। অন্তত তিন মাস। ঘা ঠিকমতো না সারলে শহরের বড় ডাক্তারের কাছেও যেতে হতে পারে। খোঁড়া দিন-আনা-দিন-খাওয়া মানুষ। তিন মাস ঘরে বসে থাকলে টানাটানি তো হবেই। কাঠগোলার মালিক জহর দত্ত অবশ্য কিছু নগদ টাকা পাঠিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু সে-টাকা এক মাসের মধ্যেই শেষ। আর এই বিপদের দিনেই ফুলমণি নিজমূর্তি ধারণ করল। প্রথম কিছু দিন মরদের সেবাযত্ন করেছিল ঠিকই, কিন্তু তার ভিতরের দয়ামায়াহীন লোভী রূপটাও বেরিয়ে আসছিল ধীরে ধীরে। সে কথা শোনাতে শুরু করল খোঁড়াকে। প্রায় প্রতি কথাতেই বলত, “তোমার সঙ্গে বিয়ে হয়ে আমার জীবনটা শেষ হয়ে গেল।”

তার পর এক ভোররাতে পাশের গ্রামের গদাই মান্ডির সঙ্গে পালিয়েই গেল ফুলমণি।

গদাই ফুলমণিকে নিয়ে গা-ঢাকা দিয়ে থেকেছিল প্রায় দু’মাস। তার পর গ্রামে ফিরলে খোঁড়া গিয়েছিল গদাইয়ের বাড়ি। তত দিনে তার পায়ের ক্ষত শুকিয়ে এসেছে। সে বোকার মতো ভেবেছিল ফুলমণি তাকে এখনও ভালবাসে, সাময়িক আবেগেই হয়তো চলে গিয়েছিল গদাইয়ের সঙ্গে। খোঁড়া সামনে গিয়ে দাঁড়ালে ফুলমণি কিছুতেই তাকে ফেরাতে পারবে না।

গদাই খোঁড়াকে বাড়িতে ঢুকতে দেয়নি, রাস্তা থেকেই তাড়িয়ে দিয়েছিল। মুখ-খিস্তি করে বলেছিল, “আর যদি কোনও দিন আমার ঘরের ত্রিসীমানায় দেখি তো তোকে আমি জেল খাটাব।”

খোঁড়া ভয় পেয়েছিল, কেননা গদাইয়ের এক মামা নাকি লোকাল থানার পুলিশ।

বিফলমনোরথ হয়ে ফিরে এলেও খোঁড়ার মনের কোণে আশা ছিল যে, ফুলমণি ঠিক এক দিন নিজের ভুল বুঝতে পেরে তার কাছে ফিরে আসবে। গদাই রগচটা, অহঙ্কারী, সে খোঁড়ার মতো ভালবাসতে পারবে না ফুলমণিকে। আর ভালবাসার অভাবেই ফুলমণি এক দিন ফিরে আসবে। এখনও সেই আশাতেই বুক বেঁধে রয়েছে সে। তার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বললেই তা টের পাওয়া যায়।

পরান আমাদের দিকে চোখ টিপে খোঁড়াদার উদ্দেশে বলল, “তুমি এবার একটা বিয়ে করো খোঁড়াদা। কত দিন আর বৌদির পথ চেয়ে অপেক্ষা করবে?”

খোঁড়াদা মাথা নেড়ে জবাব দেয়, “উঁহু, আসবে, আসতেই হবে, আজ হোক কাল হোক। কাগজ-পেনে লিখে রাখ তোরা।” কথা জড়িয়ে যায় খোঁড়া সরেনের। তার পরের আলাপচারিতা চেনা ছকেই এগোয়।

উল্লাস বলে, “কী এমন বয়স তোমার, এখনও তুমি রীতিমতো জোয়ান। তুমি বিয়ে করতে চাইলে কি মেয়ের অভাব?”

খোঁড়া বলে, “মেয়ার তো অভাব নাই, মেয়ার অভাব হবে কেন?”

“তাই তো বলছি। তুমি শুধু মুখ ফুটে একবার ‘হ্যাঁ’ বলো। আমরা মেয়ে খুঁজে এনে দিচ্ছি।”

নেশার ঘোরে একটুক্ষণ ঝিম মেরে থাকে খোঁড়া। তার পর হঠাৎ সম্বিৎ ফিরে পেয়ে বলে, “কী কথা তোরা বললু ভাই! ফুলমণি বাঁচে থাকতে আবার একটা বিয়া করব?”

বিষ্টু বলে, “তোমার মনের অবস্থা আমরা বুঝি। কিন্তু একজন মেয়ে-সঙ্গী না থাকলে কি পুরুষমানুষের চলে? আচ্ছা, মনের কথা বাদ দাও। তুমি বৌদিকে খুব ভালবাসো, আমরা জানি। অন্য কাউকে তাই মন থেকে মেনে নিতে পারবে না। কিন্তু শরীর বলেও তো একটা জিনিস আছে!”

আমি বলি, “যা-ই বলো খোঁড়াদা, শরীরের দাবি না মানলে শরীর খারাপ হবেই। মাথাও ঠিক থাকবে না।”

বিষ্টু গলা নামিয়ে বলে, “মাথা কি আর ঠিক আছে, মাথাটা তো গেছেই!”

খোঁড়াদা ঝিমোয়, দম নেয়। তার পর এক সময় বিড়বিড় করে বলে, “মেয়া খুঁজলে কি মেয়া পাবনি রে? মেয়ার অভাব নাই।” তার পর একটু বিরতি নিয়ে সে যে গল্পটি শুরু করে, তা আমাদের বেশ কয়েকবার শোনা। গ্রামের অনেকেই সে-গল্প শুনেছে।

“আমি সে-বার রায়পুরের লালু গুছাইতের ঘরে কাজ করতে গেছি। লালুদা তখন পঞ্চাত পোধান। তিনটা ঝাঁকড়া তেঁতুলগাছের ডালপালা, আজও কাটি কালও কাটি, শেষ করতে আর পারিনি। পখুরধারে জ্বালুন কাঠের পাহাড়। লালুদা সান করে খায়েদায়ে কাজে চলে যায়। তার পর আরম্ভ হয় লালুদার বৌয়ের পাঁইতারা। বৌদি ঘনঘন পখুরঘাটকে আসে আর যায়। আমাকে খাবার দিতে আসে গল্প আরম্ভ করে, গল্পের কুনো মাথামুন্ডু নাই! আমি যখন পখুরপাড়ের গাছতলায় বসে একটুকু বিশ্রাম করি, বৌদি ঘাটে লাইতে আসে, খালি গা হয়ে লায়। ভিজা কাপড়ে ঘুরঘুর করে। আমি মনে মনে ভাবি, এখেনে বেশিদিন কাজ করা চলবেনি। এক দিন খাবার দিতে আসে বৌদি বলল, ‘খোঁড়া, তোমার বৌ নাকি অন্য লোকের সঙ্গে পালি গেছে। কী করে একলা থাকো গো তুমি?’ ঠোঁট-টিপা হাসি হাসে বউদি গা দুলি চলে গেল। কী বলব ভাই, ওরকম ঢলানি মেয়ার পাল্লায় পড়লে তোদের মতো ভদ্র ছ্যানাদেরও মাথা খারাপ হবে। আমি আর তার পর দিন থিকে লালুদার ঘরে কাজে যাইনি।”

এমন দু’-একটা গল্প শুনে শুনে আমাদের মুখস্থ। মাঘ মাসের সন্ধ্যায় পুরনো গল্পই আমরা আবার শুনি। শীত একটু-একটু কমে আসে, আমরা কিছুটা অন্যমনস্ক হয়ে পড়ি। খোঁড়াদা কিছুক্ষণ নিজে-নিজেই বিড়বিড় করতে থাকে। তার পর একসময় নেশায় বুজে আসা চোখ জোর করে খুলে গলা ঝেড়ে বলে, “আর এক দিনের গল্প বলি শুন...”

আমরা নড়েচড়ে বসি।

“আমি তখন আবার দত্তর গলায় কাজ করি। আর রাত্রিবেলা মধুগেড়ার উদা মাইতির শ্যালোঘর পাহারা দেই। পাহারা মানে কিছু না, শ্যালোঘরে কাঁথা পাতে ঘুমাই। তখন চারদিকে খুব শ্যালোর পাম্‌ চুরি হতিছে। শ্যালঘর আলগা ফেলি রাখবার জো নাই। একবার দত্ত আমাকে লিয়ে গেল তার শালি ঘর, দশ দিনের কাজে। আমি উদাদাকে বলে গেলম, ‘উদাদা দশটা দিন তুমি শ্যালোঘরটা সামলাও। বাইরে একটা কাজে যাব।’ আমি আর কুডাম মিলে দশ দিনের কাজ শেষ করে দিলম সাত দিনে। সাত দিনের দিন ঘর ঘুরতে রাত্রি হয়ে গেল। ভাত খায়ে ভাবলম যাই, উদাদার শ্যালোঘরেই ঘুমাই। শ্যালোঘরে যায়ে দেখি উদাদা ঘুমাইতিছে। তাকে ঠেলে তুলে বললম, ‘উদাদা তুমি ঘরকে যাও, আমি আছি।’ উদাদা বলল, ‘তুই চলে আসছু খোঁড়া? ভালই হল, ক’দিন ঠিকমতো ঘুম হয়নি আমার। তুই থাক, আমি তবে যাই। জমির জল দেখে ঘরকে যাব।’ আমিও ঘুমি পড়ছি শুইবার সঙ্গে সঙ্গে। হঠাৎ ছাতির উপর কী যেন একটা চাপ, নিঃশ্বাস লিতে কষ্ট হতিছে। ঘুম ভাঙ্গে গেল। ঘরের ভিতরে একটা কালিপড়া হারকিন, আবছা আলো। দেখি কাঁথার ভিতর ঢুকে আমার ছাতির উপর শুয়ে আছে উদাদার বউ। সাতদিন ভাতারকে কাছে নাই পায়ে মধ্যিরাতে চলে আসছে শ্যালোঘরকে। আমি ঝটাক করে পাশ ঘুরে উঠে বসলম। বললম, ‘বৌদি, আমি খঁড়া! দাদা বিল ঘুরে ঘরকে যাবে, তুমি ঘর যাও।’ তখন বৌদি আস্তে আস্তে উঠেচলে গেল।”

এই গল্প আমি আগে শুনিনি, বন্ধুরা কেউ শুনেছে কি না জানি না। আমরা পরস্পর চোখের ইশারায় গল্পের তারিফ করি। রগড় করার জন্য বিষ্টু বলে ওঠে, “এ তোমার মনগড়া গল্প, খোঁড়াদা।”

জোরে জোরে দু’দিকে মাথা নাড়ে খোঁড়াদা, “না রে ভাই, আমি সত্যি বলতিছি। মিথ্যা কথা বলে আমার কী লাভ। আরও শুনবি? উদাদার বৌ কিন্তু কাঁথার ভিতর ঢুকেই আমাকে চিনতে পারে গেছল। চিনবেনি কেন, উদাদা রগা-পটকা লোক। তা ছাড়া, সেদিন আমার একটুকু নেশাও করা ছিল। আমি কিন্তু কোনও অধর্ম কাজ করিনি ভাই।”

গল্প শেষ করে উঠে দাঁড়িয়ে খোঁড়াদা টলতে টলতে চলে যায় মাঠের ওদিকে ক্লাবঘরের দিকে।

চানাচুরের গুঁড়োর মতো গল্পের রেশ লেগে থাকে আমাদের ঠোঁটে। আমরা ঠোঁটের উপরে জিভ বোলাই। কে কী ভাবছে জানি না, তবে শরীরের ভিতর নেশা ধরানো একটা ঝিমঝিম আবেশ টের পাচ্ছি আমি। এমন আবেশ বয়ে নিয়ে রাত্তিরে বাড়ি ফিরতে মন্দ লাগে না।

খড়ের আগুন নিবে গেছে। কিন্তু আমাদের খুব একটা শীত করছে না। আড্ডা ভেঙে সবাই উঠে দাঁড়াই। কাল আমি সপরিবার শহরে ফিরে যাব। আবার কবে দেখা হবে তাই নিয়ে কিছুক্ষণ কথাবার্তা হয়। তার পর এলোমেলো কথা বলতে বলতে আমরা মাঠের মাঝ বরাবর শর্টকাট করে এগোই।

যত এগোই, খোঁড়া সরেনের গান তত স্পষ্ট হয়। একা-একা ক্লাবঘরের বারান্দায় শুয়ে সে গান গাইছে। ক্লাবঘরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় যেন একটা টিলার মতো তার গানের ঘাসমাটি পার হয়ে আসি আমরা। আসলে সে তো গান গাইছে না, সে কাঁদছে। কান্নাকে ঢেকে রেখেছে তার গান। মৃদু বিলাপের মতো।

তার কুঁড়েঘরটা দিন-দিন আরও ভেঙে ভেঙে পড়ছে। সে মেরামত করে না। রোজগার এখনও তার মন্দ নয়, কারণ সে রীতিমতো খাটতে পারে। নিজের একটুও যত্ন নেয় না, খাওয়াদাওয়ারও ঠিক নেই। সারা দিন শুধু নেশায় ডুবে থাকে। আবার একটা বিয়ে করে ঘরে মন বসালে তার জীবনটা নতুন হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু সে সে-কথা ভাবতেও পারে না। হারিয়ে যাওয়া কোন এক ফুলমণির জন্য অপেক্ষা করতে করতে ধীরে ধীরে নিজেকে শেষ করে দিতে থাকে।

তার সুরেলা কান্না, নাকি কান্নাভেজা সুর, আমাদের সবাইকে জুড়িয়ে শীতল করে দেয়। আমরা চুপচাপ অন্ধকার পথ ধরে হাঁটতে থাকি গ্রামের দিকে।


এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Bengali Short Story Short story

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy