‘যেয়ো না, রজনি, আজি লয়ে তারাদলে!
গেলে তুমি, দয়াময়ি, এ পরাণ যাবে!’
কাশ কি কোথাও তিথি ধরে ঝরে যায়? শিউলি কি নির্ঘণ্ট মেনে মৃদু গন্ধ মুছে নেয় ঘাসের পাপোশে? ইদানীং একেবারে পঞ্জিকা মত মেনেই কি আবহাওয়া নামে খেয়ালি বাবাটির নাগাল পাই? বর্ষার বুড়ির চুলের মতো দলা পাকানো কাঁদুনে মেঘ, শরতের কাছে দশ গোল খেয়ে কি মাঠ ছেড়ে দেয় সহজে? আমরা জানি এর প্রত্যেকটা উত্তর হবে না-বাচক। উল্টে বলবেন, এ কি পর্ণকুটিরে বসে থাকা ঋষিমুনির সময়, না নিয়মনিষ্ঠ তাসের দেশ, যে ছাপার অক্ষরের নিদান মেনে চলবে? এখন শরৎ থাকে শুধু ক্যালেন্ডারে। তার ইচ্ছেমতো আমরা চলি। সেও খানিক বিভ্রান্ত, হতচকিত। এই বুঝি তার নীলাম্বরী থেকে ছাইরঙা মেঘ ঝরল। এই বুঝি পশ্চিমের সীমান্ত পেরিয়ে, রাজস্থান হয়ে দুর্ধর্ষ দুশমনি উষ্ণতা পেড়ে ফেলল তাকে। রুক্ষ ধুলোয়, গা জোয়ারি বৃষ্টিতে, অকাল মেঘগর্জনে তার শিউলি ঝরানো, কাশ ওড়ানো মান-সম্মান কাদায় গড়াগড়ি। আমরা নিয়ম অনুগত, একেই শরৎ বলে মেনে নিই।
যেয়ো না, রজনি, আজি লয়ে তারাদলে!
কিন্তু তাকে তো আসতেই হবে, না হলে মন আলো করে দেবী দুর্গা মর্তে আসবেন কীভাবে? আগমনীর সঙ্গে সঙ্গে বিজয়ার বেদনায় পুনর্বার ফিরে আসার আশা না থাকলে উৎসবের মাধুর্য কোথায়? আমরা যারা সম্বছর পর্দার সামনে চমৎকার দু-চারটে ইঁদুর ধরায় রত বা সেই সুপ্রাচীন কলমই পিষে চলি, তারা দেবী দুর্গার, তথা কন্যে শারদার আগমন প্রত্যাশায় থাকি। মা দুর্গার সঙ্গে তাঁর পুত্রকন্যাদেরও আরাধনা হয়। সেখানে শারদার আহ্বানকে এবছর শারদোৎসব বলা যাবে কি না ভাবি।
দিনে দিনে বাহ্যিক আড়ম্বর, জাঁকজমকের তলায় যা তেমন ভাবে চোখে পড়ে না, পুজোর সেই সৌন্দর্যের দিকটি দেখলে বিস্মিত হতে হয়। এই তো সেদিনও বাঘাযতীন পার্কের পুজোয় আমরা, পাড়ার দুধভাতেরা, নর্দমার ধারে দু’টি পাতা একটি কুঁড়ির মতো তিন পর্বের দূর্বা তুলতে গিয়ে বড়দের কাছে বকুনি খেলাম। পাশের বোসবাড়ির সামনে দুটো নারকেল গাছ। তার তলায় গালচের মতো দূর্বার আচ্ছাদন। ওখানকার দূর্বা সজল, সতেজ। নর্দমা নয়! একেবারে বৃক্ষতল। মহানন্দে সেই ভেজা ঘাস তুলে আনার পর সন্ধ্যার দিকে দেখি, আমাদের বিশ্বভ্রামণিক মার্জারী তার উপরে জল ছিটোচ্ছেন! তত দিনে জেনেছি, বিড়াল জলবিয়োগের জন্যে একটা নির্দিষ্ট জায়গাই পছন্দ করে! বলা বাহুল্য, পুজোয় ওই নারকেলগাছতলা থেকেই দূর্বা গেছিল! সর্বজীবের আশ্রয়দাত্রী দেবী তাতে কিছু ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন বলে মনে হয়নি।
আর দেবীর পদ্ম? এত ফুল থাকতে একশো আটটি অপরূপ পদ্ম ছাড়া তাঁর পুজো হয় না। পদ্মদিঘির কাছে নিয়ে গিয়েছিল আমার মামাতো ভাই। মামার বাড়ি পূর্ণিয়ায়। তাৎমাটোলির ভিতর দিয়ে ঘন বাঁশবন পেরিয়ে পদ্মবনের কাছে গিয়ে থমকে গেছি। দিঘির এ মাথা ও মাথা, গোলাপির তলায় উঁকি দেওয়া ঈষৎ ঘিয়েরঙা চাদর বিছানো। মাঝে সবুজ গোল, চকচকে পাতার কারুকাজ। তার উপর ছবির মতো টলমলে জলবিন্দু। তবে জলে নেমে পদ্ম তোলা বড় সহজ নয়। শুঁয়োপোকার মতো কিলবিলে জোঁক ছাড়িয়ে কেউ এক জন দু’-তিনটে ফুল তুলে দিয়েছিল। এই ফুলের মালা আর অর্ঘ্যের কাছে স্বর্ণালঙ্কার ম্লান। পুজোমণ্ডপে কাঁচা বেলপাতার সুঘ্রাণ, শিউলি ও অন্য ছিন্ন পুষ্পের সুবাস, দেবীর গলায় পুষ্পমালা যেন সম্পূর্ণ উদ্যান বিভাগ। আমরা তখন মহানগরের ছোড়দা, মেজদার পুজো দেখিনি। দেখিনি জৌলুসময় স্বর্ণালঙ্কারের কুশ্রী প্রদর্শন। পুজোর ভাবগম্ভীর ভক্তির চেয়েও মাটি-সংলগ্ন সৌন্দর্যের ছড়াছড়ি মন টানত বেশি। এই স্বল্প আয়োজনের পূজার বিসর্জন ঘটত নিজের শহরে মহানন্দার তীরে। যদিও দশমীর দিন পূর্ণিয়ায় থাকায় মামার বাড়ির স্মৃতিই বেশি।
সেখানে শহর ছাড়িয়ে প্রায় দুলতে থাকা, পড়ো পড়ো লোহার ‘কাপ্তান পুল’-এর উপর দাঁড়াবার জায়গা পাওয়া দায়। নীচে কুশীর শাখা সৌরা নদী। ব্রিজ থেকে ছোট্ট দেখায় শ্মশান। দু’পাশের চরে কাশফুলে মৃদু আলো ঠিকরে যায়। আমরা কুচোরা বিকেলের দর্শক। ফলে তখনও ছোট পুজো বা দূর-দূরান্ত ছাড়া, শহরের বড় পুজোগুলো এসে পৌঁছয় না। সন্ধের পর রাত গড়ালে, হিন্দি বলয়ের উন্মুক্ত উচ্ছ্বাস উঠে আসবে। তখন আমরা পরপর বরিশালি আত্মীয়বাড়িতে বিজয়া করতে বেরোব। পুলের উপর অল্পক্ষণ দাঁড়াবার সৌভাগ্য হবে। পিছনের লোক সামনের লোক হওয়ার আগ্রহে আপনাকে ঠেলা মারতে শুরু করবে। একের পর এক প্যান্ডেলের পুজো নামছে। ওই ঘাট-সংলগ্ন ছোট্ট শ্মশানের দিকে তাকিয়ে মনে পড়ছে, সতীনাথ ভাদুড়ীর ইচ্ছে ছিল এই সৌরা নদীর ধারে শ্মশানে বিলীন হয়ে যাওয়ার। তাই গিয়েছিলেন তিনি।
বড় মামার কাছে শুনেছিলাম, পুজোর চাঁদা চাইতে গেলে বেশি অর্থ পাওয়া যেত না সেখানে। সে সব ছিল পুজোর আড়ম্বরের চেয়ে আন্তরিকতাকে গুরুত্ব দেওয়ার দিন। ভক্তির ছলে মানুষ নিজেকে দেবতার চেয়ে বড় মনে করত না। বিজয়ার প্রণাম ততক্ষণ করা যাবে না, যতক্ষণ না বিসর্জন হচ্ছে। আর বিসর্জন হয়ে যাওয়া মানে আগামী বছরের অপেক্ষা। পুজোর ছুটি শেষ হয়ে গেল। মামার বাড়ির ভারী মজা, শেষ হয়ে না হয় শেষ। কাপ্তান পুলে বিসর্জন মানে আগামী বছরে এমনই একটি দিনের অপেক্ষায় থাকা। দেবীর আগমনী থেকে বিজয়ার মাঝে থেকে যেত কত মন দেওয়া-নেওয়া। পুজোর শুরু মানে সম্ভাবনা, মধ্য মানে দুরুদুরু বক্ষে ঘটনার ঘনঘটা এবং বিজয়া মানে অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা নিয়ে মন ভরেও না ভরা। কিন্তু শেষ অবধি মনে হয়, যে চলে যায় সে আবার ফিরে আসে। হয়তো ‘সোনার কেল্লা’র মুকুলের মতো নয়। যে সূর্যাস্ত দেখলাম, তা তো ইহজন্মে আর দেখতে পাব না, যে বহুকাঙ্ক্ষিত হাত-ধরাটি ছিল, তা তো এই মুহূর্তের, আর ফিরে আসবে না কখনও। কিন্তু স্মৃতিতে ফিরে আসে সব। যে প্রবাহ আজ দেখেছি,তা আর নেই বলে মানুষ কি জলের কাছে যায় না?
বিজয়ার নাড়ুর গন্ধে, নিমকির স্বাদে যে শৈশব-কৈশোর চলে যায়, তা আদৌ যায় না কোথাও। এই তো চোখের সামনে, মা সারা বছরের সহযোগীদের নিয়ে নাড়ু বানাতে বসেছে। করতল গুড়ের নাড়ু গড়ার সময় ঈষৎ কালচে, আর চিনির নাড়ুর সময় ফটফটে সাদা। আমি আর বোন নারকেল তেল জবজবে, গোল হয়ে ওঠা নাড়ু, কাচের বয়ামবদ্ধ হওয়ার আগেই দু’চারটে পেয়ে যাই। তখন বিভূতিভূষণের ‘পুঁইমাচা’ গল্পের লোভাতুর ক্ষেন্তির সঙ্গে কোনও তফাত থাকে না আমাদের।
ওই তো দেখি, বাবা বিজয়া দশমীর প্রণাম সারতে চলেছেন জেঠুর বাড়ি, জেঠিমার সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা চলছে। চলছে অতীতের আরও অন্য অন্য বিজয়া দশমীর গল্প। আমি শুধু দিন গুনছি, ছুটি ফুরোচ্ছে, কিন্তু শারদসংখ্যাগুলি বাবার হাত থেকে উদ্ধার করা যাচ্ছে না।
ওই তো দেখি, বাবা বিজয়া দশমীর প্রণাম সারতে চলেছেন জেঠুর বাড়ি, জেঠিমার সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা চলছে। চলছে অতীতের আরও অন্য অন্য বিজয়া দশমীর গল্প। আমি শুধু দিন গুনছি, ছুটি ফুরোচ্ছে, কিন্তু শারদসংখ্যাগুলি বাবার হাত থেকে উদ্ধার করা যাচ্ছে না।
সে ছিল একদিন আমাদের...
এক সময় দুর্গাপুজো প্রধানত জমিদার, রাজপরিবার ও অভিজাত পরিবারের আয়োজনে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বিশ শতকের শুরুতে তার চরিত্রে বড় পরিবর্তন আসে। দুর্গাপুজো ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক আয়োজনের গণ্ডি পেরিয়ে সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়। পাড়ার মণ্ডপগুলি হয়ে ওঠে মানুষের মিলনক্ষেত্র; সেই পরিসরেই বিভিন্ন সময়ে বিপ্লবী ও জাতীয়তাবাদী কর্মীদেরও যোগাযোগ ও সংগঠিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
এই সময়ের দুর্গাপুজোয় ধর্মীয় আবেগের পাশাপাশি বাঙালির আত্মপরিচয়ের বোধও ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। এক দিকে এর মধ্যে হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রভাব ছিল, অন্য দিকে পাশ্চাত্য সাংস্কৃতিক প্রভাবের মুখে নিজের ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও স্বাতন্ত্র্যকে তুলে ধরার আকাঙ্ক্ষাও কাজ করেছিল। ফলে দুর্গাপুজো শুধু দেবী আরাধনার উৎসব হয়ে থাকেনি; তা হয়ে উঠেছিল বাঙালির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় নির্মাণেরও এক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। দুর্গাপুজোর ভিতরে থেকে গেছে বহুস্তরীয় এবং সর্বজনগ্রাহ্য উৎসবের আনন্দ। হিন্দুধর্মের বাইরের লোক, কিন্তু হিন্দু সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত কবিরা দুর্গা আবাহন, তার আগমনী ও বিজয়া পর্ব নিয়ে বহু লেখা লিখেছেন। বিজয়া দশমীর ‘চলে যাওয়া মানেই চিরবিদায় নয়’— উমার বাপের বাড়িতে ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাবর্তনের চক্রটি বাংলা সাহিত্যে বহু বার ব্যবহৃত হয়েছে। যা দিয়ে লেখাটি শুরু করেছি, সেই ‘বিজয়া দশমী’ কবিতাটি লিখছেন খ্রিস্টান হয়ে নিন্দিত মাইকেল মধুসূদন দত্ত। রবীন্দ্রনাথ ১৯২৬-এ লিখছেন—‘পরবাসী, চলে এসো ঘরে।’ জীবন থেকে যা চলে যায়, তা সব সময় চিরতরে হারিয়ে যায় না; কখনও কখনও তার ফিরে আসার জন্য শুধু একটি আহ্বান দরকার। কবিতাটির কেন্দ্রে রয়েছে ঘরে ফিরে আসার এক গভীর জীবনদর্শন। এখানে ‘পরবাসী’ শুধু দূরে থাকা মানুষ নয়, নিজের অন্তরের স্বাভাবিক আশ্রয় থেকে দূরে সরে গেছে যে, কবি তাকেও ফিরে আসার আহ্বান জানান। প্রকৃতিও সেই প্রত্যাবর্তনের জন্য প্রস্তুত— আকাশে-বাতাসে আমন্ত্রণ, ফুল, ফসলের প্রাচুর্য। ফলে ‘ফিরে এসো ঘরে’ হয়ে ওঠে পুনর্মিলন ও পুনর্জাগরণের প্রতীক। ১৯২৬ মানে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে মাত্র আট বছর আগে। যুদ্ধ শেষ হলেও পৃথিবী তখনও তার ক্ষত থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত নয়। ইউরোপে শান্তির কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে, জার্মানি সেই বছরই লিগ অব নেশনসে প্রবেশ করছে; অন্য দিকে ইতালিতে ফ্যাসিবাদ শক্তিশালী হচ্ছে, চিনে রাজনৈতিক সংঘাত তীব্র হচ্ছে, আর ব্রিটেনে শ্রমিক আন্দোলন সমাজের গভীর অসন্তোষকে সামনে নিয়ে আসছে। অর্থাৎ পৃথিবী যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক অবসানের পরেও এক অস্থির সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। যুদ্ধ মানুষকে তার নিজস্ব মানবিক সত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন করে। রবীন্দ্রনাথ সেই বিচ্ছিন্নতার বিপরীতে ঘরে ফেরার একটি মানবিক আহ্বান রাখছেন। এই ‘ঘর’ কোনও নির্দিষ্ট বাড়ি নয়— এটি হতে পারে মানুষের আপন সত্তা, মানবিকতা, ভালবাসা, মিলন এবং শান্তির ঘর। তাই ‘চলে যাওয়া’এখানে শেষ কথা নয়। পরবাসের পরেও ফিরে আসার সম্ভাবনা থাকে। বিজয়ার মতোই— বিদায়ের মধ্যেই ভবিষ্যৎ প্রত্যাবর্তনের প্রতিশ্রুতি।
১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের ২২ অক্টোবর দুর্গাপুজোর বিজয়া উপলক্ষে কলকাতা ‘ক’-এর প্রথম অধিবেশনে সকাল ন’টায় প্রচারিত হল গীতি-আলেখ্য। রচনা ও প্রযোজনা কাজী নজরুল ইসলাম। এক দিকে শ্বশুরবাড়িতে, কৈলাসে সবাই তাঁকে চাইছেন, ‘বিজয়োৎসব ফুরাইল মাগো, ফিরে আয় ফিরে আয়/ আনন্দিনী! গিরি-নন্দিনী! শিবলোকে অমরায়’, অন্য দিকে মর্ত্যবাসীর আকূল বেদনা, ‘মা ফিরে, যাস্নে জননী যাস্নে মা ফিরে/ যাস্নে জননী ধরি দুটি রাঙা পায়/ শরণাগত দীন সন্তানে ফেলি ধরার ধূলায়/ (মা) ধরি রাঙা পায়.../ মোরা অসহায়, তাই অধিকারী মাগো তোর করুণায়।’
তারও আগে মির্জা হোসেন আলী, অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতকের এই কবি উমার বিদায়ের বেদনা নিয়ে অত্যন্ত করুণ ও জনপ্রিয় বিজয়ার গান লিখেছিলেন। সৈয়দ জাফর আলী, তিনিও মা দুর্গার কৈলাসে ফিরে যাওয়ার আবহ তৈরি করে বিজয়া-সঙ্গীত রচনা করেছিলেন, যা তখনকার বাংলার হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে সমান সমাদৃত ছিল।
পরিমল ভট্টাচার্যের উপন্যাস ‘সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা’-য় দেখি পর্তুগিজ অ্যান্টনি ফিরিঙ্গির কথা।
‘কাকাতুয়া!’ বসন্ত বলল, ‘কাকাতুয়াটা গান গাইছে!’
‘এ যে অ্যান্টনি ফিরিঙ্গির গলা’ শাকম্ভরী দেবী উঠোনে এসে বললেন। ‘ফিবছর পুজো দালানে বসে মা দুর্গার আগমনী শুনিয়ে যেত ফিরিঙ্গি সাহেব, ছেলেবেলায় ঠাকুমার মুখে শুনেছি।’
এই উপন্যাসেই দেখি দুর্গাপুজোর সময় ব্রাহ্মণপাড়ায় এসে গানের বায়না পাচ্ছেন অ্যান্টনি।
‘ফিরিঙ্গির ব্যাটা পুজো দালানে বসে গান গাইছে, এই নিয়ে রক্ষণশীলদের দিক থেকে কোন বাধা আসেনি।’
অ্যান্টনি এদেশে বাধা পেলেন না। কিন্তু গল্প অনুযায়ী গোয়ায় পর্তুগিজ স্বদেশি বিশপের আদেশে তাঁর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে কুশপুত্তলিকা পোড়ানো হয়েছিল। যাকে কিনা বলে ‘জীয়ৎশ্রাদ্ধ’। অ্যান্টনি ‘রেশমি আচকান পরে মাথায় লাল পাগড়ি এঁটে সাদা ঘোড়ায় চেপে আসত... ভূমির উপর হাটু মুড়ে পদ্মাসনে বসতে পারতো না, এক পাশে পা ভাঁজ করে বাঈজিদের মতো বসতো। একতারা বাজিয়ে গলায় দরদ ঢেলে গান গাইত যখন ওর বন্ধ চোখের থেকে জলের ধারা নেমে তামারং দাড়িতে ফুটে থাকত শিশির বিন্দুর মতো।’
এই যে নির্দিষ্ট ধর্মের বাইরে বহু ধর্মের মানুষকে নিয়ে শুভ উৎসব, তা যেন আজ ম্লান হতে চলেছে। কোথাও তারটি ঠিক সুরে বাজছে না। শুধু মনে হয় ‘এখন সব অলীক’।
‘তিন দিন স্বর্ণদীপ জ্বলিতেছে ঘরে দূর করি অন্ধকার; শুনিতেছি বাণী’—
আমাদের মফস্সলগুলিতে পুজো আছে, সেজেগুজে পুজো দেখতে যাওয়া আছে, কিন্তু রাজধানীর মতো মেগা শো নেই। হারিয়ে যাওয়ার ভয় নেই। সুদূর উত্তরে, পাহাড়ের কোলে থাকা ছোট শহরে বসে কলকাতার বিসর্জন, বিজয়া, নীলকণ্ঠ পাখির উড়ে যাওয়ার কথা আমরা খবরের কাগজে পড়ি, গল্পে পড়ি। সালিম আলি সাহেবের বই খুলে ওই পাখি খোঁজার চেষ্টা করি। অকুলীন মফস্সলে কোথায় অমন প্রাচীন পুজো বা তার গেরামভারী ভাব? বাবা, কাকার কাছে শুনেছি সমতল থেকে পাহাড়ে ঠাকুর ওঠবার সময় গাড়ির নীচে বালি পেতে তাকে প্রায় শুইয়ে দিতে হত। খুব কৌশলে ধরে রাখতে হত। খাড়া পাহাড় আর চুলের কাঁটার মতো বাঁক ঘোরার সময় দেবীর পরিবারের ভারসাম্য রক্ষা বড় সহজ ছিল না। দু’-একটা পুজোয় পাবনা ফেরত পাল মহাশয়রা পাহাড়েই ঠাকুর গড়তেন। গঙ্গায়, ইছামতীতে নৌকোয় করে দেবী বিসর্জনের ছবি দেখি। জলের উপর বিষণ্ণ গর্জন তেল, গলে যাওয়া মুখমণ্ডল আর ঠোঁটে মিষ্টান্ন-মাখা অপরূপ মুখশ্রীর দিক থেকে চোখ সরত না।
পাহাড়ে কোথায় এমন গভীর জল? শরতের প্রায় প্রবাহহীন ঝর্নার ধারে খানিকটা জলের ছাঁট মেখে দেবীর বিসর্জন ঘটত। এখন শুনি পাহাড়ের ঠাকুরকে অনেক সময় সমতলে নামিয়ে বিসর্জন দেওয়া হয়। তা আমাদের পাহাড়ের নীচে সমতলের নদীতেও শরতে জল কোথায়? বরফ গললে আর উপরে বৃষ্টি হলে জল থাকে। স্বাভাবিক ভাবেই হাঁটু জলে দেবী সম্পূর্ণ ভাবে অদৃশ্য হয়ে যেতে পারেন না। তখনকার পাহাড়ি এলাকায় গাঢ় মেঘ কুয়াশামাখা অরণ্য ঝর্না পাথরের ধারে পড়ে থাকত তাঁর প্রাণহীন কাঠামো। বর্ষার উন্মুক্ত খরস্রোত নামা অবধি তিনি তার মাটি, কাঠের শরীর নিয়ে প্রকৃতি দেবীর মতো মিশে থাকতেন। মধ্যরাতে ভাল্লুক এসে পাশের চাটানে গড়িয়ে নিত, হরিণ চিবোতে আসত গাছের কচি ছাল, লেপার্ড তো বটেই, রাজকীয় ব্যাঘ্র মহাশয় স্বয়ং চলে আসতেন ঝর্নার ধারে। দেবী তখন তাদেরই এক জন। অপেক্ষা করছেন আগামী বছরে আর একটি মাটির শরীরে উপ্ত হয়ে মর্তে ফিরে আসার। যেভাবে প্রাণপ্রবাহ বয়ে চলে এ মরপৃথিবীতে।
পরিবারে পরিবারে গল্প শুনি। স্মৃতিকথা ও গল্পের বই জুড়ে এমন সব মধ্যবিত্ত নিম্নবিত্ত পুরুষ সদস্যের কথা শুনি, যাঁরা দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে গ্রামে ফিরছেন। অধিকাংশই থাকেন কলকাতায় মেসবাড়িতে, বাসা বাড়ির নানা হীন ও সঙ্কীর্ণ জীবনে। তাঁদের দেশ-গাঁ মানে এখনকার বাংলাদেশ। ফিরছেন তাঁরা বুক ফুলিয়ে। তখন তাঁরা পরিবারের কর্তা। পোঁটলা থেকে বেরোচ্ছে খোকা, খুকি, মা, বাবা, পিসিমা, দিদিমা, গিন্নির পোশাক, শাড়ি। শিয়ালদায় ট্রেন ধরছেন কেউ, কেউ বা নৌকোয়। পথ যত গ্রামের দিকে এগোয়, কাশের দল অভ্যর্থনা জানায়, চেনাজানা মানুষেরা হাত নাড়ায়। আশ্চর্য এই, একটা প্রজন্মের কাছ থেকে দুর্গাপুজোয় দেশে ফেরা, বিসর্জনের পর, পরের বছরের অপেক্ষায় কলকাতায় বা প্রবাসে ফিরে যাওয়া— এই দৃশ্যটা ছিনিয়ে নেওয়া হল। কলমের এক ষড়যন্ত্রে তাঁদের দেশ-গাঁ হয়ে গেল অন্য এক দেশ। তাঁদের দুর্গাদালান, মায়ের চক্ষুদান থেকে বিসর্জনের চেনা ঘাট, অজস্র আত্মীয়-পরিজন মুহূর্তে ‘নেই’ হয়ে গেল।
কিন্তু এক সম্পর্ক হারায়, ফিরে আসে আর এক। দেখেছি আমার উদ্বাস্তু বরিশালের মামার বাড়ির লোকেরা, এক পাড়া জুড়ে আর একটি বরিশাল তৈরি করে রেখেছে। সেখানে পাড়ার বাইরের ভাষা বিহারি হিন্দি হলেও ঘরে ঘরে ঠেট বরিশালী। উঠোনে বাতাবির বদলে জম্বুরা। ইচার চচ্চড়ি, কলইয়ের ডাল, ডউয়া, কাডাল নিয়ে আস্ত একটা ভূখণ্ড উঠে আসে, যা তাঁরা শৈশবে দেখেছে বা প্রায় কিছুই মনে নেই। ইতিহাস তাঁরা ফেরাতে পারবে না, কিন্তু বর্তমানকে অতীত স্মৃতির আদলে জীবন্ত রেখেছে। পরবর্তী প্রজন্ম সে ভৌগোলিক ভূমি স্বচক্ষে না দেখেও ফেলে আসা ভিটের জন্য গর্ব অনুভব করে, তার স্থান-পরিচয়ে নিজেদের চিহ্নিত করে। কত বছর তারা শুকনো ডাঙার মানুষ, অথচ শুঁটকি মাছের কথা তুললে বলে, ‘এই জোয়ারে রান্নাঘর অবধি জল আসে, খিড়কিতে ডিঙি বাঁধা, আমরা তাজা মাছ ছেড়ে শুকনো খাব কি মরতে?’
চারদিকে শুধু বিদায় ও ফিরে আসার খেলা। মানুষ তার কল্পনার জগতে চক্রাকারে ঘুরে আসা এই মধুর মিলন-বিচ্ছেদের দেশ তৈরি করেছে। বিদায় নেওয়ার কত যে মুহূর্ত! যে সম্পর্ক আজ অবিচ্ছেদ্য, কাল সে কোথায়? পুজো প্যান্ডেলে যে নীল হাফ সোয়েটারের দিকে তাকিয়ে মনে হবে বোতাম হয়ে বুকের কাছে থেকে যাই, চারটি শরৎ কাটিয়ে সে অনিশ্চিতের ঢেউয়ে কোথায় কে জানে! যে বুকপকেটের কলমের দিকে তাকিয়ে হৃদয় টলমল, সে কলম দেখি বন্দনা করে অন্যের! এই মুহূর্তে মনে যা জুড়ল, কাঁচা আঠার মতো জুড়ি জুড়ি ভাব হল, মনে হল এই আদি ও চিরন্তন, বিজয়া দশমীর বিসর্জনে সে চলে গেল কোন অজানায়? পরের পুজো অবধি টিকবে কিনা জানি না, কিন্তু অপেক্ষা থাকে অনন্ত। কঠিন সত্য হল, এই অপেক্ষা কোনও বিশেষের জন্য নয়। আধার বদলে গেলেও ভাবটি থাকে এক।
আগমনী থেকে বিজয়ার মধ্যে শুধু রামপ্রসাদ সেন গান লিখে যাননি, কবিস্বভাব বঙ্গযৌবন, কত যে হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগিয়ে যায়! ফুচকার গাড়ির সামনে তেঁতুল গোলায়, কটন ক্যান্ডির কিটকিটে মিষ্টিতে, রোলের গড়ানো সসে, মধ্যমগ্রাম, বারাসাত, আড়াই নম্বর গেট, দুর্গানগর থেকে সেই পর্ণশ্রী, বেহালায়, অভিজাতের পাশে অনভিজাত মণ্ডপ জুড়ে চলে মন ভাঙাগড়ার বিনিময়। আজকের প্রজন্মের ক্ষণিকের অতিথি, সিচুয়েশন শিপ, ন্যানো, মাইক্রো, ডিলিউশন যাই হোক না কেন, মোদ্দা কথা হৃদয় ভাঙা বা গড়া।ওঠাপড়া অক্ষত থাকে না মোটেই। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘উদাসীন সঙ্গম’, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের আসক্ত ও অনাসক্ত ‘ধ্রুব’ কবেই এসব আমাদের শিখিয়ে গেছে, শুধু খোপে খোপে নাম ভাগ হয়নি মাত্র।
বিজয়ার মূল সুর আসলে বিদায়-বেদনার মধ্যে ফিরে আসার আশ্বাস। কয়েকটি দিনের জন্য দেবী আসেন মর্তে— ঘর ভরে ওঠে আনন্দে, আলোয়, উৎসবে, আপনজনের সমাগমে। তার পর এক সময় তাঁকে বিদায় দিতে হয়। বিসর্জনের মুহূর্তে আনন্দের সঙ্গে মিশে থাকে গভীর বিষণ্ণতা। বিজয়ার সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা এখানেই— দেবী আবার আসবেন। বিসর্জনের জলে প্রতিমার অবয়ব মিলিয়ে গেলেও সম্পর্কটি শেষ হয় না। বিদায়ের সঙ্গে উচ্চারিত হয় ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি—‘আবার এসো মা।’ এই ‘আবার’ শব্দটির মধ্যেই জীবনের এক গভীর দর্শন লুকিয়ে আছে। মানুষের জীবনেও কত প্রিয় মানুষ, কত সম্পর্ক, কত সুন্দর সময় আমাদের ছেড়ে চলে যায়। কখনও তারা দূরে যায়, কখনও সময় তাদের মুছে দেয়, কখনও মৃত্যু এসে বিচ্ছেদকে চূড়ান্ত করে তোলে। তবু স্মৃতি তাদের ফিরিয়ে আনে— কোনও গান, কোনও গন্ধ, কোনও পুরনো পথ, কোনও উৎসবের আলোয়। আমরা পরিচিত জন, আত্মীয়বন্ধুকেও সাময়িক বিদায়ের সময়ে বলি, ‘আবার এসো’। এই আহ্বান আসলে মানুষের শেষ ভরসা, আশাবাদ। চোখের সামনে যাকে গড়ে তুললাম, পুজো করলাম, মুগ্ধ হলাম, তার গলিত খড়-কাঠামো চোখের সামনেই মিশে যাচ্ছে মাটিতে, তবু তো মন বিকৃত হয় না। ঠিক জানি, আমি থাকি বা না থাকি, এই পৃথিবীর শিউলি খসে পড়ার শব্দটুকু অনুভব করি বা না করি, কাশবনের ভিতর সরীসৃপের চলাচল কল্পনা করতে পারি বা না পারি, মনুষ্যত্বের আনন্দ উদ্যাপন নিয়ে বিজয়ার পর আগমনী আসবেই।