E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

তুমি বাদ

বৃষ্টি দু’-চার ফোঁটা দিয়ে বিদায় হয়েছে, যেতে যেতে ঠান্ডা বাতাস অবশ্যি ছেড়ে গেছে সনাতনদের জন্য। ও বটের গুঁড়িতে মাথা রেখে ঝিমোয়।

চিত্রালী ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৮:৩২
ছবি: প্রসেনজিৎ নাথ।

ছবি: প্রসেনজিৎ নাথ।

সনাতন খোঁড়াতে খোঁড়াতে এসে থামে মাঠের উপর দাঁড়িয়ে থাকা বটগাছটার নীচে। পিঠে একটা বড় বোঁচকা, তাতে দু’-চারটে জামাকাপড়, একটা ডেকচি, হাতা, থালা— এই সব টুকিটাকি নিয়ে ওজন মন্দ নয়। সনাতনের বুড়ো কাঁধের পক্ষে যথেষ্ট। তার উপর হাতে একটা প্লাস্টিকের চ্যাপ্টা জলের বোতল। এইটুকু নিয়ে আসতেই দম খতম। হাঁপায়, দম নেয়, জোরে শ্বাস টানে, শেষে না পেরে বসে পড়ে গাছের নীচে। তেষ্টায় টাকরা পর্যন্ত শুকিয়ে কাঠ, জিব দিয়ে মুখের ভিতরটা ভেজানোর চেষ্টা করতে করতে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে, “জল ঝরা বাপ।”

অমনি ঝিরঝির করে বৃষ্টি শুরু হয়। সনাতন খুশিতে দু’হাত এক করে আধ আঁজলা জল ধরে মুখে দিয়ে আকাশকে পেন্নাম জানায়, বলে, “জয় হোক বাবা। তোমরা ছাড়া আর কে আছে গো আমাদের?”

চ্যাপ্টা বোতলের ছিপি খুলে আকাশের নীচে ধরে। ফোঁটা ফোঁটা জল পড়তে পড়তে চ্যাপ্টা বোতল পেটমোটা হয়ে ওঠে। সনাতন প্রাণ ভরে জল খেয়ে তৃপ্ত হয়ে তাকায় বটের দিকে। ভাবে, ‘কেমন ঝাঁকড়া হয়ে আছে দেখো!’ হাত বুলোয় কাণ্ডের গায়ে। আবার মনে হয়, ‘আহা! ঝাঁকড়া হয়ে আছে বলেই তো ছায়া পাচ্ছি। এই পকিতিটুকুন আছে দেখে আমার মতো হাড়হাভাতেগুনো তবু বেঁচে আছে, নইলে কবে মরে ভূত হয়ে যেথোম’— সনাতন নিজেকেই শোনায় নিজের গল্প, ‘যা চলছে চারদিকে! রোজদিন লোতুন আইন, লোতুন ফরম, লোতুন রেশন কাড। আর তা জোগাড় করতি নম্বা এক নাইন। এপার-ওপার দেখা যাইনি। ওই নাইনে দাঁড়ালে কবে শেষ হবে, কবে তোমার ডাক আসবে, কেউ জানেনি। অত নাইনে দাঁড়ালি বাদাম বেচব কখন? দু’-চারটে টাকা না রোজগার করলি খাব কি? আংরা? হুঁ, জবাব দেবার কেউ নেই।’

বৃষ্টি দু’-চার ফোঁটা দিয়ে বিদায় হয়েছে, যেতে যেতে ঠান্ডা বাতাস অবশ্যি ছেড়ে গেছে সনাতনদের জন্য। ও বটের গুঁড়িতে মাথা রেখে ঝিমোয়। ঝিমোতে তার খুব ভাল লাগে আজকাল, মনে হয় যেন মায়ের কোলে দোল খাচ্ছে। কত কথা যে তখন মনে আসে এলোমেলো! ‘সেগুনো ওর জেবনে ঘটেছিল কি না কে জানে, এখন তো স্বপন লাগে। ওদের নদীর পাড়ে বাড়ি ছিল, বাড়িতে মা, বাবা, ভাই, বোন, দাদু, ঠাকমা। ঠাকমা আমের কুশি ছেঁচে নঙ্কা দে ডলে দিত। কী সোয়াদ তার! এখনও জিব টাকরার ঠেকিয়ে আওয়াজ করলি সে সোয়াদ পার।’ ঝিমোতে ঝিমোতে সেই দিনগুলোয় ফিরে যায় ও।

“ও খুড়ো, কী করো এখ্‌নে বসি?”

সনাতন একটা চোখ খুলে তাকায়, দেখে হাতকাটা বাপি। অমনি চোখ বন্ধ করে ফেলে সে। তবু নিস্তার নেই। সে এদিকেই আসছে, বুঝতে পারে সনাতন। বলে, “ও খুড়ো, কাল গেচিলে?”

“হুঁ,” সনাতন সংক্ষেপে সারে।

“ফরম জমা করেচিলে আগে?”

“হুম।”

“কী বললে উনারা?”

“বললে পরে জানাবে।”

“ও,” বাপি যেন দমে গেল। একটু ঝগড়া ঝামেলা না হলে তার আবার ভাল লাগে না। তবু কিছু একটা তো বলা প্রয়োজন! তাই গলা সপ্তমে চড়িয়ে বলল, “তেমন হলে আমায় জানিয়ো, বাপি থাকতে গেরামের কাউকে ছুঁয়ে দেখুক তো, লাশ ফেলে দেব।”

এখনও কত দেমাক! হাত কাটা গেছে গতবারে বোম বাঁধতে গিয়ে, তবু দেখো! ও নাকি লাশ ফেলে দেবে! যেন পাড়ার ঝামেলা। এ খোদ সরকার বাহাদুরের কাজ, তুই কী করবি? সে রাখলে রাখবে, বাদ দিলে দেবে— ‘তোর কথা শুনবে? বলগে যা না, জেলে পুরে এইসা বাটম নাগাবে যে সিধে হয়ে যাবি’ সনাতন চোখ বুজে মনে মনে গাল দেয়।

“ও খুড়ো, কথা কও না কেন? তোমার নাম আছে তাইলে?”

“যা তো, মেলা বকিসনি। একটুস ঘুমুতে দে। বড় মাতব্বর এসেচে এক্কেরে!” সনাতন খেঁকিয়ে ওঠে।

বাপি তবু কিছুক্ষণ হম্বিতম্বি করে হাঁটা লাগায়।

সনাতন এ বার চোখ খোলে, দেখে বেলা পড়ে আসছে, সুয্যি পশ্চিমে হেলে গেছে। উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে গিয়ে ফের বসে পড়ে। কোমরে যেন জোর নেই। আজ রাতটা মনে হয় এখানেই পড়ে থাকতে হবে, ভেবে ফের এলিয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে বিকেল ফুরিয়ে আসে, পাখিরা সব ফিরে এসে বসে পড়ে গাছের কোটরে। তাদের কলরবে যেন নতুন করে জেগে ওঠে চারদিক। সনাতনও যোগ দেয়, চেঁচিয়ে ওঠে কিচমিচ করে, যেন ও-ও পাখি। তবে তা কতক্ষণ? আকাশ ঘন হতেই শান্ত হয়ে যায় ওরা। সনাতন তখন একা একা কথা শুরু করে গাছের সঙ্গে, বলে, “ও বট, তোমারে ছাড়ি যাতি হবে ভাবলেই মন যেন আকুপাকু করচে। কবে থাকতি চিনি বলো তো তোমারে! সেই যে বার বাবার হাত ধরে পেথম এসেছিনু এখানে, তখন তো তোমার ছায়ায় বসেছিনু, সে কথা মনে আচে তোমার?”

‘আচে, আচে,’ গাছ ডালপালা দুলিয়ে জবাব দেয়। বলে, ‘তবে আমাকে ছাড়ি যাচ্ছ কেনে, থেকে যাও হেথা।’

‘উপায় নেই গো।”

‘কেনে?’

“ওরা আমার নাম কাটি দেচে যে। একটা কাগজ দেখিয়ে বলে দেচে, ‘তুমি বাদ।’”

‘ওরা কারা? নাম কাটি দেচে মানে?’

“ওরা মানে সরকার বাহাদুর গো। এত দিন পর কী সব য্যান গণনা হইছে, তাতে কিচু জনের নাম আছে, কিচু বাদ গেছে। আমি বাদের খাতায়। বলে, আমি নাকি এ দেশের কেউ না!” সনাতন কেঁদে ওঠে।

‘আহা, কাঁদো কেন?’ গাছ দুটো পাতা ঝরিয়ে আদর দেয় ওকে, বলে, ‘মন খারাপ কোরো নে বাপ। ওরা কে তোমারে বাদ দেবার?’

“ওরাই তো সব গো! ওরা দেশের আইন। ওরা ‘থাক’ বললে থাকতি পারে মানুষ, আর ওরা ‘চলি যা’ বললে চলি যাতি হয়, এই নাকি দস্তুর! বলো দেখি এ কেমন ধারা! এত দিন যে ছিলম, সে কিচু নয়! এই মাটি, এই মাঠ, এই তুমি আমার রক্তের মধ্যি কখন জানি ঢুকি পড়েচ। এখ্‌নে আমার বাবার ভিটে। হ্যাঁ, মানচি তেমন সরেস কিচু নয়, মাটি-বাঁশ দে ঝুপড়ি মতন... কিন্তু ছিল তো কিচু একখানা। আমরা পাঁচ জন কোনও মতে মাথা গুঁজে ছিনু তো!”

‘তা কে তোমারে চলে যেতে বলেছে শুনি?’

“ওই ওরা। মাঠের ওপারের ইসকুলে ভিড় করি উনারা সকলে বসেচে। উনারাই কাগজ দেখে দেখে গণনা করি জানতি পেরেচে— আমি বাদ। অমনি আমাদের বস্তিতে সে কী ঝামেলি আমারে নিয়ে। ওরা বলতেচে, আমি নাকি লুকয়ে লুকয়ে নদী-নালা পার হয়ি ইঁদুরের মতো সিঁদ কাটি ঢুকি পড়িচি এ দেশে! আমি নাকি আসলে দেশের শত্তুর। এ-সব শোনাও পাপ। তাই চলি যাচ্চি এ জাগা ছাড়ি।”

‘কোথায় চলেছ বলো দেখি?’

“হারা উদ্দেশ্য যাচ্ছি গো!”

‘ফের কাঁদে! হারা উদ্দেশে যাবার কি এই বয়স? এটুকু আসতেই হাপরের মতো হাঁপাচ্ছিলে একটু আগে, তবু জেদ ধরে আছ! রোসো, ঠান্ডা হও, দু’দণ্ড ভাবো। ভিটে ছেড়ে কেউ যায়?’

“হ্যাঁ যায়, আমার মতো অভাগারা যায়। ও বট, তুমি বরঞ্চ আজ আমার কথাটা শোনো মন দে। বড় দুঃখু আমার। এত দিন জানতাম কিচু নেই আমার, বাপ-মা-ঠাকমা-দাদু সব মরেচে। সামর্থ্য নেই যে বে করি সমসার বসাব, একা মানুষ, বাদাম বেচে খাই। কিন্তুক যত বার অতীতে সে-কথা বাবারে বলতি গেচি, সে বলেচে, ‘কুনোদিন দুঃখু করবি নে সনাতন, নেই-নেই করা ভাল নয়। কিচু না থাকুক তোর দেশ তো আচে তোর সঙ্গে। চিরটাকাল সেই দেশটারে ভালবেসে যাবি। প্রেত্যেকবার ভুট আসলে ভুট দিতি যাবি পোষ্কার জামা পরি। মনে রাখিস, তোর হাতে সরকার গড়ার ক্ষেম্‌তা আচে, সেটা কেউ কাড়ি নিতি পারবেনি।’ সেই কথা শুনি সেই পেত্থম বার আমার পরানের মাটিতে যেন চারা জন্মাল গো, দেশভক্তির চারা। সে কী আকুলিবিকুলি, তোমারে কী বলব! নিজেরে যেন রাজা-উজির ভাবা শুরু করি দিলম। আমার হাতে সরকার গড়ার চাবি! তবে তো অনেক ক্ষেম্‌তা আমার! কিন্তুক কাল সে ক্ষেম্‌তা ওরা এক কথায় নাকচ করি আমারে এক্কেরে ছাগল বানায়ে দিল! একখানা কাগজ দেখায়ে চেঁচায়ে বলে দিল, ‘তুমি বাদ!’ জানো, ওই এক কথায় আমার ভিটেমাটি, বাদাম বেচা সব মিথ্যে করি দেচে উনারা। এখন আমি এখানের কেউ না। আমার হাতে এখন কুনো ক্ষেম্‌তা নাই। দেখো, দেখো খালি হাত আমার! কী হবে আর এখ্‌নে থেকে? চলি যাই তার চে।”

‘কিন্তু যাবে কোথায়? এ দেশে যেখানে যাবে সেখানেই তো এই আইন! পালানোর পথ নেই আর। তার চে এখানেই বরং মুখ গুঁজে পড়ে থাকো।’

“ক্ষেম্‌তাহীন হয়ি? পাগলের মতো? বলতি পারলে তুমি এ কতা! তুমি আমার ছোটবেলার বন্ধু হয়ে এ কতা বলতি পারলে!”

‘হ্যাঁ পারলাম, কারণ আমিও তো তোমার মতোই মুখ বুজে পড়ে আছি কবে থেকে।’

“কী রকম?”

‘দেখছ না কী ভাবে গাছ কেটে শহরের পত্তন হচ্ছে আস্তে আস্তে? গত কয়েক মাসে আমার সঙ্গীদের কেটে সাফ করে বহুতল উঠে গেছে। ওদের আর্তনাদ এখনও আমার কানে বাজে। কয়েক দিন আগে রাতে কারা যেন এসে আমার আশপাশও জরিপ করে গেছে গোপনে। এ পাড়ার লোকেরা যাতে না জানতে পারে, তাই এ-সব গোপনে হচ্ছে। ওরা জানতে পারলে তো এই মাঠ আরওদের পুরনো বটের জন্য লড়ে যাবে। ঝামেলা হবে, কমিটি বসবে।’

“কী করবে তুমি তাইলে?”

‘সেই তো, বড় চিন্তায় আছি। আমি নয় বুড়ো হয়েছি, মরে যাব। লেঠা চুকবে। কিন্তু এই এত পাখির কী হবে? কে দেবে ওদের আশ্রয়?’

“আহা রে, বেচারারা বেঘোরে মরি যাবে গো, নয়তো উড়ি চলি যাবে ভিনদেশে পরিযায়ী হয়ি। ওদের তো ভগবানে ডানা দেচে। তোমার কী হবে?”

‘সহ্য করব।’

“কিন্তুক তুমি যতই বোঝাও, আমি সহ্য করবনি এ অপমান।”

‘কী করবে তা হলে?’

“ছেলেবেলায় মা গল্প করত, মরার আগে নাকি মানষেরে বৈতরণি পার হতি হয়। সে নাকি মেলা দূর। দেখি তত দূর যাতি পারি নাকি। যদি পারি তো সগ্‌গে পৌঁচে যাব, আর যদি না পারি তো পথে পড়ি মরব। চলি গো বট, রাত থাকতি থাকতিবেইরে পড়ি।”

সনাতন ট্যামটুম নিয়ে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে হোঁচট খায়। কিসে ঠেকল দেখতে গিয়ে দেখে, বটের ঝুরিতে পেঁচিয়ে গেছে পা। ছাড়াতে গিয়ে অন্ধকারে মাথা ঠুকে যায় শক্ত কাণ্ডে। “মা গো!” বলে পড়ে যায় সে। আর ওঠে না।

পরদিন হাতকাটা বাপির দল এসে নিজেদের উদ্যোগে সনাতনের নিথর দেহ কাঁধে তুলে চেঁচিয়ে ওঠে, ‘বলো হরি…’ সনাতনের নিথর দেহ ওদের কাঁধে চড়ে দুলতে দুলতে চলে যায় শ্মশানের দিকে।

বট চুপ করে দেখে শেষ পর্যন্ত। ওরা আড়াল হতে শ্বাস ছেড়ে বলে— ‘তোমারে বাদ হতে দিইনি সনাতন। এই মাটিতেই তোমারে শোয়ায়ে দিলাম।এ হল গে প্রকৃতির নিয়ম। মানুষের নিয়মএতে খাটে না।’

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Short Stories

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy