E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

অবাঞ্ছিত

আসা যাক বন্ধুদের প্রসঙ্গে। নিকটবর্তী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছেলেগুলোর কপালে মেয়ে জোটে না বলে ওরা দিনরাত মেয়েদের কলেজের বাইরে বসে থাকে।

ইন্দ্রনীল সান্যাল

শেষ আপডেট: ১২ জুলাই ২০২৬ ০৭:১৮
ছবি: প্রসেনজিৎ নাথ।

ছবি: প্রসেনজিৎ নাথ।

মেয়েদের মুখে অবাঞ্ছিত রোম থাকলে যে কী সমস্যা হয়, সেটা মৌমিতার থেকে ভাল কেউ জানে না। কৈশোর আসতেই গোটা শরীর জুড়ে নরম ও সরু রোমের প্রাদুর্ভাব দেখা দিল। শরীর পোশাক দিয়ে ঢেকে ফেলা যায়। মুখ ঢাকার কোনও উপায় নেই। সেখানে দেখা দিল সরু গোঁফের রেখা আর হালকা দাড়ি।

মেয়েকে নিয়ে বাবা পাড়ার অ্যালোপ্যাথ ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলেন। মৌমিতার দিকে এক ঝলক তাকিয়ে ডাক্তার বলেছিলেন, “এর কোনও চিকিচ্ছে নেই।”

কয়েক বছর হোমিয়োপ্যাথি আর কবিরাজি ওষুধ খেয়ে, তাবিজ-কবচ, মাদুলি-জড়িবুটির আশ্রয় নিয়েও সুরাহা হল না। স্কুল পেরিয়ে হাওড়া গার্লস কলেজে ভর্তি হল মৌমিতা। লেখাপড়া করতে ভাল না-লাগলেও চালিয়ে গেল। কারণ কলেজ যেতে ভাল লাগে, ভাল লাগে বন্ধু-বান্ধবীদের সঙ্গে আড্ডা মারতে। গার্লস কলেজের ‘বন্ধু’ প্রসঙ্গে পরে আসা যাবে। আগে বান্ধবীদের কথা বলা যাক। অনেক ভেবে মৌমিতা দেখেছে, সে শুধুমাত্র সুন্দরী মেয়েদের ল্যাংবোট হয়ে থাকতে চায়। উদ্দেশ্য, তাদের রূপ-রুটিন জানা। মনীষার রূপটানে দু’চামচ চিনি, এক চামচ লেবুর রস আর এক চামচ জল থাকে। প্রিয়া মুখের ত্বকে লাগায় দু’চামচ বেসন, এক চিমটি হলুদ আর পরিমাণ মতো কাঁচা দুধের লেই। শুকিয়ে যাওয়ার পরে রোমের বৃদ্ধির বিপরীত দিকে টান মেরে তুলতে হয়। মুখের অবাঞ্ছিত রোম দূর করার জন্যে কুহেলি ‘সন্না’ ব্যবহার করে। কুহেলি বলেছে, ওটাকে ‘টুইজ়ার’ বলতে হয়, সন্না বললে ‘চিপ’ শোনায়। কুহেলি এও বলেছে, মেয়েদের জন্যে আলাদা রেজ়ার পাওয়া যায়, তবে সেটা মুখে ব্যবহার না-করাই ভাল। এ ক্ষেত্রেও ‘শেভিং ব্লেড’ না বলে রেজ়ার বলতে হয়। প্রথমটা ছেলেদের জন্য। পার্লারে গিয়ে থ্রেডিং বা ওয়াক্সিং করার মতো টাকা নেই। অগত্যা সন্না দিয়েই মুখের অবাঞ্ছিত রোম উৎপাটন করে মৌমিতা।

আসা যাক বন্ধুদের প্রসঙ্গে। নিকটবর্তী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছেলেগুলোর কপালে মেয়ে জোটে না বলে ওরা দিনরাত মেয়েদের কলেজের বাইরে বসে থাকে। সেই সূত্রে মৌমিতার কিছু ছেলেবন্ধু জুটেছে। ছেলেদের সঙ্গে মৌমিতার মেশার কারণ একদম আলাদা। সে মেশে একটা ঠিকঠাক বর পাওয়ার জন্য। বর মানে ‘আশীর্বাদ’ নয়, স্বামী। অবশ্য ঠিকঠাক বর খুঁজে পাওয়া আর ভগবানের আশীর্বাদ পাওয়া একই রকম দুরূহ। মুশকিল হল, ছেলেরা সবাই মৌমিতাকে ‘জাস্ট ফ্রেন্ড’ হিসেবে দেখে। কারও চোখে কামনা দেখতে না-পেয়ে বাধ্য হয়ে সুব্রতকে প্রশ্ন করেছিল, “হ্যাঁ রে! আমি যে এত সেজে এসেছি! তোর কিছু মনে হচ্ছে না?”

সুব্রত বলেছিল, “আমি কি হোমো যে, দাড়িগোঁফওয়ালা এক জনকে দেখে সেক্স পাবে?”

কী অপমান! বাড়ি ফিরে খুব কেঁদেছিল মৌমিতা। ভেবেছিল, বিএ পাশ করে চাকরি জুটিয়ে নেবে। জীবনে কখনও ছেলেদের দিকে তাকাবে না।

সুব্রতর অপমানের দিনই অফিস থেকে ফিরে বাবা মৌমিতার দিকে মোটকা একটা কাগজের প্যাকেট এগিয়ে বলেছিলেন, “তোকে জিজ্ঞেস না-করেই খবরের কাগজের ‘পাত্র চাই’ কলামে বিজ্ঞাপন দিয়েছিলাম। অনেক চিঠি এসেছে। তুই আগে দেখ। আমরা পরে দেখব।”

অজস্র ফোটোর মধ্যে সম্বিেতর ছবিটিই মনে ধরে মৌমিতার।

*****

মৌমিতার কাউকে মনে ধরতেই পারে। কিন্তু তারও যে মৌমিতাকে মনে ধরবে, এর কোনও নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু সম্বিত, সবাইকে অবাক করে, মৌমিতাকে এক দেখায় পছন্দ করল। এই ঘটনায় মৌমিতা, কিছুটা হলেও, ভয় পেল। সম্বিতের মতো সুপুরুষ এক দেখায় তাকে পছন্দ করল কেন?

সম্বিত কী রকম সুপুরুষ? সে পাঁচ ফুট ন’ইঞ্চি লম্বা। পেশিবহুল চেহারা, গায়ের রং ফর্সা। ওদের যৌথ পরিবার। বাবা, জেঠা, দাদা ও ভাই মিলিয়ে একাধিক মুদিখানার দোকান, মদের দোকান, রেশন শপ, কেরোসিন আর গ্যাসের ডিলারশিপ আর ট্রান্সপোর্টের কারবার সামলান। সম্বিত বি কম পাস করে একটি পেট্রল পাম্পের মালিক। বিয়ের আগে নানা সূত্রে খবর নিয়েও সম্বিত সম্পর্কে কোনও খুঁত বার করা যায়নি। মৌমিতা দু’টি আশঙ্কার কথা ভেবেছে। এক, সম্বিতের গোপন প্রেমিকা আছে। দুই, সম্বিত যৌন-অক্ষম।

বিয়েটা হয়েই গেল। সম্বিতের বাবা-মা এক পয়সা পণ নেননি। শুধু বলেছিলেন, “নমস্কারির শাড়িগুলো ভাল কোয়ালিটির দেবেন। আত্মীয়স্বজন যেন বদনাম না করে। আর বরযাত্রীদের আপ্যায়নে যেন ত্রুটি না থাকে।”

মৌমিতার বাবা হাত খুলে খরচ করেছিলেন। মেয়ের সুখের জন্যে এটুকু করাই যায়।

উত্তর কলকাতার পুরনো আমলের বিরাট শ্বশুরবাড়িতে এসে একাধিক গাড়ি, যৌথ পরিবারের একাধিক তরফ এবং যৌথ পরিবারের নিজস্ব রাজনীতি দেখে মৌমিতা কেন্নোর মতো গুটিয়ে ছিল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ফুলশয্যা হয়ে গেল।

পরের দিন সকালে মৌমিতা এই ভেবে নিশ্চিন্ত হল যে, তার দু’টি আশঙ্কার মধ্যে দ্বিতীয়টি ভুল প্রমাণিত হয়েছে। সম্বিত প্রবল ভাবে যৌন-সক্ষম। প্রথম সম্ভাবনা নিয়ে ভাবার সময় এখনও আসেনি।

বিয়ের পরের কয়েক বছর হুড়মুড় করে কেটে গেল। বিয়ের এক বছরের মাথায় মেয়ে হল। নাম রাখা হল রাশি। রাশির বয়স যখন এক, আরভ জন্মাল। ছেলে আর মেয়েকে নিয়ে নাকানিচোবানি খেতে খেতেই মৌমিতার বাবা-মায়ের মৃত্যু হল, সে বাপের বাড়ি বিক্রি করে দিল, রাশি আর আরভ শৈশব পেরোতে লাগল। ঠিক এই সময়ে বিয়ের আগে ভাবা প্রথম আশঙ্কাটি মাথাচাড়া দিল। কারণ, সম্বিত রোজ মদ খেয়ে বাড়ি ফিরছে।

মৌমিতা এই নিয়ে কিছু না-বললেও বাড়ির অন্যরা আপত্তি করলেন। সামাজিক মদ্যপান নিয়ে কারও আপত্তি নেই। কিন্তু সম্বিত রোজ বেহেড মাতাল হয়ে বাড়ি ঢুকছে, সবার সঙ্গে খেতে বসে হাত থেকে রুটি বা চামচ, গেলাস বা বাটি পড়ে যাচ্ছে। এক রাতে ঠান্ডা রুটি পেয়ে মেঝেয় থালা ছুড়ে মারল। না-খেয়ে, খাবার টেবিল ছেড়ে যাওয়ার আগে মৌমিতার শাশুড়ি বললেন, “এন্টালির ‘নিউ টাওয়ার’-এ তোমার বাবার কেনা অনেকগুলো ফ্ল্যাট ফাঁকা পড়ে আছে। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে সেখানে বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে চলে যাও। ফ্ল্যাটের দাম শোধ করার জন্য এক বছর সময় দিলাম।”

এই বাড়িতে মৌমিতার শাশুড়িই শেষ কথা। পরের দিন সন্ধেবেলা রাশি আর আরভকে নিয়ে মৌমিতা যখন বেরিয়ে যাচ্ছে, তখন শাশুড়ি ডেকে বললেন, “তোর জন্য আর নাতিনাতনির জন্য এই বাড়ির দরজা আজীবন খোলা রইল। আমার অমানুষ ছেলেটাকে যদি মানুষ করতে পারিস, তবেই ওকে ঢুকতে দেব। না হলে নয়।”

*****

নতুন ফ্ল্যাটে এল বটে মৌমিতা, তবে সম্বিতকে মানুষ করতে পারল না। এবং বিবাহের এত বছর পরে বুঝতে পারল যে, প্রথম আশঙ্কাটি ঠিক ছিল। বিয়ের আগে থেকেই সম্বিতের সঙ্গে এক বিবাহিত মহিলার প্রেম। এক দেখায় মৌমিতাকে বিয়ে করেছিল, কারণ তার একটি যৌনপুতুল দরকার ছিল, যে সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র এবং গৃহপরিচারিকা হিসেবে হাতের কাছে থাকবে। যৌবনের তেজ এত দিন সম্বিতকে ঘোড়ার মতো দৌড় করিয়েছে। মধ্য-চল্লিশে রক্তের তেজ কমতেই, মাঝবয়সের বিপন্নতা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার আশায় শুরু করেছে মদ্যপান। তার পর যা হয়! অ্যালকোহলিজ়মের দুষ্টচক্রে ঢুকে পড়েছে। পরে এর সঙ্গে যোগ হল স্ত্রীকে প্রহার। পৌরুষের প্রমাণ দিতেই বৌ পেটানো শুরু করে সম্বিত!

মাতলামো আর মারধরকে ন্যায্যতা দেওয়ার জন্যে সম্বিত প্রথম দিকে দোষ দিত নিজের মাকে। নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ঘ্যানঘ্যান করত, “ছোটছেলে বলে মা আমাকে কখনও ভালবাসেনি,” “মা বাড়ি থেকে বার করে না-দিলে আমি পেঁচি মাতাল হতাম না”... এই সব প্রলাপ। কিছু দিন পরে অভিযোগের তির ঘুরল মৌমিতার দিকে— “তুমি এত কুচ্ছিত বলেই বিয়ের পরে এক সেকেন্ডের জন্যে শান্তি পাইনি,” “দাড়িগোঁফওয়ালিকে বিয়ে করে লাইফ চৌপাট হয়ে গেল,” “কোনও বেটাছেলের পক্ষে জাম্বুবানের সঙ্গে ঘর করা সম্ভব নয়”... ঘুরেফিরে এই কথাগুলোই রোজ রাতে বলত। পরে যোগ হয় পিটুনি। প্রতি রাতে পারিবারিক অশান্তি দেখার ফলে রাশি এবং আরভের মনে গভীর ক্ষতর সৃষ্টি হয়। কলেজপড়ুয়া রাশির মানসিকতা অসম্ভব জটিল। আরভ সম্বিতকে পাত্তাই দেয় না। তবে দু’জনেই মায়ের খেয়াল রাখে।

মৌমিতা রোজ ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে রান্না সেরে ফেলে। দুই ছেলেমেয়ে প্রাতরাশ সেরে, টিফিন ক্যারিয়ারে দুপুরের খাবার ভরে কলেজ যায়। সম্বিত ঘুম থেকে ওঠে দশটা নাগাদ। গত রাতের খোঁয়াড়ি কাটানোর জন্যে নুন-চিনির সরবত এবং তিন কাপ ব্ল্যাক কফি পরবর্তী দু’ঘণ্টা ধরে খায়। প্রাতরাশ সেরে, টিফিন ক্যারিয়ারে লাঞ্চ ভরে ফ্ল্যাট থেকে বেরোয় বেলা একটা নাগাদ।

এবার মৌমিতা ফাঁকা। ফাঁকা ফ্ল্যাট তাকে গিলে খেতে আসে। শুরু হয় প্যানিক অ্যাটাক, আজ রাতে বাড়ি ফিরে সম্বিত তার গলা টিপে ধরবে না তো? খিলের বাড়ি মারবে না তো? যদি খুন করে?

মৌমিতার মানসিক অবস্থা দেখে তাকে লাইফগার্ড নার্সিং হোমের মানসিক চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গিয়েছিল রাশি। বিষণ্ণতা আর উৎকণ্ঠার ওষুধ রোজ খেয়ে মৌমিতার রিফ্লেক্স মন্থর হয়ে গেছে। হাঁটাচলা ও কথাবার্তা যন্ত্রমানবীর মতো। পাশাপাশি মুখে অবাঞ্ছিত রোমের সংখ্যা বাড়ছে। সারা দিন সে আয়নার দিকে তাকিয়ে বসে থাকে।

রাশি এক দিন মাকে জানাল, সম্বিতের সঙ্গে যে মহিলার শারীরিক সম্পর্ক আছে, তার নাম রুবি। রুবি আর সম্বিতের সম্পর্কের কথা রুবির স্বামী জানে। কথাগুলো শুনে মৌমিতার কোনও হেলদোল হল না। সে তখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সন্না দিয়ে নাকের পাটার রোম তুলতে ব্যস্ত। আপনমনে বলল, “আমাকে একটা হেয়ার রিমুভিং ক্রিম কিনে দিবি?”

রাত এগারোটা নাগাদ বেহেড মাতাল হয়ে বাড়ি ঢোকে সম্বিত। সোফায় আধশোওয়া হয়ে প্যান্ট, শার্ট আর মোজা খুলে এদিক-সেদিক ছোড়ে। সঙ্গে চলে মৌমিতাকে গালাগালি। রোমশ বৌয়ের কারণে কী ভাবে তার সর্বনাশ হয়ে গেল, এটা বলার সময় তড়াক করে সোফা থেকে উঠে মৌমিতার চুলের মুঠি ধরে বনবন করে ঘোরায়, টেবিলে মাথা ঠুকে দেয়, লাথি মেরে মেঝেতে ফেলে দেয়। এই সময়ে ছেলেমেয়েকে ঘর থেকে বেরোতে বারণ করেছে মৌমিতা। কারণ এই সময়টা শুধুমাত্র অন্তর্বাস পরে থাকে সম্বিত। মিনিট দশেক তাণ্ডব চলার পরে শোওয়ার ঘরে ঢুকে ওই অবস্থায় ঘুমিয়ে পড়ে। বারো-চোদ্দো ঘণ্টার জন্য ফ্ল্যাটে শান্তি নেমে আসে।

এই ভাবেই কাটছিল বছর এবং দশক। এত সমস্যার মধ্যেও মৌমিতা অবাঞ্ছিত রোমরাজির কথা ভোলেনি। কমবয়সে বন্ধুদের কাছ থেকে জেনে নিত রোম তোলার রূপটানের গোপন ফর্মুলা। এখন খবরের কাগজ, মেয়েদের পত্রিকা, সার্চ ইঞ্জিন— সব জায়গায় তথ্য মজুত। ওয়াক্সিং, থ্রেডিং, শুগারিং, এপাইলেটরস আর ক্রিম তো আছেই, নতুন সব টেকনিকও বেরিয়েছে। নিউজ় পোর্টাল দেখে জেনেছে যে লাইফগার্ড নার্সিং হোমের ত্বক-বিশেষজ্ঞ ডক্টর মুন্সি অবাঞ্ছিত রোম তোলার বিষয়ে কলকাতায় সেরা।

এক সন্ধ্যায় রাশিকে নিয়ে সেখানে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে মৌমিতা, এমন সময় বাড়ি ফিরল সম্বিত। সে আজ মদ খায়নি। সে আজ প্রবল ঘামছে, মুখ ফ্যাটফ্যাটে সাদা, হাত-পা ঠান্ডা। সোফায় বসার সময় আপনমনে বলল, “কেমন যেন লাগছে...”

তার পর জ্ঞান হারাল।

রাশি লাফিয়ে সোফা থেকে উঠে লাইফগার্ড নার্সিং হোমে ফোন করতে যাচ্ছে, তার হাত ধরে শান্ত গলায় মৌমিতা বলল, “একটু অপেক্ষা করে দেখ। ঠিক হয়ে যাবে।”

রাশি বিস্মিত হয়ে মায়ের দিকে তাকাল।

*****

সম্বিত অজ্ঞান হওয়ার দেড় ঘণ্টা পর খবর দেওয়া হল নার্সিং হোমে। ওরা অ্যাম্বুল্যান্স পাঠাল। সেখানে পৌঁছনোর পরে নানা পরীক্ষা করে জানা গেল যে, সম্বিতের মস্তিষ্কে অনেকটা রক্তক্ষরণ হয়েছে। মৃত্যু এখন সময়ের অপেক্ষা। মৌমিতা নার্সিং হোমে যায়নি। ফ্ল্যাটে বসেই সে ফোনে শাশুড়িকে খবর দিল। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে নার্সিং হোমলোকে লোকারণ্য।

ভর্তি হওয়ার দেড় দিনের মাথায় মারা গেল সম্বিত। খবর পেয়ে শাশুড়ি বললেন, “অমানুষ ছেলেটাকে বাড়িতে ঢুকতে দিইনি। তাই আজ ডেডবডি হয়ে বাড়ি ঢুকবে। তার আগে আমার মরণ হল না কেন?” তার পর যে ভাবে অশ্রুবর্ষণ করলেন, তা চোখে দেখা যায় না।

শ্বশুরবাড়ি বা শ্মশান— মৌমিতা কোথাও যায়নি। সে নিজেকে ফ্ল্যাটবন্দি করেছে। সম্বিতের মোবাইল ফোন দিয়েছে আরভকে। রাশি একাই আত্মীয়স্বজনদের আপ্যায়ন করছে। তাঁরা আসছেন, নীরবে বসে থাকছেন, চা খাচ্ছেন, চলে যাচ্ছেন।

দিন তিনেকের মধ্যে লোকের আসা বন্ধ হল। ফ্ল্যাট এখন শান্ত। শান্ত মৌমিতাও। সারা দিন ঘুমোচ্ছে আর খাচ্ছে। এক দিন শাশুড়ি ফোনে জানালেন, “হ্যাঁ রে, শ্রাদ্ধ আর মৎস্যমুখ যদি এই বাড়িতে করি, তোর আপত্তি আছে? তোরা ওই ছোট জায়গায় সামলাতে পারবি না।”

মৌমিতা জানাল, তার কোনও আপত্তি নেই। এও জানাল, সে শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে যাবে না। তবে নিয়মভঙ্গে যাবে। শাশুড়ি কিছু বললেন না।

সম্বিতের মৃত্যুর দশ দিনের মাথায় মেয়েকে নিয়ে আবার লাইফগার্ড নার্সিং হোমে গেল মৌমিতা। ত্বক-বিশেষজ্ঞ ডক্টর মুন্সি রোগিণীকে পরীক্ষা করে বললেন, “এই সমস্যা কবে থেকে?”

মৌমিতা বলল, “ছোটবেলা থেকেই সমস্যা। তখন কোনও চিকিৎসা ছিল না। আজকাল তো অনেক কিছু বেরিয়েছে।”

মুন্সি বললেন, “ঠিকই জানেন।” তার পর লেজ়ার থেরাপির পদ্ধতি বুঝিয়ে বললেন, “আপনার আনওয়ান্টেড হেয়ারের যা ক্যারেক্টার, তাতে মাসে এক বার করে মিনিমাম আটটা সেশন লাগবে। অনেকের ক্ষেত্রে লেজ়ার থেরাপির পরে মুখে লালচে দাগ হয়। তবে সে দাগ দিন দুয়েকের মধ্যে মিলিয়ে যাবে।”

রাশিকে মৌমিতা বলল, “তোদের বাবার শ্রাদ্ধ কাল। আমি আজই প্রথম সেশনটা সেরে ফেলি।”

রাশি অবাক হয়ে বলল, “আজই? কেন?”

অভিব্যক্তিবিহীন মুখে মৌমিতা বলল, “লেজ়ার থেরাপির পরে মুখে যদি লালচে দাগ হয়, তা হলে সেটা নিয়মভঙ্গের আগে মিলিয়ে যাবে। সেদিন, সবার সঙ্গে দেখা হওয়ার আগে আমার মুখটা মসৃণ লাগবে তো, ডক্টর মুন্সি?”

ডক্টর মুন্সি উপর-নীচে ঘাড় নেড়ে বললেন, “হ্যাঁ, মসৃণ লাগবে।”


এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Short story

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy