বিছানায় আধশোয়া হয়ে মোবাইলে একটা পডকাস্ট দেখছিল মেঘনা। ফেসবুক মেসেঞ্জারে একটা মেসেজ এল, “মেঘনা, আমার নাম নন্দিতা। প্রতিমের স্ত্রী। কাল বা পরশু তোমার সঙ্গে এক বার দেখা করা যায়? কোনও কাফেতে?”
আকাশ থেকে পড়ল মেঘনা। এর মানে কী? উঠে বসে প্রতিমকে তাড়াতাড়ি কল করল। দু’বার রিং হতেই প্রতিম ধরল। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল, “হাই! কী হল?”
রাত এগারোটা পনেরো এখন। একটু আগেই, রোজকার মতো, মেঘনার সঙ্গে ফোনে আধ ঘণ্টা কথা হয়েছে প্রতিমের। আবার কাল সকালে কথা হওয়ার কথা। অসময়ে মেঘনার ফোন দেখে উদ্বিগ্ন হওয়াটাই স্বাভাবিক।
মেঘনা বলল, “ইউ ওন্ট বিলিভ দিস!”
“কী ব্যাপার বলবে তো!” বলল প্রতিম।
“আমি এক্ষুনি একটা মেসেজ পেলাম ফেসবুকে ফ্রম ইয়োর ওয়াইফ।”
“নন্দিতা তোমাকে মেসেজ করেছে?” বিশ্বাস করতে পারল না প্রতিম।
মেঘনা বলল, “হ্যাঁ। আমার সঙ্গে দেখা করতে চান!” তার পর একটু থেমে বলল, “আমাকে ট্র্যাক ডাউন করলেন কী করে?”
প্রতিম আর মেঘনার অ্যাফেয়ারটার কথা জেনে গেছে নন্দিতা। কী করে, সেটা জানে না প্রতিম। মাসদুয়েক আগে এক দিন রাতে খাবার টেবিলে প্রতিমকে সরাসরি জিজ্ঞেস করেছিল, “তোমার কি কোনও অ্যাফেয়ার চলছে?”
ওদের সতেরো বছরের মেয়ে রিমা সেদিন এক বান্ধবীর বাড়িতে গেছিল। রাতে থাকবে বলে।
নন্দিতার শরীরী ভাষা আর কণ্ঠস্বরে একটা সুস্পষ্ট দৃঢ়তা ছিল। প্রতিম বুঝতে পেরেছিল, ও আন্দাজে ঢিল মারছে না। কোনও ভাবে প্রমাণ পেয়েছে। প্রতিম তাই কিছু লুকোয়নি। মেনে নিয়েছিল মেঘনার সঙ্গে ওর সম্পর্কের কথা।
প্রতিম বলল, “ও তো তোমার নাম জানেই। তুমি যে প্রেসিডেন্সিতে ইংলিশ নিয়ে পড়ছ, তাও। আমিই বলেছিলাম যখন ও প্রশ্ন করেছিল। দ্যাট’স হাউ শি ট্র্যাকড ইউ ডাউন। আমি ভাবছি, ও তোমার সঙ্গে দেখা করতে চায় কেন?”
ব্যাপারটার মাথামুন্ডু বুঝতে পারছিল না প্রতিম। সেই রাতের পর থেকেই নন্দিতার সঙ্গে ওর কথাবার্তা নেই। এক-দু’বার প্রতিম কথা বলার চেষ্টা করলেও নন্দিতা সাড়া দেয়নি। অশান্তিও করেনি, জাস্ট চুপ করে গিয়েছে। দু’জন এক ঘরে শোয়ওনি তার পর থেকে। এক ফ্ল্যাটে থাকলেও, ওরা এখন একে অপরের থেকে কয়েক আলোকবর্ষ দূরে।
তাই নন্দিতা কী ভাবছে বা করছে, সেটা জানা সম্ভব নয় প্রতিমের পক্ষে। শুধু কয়েক দিন আগে রিমার কাছে থেকে এটুকু জেনেছে, সপ্তমীর দিন রিমা আর নন্দিতা আমোদপুর যাচ্ছে। এ বছর পুজোটা ওরা নন্দিতার বাপের বাড়িতেই কাটাবে।
মেঘনা বলল, “আমিও বুঝতে পারছি না উনি কেন দেখা করতে চান। শুড আই মিট হার?”
একটু চুপ করে রইল প্রতিম। মেঘনাকে কী পরামর্শ দেবে, বুঝতে পারল না। নন্দিতা কি পাবলিক স্পেসে চিৎকার-চেঁচামেচি করে মেঘনাকে অপমান করার প্ল্যান করছে? নাকি কান্নাকাটি করে একটা নাটক করবে?
নন্দিতাকে যত দূর চেনে ও, প্রথম ঘটনাটা ঘটার সম্ভাবনা কম। যদিও সেটা একেবারেই ঘটবে না, সেটা বলা যাচ্ছে না— আফটার অল মেঘনাকে পাবলিকলি অপমান করে প্রতিমের উপর ও শোধ নিতে চাইতে পারে। দ্বিতীয় ঘটনাটা ঘটার সম্ভাবনা বেশ ভালই। নন্দিতা মেলোড্রামা করতে ওস্তাদ। কলকাতায় কুড়ি বছর থেকেও ওর মধ্যে থেকে গেঁয়োভাব পুরোপুরি মুছে যায়নি। বছর দুয়েক আগে যখন সামার ক্যাম্পের জন্য রিমা বেঙ্গালুরু যাচ্ছে, এয়ারপোর্টে, সবার সামনে, এমন কান্না শুরু করল যে প্রতিম রীতিমতো বিব্রত হয়ে পড়েছিল!
সেটাই বলল প্রতিম মেঘনাকে।
মেঘনা বলল, “আচ্ছা, ভেবে দেখি। গুড নাইট।”
ফোনটা রেখে উঠে পড়ল মেঘনা। বেডরুম-লাগোয়া বারান্দাটায় এসে দাঁড়াল। নির্জন, ভেজা পিচরাস্তার উপর স্ট্রিট ল্যাম্পের নিয়ন আলো আলপনা দিচ্ছে। বিকেল থেকে এক নাগাড়ে বৃষ্টি পড়ছে। ডিনারের সময় বাবা বলছিল, পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ উপকূলে নাকি একটা ডিপ্রেশন তৈরি হয়েছে। আগামী দু’-তিন দিন বৃষ্টি চলবে।
একটু দূর থেকে সানাইয়ের শব্দ ভেসে আসছে। মেঘনাদের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে মিনিট দশেক হেঁটে গেলেই রাজডাঙা নতুনপল্লির বিখ্যাত দুর্গাপুজো। শব্দটা আসছে ওখান থেকেই সম্ভবত। আজ চতুর্থী। আজকাল কলকাতার সমস্ত বড় পুজো চতুর্থীর মধ্যেই উদ্বোধন হয়ে যায়। রাজডাঙার পুজোটাও সম্ভবত খুলে দেওয়া হয়েছে জনসাধারণের জন্য।
গত বছর পুজোর ঠিক আগেই প্রতিমের সঙ্গে ওর আলাপ। তখন কলেজের সেকেন্ড ইয়ারে, একটা ইংরেজি সংবাদপত্রে ফ্রিলান্সিং করছে। সেখানেই, লাইফস্টাইল বিভাগের সম্পাদক সুব্রতদার কেবিনে, প্রতিমকে প্রথম দেখে। প্রতিমের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়ে সুব্রতদা বলেছিল, “এক সঙ্গে স্কুলে পড়তাম। এখন বিরাট ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্কার।”
সুব্রতদার বন্ধু যখন, বয়স নিশ্চয়ই মধ্য-চল্লিশ অতিক্রান্ত, কিন্তু প্রতিমের টান টান, নির্মেদ চেহারা দেখে এক বারের জন্যও সেটা মনে হয়নি মেঘনার।
সে দিন সন্ধেবেলায় বৃষ্টি পড়ছিল, তাই প্রতিম লিফ্ট অফার করে মেঘনাকে। চাঁদনি চক থেকে রাজডাঙা ওদের পৌঁছতে দেড় ঘণ্টা লেগেছিল। গাড়িতে অনেক গল্প হয়েছিল। সেই দেড় ঘণ্টাতেই উনিশের মেঘনা বুঝতে পেরেছিল, বিবাহিত ও এক কন্যাসন্তান থাকা সত্ত্বেও, দারুণ হ্যান্ডসাম, আশ্চর্য সপ্রতিভ আর ওর মতোই কফি-অ্যাডিক্ট আর পিঙ্ক ফ্লয়েডের ফ্যান প্রতিমের প্রতি ও এক দুর্নিবার আকর্ষণ অনুভব করছে।
রাতেই টেক্সট করেছিল ও, “থ্যাঙ্ক ইউ ফর দ্য রাইড। আলাপ করে খুব ভাল লাগল।”
উত্তরে প্রতিম লিখেছিল, “লেট’স মিট ফর কফি সুন।” দিন দশেক বাদে ওরা আবার দেখা করে একটা কাফেতে। তার সাত দিন পর আবার, বুক স্টোরে।
তত দিনে মেঘনার দিক থেকে আকর্ষণটা আরও গভীর হয়েছে। প্রতিমও স্বীকার করেছে, মেঘনাকে ওর প্রথম দিনই ভাল লেগে গিয়েছিল।
“কেন?”— প্রশ্ন করেছিল মেঘনা।
“তোমাকে দেখে ‘জিস্ম’-এর বিপাশা বসুর কথা মনে পড়ে গিয়েছিল! মেয়েদের চাপা রং, লম্বা চেহারা আর সুন্দর চোখের প্রতি আমার দুর্বলতা চিরকালের...” হাসতে হাসতে বলেছিল প্রতিম।
আস্তে আস্তে আরও ঘন ঘন দেখা হতে লাগল। প্লেটোনিক থেকে সম্পর্কটা শারীরিক হল। নিজেকে আটকানোর চেষ্টা করেছিল মেঘনা। প্রতিম বিবাহিত। মেঘনা কেন ওর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে একটা সংসার ভাঙবে? ওর বেস্ট ফ্রেন্ড মধুলিকাও বলেছিল বেরিয়ে আসতে। পারেনি মেঘনা। বরং ভেসে গিয়েছিল। প্রতিমের টেক্সটের উত্তর এক দিন দেয়নি, দু’দিন দেয়নি, কিন্তু তিন দিনের দিন না দিয়ে আর পারেনি। প্রতিম দেখা করতে চাইলে অ্যাভয়েড করেছে, তার পর প্রতিমকে পাগলের মতো মিস করতে শুরু করে নিজেই টেক্সট করেছে।
প্রতিম ওর দ্বন্দ্বটা বুঝতে পেরেই সম্ভবত আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছিল, “ভেবো না তুমি সংসার ভাঙছ।” আরও বলেছিল, কুড়ি বছরে ওদের দাম্পত্যটা শুষ্ক বালিয়াড়িতে পরিণত হয়েছে। ওদের বিয়েটা অ্যারেঞ্জড। নন্দিতার সঙ্গে ওর কোনও দিনই মিল ছিল না, এত দিন ধরে ও সম্পর্কটা জোর করে বয়ে নিয়ে চলেছে।
এক দিন কলেজ থেকে ফেরার সময় মধুলিকা মেঘনাকে জিজ্ঞেস করেছিল, “যদি ধরেও নিই প্রতিমের কথাটা ঠিক, তুই কি ভেবে দেখেছিস, তুই সত্যিই ওকে ভালবাসিস? নাকি তোর এটা জাস্ট একটা সাময়িক মোহ? তা ছাড়া তোদের সম্পর্কের পরিণতিটাই বা কী?”
মেঘনা এ-সব প্রশ্নের উত্তর জানে না। এত জটিল করে ভাবতেও চায় না ও। ও শুধু জানে, প্রতিমকে ছেড়ে থাকতে ওর কষ্ট হয়। বুকের কাছটা কেমন শূন্য মনে হয়। ওর মা মারা গিয়েছিল ও যখন ক্লাস টেনে। বাবা ডাক্তার, খুব ভাল, কিন্তু সারা দিন রোগী নিয়েই ব্যস্ত। মাঝে মাঝে খুব একা লাগত ওর। অকারণে কান্না পেত, মরে যেতে ইচ্ছে হত। প্রতিম ওর জীবনে আসার পর, সেটা আর হয় না।
বসার ঘরে মিউজ়িক্যাল ক্লকে বারোটা বাজার শব্দ হল। ঘরে ফিরে এল মেঘনা। মোবাইল হাতে তুলে নিয়ে কয়েক মুহূর্ত ভাবল।
তার পর মেসেঞ্জারে নন্দিতাকে লিখল, “হাই! আমরা পরশু দেখা করতে পারি দুপুর তিনটে নাগাদ। আপনি বিবেকানন্দ পার্কের পাশে যতীন বাগচী রোডে আসতে পারবেন?”
নন্দিতা কেন মিট করতে চায়, সেটা জানার একটা অদম্য কৌতূহল অনুভব করছে ও।
*****
তিনটে কুড়ি— মোবাইল ঘড়িতে সময় দেখল মেঘনা। যতীন বাগচী রোডের ‘কফি অ্যান্ড মোর’-এ বসে আছে ও। আজ পরেছে ট্যাঙ্ক টপ আর জিনস।
নন্দিতা কি শেষ পর্যন্ত আসবে না? একটা টেক্সট করে জিজ্ঞেস করা যায়, কিন্তু ওর কী দরকার! ও তো আর দেখা করতে চায়নি! মেঘনা ঠিক করল, আর একটু অপেক্ষা করে উঠে পড়বে। এমনিতেই ষষ্ঠী বলে বিকেল থেকে কলকাতার রাস্তাঘাটে মানুষের ঢল নামবে। তার উপর, তোড়টা কমে এলেও, বৃষ্টিটা হয়েই চলেছে। রাস্তাঘাটে জ্যাম হওয়ার আশঙ্কা প্রবল।
ওর ফোনে একটা ওয়টস্যাপ এল। না, নন্দিতা নয়, প্রতিম। “হ্যাজ শি অ্যারাইভড?”
“নট ইয়েট…ওয়েটিং...” উত্তরটা লিখে সবে ফোন থেকে মুখ তুলে তাকিয়েছে, সামনে দাঁড়িয়ে নন্দিতা। বৃষ্টিতে মাথার চুল, পরনের শাড়ি অল্প ভিজে গিয়েছে। একটু ভারীর দিকে চেহারা, ফর্সা গোল মুখ, টিকোলো নাক, পাতলা ঠোঁট, চোখ দুটো বড় আর গভীর। সম্প্রতি ফেসবুকে, আর তার আগে প্রতিমের ফোনে ছবি দেখেছিল ওর। তাই চিনতে অসুবিধে হল না।
“তুমি মেঘনা তো! স্যরি গো… তোমাকে অপেক্ষা করতে হল। আসলে যে ক্যাবটায় আসছিলাম সেটা খারাপ হয়ে গেল রাসবিহারীর কাছে এসে…” নন্দিতার কথায় স্পষ্ট মফস্সলি টান লক্ষ করল মেঘনা।
ও উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “দ্যাট’স ওকে। বসুন না।”
দু’জনে বসল। নন্দিতার কাঁধে একটা টোট ব্যাগ ছিল, সেটা ঝুলিয়ে রাখল চেয়ারের পিছনে। মেঘনা একটা ফ্ল্যাট হোয়াইট অর্ডার করল, নন্দিতা ক্যাপুচিনো।
নন্দিতা বলল, “তোমাকে বেশি ক্ষণ আটকে রাখব না। ষষ্ঠীর বিকেল…” তার পর সাফাই গাওয়ার মতো করে, “আসলে অনেক দিন ধরেই ভাবছিলাম মেসেজ করে বলব দেখা করার কথা, সাহস পাচ্ছিলাম না…”
উত্তরে কী বলবে মেঘনা, বুঝতে পারল না।
নন্দিতা বোধহয় পড়তে পারল মেঘনার মনের কথা। তাই ও-ই কথোপকথন চালানোর ভার নিল যেন, “পুজোয় কী করছ?”
“জানি না ঠিক… সে রকম প্ল্যান করিনি কিছু…” বলল মেঘনা, “আপনি?”
“আমি আর আমার মেয়ে রিমা কাল বর্ধমান যাচ্ছি। আমার বাপের বাড়ি বর্ধমানের কাছে আমোদপুর বলে একটা গ্রামে। পুজো হয়। বহু বছর হল যাওয়া হয় না।”
“পুজোর পর ফিরবেন?”
“রিমা একাদশীর দিন ফিরে আসবে গো,” একটু চুপ করে থেকে বলল নন্দিতা, “আমি আরও কিছু দিন থাকব হয়তো। আমার তো এখানে তেমন কাজ নেই। চাকরি-বাকরি করি না। রিমাও বড় হয়ে গিয়েছে।…”
ততক্ষণে ওদের কফি এসে গিয়েছে। কফিতে চুমুক দিয়ে নন্দিতা বলল, “কী জানো, বয়স হচ্ছে বলেই আজকাল গ্রামের কথা, ছোটবেলার কথা খুব মনে পড়ে। কুড়ি বছর হয়ে গিয়েছে কলকাতায় এসেছি, তাও এখনও কলকাতার থেকে গ্রামই বেশি ভাল লাগে। আসলে ওখানেই বড় হয়েছি তো!” তার পর ওর ছোটবেলার কথা, গ্রামের দুর্গাপুজো, চড়কের মেলা, শীতকাল, নবান্ন, বন্ধুবান্ধবদের কথা বলে চলল।
নন্দিতার আত্মকথা শুনতে ভাল না লাগলেও, শুনে যাচ্ছিল মেঘনা।
মিনিট দশেক একটানা কথা বলে গেল নন্দিতা। তার পর বলল, “আমার কথাই বলে যাচ্ছি। তোমার কথা তো শোনাই হচ্ছে না। তুমি বলো।”
কী বলবে মেঘনা! ওর থোড়ি ইচ্ছে ছিল নন্দিতার সঙ্গে খেজুরে আলাপ করার! মুখে কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে বলল, “আমার তো সে রকম কিছু…”
“কেন? তোমার বাড়ির কথা, কলেজ, বন্ধুবান্ধব… তুমি তো দারুণ ছবি তোলো… দেখছিলাম ফেসবুকে…”
মেঘনা মুখে বলল, “ওই আর কী…” কিন্তু ভিতরে ভিতরে বেশ বিরক্তই লাগছে ওর। নন্দিতা কিছুতেই ঝেড়ে কাশছে না। কেন ও মেঘনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে বলছে না। খালি আগডুম বাগডুম কথা বলে চলেছে।
আবার একটা ওয়টস্যাপ এল ওর ফোনে। প্রতিম লিখেছে, “এসেছে?”
ও লিখল, “ইয়েস, বাট কান্ট গেস হার মোটিভ।”
ফোন থেকে মুখ তুলে দেখল, অদ্ভুত দৃষ্টিতে নন্দিতা ওর দিকে তাকিয়ে। একটু অস্বস্তি হল। ভদ্রমহিলা পাগল নাকি? চোখ সরিয়ে নিল ওর চোখ থেকে। তার পর বলল, “আপনার কি স্পেসিফিক কিছু দরকার ছিল?”
নন্দিতা তাড়াতাড়ি বলে উঠল, “দেখেছ, একদম ভুলে গেছি!” তার পর ব্যাগ থেকে একটা প্লাস্টিকে মোড়া জিনিস বার করল। মেঘনার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “এটা তোমার জন্য। জানি না তুমি শাড়ি পরো কি না। পছন্দ হবে কি না, তাও। প্রতিম আর রিমা বলে, আমার পছন্দ নাকি খুব লাউড।”
“কিন্তু এর আবার কী দরকার…” মেঘনা এবার চূড়ান্ত অপ্রস্তুত।
“পুজোর সময় কাছের মানুষদের দিতে হয় গো। তুমি তো আমাদের বাড়িরই এক জন।”
মেঘনা শুকনো গলায় শুধু ধন্যবাদ জানাল। আর কোনও কথা খুঁজে পেল না।
“আর দেরি করাটা বোধহয় ঠিক হবে না। বিল দিতে বলবে?” বলল মেঘনা।
বিল এল। নন্দিতা কিছুতেই মেঘনাকে পেমেন্ট করতে দিল না।
ক্যাফের দরজা ঠেলে বেরিয়ে এল ওরা। রাস্তাঘাট ভিজে, কিন্তু এখন বৃষ্টি পড়ছে না আর।
নন্দিতা বলল, “আসছি মেঘনা। সাবধানে, ভাল করে পুজো কাটিয়ো।”
মেঘনার হয়তো বলা উচিত ছিল, আপনিও ভাল করে পুজো কাটাবেন। পরিবর্তে বলে উঠল, “প্রতিম আর আমার ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞেস করলেন না তো? আপনি তো জানেন সব।”
“কিছু তো জিজ্ঞেস করার নেই মেঘনা,” শান্ত গলায় বলল নন্দিতা। শান্ত, নাকি নিঃস্ব?
মেঘনা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “আপনার কষ্ট হয় না?”
“হয় হয়তো।”
“তা হলে কেন আমাকে বললেন না প্রতিমের থেকে দূরে সরে যেতে? কেন বকলেন না?” প্রায় চেঁচিয়ে উঠল মেঘনা। নন্দিতার এই অস্বাভাবিক শীতল আচারণ আর সহ্য করতে পারছিল না ও!
“তা হলে যে তোমার কষ্ট হত,” একটু চুপ করে থেকে নন্দিতা বলল, “রিমা, আমার মেয়ে তোমার থেকে অল্পই ছোট হবে। ওর কষ্ট হলে আমি ঠিক বুঝতে পারি।… ভাল থেকো।”
পুজোর ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে গেল নন্দিতা।
দূর থেকে কিশোরকুমারের গান ভেসে আসছে। তার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে ঢাকের আওয়াজ, আর পুজোর শহরের কোলাহল।
পুজোর উপহার হাতে নিয়ে ব্যস্ত রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ গলার কাছটা ব্যথা করে উঠল মেঘনার। তার পর চোখের কোল ছাপিয়ে গড়িয়ে পড়ল বুকের ভিতরে জমে থাকা জল। কী হল ওর হঠাৎ? বুঝতে পারল না।
জিন্সের পকেটে ফোনটা বাজছে। বার করে দেখল, প্রতিম। ধরল না মেঘনা। ধরবে না আর কোনও দিন। ওর যতই কষ্ট হোক, সেটা সহ্য করবে। আজ মায়ের বোধন। মাকে আর কষ্ট দিতে পারবে না ও। কিছুতেই না।
নিম্নচাপ কেটে গিয়ে ততক্ষণে শরতের নীল আকাশে ছড়িয়ে পড়েছে ভ্যানিলা আইসক্রিমের মতো মেঘ।