E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

ঠামি

ননীবালা বন্দনার কথায় একটু রেগেই যান, “আপন ছেলেরা তো টুকি দিয়েও দেখে না। পরের ছেলে রোজ এই একলা মানুষটার খোঁজ নেয়, সেটাও কি তোর অপছন্দ?”

সুদীপ জোয়ারদার

শেষ আপডেট: ২৫ অক্টোবর ২০২৬ ০৮:০২
ছবি: তারকনাথ মুখেপাধ্যায়।

ছবি: তারকনাথ মুখেপাধ্যায়।

ননীবালা বিকেলের ম্লান আলোয় হাতপাখাটা নাড়তে নাড়তে ভাবলেন, ফোনটা আজ একটু আগে এলেই ভাল হয়। আবার ভাবলেন, আগে এলে রাতটা বড় লম্বা হয়ে যাবে। তার চেয়ে একটু বেশি রাতে এলেই ভাল। ফোনের রেশটুকু থেকে যাবে ঘুম আসা অবধি।

চিতু ফোন প্রতি রাতেই করে। কিন্তু কোনও নির্দিষ্ট সময় থাকে না। এক দিন সন্ধে সাতটা নাগাদ করে, তো আর এক দিন রাত দশটার পরে। আটটাতেও করে এক-এক দিন। ননীবালা সারাটা দিন চিতুর ফোনের আশাতেই পার করে দেন।

রান্না করার মেয়ে বন্দনা ফোনের ব্যাপারটা জানে। সে মাঝে মাঝে তাঁর দিকে চেয়ে টিপ্পনী কাটে, “জেঠির দিন আর পার হয় না কিছুতেই, মনে হয় কখন রাত হবে, কখন চিতুর গলা শুনতে পাব!”

ননীবালা বন্দনার কথায় একটু রেগেই যান, “আপন ছেলেরা তো টুকি দিয়েও দেখে না। পরের ছেলে রোজ এই একলা মানুষটার খোঁজ নেয়, সেটাও কি তোর অপছন্দ?”

“না না, অপছন্দ কেন হবে? আমি ভাবছি, তার মতলবখানা কী!”

“মতলব! একটা কলেজে-পড়া ছেলের মতলব কেন থাকবে? আর তা ছাড়া আমার আছেই বা কী যে, সে মতলব ভাঁজবে? শ্বশুরমশাই কিছু টাকা রেখে গিয়েছিলেন। তা দিয়ে দুই ছেলেকে পড়িয়ে বড় করে ছিটেফোঁটা বেঁচে আছে। সেই ছিটেফোঁটার সুদ দিয়ে চলছে। হতভাগী, তুই কি মতলবের বাইরে কিছু ভাবতে পারিস না? রোজকার খবরাখবর দেওয়া-নেওয়া ছাড়া আর কী কথাই বা হয় আমাদের!”

বেনারস যাওয়ার সময় ননীবালার পাশের সিটেই অসুস্থ হয়ে পড়েছিল ছেলেটা। ওষুধ এক জন দিল। কিন্তু সেটা খেয়েও কমার তেমন লক্ষণ দেখা গেল না। কেউ কেউ বলল, “জ্বরটা খারাপ, হয়তো ছোঁয়াচেও, একে সঙ্গে নিয়ে চলাটা ঠিক নয়।”

এই সব শুনে খেপে গেল ট্যুর ম্যানেজার, “আচ্ছা নির্দয় লোক তো আপনারা! একটা ছেলে আমাদের সঙ্গে বেড়াতে বেরিয়েছে, অসুস্থ হয়েছে বলে বাস থেকে নামিয়ে দিয়ে চলে যেতে হবে! তার পর? কী হবে ওর? রাস্তায় বেঘোরে মরবে? নিজের পরিবারের কেউ হলে এ-সব বলতে পারতেন?”

ট্যুর ম্যানেজারের ধমকে সবাই চুপ করল ঠিকই, তবু মৃদুস্বরে গুঞ্জন চলল অনেক ক্ষণ। এক বয়স্ক ভদ্রলোক ননীবালার পিছনে বসে পাশের জনকে নিচুস্বরে বললেন, “করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট এসেছে। আরও শক্তিশালী। কেরলে ওতে দু’জন নাকি মারাও গেছে! ছেলেটাকে জ্বর যে ভাবে ধরেছে, তাতে মনে হচ্ছে এ-ও ওই কেরল-কেস। শুনেছি এই নতুন ভ্যারিয়েন্ট নাকি খুব ছোঁয়াচে। কী যে হবে আমাদের!”

ননীবালার কেমন মায়া হল ছেলেটাকে দেখে। পিছনের ভদ্রলোকের কথায় না ঘাবড়ে, বোতলের জলে রুমাল ভিজিয়ে ওর কপালে জলপটি দিতে লাগলেন। অনেক ক্ষণ দেওয়ার পর মনে হল জ্বরটা কমের দিকে। জলপটি নামিয়ে ননীবালা এর পর প্রায় সারা রাতই ছেলেটার মাথা কোলে নিয়ে কখনও চুলে বিলি কেটে দিলেন, কখনও কপালে হাত বুলিয়ে দিলেন।

ভোরবেলায় চোখ খুলল ছেলেটি। এক মাথা সাদা চুল দেখে কিনা কে জানে, ননীবালাকে ‘ঠামি’ বলে জড়িয়ে ধরল। সেই ‘ঠামি’। সেটা থেকেই গেল।

“নিজের ছেলেরা যখন খোঁজ নেয় না, তখন আর কী, ওই চিতুই তোমার ভরসা! তবে ভুল করে আবার উইল-টুইল করে ওকে ভিটেটা লিখে দিয়ো না যেন!” বন্দনা যাওয়ার সময় আবার গলা তোলে।

বন্দনাকে এই জন্যই এক-এক সময় অসহ্য লাগে ননীবালার। সব কিছুতেই ও প্যাঁচ কষে, অন্য অর্থ বার করার চেষ্টা করে। তেমন হলে এত দিনেও কি কিছু টের পেতেন না! আসলে বন্দনা সব কিছুতেই লেনদেন, কারণ খোঁজে। তার বাইরে কিছু ভাবতেই পারে না।

ইন্দোরে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে চিতু। বাড়ি রাঁচীতে। তবে বাংলা বলে দিব্যি। ট্যুরের বাসে ও কী ভাবে জুটেছিল, ননীবালা জানতেন না। পরে শুনেছিলেন, মাসির বাড়ি কাছাকাছি কোথাও। পুজোর ছুটিতে সেখানে এসেছিল বেড়াতে। বেনারস যাওয়ার টিকিট কাটা ছিল মাসির ছেলের। কিন্তু তার হঠাৎ পক্স হয়। তখন ভাই শুভ্রাংশুর জায়গায় যুক্ত হয়েছিল চিত্রাংশু মানে চিতু। একে পুজোর ছুটি, তার উপর চিতুর তখন ফার্স্ট ইয়ার। কোনও দিক থেকেই অসুবিধে ছিল না। তাই ট্যুরে যুক্ত হতে ওর সমস্যা হয়নি। ভাগ্যিস হয়নি!

তা ছাড়া, কারও অসুস্থতা কাম্য নয়, কিন্তু চিতুর ভাইয়ের অসুস্থতা সে দিন ননীবালার পক্ষে গিয়েছিল। সে অসুস্থ হয়েছিল বলেই না তিনি চিতুর ‘ঠামি’ হওয়ার সুযোগ পেলেন! না হলে দিনগুলো এখন কিসের আশায় পার করতেন, আর রাতটাই বা কেমন করে এ রকম আনন্দময় হয়ে উঠত!

“এক বার আমার কাছে আসবি না, নাতি?” গতকাল বলেছিলেন।

উত্তরে চিতু বলেছিল, “যাব, পড়া শেষ হোক, তার পরে। এখন তো রাঁচী-ইন্দোর করতেই ছুটি শেষ হয়ে যায়!”

রাঁচী শব্দটা শুনলে আজও বুকটা কেমন করে ওঠে ননীবালার। কেন যে মানুষটা এমন করল! অবশ্য তাঁর আর দোষ কী। মাথার গোলমাল, দেখেশুনে রাখবে না হাসপাতালের লোকেরা! গোলমাল হয়েছিল, সেরেও যেত, ডাক্তাররা তেমনই বলেছিল। কিন্তু এক দিন খবর এল হাসপাতাল থেকে, লোকটা নিরুদ্দেশ। শ্বশুরমশাইয়ের সঙ্গে ননীবালা রাঁচী গিয়েছিলেন। প্রথমে হাসপাতালের তরফে, পরে পুলিশের তরফে অনেক খোঁজাখুঁজি হয়েছিল। কিন্তু তাঁকে পাওয়া যায়নি। গাফিলতির কারণে সিকিয়োরিটির এক জনকে সাসপেন্ড করে হাসপাতাল কর্তব্য সেরেছিল।

এ দিকে দুই ছেলে নিয়ে তখন কী যে আতান্তরে পড়েছিলেন ননীবালা! শ্বশুরমশাই বেঁচে ছিলেন, এ বাড়ির বিষয়-সম্পত্তিও তখন ছিল, তাই কোনও রকমে সামলে গিয়েছিল ব্যাপারটা।

ছেলেরা বড় হল। নিজের পায়ে দাঁড়াল। ননীবালা আশা করেছিলেন বাবার বিষয়ে ওরা কৌতূহলী হবে, হয়তো শ্বশুরমশাই আর ও যা পারেনি, তাই অর্থাৎ নিরুদ্দিষ্ট বাবার একটা হদিস করবে। কিন্তু কোথায় কী! ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া শেষ হতেই বিয়ে-টিয়ে করে দু’-এক বছরের মধ্যে মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক এক রকম ছেদই করে দিল ওরা।

বড়টা গত চার বছরে এক বার এসেছিল, তাও ঘণ্টাখানেকের জন্য। আর ছোটটা পড়ার পরেই আমেরিকায় চলে গেছে। সেও বেশ কয়েক বছর হল, এখন ওখানকারই পাকাপাকি বাসিন্দা। প্রথম-প্রথম ফোন করত। টাকাও পাঠিয়েছে কিছু দিন। তার পর এক দিন টাকা, ফোন সবই বন্ধ হয়ে গেল। ছেলেরা যে তাঁকে এক রকম ত্যাগ করেছে, সে কারণে ননীবালা তাদের দোষী করেন না। ঠিকঠাক মানুষ না করতে পারার জন্য নিজেকেই দায়ী করেন।

এক বুক কষ্ট নিয়ে দিন কাটছিল ননীবালার। মাঝে মাঝে বড়টার স্কুলের বন্ধু চরণ বাস ছাড়ত, বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্য। চরণ ননীবালাকে প্রথম দিকে সাধাসাধি করে নিয়ে যেত। তখন এই অঞ্চলের লোক নিয়েই ওর ট্যুরের আয়োজন, ফলে সব সিট ভর্তির একটা চাপ থাকত। কিন্তু ক্রমে ওর কাজের পরিধি বাড়ল। ট্রাভেল এজেন্সি হল। নামও ছড়াল। ট্যুরে যুক্ত হতে লাগল বাইরেরও বহু মানুষ।

তবু যে সব জায়গায় যাওয়া ননীবালার শারীরিক সাধ্যের মধ্যে, সেখানকার উদ্দেশে বাস ছাড়লেই চরণ সবার আগে এখনও ননীবালাকে খবর দেয় যাওয়ার জন্য। ননীবালাও যেন চরণের ডাকের অপেক্ষাতেই থাকেন। একঘেয়ে, একাকী জীবনে যে ক’টা দিন একটু আনন্দে থাকা যায়!

বেনারস ভ্রমণের সেরা প্রাপ্তি নিঃসন্দেহে চিতু। ওর ‘ঠামি’ ডাক এখন প্রতি রাত্তিরে ননীবালাকে বেঁচে থাকার শক্তি জোগায়। ওর ফোন আসবে বলে সন্ধেয় চা খেয়েই চেয়ারে ফোনটা নিয়ে বসে যান। আজও বসলেন। কিন্তু ফোনটা আজ আসে না তো আসেই না।

শীত বিদায় নিয়েছে অনেক দিন। গ্রীষ্ম ননীবালার প্রিয় ঋতু। আজ একটু ঝড়-ঝড় ভাব ছিল। আচ্ছা, চিতু যেখানে থাকে, সেখানে গ্রীষ্মে কি বিকেলের দিকে ঝড়-টড় হয়? আজ আবার হচ্ছে না তো! হয়তো সে জন্যই ছেলেটা ফোনে ননীবালার নম্বর বার বার টিপেও লাগাতে পারছে না!

বেশি লেখাপড়া ননীবালা করেননি। তবু আবছা মনে পড়ছে, কোথাও পড়েছিলেন, গ্রীষ্মের এই ঝড়টা, যেটাকে কালবৈশাখী বলা হয়, সেটা এ দিকেই হয়ে থাকে। কিন্তু তা না হয় হল, চিতুর ফোনটা তো এই ঝড়ের মুলুক দিয়েই তাঁর ফোনে ঢুকবে। এখানে ঝড় হচ্ছে না, আশপাশের কোথাও কি আর হচ্ছে না! নিশ্চয়ই হচ্ছে। না হলে হঠাৎ গরমটা কমে গিয়ে আবহাওয়াটা নরম হল কী ভাবে?

রাতে বিশেষ কিছু খান না ননীবালা। আধ সের দুধ নেন। সেটা দিয়ে বন্দনা ছানা তৈরি করে দিয়ে যায়। ছানা আর অল্প একটু মুড়ি, এই ননীবালার রাতের খাবার। রাত আটটা বাজতে চলল। খাবারটা আজ নিয়েই বসা যাক।

ননীবালা রান্নাঘরে গিয়ে বাটিতে মুড়ি আর ছানা নিলেন। অন্য দিন হাত দিয়ে খান। খেতে খেতে যদি ফোনটা আসে, হাত দিয়ে খেলে, হাত না ধুয়ে ফোন ধরতে পারবেন না। আজ ছানা-মুড়ি খাওয়ার জন্য একটা চামচ নিলেন।

সন্ধে হলে আগে ছেলেদের কথা ভেবে মনটা দুমড়ে মুচড়ে যেত। মাকে কি এ ভাবে ছেলেরা ভুলে যায়! ননীবালা তো কারও পথে বাধা হয়ে দাঁড়াননি। কোনও প্রত্যাশাও ছিল না, মাঝে মাঝে ফোনে ওদের একটু গলা শোনা ছাড়া। কিন্তু সেটুকুও ওরা মাকে দিল না! চিতু সেই মনখারাপের রাতটাকে পাল্টে দিয়েছে। এখন আর ছেলেদের কথা ভেবে ননীবালা কষ্ট পান না।

ননীবালা ছানা দিয়ে মুড়ি খাচ্ছেন। নিস্তব্ধ চার ধার। মচমচ আওয়াজ হচ্ছে। মুড়ি খেয়ে বাটিটায় জল ঢেলে খেলেন। সময় যাচ্ছে, ফোন তবু নীরব।

আশপাশে বাড়ি আছে। দত্তদের, দাসেদের… দত্তরা সুবিধের নয়, কিন্তু দাসেরা ভাল। ওদের বড় ছেলে শম্ভু রাতে বারান্দায় এসে শোয়। শম্ভু চরণের কর্মচারী। চরণই ওকে ঠিক করে দিয়েছে। বয়স্ক মানুষ, একা থাকেন, রাতবিরেতে সমস্যা তো হতেই পারে। ওর কোনও দাবিদাওয়া নেই, তবু সামান্য হলেও ননীবালা শম্ভুকে মাসান্তে কিছু দেন।

কিন্তু শম্ভুর আসতে আসতে এগারোটা। রেডিয়োটা কি চালাবেন? আজ শুক্রবার। শুক্রবারে আটটার পরে নাটক থাকে, জানেন। রেডিয়োর নব ঘোরালেন ননীবালা। বহু পুরনো নাটক দিয়েছে আজ, ‘সরীসৃপ’। অনেক বার শোনা। তবু চলুক, চিতুর ফোন আসা অবধি।

একটু বেশিই জল খাওয়া হয়ে গিয়েছে। হঠাৎ বাথরুমের বেগ চাপল। ননীবালা রেডিয়োটা বন্ধ করে বাথরুমে ছুটলেন। কী আশ্চর্য, বাথরুমে বসেই শুনতে পেলেন ফোনটা বাজছে। বাথরুম কোনও রকমে সেরে পড়িমরি করে ছুটে আসতে গিয়ে ননীবালা ছাদের সিঁড়ির কোণে ধাক্কা খেয়ে পড়লেন মেঝেতে। লাগেনি, তবে পঁয়ষট্টি বছরের ভারী শরীরটা নিয়ে উঠতে অনেকটা সময় লাগল। যখন উঠলেন, তখন ফোনের রিং থেমে গেছে। এসে দেখলেন, চিতুর নম্বর থেকে তিনটে মিসড কল।

চিতুকে কি একটা ফোন করবেন ননীবালা? ফোনটা নাড়েন চাড়েন, কিন্তু ফোনটা করা হয় না। আসলে ফোন ধরাতেই অভ্যস্ত, এখনও করায় তেমন নন। করতে গিয়ে যদি ভুল হয়ে যায়! সবে তো সাড়ে আটটা। অনেক সময় পড়ে আছে। চিতু নিশ্চিত আবার ফোন করবে।

বেনারসে নিজের ফোন দিয়ে তোলা দর্শনীয় জায়গার ছবি পাঠানোর জন্য ননীবালার ফোনে ওয়টস্যাপ খুলে দিয়েছিল চিতু। কী ভাবে দেখতে হয়, সেটাও শিখিয়েছিল। ফোনে এই কাজটা ননীবালা পারেন। আজ কী মনে করে ওখানে গিয়ে দেখেন, একটা মেসেজ পাঠিয়েছে ছেলেটা।

ননীবালা মেসেজ খোলেন, “আজ ফোন ধরলে না যে! শরীর ঠিক আছে তো ঠামি? পরে করছি আবার। বাবা-মার ছবি দেখতে চেয়েছিলে, দিলাম।”

চিতু ছবির তলায় লিখেছে, “বাবা নেই, মা আছে। আজ বাবার প্রয়াণদিবস। বাবা যেখানেই থাকুক, যেন শান্তিতে থাকে, প্রার্থনা কোরো ঠামি!”

নিজের অনুভূতি নিজের কাছেই অচেনা লাগল ননীবালার। আনন্দে চিৎকার করবেন, নাকি দুঃখে কাঁদবেন? নিরুদ্দেশ হয়ে কবে, কী ভাবে এ-সব হল, পুরনো কথা কি মনেও পড়ল না মৃত্যু অবধি! ফিরে আসবেন, এমন প্রত্যাশা প্রায় ছিলই না, কিন্তু পৃথিবীটা এক দিন এ ভাবে দুলে উঠবে, ভেবেছিলেন কি! সাদা সিঁথির অভ্যন্তরে লুকিয়ে রাখা সিঁদুরের ছোট্ট চিহ্নটা আজ মুছে যাবে চিরতরে। চিতুর বাবার ছবিটার দিকে তাকিয়ে উথালপাথাল ননীবালা করুণ গলায় বলে উঠলেন, “দেখাই যদি দিলে, তবে কেন থেকে গেলে সেই ধরাছোঁয়ার বাইরেই!”

ননীবালার কাছে চিতুর জায়গা পাল্টাতে পারত। কিন্তু হল উল্টো। মানুষটাকে হারিয়ে ফেলার হতাশা এত দিনে যেমন কিছুটা প্রশমিত হল, তেমনই তাঁকে না-পাওয়া দিনগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ছেলেটার জন্য একটা অন্য রকম টান অনুভব করলেন।

কিন্তু ওর ফোন এলে কি বলবেন, ‘যে ভাবে ঠামি বলে ডাকিস, এখন থেকে সেভাবেই বড়মা বলে ডাকিস!’ কথাটা মনে হতেই থেমে গেলেন। চিতু বাবার কতটা কী জানে, তিনি জানেন না। হঠাৎ এমন একটা কথা বললে কারণটাও বলতে হবে। মানুষটাকে নিয়ে নিজের কৌতূহলই কি দমন করতে পারবেন? এ-সব সে কী ভাবে নেবে, অনুমান করা কঠিন। কিন্তু এতে গড়ে ওঠা স্নেহের সম্পর্কটা যদি টাল খায়! ননীবালা চিতুকে হারাতে পারবেন না। তার চেয়ে যা আছে…আর ‘ঠামি’ তো ‘ঠাকুমা’ থেকেই…‘বড়’ কথাটা কী আর এমন…‘ঠাকুমা’র ওই একটু দূরের কথাটাতেই বা কী যায় আসে… শেষে ‘মা’ তো রয়েছেই!


এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
story

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy