সেই সময় ক্লাসরুমে কোনও সিসি ক্যামেরা লাগানো থাকলে তার ফুটেজে দেখা যেত, অগ্রণ্যর দিকে রক্তমাখা চোখে তাকিয়ে রয়েছে অগ্রদূত। চোখ থেকে হল্কা বেরোচ্ছে। সেই আগুন মানুষকে ভস্ম করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। অগ্রদূতও চোখের ভাষায়, শরীরের ভাষায় যতটা সম্ভব পাল্টা দেওয়ার চেষ্টা করছে। মুষ্টিবদ্ধ হাত। সুযোগ পেলেই সেটা মিসাইল হয়ে গিয়ে সোজা গিয়ে পড়বে অগ্রণ্যর মুখে।
ক্লাস নাইনের ষাণ্মাসিক পরীক্ষার অঙ্ক খাতা দেখাচ্ছিলেন বিজনবাবু। একশোয় অগ্রদূতের প্রাপ্ত নম্বর ছিয়ানব্বই। অগ্রণ্য চুরানব্বই। ঝাঁপিয়ে পড়ে অগ্রদূতের খাতা কেড়ে নিয়ে অগ্রণ্য দেখে, একটি উপপাদ্য প্রমাণে ওকে ছয়ে চার দিয়েছেন বিজনস্যার। অগ্রদূতের ভাগ্যে ছয়ে ছয়। অগ্রণ্য জানত, প্রশ্নের উত্তর ও ভুল লেখেনি। সে সোজা এগিয়ে যায় স্যরের দিকে, দৃপ্তভঙ্গিতে। স্যরের টেবিলে খাতাটা ছুড়ে ফেলে কার্যত।
“এটায় দু’নম্বর কাটলেন কেন স্যর? কোথায় ভুল হয়েছে প্রমাণ করুন! অগ্রদূত ছয় পেল কী করে?”
“তুমি অনেক জটিল ভাবে উপপাদ্যটা প্রমাণ করেছ অগ্রণ্য। আমি কি ক্লাসে এই ভাবে শিখিয়েছিলাম? কত সহজ উপায়ে ওটা প্রমাণ করা যেত। অগ্রদূত তো সেটাই করেছে।”
“এভারেস্টে কি শুধু একটা পথেই ওঠা যায় স্যর? আমার প্রমাণে শেষ পর্যন্ত কোনও ভুল আছে কি— হ্যাঁ কি না?”
“না। প্রমাণ তো তুমি করেই দিয়েছ। কিন্তু অনেক জটিল পথ ঘুরে গন্তব্যস্থলে পৌঁছেছ। কোনও দরকার ছিল না।”
“আমি সোজা বাড়ি যাব, নাকি অলিগলি ঘুরে যাব— সেটা সম্পূর্ণ আমার ব্যাপার, তাই না স্যর? চিরাচরিত পথেই যে যেতে হবে, তার তো কোনও মানে নেই।”
“তা অবশ্য ঠিকই।”
“চারটা কেটে ছয় করে দিন।”
“আমি বুঝেই দু’নম্বর কমিয়েছি অগ্রণ্য। মাধ্যমিকে যদি এই প্রশ্নটাই আসে, জটিলভাবে করার জন্য মিছিমিছি তিন-চার মিনিট অতিরিক্ত সময় খরচ হবে তোমার।”
“সেটা আমার সমস্যা স্যর। আপনি আপাতত এই নম্বরটা ঠিক করে দিন। এখনই।”
পঞ্চান্ন ছুঁয়ে ফেলা মানুষটি ছাত্রের কাছে হার মেনে পাল্টে দিয়েছিলেন নম্বর। অগ্রণ্য ডান হাতের মুঠো দিয়ে বাঁ হাতের তালুতে সজোরে মেরে বলে উঠেছিল, “ইয়েস!”
ওর নম্বরও বেড়ে ছিয়ানব্বই হল। সারা ক্লাস শুনতে পেয়েছিল, “অগ্রদূতের কাছে হারার জন্য পয়দা হয়নি অগ্রণ্য চট্টোপাধ্যায়।”
‘মুখের ভাষা সংযত করো’ গোছের কিছু কথা মিনমিন করে বলার চেষ্টা করেছিলেন বিজনবাবু। জোরেই বলেছিলেন হয়তো। তবে অগ্রণ্যর হুঙ্কারের পাশে তা মিনমিন-ধ্বনির বেশি বলে মনে হওয়ার কোনও যুক্তি থাকে না।
শুধুমাত্র নামের সামঞ্জস্যই অগ্রদূত ঘোষ এবং অগ্রণ্য চট্টোপাধ্যায়কে একে অপরকে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভাবতে বাধ্য করেছিল কি না, তা নিয়ে গবেষণা হতে পারে। তবে ইতিহাস জানে, ক্লাস টু-তে নামের মানে বুঝতে পারার পরে অগ্রণ্য অগ্রদূতকে বলেছিল, “আমি সবার আগে গণ্য হই। এগিয়ে থাকি। তুই আগে চলার দূত কী করে হলি?”
উত্তরে অগ্রদূত বলেছিল, “পিছনের লোকগুলো তো আমাকেই ফলো করে। তুই আমার আগে থাকবি কী করে?”
ওদের মধ্যে প্রথম বিষদৃষ্টি বিনিময়ের সূচনা কি এভাবেই হয়েছিল? ওই যে বললাম, এই নিয়ে গবেষণা হতে পারে।
প্রতিযোগিতায় টিকে থাকবে বলেই অগ্রণ্য এবং অগ্রদূত, জীবনে কেউ কাউকে ছাড়েনি। কোনও এক অদ্ভুত সমীকরণে কোনও পরীক্ষায় অগ্রণ্য প্রথম স্থান অধিকার করলে পরের পরীক্ষায় অগ্রদূত ছিনিয়ে নিত সেই জায়গা। মাধ্যমিকে অগ্রদূত, অগ্রণ্যর থেকে দু’নম্বর বেশি পায়। ওর মনের মধ্যে ডিজে বক্স বেজেছিল। উচ্চ মাধ্যমিকে অগ্রদূত বেশি পায় তিন নম্বর। এক অক্ষৌহিণী সেনা যুদ্ধজয়ের পরে, শত্রুনিধনের পরে যেভাবে অট্টহাসি দিয়ে ওঠে, অগ্রদূতের বুক থেকে উথলে ওঠা হাসি তাকেও হার মানিয়েছিল। একই স্কুলে প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি। একই কলেজে বিবিএ এবং এমবিএ। ব্যাচেলর এবং মাস্টার্স ইন বিজ়নেস অ্যাপ্লিকেশন, যথাক্রমে। বিবিএ-তে অগ্রদূত ওর প্রতিযোগীর থেকে এক শতাংশ বেশি পায়। এমবিএতে অগ্রণ্য ওর প্রতিযোগীর থেকে দু’শতাংশ বেশি পায়।
প্রেমে পড়ার পরে অগ্রদূত নন্দিনীকে বলেছিল, “অগ্রণ্য যদি তোমার দিকে কখনও তাকায়, ওর চোখ গেলে দেব।”
আর প্রোপোজ় করার পরে অগ্রণ্য তানিয়াকে বলেছিল, “অগ্রদূত যদি তোমার উপরে কখনও নজর দেয়, ওর লাশ ফেলে দেব।”
প্রতিযোগীর প্রেমে ভাংচি দেওয়া যাকে বলে, তা নিয়ে অগ্রণ্য এবং অগ্রদূত কারওই চেষ্টার ত্রুটি ছিল না। কলেজ থেকে বেশ খানিকটা দূরে, এক নির্জন চায়ের দোকানের পিছনে নন্দিনী এবং তানিয়ার মধ্যে রক্তারক্তি হয়েছিল। অন্যের সম্পর্ক ভাঙার আনন্দে অগ্রণ্য এবং অগ্রদূত দু’জনেই নিজে নিজেকে ট্রিট দিয়েছিল। ইংরেজিতে এর একটা বেশ ভাল টার্ম রয়েছে। ‘সেল্ফ-প্যাম্পারিং’। ওই ট্রিট-পর্বে নিজের প্রেম ভেঙে যাওয়ার যন্ত্রণা তুচ্ছ ছিল। শাখে শাখে পাখি ডাকছিল। কত শোভা ছিলচার পাশে।
এমবিএ-র অন্তিম লগ্নে ক্যাম্পাস ইন্টারভিউয়ে ওয়েটিং এরিয়ায় পাশাপাশি দুটো চেয়ারে বসে ছিল অগ্রণ্য এবং অগ্রদূত। দু’জনের ক্রমিক সংখ্যা পর পর। প্রথমে অগ্রদূত গিয়ে প্রায় কুড়ি মিনিট ইন্টারভিউ দিয়ে বিজয়ীর মতো বেরিয়ে এল। বেরিয়েই কাকে যেন ফোন করল। অগ্রণ্যর বহু দিনের বিশ্বাস ছিল, মিথ্যে ফোন ওটা। অগ্রদূত চিৎকার করে বলল, “ইয়েস। ক্র্যাকড ইট!”
“ইয়েস!” বলার সময় ওর ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে চিড়িক করে বেরিয়ে আসা থুতু অগ্রণ্যর গায়ে পড়েছিল। আর দু’সেকেন্ড সময় পেলেই অগ্রদূতের গালে ঠাটিয়ে থাপ্পড় কষিয়ে দিত অগ্রণ্য। সুযোগ হয়নি। অগ্রণ্যর ডাক পড়েছিল ভিতরের ঘর থেকে। ইন্টারভিউ-পর্বের কিছু নির্বাচিত প্রশ্নোত্তর তুলে দেওয়া যেতে পারে।
“তুমি নিজেকে পাঁচ বছর পরে কোথায় দেখতে চাও?”
“আমার আগেই যে ছেলেটা ইন্টারভিউ দিয়ে বেরোল, একই সংস্থায় ওর অন্তত দু’ধাপ উপরে।”
“কিন্তু তুমি কী করে জেনে যাচ্ছ যে, ও সিলেক্টেড?”
“বডি ল্যাঙ্গুয়েজ পড়ার ব্যাপারে আমার চোখ ইগলকেও হার মানায়।”
“এটা ওভারকনফিডেন্স নয় কি? কী করে নিশ্চিত হচ্ছ যে, তুমি ওর থেকে দু’ধাপ উপরে থাকবে?”
“ইতিহাস রিপিটস ইটসেল্ফ।”
“আশ্চর্য! ওই ছেলেটাও জাস্ট বলে গেল, আমার পরে যে আসছে তার থেকে তিন ধাপ উপরে থাকবে আগামী দিনে।”
“মাফ করবেন, ওরটা স্ট্যান্ড-আপ কমেডি শো হতে পারে। আমারটা নয়।”
“কিছু মনে কোরো না। তোমরা কি একে অন্যের তুমুল প্রতিযোগী?”
“মনে করার কী আছে? একে-ফর্টি সেভেন কখনও ক্যাপ ফাটানোর বন্দুককে ডরায় না।”
“সারপ্রাইজ়িং। আগের জনও তোমার সম্পর্কে একই কথা বলল।”
প্রশ্নকর্তারা ভেবেছিলেন, জব্বর কম্পিটিশন হবে দুই বন্ধুতে। দু’জনকেই সিলেক্ট করে নিয়েছিলেন। কোনও প্রয়োজন না থাকলেও ওয়েটিং এরিয়ায় বসে ছিল অগ্রদূত। অগ্রণ্য পকেট থেকে ঝটিতি বের করল মোবাইল ফোন। ফোনটা ভাইব্রেশনে ছিল কি না জানা যায় না। কেউ সত্যিই ফোন করেছিল কি না জানার উপায় নেই তাও। অগ্রণ্য গ্যাজেটটা কানে লাগিয়ে বলছিল, “বহু বার বলেছি কিছু কিছু এলিমেন্ট কমোডে ফেলে ফ্লাশ করে দিতে হয়। আরে বললাম তো হ্যাঁ। আমাদের মধ্যেই এমন এলিমেন্ট আছে। জাস্ট ক্রাশ দেম।”
প্রখ্যাত ওয়াটার পিউরিফায়ার সংস্থায় সেলস অফিসার হিসেবে একই সঙ্গে কাজে যোগ দিল অগ্রণ্য ও অগ্রদূত। তিলোত্তমা মহানগরীর এক জন দেখত উত্তরভাগ। অন্য জন দক্ষিণ। সংস্থাটি জানে, এমন লড়াকু দুই কর্মী তারা তাদের ইতিহাসে পায়নি। সংস্থার অন্দরমহলে কান পাতলে জানতে পারা যাবে, এই দু’জনের মধ্যে কাকে পরবর্তী উঁচু আসনে বসানো যেতে পারে, তা নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ স্পষ্টত দু’ভাগহয়ে গিয়েছিলেন।
সেরা পারফর্মার পুরস্কার প্রদানের জন্য সেজে উঠেছিল বাইপাসের ধারের একটি পাঁচতারা হোটেল। এক বছরে ৪৯৩২টি মেশিন বিক্রি করার সুবাদে সেরার তকমা উঠতে চলেছিল অগ্রণ্যর হাতে। এক দিন আগে খবরটা পাওয়ামাত্র বমি হচ্ছিল অগ্রদূতের। ওর বিক্রির পরিমাণ ৪৯৩১টি মেশিন। রাগে জ্বলছিল অগ্রদূত।
নিয়ন আলোর ঝলকানি। বিরাট ডিজিটাল পর্দায় বিশাল মেমেন্টো আসছে, যাচ্ছে, আসছে। সার্টিফিকেট আসছে, যাচ্ছে, আসছে। পুরস্কারমূল্য হিসেবে পাঁচ লক্ষ টাকার চেকের ছবি বার বার ভেসে উঠছে পর্দায়। অ্যাকাউন্টস সেকশনের এক উচ্চপদস্থ আধিকারিকই অনুষ্ঠানটির সঞ্চালক। সংস্থার ইতিহাস, নানা গৌরবোজ্জ্বল মাইলফলক ঘোষণার করে, স্পিকার দিয়ে টানা এক মিনিট প্রি-রেকর্ডেড ঢাকের আওয়াজ বাজার পরে উনি বললেন, “মাই ডিয়ার কোলিগস, লেডিজ় অ্যান্ড জেন্টলমেন, এ বছরের সেরা পারফর্মার অ্যাওয়ার্ড গোজ় টু...”
অগ্রণ্যর মুখ থেকে ঠিকরোচ্ছিল ফ্লাডলাইটের আলো।
“এক মিনিট!” অডিয়েন্সের একেবারে শেষের সারি থেকে চিৎকার করে উঠল অগ্রদূত। থমকে গেল সব কিছু, হঠাৎ।
“কিছু বলবেন আপনি, অগ্রদূত?”
“মনে হয়, ভুল হচ্ছে আমাদের। সেলস-এর হিসাব তো গত মাসের শেষ দিন অবধি নেওয়া। আজ মাসের সাত তারিখ। কাল রাতে অগ্রণ্যর এক কাস্টমার প্রোডাক্টটি রিটার্ন করেছেন। কোয়ালিটি পছন্দ হয়নি। ওর সেলস থেকে সেটা কাটা হয়নি।”
শুরু হল ফিসফাস। সেটা মৃদু হট্টগোলে পরিণত হতে বেশি সময় লাগেনি। ঘাবড়ে গেলেন সঞ্চালক।
“না, মানে... সেলসটাই তো আমরা দেখি। রিটার্ন তো এর মধ্যে আসার কথা নয়। কী হল? আমি ঠিক বলছি তো? বলুন আপনারা।”
“লড়াইটা যেহেতু মাত্র এক পিসের, সেখানে এটা হিসাব গোলমাল করে দেয় না কি? আপনিই বলুন। একশো-দেড়শো ইউনিটের ফারাক থাকলে এই প্রশ্ন উঠত না। ব্যবধান মাত্র এক পিসের।”
মাঝপথে ভেস্তে গিয়েছিল অনুষ্ঠান। অগ্রণ্যর চোখ থেকে আগুন ঝরছিল। তির্যক হেসে ব্যাঙ্কোয়েট হলের বাহারি ঝাড়বাতির দিকে তাকিয়ে ছিল অগ্রদূত। সেগুলো নিবে যাবে জলদি।
পরের বছর সেরার শিরোপায় ঘোষণা হয় অগ্রদূতের নাম। ৫৬১২টি মেশিন বিক্রি করে দেখিয়েছে সে। খবরটা জানতে পেরে বমি করছিল অগ্রণ্য। ওর পারফরম্যান্স শিট বলছে, ও বিক্রি করতে পেরেছে ৫৬১০টি মেশিন। সহ্য করতে পারেনি। ফিল্ডে যে ছেলেরা কাজ করে, তাদের দিয়ে ব্যাকডেটে দুটো মেশিন কিনে নিয়েছিল নিজে। পার্ক স্ট্রিটে গিয়ে ওদের মদ খাইয়েছিল। ওরা কথা দিয়েছিল, ব্যাপারটা পাঁচকান হবে না। শেষ মুহূর্তে হিসাবে গন্ডগোল হয়ে গিয়ে সেবারের অনুষ্ঠানও ভন্ডুল হয়ে যায়।
অগ্রণ্য বিয়ে করেছিল আগে। বলাই বাহুল্য, স্কুলজীবনের বন্ধু হলেও অগ্রদূত আমন্ত্রিতদের তালিকায় ছিল না। সহকর্মীদের মোবাইলে দেখেছিল ওর বৌয়ের ছবি। অসম্ভব ভাল লেগেছিল অগ্রদূতের। কিন্তু মুখে বলেছিল, “ওয়াক!” সহ্য না করতে পেরে এক মাসের মধ্যে বিয়ে করে নিয়েছিল অগ্রদূত। অগ্রণ্য সহকর্মীদের মোবাইলে দেখেছিল অগ্রদূতের বৌয়ের ছবি। খুবই ভাল লেগেছিল অগ্রণ্যর। কিন্তু পরিচিতমহলে নাক কুঁচকে বলেছিল, “কুৎসিত টু দ্য পাওয়ার ইনফিনিটি!”
কিছু দিন পর থেকে ওরা সহকর্মীদের মোবাইলে সুযোগ পেলেই একে অপরের বৌকে দেখত। শরীরে শিহরন হত। তবে লোকেরা জানত, ওদের গলার কাছে উঠে এসেছে এক দলা কফ।
অগ্রদূত পরিবারকে সময় দিতে পারত না একদম। বাড়িতে ফিরেও রাত সাড়ে এগারোটা-বারোটা অবধি অফিসের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকত। চির-প্রতিদ্বন্দ্বী অগ্রণ্যকে এক ইঞ্চিও জমি ছেড়ে দেওয়া যাবে না। টেনশন কমানোর জন্য মোবাইলে সার্চ দিত— হাউ টু ম্যানেজ স্ট্রেস? স্ক্রিনে হাজির হয়ে যেতেন স্বামী সরলানন্দ। বলতেন, “পৃথিবীতে এসেছ একা, যাবেও একা। ষাট-সত্তর বছরের রঙ্গমঞ্চে কী হারালে, কী-ই বা পেলে? যাকে তোমার প্রতিযোগী ভেবে ঘুমোতে পারছ না রাতে, তার পরিণতিও তোমার মতোই হবে। সেও একা যাবে। নখ-দাঁত বারনা করে বেঁধে বেঁধে থাকলে জীবন সরল হয়...”
পাঁচ পেগের পরে ঘুম নেমে আসত অগ্রদূতের চোখে। “ডিজ়গাস্টিং!” বলে ভিডিয়ো বন্ধ করে চেয়ারে ঘুমিয়ে পড়েছে কত বার! ওর বৌয়ের চোখের কোণে জল চিকচিক করত। লোকটা পাল্টাল না। অগ্রদূত স্বপ্নে দেখত, গুলি ঝাঁঝরা করে দিচ্ছে অগ্রণ্যকে। পরি নামত।
অগ্রণ্য কাজ করত রাত সাড়ে বারোটা অবধি। অগ্রদূত না থাকলে হয়তো এত কাজের দরকার হত না। মাথার মধ্যে ইটের মতো ভর করে থাকত প্রতিযোগিতার চিন্তা। অন্তত পাঁচশো ইউনিটে এবারে টেক্কা দিতে হবে অগ্রদূতকে। মোবাইলে চলে আসতেন ভোলা মহারাজ। স্বামী আত্মভোলানন্দ। বলতেন, “সামান্য এ জীবনে কেঁচোর মতো, কেন্নোর মতো ঈর্ষাসুতোগুলোকে ভুলে থাকতে পারলে ক্ষতি কী? মনের জোরে ওদের গায়ে এক টোকা দাও। দেখবে, গুটিয়ে গিয়ে শান্ত হয়ে গিয়েছে। পাশের লোকের সঙ্গে দৌড়ের কোনও শেষ নেই এই ক্ষুদ্র জীবনে। শান্ত হও। মনে স্থিতি আসুক। ছাই হয়ে যাওয়ার আগে সৌন্দর্যে ভরে উঠুক মন।”
“ধ্যাত্তেরিকা!” বলে ভিডিয়ো বন্ধ করে দিত অগ্রণ্য। ছ’পেগের পর আরও একটু খেতে মন চাইত। দু’চোখ জুড়ে ঘুম। ওর বৌয়ের গালে গড়িয়ে পড়ত জল। মানুষটা বদলাল না। অগ্রণ্য স্বপ্ন দেখত, পিচ সমান করার রোলারের চাকা দিয়েও গুঁড়িয়ে দিচ্ছে অগ্রদূতের শরীর। পরি নামত।
এমনই এক দিন রাত বারোটার সময় হঠাৎ প্রবল ঘামতে থাকে অগ্রদূত। গ্লাস পড়ে থাকে। ওর বুকের মধ্যে কিছু একটা জ্বলতে থাকে দাউদাউ করে। হাঁপিয়ে ওঠে। মাথা ঘুরতে থাকে। ব্যথা ছড়িয়ে পড়ে সারা শরীরে। ঢলে পড়ে। দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যায় অগ্রদূতের বৌ। ইমার্জেন্সি। কিছুক্ষণ পরে ডাক্তারবাবু বললেন, “স্যরি। সব শেষ। হার্ট অ্যাটাক।”
কয়েক কিলোমিটার দূরে আরও একটি বেসরকারি হাসপাতালের ইমার্জেন্সি বিভাগে প্রায় একই সময়ে ভর্তি করানো হয় অগ্রণ্যকে। মুখ বেঁকে গিয়েছিল, কথা জড়িয়ে গিয়েছিল। চোখে অন্ধকার দেখছিল। চেয়ার থেকে উঠতে গিয়ে টলে পড়েছিল। চৌচির হয়ে গিয়েছিল রঙিন তরল ভরা গ্লাস। পা অসাড় হয়ে গিয়েছিল। হাউহাউ করে কাঁদতে থাকা অগ্রণ্যর বৌকে ডাক্তারবাবু কিছুক্ষণ পরে বললেন, “দুঃখিত। হি ইজ় নো মোর। ম্যাসিভ স্ট্রোক।”
পরের দিন সকালে শহরের এক বিখ্যাত শ্মশানে পর পর দুটো শববাহী গাড়ি ঢুকল। পাশাপাশি দুটো বৈদ্যুতিক চুল্লিতে প্রায় একই সময়ে দাহকাজ সম্পন্ন হল অগ্রণ্য ও অগ্রদূতের। দু’জনেরই নিউক্লিয়ার পরিবার। আত্মীয়বল প্রায় শূন্য। সংখ্যায় ঢের বেশি ছিলেন ওই দু’জনের অফিসের সহকর্মীরা। সেখানে একে অপরকে প্রথম বারের জন্য দেখল অগ্রণ্য ও অগ্রদূতের বৌ।
গঙ্গায় অস্থিভস্ম ভাসাতে একই সঙ্গে গেল দু’জনে।
অগ্রদূতের বৌ অস্থিভস্ম ভাসিয়ে মাটির সরাটিকে বলল, “কী দরকার ছিল এত দৌড়ের, কম্পিটিশনের? এবারে তুমি মুক্ত তো?”
অগ্রণ্যর বৌ অস্থিভস্ম বিসর্জন দিয়ে মাটির সরাটিকে বলল, “কী পেলে জীবনে তুমি, শুধু অন্ধেরমতো দৌড়ে যাওয়া ছাড়া? এবারে তুমি ফ্রি তো?”
অস্থিভস্ম প্রলেপিত দু’টি গরম সরা নদীর জল স্পর্শ করল। ছ্যাঁক করে আওয়াজ হল দু’বার। সরাদু’টি ডুবে গেল। গুবগুব করে জলের উপরে ভেসে উঠল কিছু ছাই।
শোক। নদীর জল শান্ত। ক্লান্ত। চুপচাপ। স্রোতহীন। মৃত।
ছাইয়ের সারি একটা অন্যটাকে টপকে এগোতে লাগল।
দ্রুত। আরও দ্রুত।
ওদের গতি বাড়ছে ক্রমশ।