E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

সংস্কৃতির মিলনভূমি বরোবুদুর বৌদ্ধস্তূপ

নীচ থেকে উপর অবধি বরোবুদুরের তিনটি স্তর— কামধাতু, রূপধাতু আর অরূপধাতু— ব্রহ্মাণ্ডের তিনটি স্তরের প্রতীক। পালযুগে বাংলা থেকে মহাযান বৌদ্ধ ধর্ম, বিশেষ করে তার বজ্রযান শাখা ইন্দোনেশিয়ায় এসে পৌঁছেছিল, তাই বজ্রযানী দর্শনের প্রভাবও এখানে প্রতিফলিত।

সুদীপ্ত পাল

শেষ আপডেট: ২৩ অগস্ট ২০২৬ ০৬:৫৪
ঐতিহাসিক: বারো শতক আগে জগৎলোকের প্রতিরূপ হিসেবে নির্মিত বরোবুদুর বৌদ্ধস্তূপ। (ছবি: লেখক)

ঐতিহাসিক: বারো শতক আগে জগৎলোকের প্রতিরূপ হিসেবে নির্মিত বরোবুদুর বৌদ্ধস্তূপ। (ছবি: লেখক)

ভারতীয় সংস্কৃতির আন্তর্জাতিক প্রসারের দক্ষিণতম নিদর্শনগুলির একটি হল ইন্দোনেশিয়ার বরোবুদুর— পৃথিবীর বৃহত্তম বৌদ্ধ স্তূপ। সাঁচী আর সারনাথের স্তূপ ছিল গৌতম বুদ্ধের দেহাস্থি রক্ষার জন্য তৈরি স্মৃতিসৌধ। কিন্তু বরোবুদুরের উদ্দেশ্য ছিল বৃহত্তর। শুধুই স্মৃতিরক্ষার জন্য নয়, বরোবুদুরের স্তূপ নির্মাণ করা হয়েছিল সমগ্র জগৎলোকের প্রতিরূপ হিসাবে। শৈলেন্দ্রবংশীয় রাজারা বারোশো বছর আগে এর নির্মাণ করেন। এটি ভূগোলকের দক্ষিণার্ধে অবস্থিত, তাই অগস্ট মাস এখানে বসন্তকাল, ঘোরার পক্ষে খুব ভাল সময়। এমনই এক অগস্টের সকালে বরোবুদুর দেখতে এসেছিলাম।

সামনের প্রশস্ত পথ ধরে এগোতে এগোতে দূর থেকেই বরোবুদুর স্তূপের বিশালতা উপলব্ধি করা যায়। সমগ্র স্তূপটির উচ্চতা ১১৫ ফুট, বিস্তার দেড় লক্ষ বর্গফুট। গাইড ছাড়া স্তূপের উপরের স্তরগুলোতে ওঠা যায় না, আর গাইডেড ট্যুর শুরু হওয়ার বেশ খানিকটা আগেই চলে এসেছি, তাই এই সময়টার সদ্ব্যবহার করতে চলে এলাম পাশের মিউজ়িয়মে। নাম, কর্মবিভঙ্গ মিউজ়িয়ম। এখানে ছবির মাধ্যমে সুন্দর করে বোঝানো হয়েছে স্তূপের অতীত এবং সাম্প্রতিক ইতিহাস। গৌতম বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের পর তাঁর অস্থিভস্ম আট ভাগে ভাগ করে ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে স্তূপ বানিয়ে সেই স্তূপগুলির নীচে সমাহিত করা হয়। এখান থেকেই বুদ্ধের স্মৃতিতে স্তূপ নির্মাণের সূচনা। বৌদ্ধধর্ম দেশে-বিদেশে যত প্রসারিত হয়, এই স্তূপ নির্মাণের ধারাও তার সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে মায়ানমার, তাইল্যান্ড, তিব্বত ও ইন্দোনেশিয়ায়।

১৮১৪ সালে এখানকার ইংরেজ গভর্নর যখন স্তূপটি পুনরাবিষ্কার করেন, তখন এটি আগ্নেয়গিরির ছাইয়ে সম্পূর্ণ চাপা পড়ে ছিল। বরোবুদুরের তিরিশ কিলোমিটারের মধ্যে তিনটি সক্রিয় আগ্নেয়গিরি আছে, যেগুলি থেকে বহুবার উদ্‌গীরণ হয়েছে গত হাজার বছরে। ইংরেজদের পর এই অঞ্চল ওলন্দাজদের অধীনে গেলে ওলন্দাজ ইঞ্জিনিয়াররা সম্পূর্ণ স্তূপটি পুনরুদ্ধার করেন কয়েক দশকের দীর্ঘ পরিশ্রম ও পরিকল্পনার মাধ্যমে।

মিউজ়িয়ম দেখে স্তূপের কাছে ফিরে এলাম, আর গাইডেড ট্যুর শুরু হল। বরোবুদুরকে নীচ থেকে দেখলে মনে হবে ধাপে ধাপে উঠে যাওয়া পিরামিড। নীচ থেকে উপর অবধি বরোবুদুরের তিনটি স্তর— কামধাতু, রূপধাতু আর অরূপধাতু— ব্রহ্মাণ্ডের তিনটি স্তরের প্রতীক। ‘কামধাতু’ হল ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগৎ, যেখানে মানুষ আর যক্ষ-যক্ষী-গন্ধর্বরা বাস করে। ‘রূপধাতু’তে দেবতাদের বাস, আর ‘অরূপধাতু’তে বিরাজ করে পরম শূন্যতা, যার স্থান কাম এবং রূপের ঊর্ধ্বে। স্তূপের নীচের ভিত্তি বর্গাকার— খাঁজকাটা বিংশভুজ বর্গক্ষেত্র। এই অংশটি হল কামধাতু— দেওয়াল-ভাস্কর্যের মাধ্যমে এখানে কর্মফলবাদ বোঝানো হয়েছে। এখানকার ১৬০টি ভাস্কর্যফলকের কাহিনি গ্রহণ করা হয়েছিল ‘মহাকর্মবিভঙ্গোপদেশ’ থেকে। এই ভাস্কর্যগুলির সিংহভাগই এক হাজার বছর ধরে পাথরে ঢাকা পড়ে ছিল। অনুমান, স্তূপকে স্থিতিশীল রাখার জন্য তার নীচের অংশে বাড়তি পাথর যোগ করার প্রয়োজন হয়, আর তাতেই এই নীচের নিদর্শনগুলি চাপা পড়ে যায়। আবার অনেকে বলেন, এই অংশের কাহিনিগুলো কর্মফলতত্ত্ব বোঝানোর জন্য এতটাই জাগতিক কামনা-বাসনা ও হিংসাকে দেখায় যে সেটা বাদবাকি স্তূপের সঙ্গে বেমানান, তাই ঢেকে দেওয়া হয়। এখন শুধু দক্ষিণ-পূর্ব দিকের চারটি ফলক উন্মুক্ত করা হয়েছে দেখার জন্য।

‘কামধাতু’ দেখে আমরা সিঁড়ি বেয়ে উঠলাম ‘রূপধাতু’তে। এই অংশটি পাঁচতলা। গৌতম বুদ্ধের জীবনী এবং জাতক-কাহিনি— এই হল ‘রূপধাতু’র দৃশ্যকল্প। পুবদিকের প্রবেশপথে রয়েছে বুদ্ধের জন্ম, তার পর দক্ষিণদিকে বোধিলাভ, পশ্চিমের প্রবেশপথে ধর্মচক্রপ্রবর্তন আর উত্তরের দরজায় মহাপরিনির্বাণ। এরই সঙ্গে দেওয়াল-ভাস্কর্যগুলিতে রয়েছে বুদ্ধের অতীতজন্মের চিত্রণ, যেগুলি জাতকের কাহিনি হিসেবে দেশে-বিদেশে জনপ্রিয়।

বুদ্ধজীবনী ছাড়াও ‘রূপধাতু’তে পাঁচতলা জুড়ে আছে ৪৩২টি ধ্যানী বুদ্ধের মূর্তি— এক-একটির প্রায় দশ ফুট উচ্চতা। লক্ষণীয়, বুদ্ধমূর্তিগুলি ভিন্ন ভিন্ন মুদ্রায়, জগতের চারটি দিকের সঙ্গে মিলিয়ে। পুবদিকের বুদ্ধ ভূমিস্পর্শমুদ্রায়, দক্ষিণদিকে তিনি বরদামুদ্রায় বরদানের ভঙ্গিতে উদ্যতহস্ত। পশ্চিমে ধ্যানমুদ্রা আর উত্তরের মূর্তিগুলি অভয়মুদ্রায়, যেখানে তিনি ডান হাত তুলে অভয়দান করেন। এভাবে চারতলা অবধি প্রত্যেকটি মুদ্রায় ৯২টি করে মূর্তি। গাইড জানালেন, এই বুদ্ধগুলির নাম যথাক্রমে— অক্ষোভ্য, রত্নসম্ভব, অমিতাভ আর অমোঘসিদ্ধি। পাঁচতলায় ৬৪টি মূর্তির সব ক’টিই বিতর্কমুদ্রায়, এই মুদ্রায় তাঁর ডান হাত বক্তব্য রাখার ভঙ্গিতে উদ্যত।

লক্ষ করলাম, অনেক বুদ্ধমূর্তির মাথা নেই। কৌতূহল নিরসনের জন্য গাইডের কাছে জানতে চাইলাম এর কারণ। জানলাম, এগুলো কোনও মূর্তিবিদ্বেষের ফল নয়, যারা প্রত্নসামগ্ৰী চোরাপাচার করে, তারা কেটে নিয়ে মাথাগুলো সরবরাহ করেছে পৃথিবীর বিভিন্ন মিউজ়িয়ম আর ব্যক্তিগত সংগ্রহে। পশ্চিমি দেশের কোনও মিউজ়িয়মে বুদ্ধের মাথা দেখলে বুঝবেন, সেটা চোরাপথে এসে থাকতে পারে এবং তার বাকি শরীরটা আছে প্রাচ্যের কোনও দেশে— ভারতে, তাইল্যান্ডে বা এই বরোবুদুরের অগণিত মাথাকাটা বুদ্ধমূর্তিগুলির মধ্যে।

‘রূপধাতু’ থেকে ‘অরূপধাতু’তে উঠে দৃশ্যকল্পের এক নাটকীয় পরিবর্তন দেখতে পেলাম। ‘অরূপধাতু’র স্তূপভূমির নকশা বৃত্তাকার, যেটা রূপধাতুর বহুভুজ বর্গাকার ভিত্তি থেকে বেশ আলাদা। বৃত্তাকার তিনটি তলা, একের উপর এক। বৃত্তগুলি বড় থেকে ছোট হতে থাকে, তাই ছয় তলায় ৩২টি বুদ্ধমূর্তি, সাত তলায় ২৪টি, আট তলায় ১৬টি। ‘অরূপধাতু’ অংশের বুদ্ধের নাম বজ্রসত্ত্ব, তিনি ধৰ্মচক্রপ্রবর্তনমুদ্রায় দৃশ্যমান। বজ্র হল সম্পূর্ণ শূন্যতার উপলব্ধি— বস্তু যে মৌলিকভাবে স্বভাবশূন্য— তার বোধ, আর এটাই হল মহাযানমতে চূড়ান্ত মোক্ষের ধারণা। বজ্রসত্ত্ব হলেন এই শূন্যতারই মূর্তরূপ, তাই তিনি বিচরণ করেন অরূপধাতুতে। পালযুগে বাংলা থেকে মহাযান বৌদ্ধধর্ম, বিশেষ করে তার বজ্রযান শাখা ইন্দোনেশিয়া এসে পৌঁছেছিল, তাই বজ্রযানী দর্শনের প্রভাব স্বাভাবিক ভাবেই এখানে প্রতিফলিত হয়েছে।

‘রূপধাতু’ অংশে চারটি ভৌগোলিক দিকের জন্য চার জন বুদ্ধ, তাই সেই অংশের প্রতিটি তল ছিল বর্গাকার, কিন্তু ‘অরূপধাতু’ হল জগৎলোকের সেই অংশ যেখানে দিকের ধারণা নেই, যেখানে বুদ্ধের বজ্রসত্ত্ব বা শূন্যরূপ ছাড়া আর কোনও রূপ নেই, তাই চারটি দিক আর চার দিকের চার জন বুদ্ধের প্রসঙ্গ এখানে আসে না। তাই এই অংশ বৃত্তাকার। এখানে বুদ্ধ-ব্যতীত অন্য কোনও ভাস্কর্য নেই আর বুদ্ধমূর্তিগুলিও উন্মুক্ত নয়।‌ প্রত্যেকটি বুদ্ধমূর্তি এখানে গৌণ স্তূপ দিয়ে আবৃত, আর সেই স্তূপগুলির আবরণ জালিকার আকারে নির্মিত হয়েছিল, যাতে ফাঁক দিয়ে মূর্তিগুলির ঝলক পাওয়া যায়। বরোবুদুরের মুখ্য স্তূপের শীর্ষভাগকে এইভাবে অলঙ্কৃত করেছে ৭২টিগৌণ স্তূপ।

‘কামধাতু’র কর্মফলবদ্ধ সংসার থেকে আমরা অনেক উপরে উঠে এসেছি ‘অরূপধাতু’র শূন্যতায়। অরূপধাতুর সবচেয়ে উপরের অংশে আছে ঘণ্টার আকারের এক বিশাল স্তূপ। নীচ থেকে এই স্তূপটিকেই পুরো বরোবুদুর স্তূপের শিখর বলে মনে হয়। এই স্তূপের ভিতরে একটি শূন্য কক্ষ আছে। সেখানে কোনও বুদ্ধমূর্তি নেই। সম্ভবত শূন্যতার প্রতীক হিসেবে এই অংশকে শূন্য রাখা হয়েছিল, অথবা এখানে কখনও বুদ্ধের দেহাস্থি রাখা ছিল।

পাল সাম্রাজ্যের দু’টি স্তূপের সঙ্গে বরোবুদুরের লক্ষণীয় সাদৃশ্য আছে— বাংলার সোমপুর মহাবিহারের স্তূপ আর বিহারের কেসরিয়া স্তূপ। বাংলাদেশে অবস্থিত সোমপুরের স্তূপের ভিত্তি বরোবুদুরের মতোই বিংশভুজ বর্গাকার। সোমপুরের স্তূপটিও ধাপে ধাপে উঠে যাওয়া বহুভুজাকৃতি পিরামিডের মতো, যেটা বরোবুদুর স্তূপের ‘কামধাতু’ আর ‘রূপধাতু’ অংশে দেখা যায়। তবে বরোবুদুর আর সোমপুর সমসাময়িক। তাই সোমপুর আর বরোবুদুরের বহুভুজাকার ভিত্তির অনুপ্রেরণা— একই আকারের প্রাচীনতর দু’টি স্তূপ থেকে এসে থাকতে পারে। দু’টিই কুমিল্লায়— রূপবান মুড়া আর রাজা ভোজ বিহার। এই জ্যামিতিক আকারগুলি হিন্দুধর্মে যন্ত্র আর বজ্রযান বৌদ্ধধর্মে মণ্ডল নামে পরিচিত, ব্রহ্মাণ্ডের নকশা হিসাবে এগুলি আঁকা হত। মণ্ডলকে ত্রিমাত্রিক রূপ দিলে এই স্তূপগুলির আকার দাঁড়ায়। অন্য দিকে, কেসরিয়া স্তূপও ধাপে ধাপে উঠে যাওয়া স্তূপ, তবে তার ভিত্তি বহুভুজাকার নয়, এর এক একটা তলা হল বৃত্তাকার— বরোবুদুর স্তূপের ‘অরূপধাতু’ অংশের মতো। অর্থাৎ বরোবুদুর স্তূপকে এভাবে ভাবা যায়— সোমপুর স্তূপের মতো একটা স্তূপের উপর বসিয়ে দেয়া হয়েছে কেসরিয়া স্তূপকে।

পালযুগের আরও প্রভাব এই শহরে আছে, স্তূপ থেকে কয়েক কিলোমিটার পূর্বে পাওন মন্দির। বিকেলে দেখতে এলাম। নবম শতকের এই মন্দিরের দেওয়ালে দেবী তারার দণ্ডায়মান রূপের তিনটি মূর্তি আছে, যা বাংলার বজ্রযান ধর্মের প্রভাব। পরদিন নিকটবর্তী যোগযাকার্তা শহরের সোনোবুদোয়ো মিউজ়িয়মে সহস্রাব্দ-প্রাচীন তিনটি মহিষাসুরমর্দিনী আর একটি পদ্মাসীনা তারার মূর্তি দেখারও সুযোগ হল। বরোবুদুরের আশপাশে এমন অজস্র নিদর্শন ছড়িয়ে আছে, যা আজও পাল-সাম্রাজ্যের সঙ্গে অতীতের ইন্দোনেশিয়ার সাংস্কৃতিক যোগাযোগের সাক্ষ্য দেয়।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Indonesia

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy