আমার জীবনের ভিতর রবীন্দ্রনাথের অজস্র কবিতা একই সঙ্গে বসবাস করে, যা প্রায় প্রত্যেক দিনই নতুন-নতুন ভাবে আমার সামনে এনে দাঁড়ায়। বলা ভাল, তাদের আমি আরও একটু চেনার চেষ্টা করি। তাকে চিনতে পারি কি সব সময়? ঠিক বলতে পারব না। কিন্তু চেনা-অচেনার ভেতর ছায়া-অন্ধকারে যে-রাস্তা এগিয়ে চলেছে, সেই রাস্তায় এগোলে দেখতে পাই, মনের যে-মাটি, তার বহু নীচ পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা আমারই অসংখ্য ও অপরিচিত মনকে।
যেমন, রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, “চির দিন আছি আমি অকেজোর দলে।/ বাজে লেখা বাজে পড়া/ দিন কাটে মিথ্যা বাজে ছলে”। এ কথা তিনি বলছেন কাকে? বলছেন, নিজের সম্পর্কে! লিখছেন কখন? ১৯৪১ সালের জানুয়ারি মাসে। তার কয়েক মাস পরেই কিন্তু উনি চলে যাবেন। যখন এ-কথা বলছেন রবীন্দ্রনাথ, তখন সারা পৃথিবীতে তিনি বিপুল ভাবে সমাদৃত। তখন তাঁর চারপাশে, সম্মানে, প্রতিষ্ঠায় তাঁর তুল্য আর কেউ নেই। অথচ, সারাজীবনটা পার করে এসে উনি ওঁর লেখাকে বলছেন: বাজে। সব কিছুকে মনে হচ্ছে ওঁর— মিথ্যা, ছল। ‘চিরদিন আছি আমি অকেজোর দলে’— তাহলে এই ‘অকেজোর দল’ কী? নিজের আজীবনের লেখা? বাংলা ভাষায় রবীন্দ্রনাথের মতো বড় কবি আর কেউ এসেছে কি? আমি অন্তত জানি না। সেই তিনি, নিজেকে এবং নিজের লেখাকে শেষ বয়সে বলেছেন, ব্যর্থ! লক্ষ করে দ্যাখো অভিরূপ, এই তিনটি লাইনে, কেবল ‘মিথ্যা’ শব্দটির মধ্যে ধ্বনির উচ্চাবচতা কী আশ্চর্যভাবে উপস্থিত রয়েছে। ‘চির দিন আছি আমি অকেজোর দলে/ বাজে লেখা বাজে পড়া, দিন কাটে মিথ্যা বাজে ছলে’। সারা জীবন পেরিয়ে এসে নিজেকে যখন ব্যর্থ মনে হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের, তখন সেই ব্যর্থতার প্রকাশ-ধ্বনিকে ধরে রাখছে এই ‘মিথ্যা’ শব্দটির ‘য’ফলার তীব্রতা। মিথ্যা শব্দটি একটি ঝাঁকি দেয়। কারণ দু’টি লাইনের মধ্যে এখানেই একমাত্র ‘য’-ফলা আছে। লক্ষ করো, ‘য’-ফলা-কে একটি ঝুলন্ত চাবুকের মতো দেখতে। আসলে ‘মিথ্যা’-র মধ্যেকার ‘য’-ফলাকে এক প্রকার চাবুকের মতো ব্যবহার করে যেন এখানে নিজেকেই প্রহার করছেন রবীন্দ্রনাথ। এই অতুলনীয় কাব্যশক্তি তাঁর শেষ জীবনের লেখার ভেতরেও কত আনায়াসে জাগ্রত হয়ে আছে, যখনই দেখতে পাই, বুঝতে পারি আবিষ্কারের আনন্দ আসলে কী!
যে লেখাটির কথা এক্ষুনি বললাম, তার কিছু দিন পরেই, ১৯৪১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, “পলাশ আনন্দ-মূর্তি জীবনের ফাল্গুনদিনের/ আজ এই সম্মানহীনের/ দরিদ্র বেলায় দিলে দেখা/ যেথা আমি সাথীহীন একা”। ফেব্রুয়ারি মাস, অর্থাৎ তখন চারিদিকে বসন্তকাল। মনে রাখতে হবে, এটাই রবীন্দ্রনাথের দেখা শেষতম ফাল্গুন। শেষতম, বসন্ত! আর, সেই বসন্তের ভেতর, নিজের ফুরিয়ে আসা জীবনের প্রান্তসীমায় পৌঁছে রবীন্দ্রনাথ দেখতে পাচ্ছেন, তিনি সাথীহীন। তিনি একা। জীবনকে ওঁর মনে হচ্ছে সম্মানহীনের দরিদ্রবেলা! আমি রবীন্দ্রনাথের মতো বড় নই। আমি সামান্য একজন ছাপোষা মানুষ। কিন্তু তাঁর মনের এই অবস্থানের সঙ্গে আমি এখন আমার নিজের সাদৃশ্য খুঁজে পাই। রবীন্দ্রনাথ দুটি শব্দ পাশপাশি রাখছেন— ‘সম্মানহীনের দরিদ্রবেলা’। প্রত্যেক মুহূর্তে যে-মন সম্মানহীন, তার সমগ্র বেঁচে থাকাকেই তো ঘিরে আছে ওই দরিদ্রবেলার রোদ!
এই লেখাও যেমন এখন এক সকালের রোদে বসে লিখে নিচ্ছ তুমি। সেরকমই একটা রোদ। তবে সকালের নয়। আগের কবিতায় রবীন্দ্রনাথ যে দরিদ্রবেলার কথা বললেন, এই রোদ তারই আত্মীয়। আমি যে রোদের কথা বলব তা ভরা দুপুরের। ভুল বললাম। দুপুর তো নয়। দুপুরের প্রেত! তুমি নিশ্চয়ই জানো, ১৯৪১ সালের এপ্রিল মাসে প্রকাশিত হয় রবীন্দ্রনাথের ‘জন্মদিনে’ নামক কাব্যগ্রন্থ। বইটির একটি কবিতায় রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, “পোড়ো বাড়ি শূন্য দালান/ বোবা স্মৃতির চাপা কাঁদন হুহু করে/ মরা-দিনের-কবর-দেওয়া ভিতের অন্ধকার/ গুমরে ওঠে প্রেতের কণ্ঠে সারা দুপুরবেলা।/ মাঠে মাঠে শুকনো পাতার ঘূর্ণিপাকে/ হাওয়ার হাঁপানি।/ হঠাৎ হানে বৈশাখী তার বর্বরতা/ ফাগুনদিনের যাবার পথে।” এর পর একটি ব্যবধান চিহ্নকে রেখে আবার বলছেন, “সৃষ্টিপীড়া ধাক্কা লাগায়/ শিল্পকারের তুলির পিছনে।/ রেখায় রেখায় ফুটে ওঠে/ রূপের বেদনা/ সাথীহারা তপ্তরাঙা রঙে।/ কখনও বা ঢিল লেগে যায় টুলির টানে;/ পাশের গলির চিক-ঢাকা ওই ঝাপসা আকাশতলে/ হঠাৎ যখন রণিয়ে ওঠে/ সংকেতঝংকার/ আঙুলের ডগার ’পরে নাচিয়ে তলে মাতালটাকে/ গোধূলির সিঁদুর ছায়ায় ঝ’রে পড়ে/ পাগলা আবেগের/ হাউই-ফাটা আগুনঝুরি।” এবার শেষে বলছেন, “বাধা পায়, বাধা কাটায় চিত্রকরের তুলি/ সেই বাধা তার কখনও বা হিংস্র অশ্লীলতায়/ কখনও বা মদির অসংযমে/ মনের মধ্যে ঘোলা স্রোতের জোয়ার ফুলে ওঠে/ভেসে চলে ফেনিয়ে-ওঠা অসংলগ্নতা/ রূপের বোঝাই ডিঙি নিয়ে চলল রূপকার/ রাতের উজান স্রোত পেরিয়ে/ হঠাৎ মেলা ঘাটে/ ডাইনে বাঁয়ে সুর-বেসুরের দাঁড়ের ঝাপট চলে/ তাল দিয়ে যায় ভাসান-খেলা শিল্পসাধনার।” তিরিশের একজন বিখ্যাত কবি, তাঁর অসামান্য ছন্দ বিশ্লেষণাত্মক গদ্যে এই লাইনটি লিখেছিলেন, তা তো আমরা ভুলে যাইনি, “মাত্রাবৃত্ত মুক্তক যদি একবার সম্ভব হয়ে থাকে, তবে তা বারবার সম্ভব হওয়ার পথে বাধা রইল কোথায়?” এ-কবিতায় রবীন্দ্রনাথ লিখছেন স্বরবৃত্তের মুক্তক! কবিতাটি পোড়ো বাড়ি থেকে শুরু হয়ে শেষ পর্যন্ত এসে পৌঁছল কোথায়? “ডাইনে বাঁয়ে সুর-বেসুরের দাঁড়ের ঝাপট চলে/ তাল দিয়ে যায় ভাসান-খেলা শিল্পসাধনার।” একেবারে এই জিনিসটাই অনেক পরে অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের কবিতায় আমরা ফিরে পাব, “আমার কাজ প্রতিবর্ণীকরণ/ ভোরের দিকে অতসী রঙা মেঘের,/ রাত্রিবেলার অভিমানের, আর/ মাল্লাদের দাঁড়ের ঝাপটের।” এই যে অলোকরঞ্জন লিখছেন “মাল্লাদের দাঁড়ের ঝাপটের”, ধ্বনির নৃত্যকে ধরে রাখতে রাখতে এই ছেড়ে দেওয়া, উনি শিখছেন কোথায়? “ডাইনে বাঁয়ে সুর-বেসুরের দাঁড়ের ঝাপট চলে/ তাল দিয়ে যায় ভাসান-খেলা শিল্পসাধনার।” অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের যে কবিতাটির কথা বললাম, তার কয়েকটি লেখা আগেই ছিল এমন লাইন, “আমি তোমার অনন্ত সবুজ/ শোষণ করে করে হব দূর্বাদলশ্যাম”। কবিতাটির নাম ‘মন্ত্র’। এখানেই, এই কবিতাতেই পাওয়া যাবে অলোকরঞ্জন কিন্তু স্বীকার করেছিলেন, “গুরু তোমার প্রার্থনার ভাষা/ আমার মতো আর কে এমন অযত্ন করেছে?” রবীন্দ্রনাথের কবিতার এইসব নিবিড় কারুধর্মকে গ্রহণ করে তাকে অলোকরঞ্জন যে নিজের কবিতায় নিজস্ব উপায়ে ব্যবহার করছেন— এ তো আমরা বুঝতেই পারি!
শুধু কি অলোকরঞ্জন? আর একটু যদি পিছিয়ে যাই? রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, “মরা-দিনের-কবর-দেওয়া ভিতের অন্ধকার/ গুমরে ওঠে প্রেতের কণ্ঠে সারা দুপুরবেলা/ মাঠে মাঠে শুকনো পাতার ঘূর্ণিপাকে/ হাওয়ার হাঁপানি”। ‘হাওয়ার হাঁপানি’ কথাটিকে খেয়াল করো, কেমন ভাবে শব্দটিকে ছেড়ে দিচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ। বহু পরে, ‘জল দাও’ কবিতায় বিষ্ণু দে লিখবেন, ‘হাওয়ায় হাঁপায়’। অর্থাৎ সকলেই রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে কিছু-না-কিছু গ্রহণ করছেন। এবং সে-কথা স্বীকার করেছেন কেউ কেউ। কেউ, করছেন না। তাতে কোনও ক্ষতি নেই। ক্ষতি মানে, রবীন্দ্রনাথ এতই বড় যে, এসবে আমার মতো সাধারণ পাঠকের কিছু যায় আসে না। এবং যে-মানুষ জাগতিক অর্থে সমস্তভাবে সফল হওয়ার পরেও নিজেকে বলতে পারেন, ‘অকেজোর দলে’ কিংবা সম্মানহীনের দরিদ্রবেলায় যার নিজেকে একা মনে হয়, তার কাছে এসব কিছুই নয়।
তবে, পাখিরা যেমন ফলফলাদি খুঁটে খুঁটে খায়, আমার তেমনই কবিতার ভেতর শব্দ ও তার বহুগামিনী অর্থকে খুলে-খুলে দেখার স্বভাব। এ বয়সে আর সেই স্বভাব পাল্টাই কী করে বলো? এই যে রবীন্দ্রনাথ কবিতাটির প্রথমে বলছেন, “মরা-দিনের-কবর-দেওয়া ভিতের অন্ধকার”— ‘মরা’, ‘দিনের’, ‘কবর’, ‘দেওয়া’ শব্দগুলিকে হাইফেন দিয়ে দিয়ে জুড়ে রাখছেন কেন উনি? তার কারণ, কবর যখন দিয়ে দেওয়া হয়, চাপ-চাপ মাটি তো তার ওপরে থাকে, তাই না? ওই সঙ্ঘবদ্ধতার জন্য, ওই মাটির ভার সহ্য করার জন্য এই হাইফেন। তারপর আছে, ‘ভিত’। ভিতকেও তো কবরই দেওয়া হয়। ভিতের উপর বাড়ি ওঠে ঠিক কথা। কিন্তু ভিত থাকে মাটির তলায়। অর্থাৎ, কবরে। “মরা-দিনের-কবর-দেওয়া”-র মধ্যে হাইফেন দিয়ে দিয়ে উনি বিপুল মাটি আমাদের চোখের সামনে জাগিয়ে তুলছেন। ভাবো, এর কত পরে সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখবেন, “তারপর যে-তে যে-তে যে-তে এক নদীর সঙ্গে দেখা’। সুভাষ, ‘যে-তে’-এ হাইফেন কেন দিচ্ছেন? কারণ একজন অনেকক্ষণ ধরে হাঁটছে... দীর্ঘ সময়ের সেই হাঁটার ধরনকে বোঝানোর জন্য ‘যে-তে’-এ হাইফেন ব্যবহার করছেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়। এই একই কাজ, রবীন্দ্রনাথ কত দিন আগেই করে গেছেন, ভাবলে আশ্চর্য লাগে!
এবার, কবিতাটির প্রথমের দিকে ফিরে যাই। “পোড়ো বাড়ি শূন্য দালান/ বোবা স্মৃতির চাপা কাঁদন হুহু করে/ মরা-দিনের-কবর-দেওয়া ভিতের অন্ধকার/ গুমরে ওঠে প্রেতের কণ্ঠে সারা দুপুরবেলা/ মাঠে মাঠে শুকনো পাতার ঘূর্ণিপাকে/ হাওয়ার হাঁপানি/ হঠাৎ হানে বৈশাখী তার বর্বরতা/ ফাগুনদিনের যাবার পথে।” এ লেখার, অনেক বছর পর, পঞ্চাশ দশকের একজন প্রধান কবি লিখবেন, “ওইখানে ওর রোদ পড়েছে, ওইখানে ওর ছায়া/ এক খানে জল অন্যখানে পা রেখেছেন হাওয়া/ কিন্তু সে কই?” বুঝতেই পারছ, এমন অভাবনীয় কবিতা শক্তি চট্টোপাধ্যায় ছাড়া আর কে লিখবে? আর একটু এগোনোর পরে, কবিতাটি বলছে, “শূন্য দালান মুখ বোজা মাঠ কোঠায় কোন সাহসে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্রি রোঁয়া ওঠা পুশ্যি কুকুর একটি মাত্র? তার পাহারার মানে যে নেই তাকে ভরিয়ে রাখার কঠিন সন্নিধানে তাই বলে কি পারে?” এই, এখানেই, আবারও, দেখা দিয়ে গেলেন রবীন্দ্রনাথ। শূন্য দালানের যে হাহাকার-ভরা অস্তিত্ব, তা শক্তি শোষণ করছেন, “পোড়ো বাড়ি শূন্য দালান/ বোবা স্মৃতির চাপাকাঁদন হুহু করে...” এখান থেকেই! হ্যাঁ, শক্তি চট্টোপাধ্যায় খুবই বড় কবি। কিন্তু এঁদের সবার সূচনা হচ্ছেন, রবীন্দ্রনাথ।
এতক্ষণ যে কবিতাটি বিষয়ে কথা বলছি, সেই কবিতা রবীন্দ্রনাথ লিখছেন ২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪১। সামান্য কিছু দিনের আয়ু তাঁর সামনে তখন পড়ে রয়েছে। কবিতার এই লাইনগুলির ভেতর ঠিক কী কী দেখতে পাচ্ছি আমরা? পোড়ো বাড়ি। শূন্য দালান। বোবা স্মৃতির কান্না। মরা-দিনের-কবর-দেওয়া সেই পোড়ো বাড়িটার যে-ভিত, সেই ভিতের ঘন অন্ধকার। ‘মরা-দিনের-কবর-দেওয়া’-র পরের লাইনে কী রয়েছে? ‘গুমরে ওঠে প্রেতের কণ্ঠে সারা দুপুরবেলা’। মনে করে দ্যাখো, শুরুতে, আমি এই দুপুরের রোদের কথাই বলছিলাম। যে-দুপুর আসলে একজন প্রেত। দুপুরবেলার প্রেত! বাহাত্তর বছর বয়সে পৌঁছে, আমি নিজেকে এক দুপুরবেলার প্রেত হিসেবেই ভাবি এখন! আমার জীবন আজ ঠিক ওই পোড়ো বাড়ি, ওই শূন্য দালানের মতোই। “ডাইনে বাঁয়ে সুর-বেসুরের দাঁড়ের ঝাপট চলে/ তাল দিয়ে যায় ভাসান-খেলা শিল্পসাধনার।” রবীন্দ্রনাথের এ-কবিতার উপসংহারে পৌঁছব সে ক্ষমতা কি আমার আছে? তা তো নেই। কিন্তু আমার কথা তিনি এইভাবে, কবিতায় বলে গেছেন!
যেমন, আর একটি জায়গায় আমি আমার কথা খুঁজে পাই, “বুঝিলাম, এ মিলন ঝড়ের মিলন,/ কাছে এনে দূরে দিল ঠেলি/ ক্ষুব্ধ মন/ যতই ধরিতে চাই, বিরুদ্ধ আঘাতে/ তোমারে হারায়ে হতাশ্বাস/ তব হাতে/ দাক্ষিণ্য যে নাই, শুধু শিথিল পরশে/ করিছে কৃপণ কৃপা। কর্তব্যের বশে/ যে-দান করিলে তার মূল্য অপহরি/ লুকায়ে রাখিলে কোথা/ আমি খুঁজে মরি/ পাই নে নাগাল। শরতের মেঘ তুমি/ ছায়া মাত্র দিয়ে ভেসে যাও/— মরুভূমি/ শূন্য-পানে চেয়ে থাকে পিপাসা তাহার/ সমস্ত হৃদয়ব্যাপী করে হাহাকার।” পরের মুভমেন্টে কী বলছেন? “ভয় করিও না মোরে।/ এ করুণাকণা/ রেখো মনে— ভুল করে মনে করিয়ো না/ দস্যু আমি, লোভেতে নিষ্ঠুর/ যেন মোরে/ প্রেমের তাপস/ সুকোঠর ব্রত ধ’রে/ করিব সাধনা/ আশাহীন ক্ষোভহীন/ বহ্নিতপ্ত ধ্যানাসনে রব রাত্রিদিন।/ ছাড়িয়া দিলাম হাত।/ যদি কভু হয়/ তপস্যা সার্থক, তবেই পাইব হৃদয়।/ না-ও যদি ঘটে, তবে আশাচঞ্চলতা/ দাহিয়া হইবে শান্ত। সেও সফলতা।” কবিতার প্রথমে রবীন্দ্রনাথ বলছেন, “বুঝিলাম, এ মিলন ঝড়ের মিলন”। অর্থাৎ এ মিলন আকস্মিক। পূর্ব পরিকল্পনায় যেন ছিল না। অন্তত আমার জীবনে এমন একাধিকবার ঘটেছে। অন্য কেউ এ কবিতার অন্য অর্থ করতে পারেন। সে স্বাধীনতা তাঁর আছে। কিন্তু আমার কাছে এ কবিতা এমন ভাবেই আসে। “কাছে এনে দূরে দিল ঠেলি”— অর্থাৎ তারপর আর সম্পর্কটা থাকল না। দূরত্ব তৈরি হল। এমন তো আমাদের কত মানুষের জীবনেই ঘটেছে। তাই না, বলো? মন ক্ষুব্ধ, বারবার সেই আকস্মিক ঘটে যাওয়া মুহূর্তটিকে ধরতে গিয়ে বিফল হচ্ছে। কারণ, তা হঠাৎই ঘটেছিল। এবং আর ঘটবে না। তাই, “বিরুদ্ধ আঘাতে/ তোমারে হারায়ে হতাশ্বাস।” এরপরই কবিতাটি বলছে, “তব হাতে/ দাক্ষিণ্য যে নাই, শুধু শিথিল পরশে/ করিছে কৃপণ কৃপা। কর্তব্যের বশে/ যে-দান করিলে তার মূল্য অপহরি/ লুকায়ে রাখিলে কোথা”। এখানে আমাদের মনে পড়ে, উৎপলকুমার বসুর একবিংশ শতাব্দীতে একটি ছোট্ট কবিতায় লেখা ‘দাতার ধিক্কার’ কথাটিকে। যিনি দান করছেন, তিনি নিশ্চয়ই মহৎ। কিন্তু তাঁর দানের সঙ্গে ধিক্কারও আছে। সে কি আমি জীবনে দেখিনি? সেই দেখাকে মাত্র দুটি শব্দে প্রকাশ করলেন উৎপল। আর, উৎপলের কবিতার বহু আগেই, রবীন্দ্রনাথের এ কবিতাও, সেই একই কথা প্রকাশ করছে দুটি শব্দে— ‘কৃপণ’ ও ‘কৃপা’। এখানে আমরা অতিরিক্ত যা লাভ করছি তা হল হল ‘কৃপণ’ ও ‘কৃপা’-র মধ্যেকার গোপন অনুপ্রাস! মাদার টেরিজা যখন নোবেল পুরস্কার পেলেন, সেই পুরস্কার-প্রাপ্তির অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, “যিনি দান করছেন, তাঁর কর্তব্য হচ্ছে প্রাপকের সমভূমিতে এসে দাঁড়ানো। তা নইলে সেই দানের মধ্যে অহঙ্কার প্রকাশ পায়।” কার্ল মার্ক্স বৈজ্ঞানিক যুক্তির মাধ্যমে যে শ্রেণিবিভাজনের কথা বলেছিলেন, এই কবিতাটি প্রেমসম্পর্কের মধ্যেও দাতা-গ্রহীতার সেই শ্রেণিবিভাজনকেই যেন প্রবেশ করিয়ে দিচ্ছে।
আরও একটি কথা, খেয়াল করে দ্যাখো এই কবিতায় ‘মরুভূমি’ শব্দটি একবারই আছে, তার আগে আছে একটি ড্যাশ। কেন এই ড্যাশ? কারণ, মরুভূমি হল এক বিস্তৃত, প্রায় সীমানাবিহীন বালু-সমুদ্র। ড্যাশ দিয়ে তার বিস্তৃতিকেই যেন প্রকাশ করা হল। এই মরুভূমি তাকিয়ে আছে শূন্যের দিকে। এবং “পিপাসা তাহার/ সমস্ত হৃদয়ব্যাপী করে হাহাকার।” এখানে শেষ হল কবিতার প্রথম মুভমেন্ট।
দ্বিতীয় মুভমেন্ট যখন জেগে উঠছে তা নিয়ে আসছে এক নাট্যধর্মকে, যেখানে কোনও প্রেমের তাপস আজ সুকঠোর তপস্যা করতে চাইছে। একদিন ঝড়ের মতো ঘটে গিয়েছিল মিলন। সেখানে ফিরে যাওয়ার চেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছে— তা আমরা প্রথমেই দেখেছি। তার ভেতরে এখন আর কোনও আশা নেই। ক্ষোভ নেই। বহ্নিতপ্ত ধ্যানাসনে সে শুধু রাত্রিদিন উপবিষ্ট।
এরপরেই আমার জীবনে যা বারবার ঘটেছে এরকম একটি অংশ এ কবিতা আমাকে বলে দেয়। যখন প্রথম পড়েছিলাম তখন অবশ্য বলেনি। আজ এই বাহাত্তর বয়সে বলছে। কবিতার একটি লাইনের অর্ধাংশ, একটিমাত্র বাক্য— যাকে বিশেষভাবে লক্ষগোচর করার জন্য আগে-পরে কোনও স্পেস নেই। খুব স্বাভাবিকভাবেই বাক্যটিকে কবিতার মধ্যে রাখা রয়েছে। কিন্তু সে বাক্যটি মারাত্মক। অন্তত আমার কাছে। কী সেই বাক্য? তা হল: “ছাড়িয়া দিলাম হাত”, তারপর পূর্ণচ্ছেদ। যতিচিহ্ন নিজে কথা বলে, তা তো তুমি জানোই অভিরূপ! আমার জীবনে এমন কতবার ঘটেছে, যে, আমি কোনও সম্পর্ক থেকে, কোনও বন্ধুত্ব থেকে সরে এসেছি সাইলেন্টলি। কিচ্ছু বুঝতে না দিয়ে। নীরব হতে হতে কখন সেই মানুষটার সমস্ত সীমানার বাইরে চলে গেছি। স্টেপ আউট করে গেছি। এ-কবিতায় এভাবেই একটি শব্দ আছে, “আশাচঞ্চলতা/ দাহিয়া হইবে শান্ত।” অর্থাৎ পুড়ে পুড়ে শান্ত হয়ে যাবে। এই স্টেপ আউট করে যাওয়ার আগে কি একটা দহনপর্ব ছিল না? ছিলই তো! আর, এই নিঃশব্দ সরে আসা, এও কি এক সফলতা নয়? এই ‘আশাচঞ্চলতা’র কথা যদি ভাবি, তাহলে এই দুটি শব্দ, ‘আশা’ এবং ‘চঞ্চলতা’কে এক করে রবীন্দ্রনাথ এখানে একটি শব্দ উৎপন্ন করলেন। ‘আশা’ মনোভাবটির ভেতরেই একটি চঞ্চলতা থাকে। কোনও কিছু প্রাপ্তির জন্য চঞ্চলতা। আর একজন কবি, যিনি বাংলায় সম্পূর্ণ নতুন কাব্যভাষা নিয়ে এসেছেন, তাঁর প্রয়োগের মধ্যে আমি লক্ষ করি, “ত্রাসক্ষমতার নীচে যমছুরি” অথবা, “হুরী-নিশ্চেতনা চেয়েছিল পাখি-কথাবলা”— এই রকম যুগ্ম শব্দের একীকরণ। তিনি, উৎপলকুমার বসু। কিন্তু সূচনায় কে দাঁড়িয়ে আছে? রবীন্দ্রনাথ!
আর একটি কবিতা না বলে পারছিই না। “ও গো মোর না-পাওয়া গো, কখন আসিয়া সঙ্গোপনে/ আমার পাওয়ার বীণা কাঁপাও অঙ্গুলিপরশনে।” এর মধ্যেও, আমি আমার নিজের জীবনের একটি প্রণয়চিতাগ্নিকে সারাক্ষণ জ্বলে থাকতে দেখি। একজনকে মনে করো চরম ঘনিষ্ঠতায় পাচ্ছ। সেও পাচ্ছে তোমাকে। ঠিক এই রকম সময় তোমার মনে হচ্ছে, যাকে পেতে পেতেও তুমি পাওনি কখনও— ধরো ঠিক সময় দরজায় একটা বেল বেজেছিল, কোনও আগন্তুক এসে পড়েছিলেন। আর তোমাদের মুহূর্ত, পরিপূর্ণতা পায়নি— সেই পাওয়ার পরিবেশ পরবর্তী সময়ে আর ফিরেও আসেনি কখনও! কিন্তু সেই না-পাওয়া, আর একজনকে পাওয়ার আশ্লেষ তীব্রতার মধ্যেও সেই না-পাওয়ার পরিতাপ ঢুকে পড়ছে। এ কি হয়নি? তোমার কিংবা আমার? অথবা, সংখ্যাহীন নারী-পুরুষের?
এভাবে রবীন্দ্রনাথের কবিতা নিয়ে বলতে বলতে আমার বলা কখনও শেষ হবে না। কিন্তু তুমি তো জানো, আমার জীবন আমি রবীন্দ্রকাব্যের মধ্যে দিয়ে নিয়ে যেতে যেতে একদিন শেষ করে দিতে পারি। দুপুরের এই প্রেত তখন পিণ্ড লাভ করবে!
সাক্ষাৎকার-ভিত্তিক অনুলিখন:অভিরূপ মুখোপাধ্যায়