গোড়ায় যেটুকু বলার
মাফিয়া। ছোট এই শব্দটা আজকাল খবরের কাগজে, নিউজ় চ্যানেলে অথবা সিনেমার পর্দায় চোখ রাখলে প্রতিদিন অন্তত বেশ কয়েক বার শুনতে পাওয়া যায়। মাফিয়া মানে একটা ভয়ঙ্কর ব্যাপার, কথায় কথায় মারদাঙ্গা, জুলুম, তোলাবাজি, গুলিগোলা, খুন-জখমের মতো ভয়াবহ অপরাধ— আমাদের চার পাশে বেশির ভাগ মানুষই কিন্তু এ সব মিলিয়ে-মিশিয়ে একটা ধোঁয়াশা মতো ধারণা নিজেদের মধ্যে পোষণ করে থাকেন। কিন্তু এর পিছনের সুদীর্ঘ, প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে অবহিত নন প্রায় কেউই। ফলে বহু সাদা-কালো ঠিক-ভুল গায়ে গা লাগিয়ে মিশে থাকে সেই ধারণার বৃত্তে। এদিকে আমার যে-হেতু এই বিষয়টা নিয়ে বহুকাল ধরেই আগ্রহ বা উৎসাহের শেষ নেই, তাই মনে হল, অতীব রহস্যময়, ভয়ঙ্কর বিপজ্জনক, নিজস্ব কিছু গোপন এবং একই সঙ্গে কঠিন নিয়মশৃঙ্খলা মেনে চলা এই জগৎটা ও তাদের কুশীলব সম্পর্কে বিশদে কিছু বলা দরকার। টান মারা প্রয়োজন এর দীর্ঘ ইতিহাসের সুতো ধরে। যাওয়া দরকার ‘মাফিয়া’ শব্দটির উৎস সন্ধানে। সে কাজে কতটা সফল হব জানি না, তবে আন্তরিক, সচেষ্ট এবং তথ্যনিষ্ঠ থাকার চেষ্টা করব যথাসম্ভব, এটুকু কথা দিতে পারি।
প্রথমাংশ: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
কোসা নস্ত্রা
মাফিয়া। সংগঠিত অপরাধচক্র। যার উত্থান বা পথ চলা শুরু উনিশ শতকের গোড়ায়, ইটালির সিসিলি দ্বীপপুঞ্জে। মূল ভূখণ্ড থেকে দূরত্ব এবং সে কারণে শিথিল শাসনব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে বেড়ে উঠতে থাকে ভয়ঙ্কর এই ক্রাইম সিন্ডিকেট। প্রাথমিক স্তরে বৃহৎ জমিদার ও ভূস্বামীদের ভাড়াটে সৈন্যবাহিনী হিসেবে কাজ শুরু করলেও, পরে আরও বহুবিধ অপরাধের ক্ষেত্রকে নিজেদের পেশা বা জীবিকা হিসেবে বেছে নেয় এরা। যার মধ্যে অন্যতম জলপাই তেলের কালোবাজারি, চাষের জলের কুয়োগুলোর দখল নেওয়া, পেশাদারি খুন, মাদকের কারবার, তোলাবাজি ইত্যাদি।
প্রথম দিকে সাংগঠনিক স্তরে কিছুটা ঢিলেঢালা ভাব থাকলেও, খুব দ্রুত অত্যন্ত শৃঙ্খলাপরায়ণ এবং সঙ্ঘবদ্ধ এক ‘ক্রাইম কার্টেল’ বা অপরাধী সমবায় হিসেবে এরা প্রতিষ্ঠিত করে নিজেদের। সমগ্র সিসিলির প্রতিটি এলাকা আলাদা আলাদা ভাবে চলে যায় এক-একটা মাফিয়া গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে। ‘ফ্যামিলি’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে গোষ্ঠীগুলো। পদমর্যাদা অনুযায়ী পরিবারের প্রধান ‘ডন’। আইনি পরামর্শদাতা ‘কনসিলিওরি’। ডনের মূল সহচর বা ডান হাত ‘কাপোরিজিমি’ বা আন্ডারবস। সাধারণ সদস্য— কাপো বা ডেগো। মোটামুটি এই ছিল পরিবার বা গোষ্ঠীর বিন্যাস।
নানাবিধ নামে সমাজে নিজেদের পরিচয় দিত মাফিয়ারা। যেমন ‘ম্যান অব অনার’, ‘ল এনফোর্সার’, ‘ব্ল্যাক হ্যান্ডস’ ইত্যাদি। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে এদের পরিচিতি ছিল সংগঠিত দুর্বৃত্ত গোষ্ঠী হিসেবেই।
আগেই বলেছি, দলীয় শৃঙ্খলার ব্যাপারটা কঠোর ভাবে মেনে চলা হত প্রত্যেকটি মাফিয়া ‘ফ্যামিলি’ বা পরিবারে। আর সেই শৃঙ্খলার সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রধান শর্ত ছিল দু’টি— প্রথমত, ওমেত্রা, অর্থাৎ দল বা সংগঠনের গোপনীয়তা বজায় রাখতে হবে যে কোনও শর্তে। কোনও রকম চাপ বা অত্যাচারের কাছেই মাথা নোয়ানো, বলা ভাল মুখ খোলা চলবে না কিছুতেই। পরিবর্তে আজীবন সেই সদস্য এবং তার পরিবারের সমস্ত দায়িত্ব বহন করবে ‘ফ্যামিলি’। আর এর উল্টোটা ঘটলে সেই সদস্য এবং তার পরিবারের প্রত্যেকের জন্য একটিই শাস্তি নির্ধারিত— মৃত্যুদণ্ড! দ্বিতীয়ত, কোসা নস্ত্রা। যার অর্থও ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে মোটামুটি একই— ‘এটা একান্তভাবেই আমাদের নিজস্ব বিষয়।’ বাইরের কেউই এর ভিতরে প্রবেশ করতে পারবে না। বিপরীতে কেউ দলের অভ্যন্তরীণ কোনও তথ্য বাইরে ফাঁস করতে পারবে না। এই কৃতকর্মের শাস্তির ব্যাপারটা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। কঠোর এই শৃঙ্খলার প্রাচীর ভেঙেছিল বহুকাল বাদে। আশির দশকে। যথাসময়ে বিষয়টি বিশদে আলোচিত হবে। ফলে আপাতত প্রসঙ্গান্তরে যাই।
মাফিয়া! মাফিয়া!
সিসিলি ও তার অন্তর্গত পালেরমো অঞ্চল ছাড়াও অনতিদূরে আর একটি দ্বীপপুঞ্জ। নাম নেপলস। মাফিয়াদের অনেক আগেই, প্রায় সপ্তদশ শতকের মধ্যভাগ থেকেই সেখানে উত্থান ঘটেছিল আর এক দুর্বৃত্ত গোষ্ঠীর— ‘কামোরা’। যে-হেতু নেপলসের কামপোনিয়া অঞ্চলে প্রথম আত্মপ্রকাশ, ফলে ‘কামোরা’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে এই দুর্বৃত্তরা এবং অনতিবিলম্বেই একাধিক গোষ্ঠীতে ছড়িয়ে পড়ে নেপলসের সর্বত্র। কার্যকলাপ হুবহু মাফিয়াদের মতোই। এক দিক থেকে দেখতে গেলে মাফিয়াদেরই বরং কামোরাদের সফল উত্তরসূরি বলা চলে। তবে মূলগত স্তরে সামান্য কিছু ফারাক ছিল। আর সেটা নামকরণে। কোনও মাফিয়া গোষ্ঠীর প্রধান ও সেই গোষ্ঠী পরিচিত হত যথাক্রমে ‘ডন’ ও ‘ফ্যামিলি’ নামে, বিপরীতে কামোরা-প্রধান ও গোষ্ঠীর পরিচয় ছিল যথাক্রমে ‘বস’ এবং ‘ক্ল্যান’। মাফিয়াদের মতো ‘কামোরা’ সমাজেও চূড়ান্ত শৃঙ্খলা এবং যে কোনও অবস্থাতেই গোপনীয়তা বজায় রাখা, এই দুটি শর্ত মেনে চলা হত অত্যন্ত কঠোর ভাবে। মাফিয়াদের মতোই সেখানে আনুগত্য মেনে চলা মানে পরিবার বা গোষ্ঠীর তরফে আজীবন নিরাপত্তা, আর অন্যথা মানে মৃত্যুদণ্ড!
আগেই উল্লেখ করেছি, মাফিয়ারা নিজেদের পরিচয় দিত একাধিক নামে। এবার যাওয়া যাক তাদের নামকরণের উৎস সন্ধানে। প্রসঙ্গত জানানো দরকার, বিভিন্ন সময় আরব, ফরাসি-সহ একাধিক বিদেশি শাসকের শাসনাধীন ছিল এই দুই দ্বীপপুঞ্জ। ফলে সেই সমস্ত ভাষার প্রভাব পড়েছিল মাফিয়াদের নামকরণেও। বাংলায় যার অর্থ ‘ডাকাবুকো’, ‘মধ্যস্থতাকারী’, ‘সাহসী’, ‘ন্যায় প্রতিষ্ঠাকারী’, ‘সেনাবাহিনী’, ‘সবলের হাত থেকে দুর্বলকে রক্ষাকারী’ ‘পুষ্পশিশু’ ইত্যাদি। আবার দীর্ঘ আরব শাসনকালে স্থানীয় বেশ কিছু শক্তিশালী পরিবার আরব-নৃপতিদের কর্তৃত্ব অস্বীকার করে দুর্গম পাহাড়-জঙ্গলে গিয়ে আশ্রয় নেয় এবং সেখান থেকে গেরিলা কায়দায় দখলদার বিদেশি শাসকদের বিরুদ্ধে লড়াই চালাতে থাকে। আরবি-ইটালিয়ান অপভ্রংশ উচ্চারণে ‘আশ্রয়’ শব্দের আর এক নাম ‘মাফিয়া’। ফলে বহু অপরাধ-ইতিহাসবিদ এই তথ্যটিকেও ‘মাফিয়া’ নামকরণের মূল উৎস বলে মনে করেন। তবে এর বাইরেও নামকরণের দু’টি ইতিহাস যেমনই অভিনব, তেমনই চমকপ্রদ। সে প্রসঙ্গেই আসছি এবার।
সালটা ১২৮২। সিসিলির বুকে চলছে ফরাসি বুরবোঁ সাম্রাজ্যের শাসন। চরম স্বৈরতান্ত্রিক, অত্যাচারী আর দমন-পীড়নমূলক সেই শাসনব্যবস্থা। স্থানীয় জনসাধারণের উপর শোষণ আর অত্যাচার চালানোর নিত্যনতুন ফন্দিফিকির খুঁজে বার করায় সিদ্ধহস্ত ছিল এই বিদেশি শাসকরা। এই নির্মম জুলুম আর শোষণ এক দিন তার সর্বোচ্চ সীমা অতিক্রম করে গেল ‘প্রেয়ার ট্যাক্স’-এর হাত ধরে। প্রেয়ার ট্যাক্স। হুবহু এ দেশে ঔরঙ্গজেব শাসনে তীর্থযাত্রীদের উপর চাপিয়ে দেওয়া জিজিয়া করের মতোই এক ভয়ঙ্কর কানুন। এই কানুন অনুযায়ী স্থানীয় গির্জাগুলোয় প্রার্থনা করতে গেলে বিদেশি শাসকদের কর দিতে হবে সিসিলির জনসাধারণকে।
এমনিতেই ইটালি থেকে বিচ্ছিন্ন এই দ্বীপপুঞ্জের মানুষ মূল ভূখণ্ডের অধিবাসীদের তুলনায় অর্থনৈতিক ভাবে অনেক বেশি দরিদ্র ও পশ্চাৎপদ। ফলে এই প্রার্থনা কর তাদের কাছে হয়ে দাঁড়াল অনেকটা ওই গোদের উপর বিষফোড়ার মতো। তার সঙ্গে পরাধীনতার গ্লানি ও ক্ষোভ তো ছিলই। এই সব কিছুর সম্মিলিত বিস্ফোরণ ঘটে গেল এক দিন।
১২৮২ সালের এপ্রিল মাস। সিসিলির পালেরমো অঞ্চলের এক অপরূপা সুন্দরী কন্যা, নাম নাইজেলা ভিনেত্তি। বয়স মাত্র আঠেরো। বিধবা মায়ের সঙ্গে গির্জায় যাচ্ছিল ইস্টার সপ্তাহের প্রার্থনা জানাতে। গির্জায় ঢোকার মুখে তাদের পথ আটকায় বুরবোঁ সেনাবাহিনীর পাহারাদাররা। কর আদায়ের জন্য ক্রিসমাস, গুড ফ্রাইডে, ইস্টার, রবিবার এই সব দিনগুলো বেছে নিত ওরা। কারণ ওই বিশেষ দিনগুলোয় গির্জায় ভক্তসমাগম হয় সবচেয়ে বেশি। এদিকে নাইজেলার হতদরিদ্র মায়ের হাতে কর দেওয়ার পয়সা নেই। কিন্তু মা ও মেয়ে দু’জনেই বদ্ধপরিকর, ইস্টার প্রেয়ারের জন্য তারা চার্চে ঢুকবেই। অন্য দিকে প্রহরীরাও তাদের জেদে অটল। কর না দিয়ে কিছুতেই চার্চে ঢুকতে পারবে না ওই দু’জন। তর্ক, বাকবিতণ্ডা— পরিস্থিতি আয়ত্তের বাইরে চলে যেতে থাকে ক্রমশ। বিতণ্ডার মাঝখানেই ধৈর্য হারিয়ে নাইজেলার মাকে চপেটাঘাত করে বসে প্রহরীদের এক জন। ব্যস! এই একটি ঘটনাই স্থানীয় মানুষের মনে জমে থাকা এতদিনকার ক্ষোভের বারুদে আগুন ছুঁইয়ে দেয়। মুহূর্তে প্রহরীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে গির্জায় প্রার্থনার জন্য সমবেত বিশাল জনতা। বিপুল জনরোষে কিছুক্ষণের মধ্যেই মৃত্যু হয় প্রহরীদের। ইতিমধ্যে ঘটনাস্থলে এসে হাজির হয় বিশাল এক সেনাবাহিনী। সঙ্গীদের মর্মান্তিক পরিণতি দেখে ক্রোধোন্মত্ত হয়ে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ শুরু করে তারা। হতাহত হন অসংখ্য মানুষ। এসবের মাঝখানেই নাইজেলাকে চার্চের পিছনে তুলে নিয়ে গিয়ে গণধর্ষণ চালায় এক দল সেনা। চরম সন্ত্রস্ত, অসহায় নাইজেলার মা পালেরমোর রাজপথ ধরে আর্তনাদ করতে করতে ছুটতে থাকেন “মা-ফিয়া! মা-ফিয়া!” (আমার মেয়ে, আমার মেয়ে) বলে। পরমুহূর্তেই সেনাবাহিনীর বন্দুক থেকে ছুটে আসা বুলেট স্তব্ধ করে দেয় অসহায় ওই নারীর কণ্ঠস্বর। অতঃপর অপমানে আত্মহননের পথ বেছে নেয় ধর্ষিতা নাইজেলাও। আর এখানেই এক নতুন মোড় নেয় সিসিলির অপরাধ-ইতিহাস।
নাইজেলার প্রেমিকের নাম ছিল ভিত্তোরিয়ো টমাসিনো। বছর বিশেকের ডাকাবুকো এক স্থানীয় যুবক। অঞ্চলের অন্যান্য যুবকের মধ্যেও তার প্রভাব আর নেতৃত্ব ছিল প্রশ্নাতীত। ভিত্তোরিয়োর বাগদত্তা ছিল নাইজেলা। প্রেয়সীর এ-হেন মর্মান্তিক পরিণতির খবরটা শোনামাত্র ক্রোধে উন্মাদ হয়ে যায় সে। যে কোনও শর্তে এর প্রতিশোধ সে নেবেই, প্রতিজ্ঞা করে তৎক্ষণাৎ।
নাইজেলার ধর্ষণকারীরা সংখ্যায় ছিল মোট পাঁচ জন। দলটির নেতা ছিল সেনাবাহিনীর এক কম্যান্ডার। নাম দ্রোয়েত্তো। ঘটনার দিনকয়েক বাদে স্থানীয় এক পানশালায় বাকি চার সঙ্গীর সঙ্গে মদ্যপান করছিল সে। সহসা সদলবলে সেখানে হানা দেয় ভিত্তোরিয়ো— কম্যান্ডার দ্রোয়েত্তো-সহ বাকি চার জনকে হত্যা করে নির্মমভাবে। এই হত্যাকাণ্ড চলার সময় বারবার সগর্জনে স্লোগান তুলছিল ভিত্তোরিয়ো আর তার সঙ্গীরা… “মোরতে আলা ফ্রাঁসিয়া/ ইতালিয়া আনেলা!” (ফ্রান্সের মৃত্যু চাইছে ইটালি) বাক্যবন্ধটির সব ক’টি শব্দের আদ্যক্ষরগুলি ক্রমানুযায়ী পাশাপাশি রাখলে দাঁড়ায় ‘মাফিয়া’!
ক্রমশ