সহমত পোষণ করতে পারলেন না ডা. নীলরতন সরকার। ডা. বিধানচন্দ্র রায় ও ডা. ললিতমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর মত মিলল না। ‘এনলার্জড প্রস্টেট গ্ল্যান্ড’-এর অপারেশন মামুলি হলেও নীলরতন সরকার মনে করতেন, অন্য কোনও সাধারণ রোগীর সঙ্গে কবির মতো একজন সংবেদনশীল মানুষকে এক করে দেখাটা ঠিক নয়। আর কবি নিজে কোনও রকম কাটাছেঁড়া করার পক্ষপাতীই ছিলেন না। কিছুটা রসিকতার সুরে হলেও মনের কথাটাই বলেছিলেন, “শনি যদি একটা-কিছু ছিদ্র খোঁজে, সে যদি আমার মধ্যে রন্ধ্র পেয়েই থাকে— তাকে স্বীকার করে নাও। মানুষকে তো মরতেই হবে একদিন। মিথ্যে এটাকে কাটাকুটি ছেঁড়াছুঁড়ি করার কী প্রয়োজন। দেহ অক্ষতভাবেই তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়া ভালো।” এর কয়েক দিন আগে কবিরাজ বিমলানন্দ তর্কতীর্থ শান্তিনিকেতনে পৌঁছলে কবি ভাবলেন যে, কবিরাজের দাওয়াইতেই তিনি শল্যচিকিৎসার হাত থেকে মুক্তি পাবেন। তাই কবিরাজমশাইকে দেখে তাঁর প্রাথমিক উচ্ছ্বাস গোপন করেননি, “দ্যাখো হে, তোমরা আমার কিছু করতে পার কিনা। শেষকালে ওরা কি আমায় ছেঁড়াখোঁড়া করে দেবে?” তবু শেষ পর্যন্ত কবিকে শল্যচিকিৎসার প্রয়োজনে শান্তিনিকেতন থেকে কলকাতা নিয়ে যাওয়াই স্থির হল।
কিন্তু অসুস্থ শরীরে কবি ট্রেনের ধকল কতটা নিতে পারবেন, এই নিয়ে সকলে চিন্তিত ছিলেন। সেই সময় ইস্ট ইন্ডিয়ান রেলের সিওপিএস নিবারণচন্দ্র ঘোষের সঙ্গে কবির হৃদ্যতা ছিল। বিধানচন্দ্র রায়ের সঙ্গেও তাঁর বিশেষ পরিচয় ছিল। সেই সূত্র ধরেই বিধানচন্দ্র রায় নিবারণবাবুকে তাঁর পদাধিকারবলে প্রাপ্ত সেলুন-কারটিকে এই প্রয়োজনে ব্যবহারের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। নিবারণবাবু শুধু রাজিই হননি, সঙ্গে এটাও নিশ্চিত করেন যে, আগের দিন রাতে বোলপুরে তিনি সেলুন-কারটি নিয়ে পৌঁছে যাবেন এবং পরের দিন সকালে কবিকে সঙ্গে নিয়েই হাওড়া আসবেন। সম্পূর্ণ ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্ট সকলে স্বস্তি পেয়েছিলেন। জনসমাগম এড়িয়ে যাওয়ার জন্যই যথাসম্ভব গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়েছিল।
২৪ জুলাই, বৃহস্পতিবার নিবারণচন্দ্র ঘোষ সেলুনটি (ইআইআর ২৩৭৭) নিয়ে সন্ধ্যায় বোলপুর স্টেশনে পৌঁছে যান। তাঁর সঙ্গী হয়েছিলেন নির্মলকুমারী মহলানবিশের দাদা, বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা. জ্যোতিপ্রকাশ সরকার। স্টেশন থেকে জ্যোতিপ্রকাশ উদয়নে চলে গেলেও, নিবারণবাবু কাজের তদারকি করার জন্য সেই রাতে বোলপুর স্টেশনেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। এদিকে কলকাতায় কবিকে রাখার ও চিকিৎসার সমস্ত পরিকল্পনা খতিয়ে দেখতে আগের দিন বিকেলে শান্তিনিকেতন থেকে রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও অনিল চন্দ কলকাতার উদ্দেশে রওনা হন। যাওয়ার আগে কবিকে প্রণাম করে বিদায় নিতে গেলে কবি অনিল চন্দকে হঠাৎ বলে ওঠেন, “গাড়ির ব্যবস্থা না মারবার ব্যবস্থা করতে যাচ্ছ?” অনিল-সহ উপস্থিত সবাই একটু হকচকিয়ে গেলে পরক্ষণেই কবি হাসতে হাসতে বলেন, “বাঙাল ঠাট্টাও বোঝে না।”
রাণী ভোরবেলায় উঠেই কবির ঘরে গিয়ে দেখলেন, ভোর চারটের সময়েই তিনি তৈরি হয়ে পূর্বদিকের জানলার দিকে তাকিয়ে বসে আছেন। সারা জীবন ধরে ব্রাহ্মমুহূর্তে উঠেই তো তিনি প্রাত্যহিক ধ্যান ও উপাসনায় বসতেন। সেদিনও তার অন্যথা হয়নি। একটু পরেই আশ্রমের ছেলেমেয়েরা উদয়নের ফটক হয়ে লাল কাঁকরের রাস্তা ধরে এসে কবিকে শুনিয়ে গেলেন— “এ দিন আজি কোন্ ঘরে গো খুলে দিল দ্বার, আজি প্রাতে সূর্য ওঠা সফল হল কার।” এক প্রশান্তি বয়ে গেল শরীর জুড়ে। প্রত্যুষে বৈতালিক করে কবিকে জাগানোর পরিকল্পনা ছিল শৈলজারঞ্জন মজুমদারের। আগের দিন হঠাৎ এই পরিকল্পনাটি তাঁর মাথায় আসার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি ছেলেমেয়েদের জানিয়ে দেন এবং ভোরবেলা লাইব্রেরির বারান্দায় জড়ো হওয়ার নির্দেশ দেন। হাতে সময় না থাকায় প্রস্তুতির আয়োজন করা যায়নি। শৈলজারঞ্জন জানাচ্ছেন, “গুরুদেব উদয়নের দোতলাতে ছিলেন, আমরা উত্তরায়ণের গেটের ভিতর দিয়ে গিয়ে উদয়নের জানলার নীচে দাঁড়িয়ে ভোরের অন্ধকারে গানটা করতে লাগলাম। গুরুদেব জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে আমাদের দর্শন দিলেন— আমাদের গান গ্রহণ করলেন। বোধহয় বহু কষ্টে উঠেছিলেন, একটু পরেই তিনি অদৃশ্য হয়ে গেলেন। আমরা ধন্য হয়ে ফিরে এলাম।”
কবির স্বপ্নভূমিতে তাঁর শেষ প্রভাত। সকাল সাড়ে সাতটা। চলে এল বিদায়ক্ষণ। ধীরে ধীরে শান্তিনিকেতনের নীল বাসটা এসে দাঁড়াল উদয়নের সামনে। কবিকে স্ট্রেচারে ধরাধরি করে নামিয়ে বাসে তোলা হল। উপস্থিত ছিলেন দৌহিত্রী নন্দিতা ও কৃষ্ণা কৃপালনী, সুরেন্দ্রনাথ কর, বিশ্বরূপ বসু, ক্ষিতীশ রায় প্রমুখ। প্রবল জ্বরে আক্রান্ত থাকায় উপস্থিত থাকতে পারেননি পুত্রবধূ প্রতিমা দেবী। বাসে কবির পাশে রয়েছেন ডা. জ্যোতিপ্রকাশ সরকার। পিছনে মোটরগাড়িতে ছোট মেয়ে মীরা আর রাণী মহলানবিশ। বাস এগিয়ে চলল। ভেসে এল গানের কথা, ‘আমাদের শান্তিনিকেতন, সব হতে আপন’। কবি গালে হাত দিয়ে আধশোয়া অবস্থায় স্ট্রেচারের হাতলে ভর করে বাইরের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। ড্রাইভার নীলমণি মনে হয় ইচ্ছে করেই আশ্রমের ভিতর দিয়ে নিয়ে চললেন। কয়েক দিন আগেই চুল কাটা হয়েছে, তাই যেন কবিকে একটু বেশি রোগা লাগছে। চোখে অনভ্যস্ত কালো চশমা। যেন এভাবেই চোখের জলকে আড়াল করতে চেয়েছেন। একে একে পিছনে পড়ে রইল উপাসনাগৃহ, ছাতিমতলা, গৌরপ্রাঙ্গণ, শ্যামলী, উদীচী, কোণার্ক। অদূরে খোয়াই, কোপাই, সোনাঝুরি, নীচুবাংলা, সুরুল, শ্রীনিকেতন। চলে এল বোলপুর স্টেশন।
বোলপুর স্টেশনের বিভিন্ন উঁচু-নিচু জায়গা নির্বিঘ্নে পেরিয়ে কবির সেলুন-কার অবধি নির্ঝঞ্ঝাটে পৌঁছনোর সমস্ত ব্যবস্থাই ইতিমধ্যে করে ফেলা হয়েছে। সারা রাত এই ব্যবস্থা নিখুঁত ভাবে করতেই শান্তিনিকেতনে না গিয়ে বোলপুর স্টেশনে থেকে গিয়েছিলেন ঘোষসাহেব। স্বাভাবিক ট্রেন চলাচলকে ব্যাহত না করে শান্তিপূর্ণ ভাবে কবিকে তোলার জন্য তাঁর পরামর্শেই সেলুনটিকে সাইডিংয়ে রাখা হয়েছিল। সেখানে কবিকে সযত্নে তোলার পর তাকে যুক্ত করা হল পাকুড় প্যাসেঞ্জার ট্রেনের সঙ্গে। সেলুনে দুই শয্যার একটি শয়ন কক্ষ ছাড়াও একটি বসবার ঘর, খাবার ঘর ও রান্নাঘর ছিল। বাতানুকূল না থাকায় প্রত্যেকটি ঘরে দু’টি করে ফ্যান লাগানো হয়েছিল। এ ছাড়াও ছিল দু’টি স্নানের ঘর এবং ভৃত্যদের জন্য একটি ঘর। সব মিলিয়ে চারটি সুসজ্জিত ঘর-সমন্বিত সেলুনটি ছিল বারো চাকার একটি দীর্ঘ কামরা। নিবারণচন্দ্র ঘোষ ছাড়াও ট্রেনে কবির সফরসঙ্গীদের মধ্যে ছিলেন মেয়ে মীরা, নাতনি নন্দিতা, কৃষ্ণা কৃপালনী, সচিব সুরেন্দ্রনাথ কর, রাণী মহলানবিশ, ডা. জ্যোতিপ্রকাশ সরকার, কবিরাজ কমলাকান্ত ঘোষ প্রমুখ।
সেলুনে উঠে নিজের পছন্দমতো বসবার ঘরের চেয়ারে বসে কবি সামনের বিরাট জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইলেন। মনটা হয়তো ঈষৎ ভারাক্রান্ত। ভাবছিলেন, আর কখনও এই আশ্চর্য বাতাবরণে ফিরে আসতে পারবেন কি না। ট্রেন ছাড়তেই নাতনি নন্দিতা বলে উঠল, “দাদামশাই, অজয় পার হচ্ছে।” কবি বিহ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। কবির ভাবালু, আচ্ছন্ন চাহনি উপলব্ধি করেই নিবারণবাবু যেন লিখেছিলেন, “পারহ্যাপস, হি হ্যাড ওয়ান্টেড টু হ্যাভ এ লাস্ট লিঙ্গারিং লুক অ্যাট মাদার আর্থ ইন হার প্রিস্টাইন গ্লোরি— দি রাগেড চার্মস অব দ্য ওয়েভি আপল্যান্ডস, দ্য রিচ ভার্ডিউর অব দ্য ফিল্ডস অ্যান্ড দ্য উডস, দ্য স্লিপি সাইলেন্স অব দ্য শেডি অর্চার্ডস— অল দ্য গ্রেস অ্যান্ড ওয়েলথ অব নেচার, হুইচ দ্য পোয়েট হ্যাড লাভড অল হিজ় লাইফ।”
শারীরিক অসুবিধার মধ্যেও কবির রসবোধের এতটুকু ঘাটতি হয়নি। অজয় সেতু পেরোনোর কিছুক্ষণ পরেই একটু অসুস্থ বোধ করায় পাশের শোবার ঘরে নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দেওয়া হল। ট্রেন বর্ধমান স্টেশন পৌঁছতে সদাসচেতন নিবারণবাবু স্টেশনে নেমে জানলা দিয়ে যেই জিজ্ঞেস করলেন, কেমন বোধ করছেন, কবির তৎক্ষণাৎ জবাব “না, বেশ আছি, দিব্যি ‘মুন্ডু’ খেতে খেতে চলেছি।” আসলে কবিরাজ ট্রেনে চিঁড়ে খাওয়ার পরামর্শ দেওয়ায় চিঁড়ের মণ্ড তৈরি করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেটাই কবির ভাষায় হয়েছে ‘মুন্ডু’।
বর্ধমান স্টেশন ছাড়ার পর নতুন এক সমস্যার উদ্ভব হল, যখন কবি দুধের সঙ্গে বিস্কুট খেতে চাইলেন— যা নিবারণবাবুর ব্যাখ্যায় ‘ক্রিস্প বিস্কিটস নাইদার সুইট নর সল্টি’। সঙ্গে কবির পছন্দের বিভিন্ন রকমের খাবার থাকলেও কারওই বিস্কুট নেওয়ার কথা মনে ছিল না। সবাই যখন রীতিমতো অস্বস্তিতে পড়েছেন, পুনরায় পরিত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হলেন সেই ঘোষসাহেব। শেষমেষ নিবারণবাবুর তাঁর নিজের জন্য সংগ্রহে থাকা চারটি ক্রিম ক্র্যাকার বিস্কুট থেকে দু’টি বিস্কুট কবির হাতে তুলে দিলে কবি বেশ খুশি হলেন। তিনি একটা গোটা বিস্কুট ও আর একটির সামান্য অংশ দুধ দিয়ে খেলেন। নিবারণবাবুর তৎপরতা ও প্রত্যুৎপন্নমতিত্বে সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। পাশাপাশি কবিকে একটু কিছু খাওয়ানো গেছে, এই আনন্দে সকলেই বেশ মানসিক তৃপ্তিও অনুভব করলেন। নিবারণবাবু সেই সুখানুভূতিকে সানন্দে লিপিবদ্ধ করে গেছেন, “বাট ফর দোজ় লিটল পিসেস, আওয়ার রিমোর্স উড হ্যাভ নোন নো বাউন্ড। আই কনসিডার মাইসেল্ফ এক্সিডিংলি ফরচুনেট ইন হ্যাভিং হ্যাড দিস লিটল অপরচুনিটি অব সার্ভিস টু দ্য পোয়েট ইন আ হাম্বল ওয়ে। অ্যাজ় আই রুমিনেট অব দ্য মেমরি অব দ্যাট ডে, ইট গিভস মি ইমেন্স সেল্ফ-স্যাটিসফ্যাকশন ইভন টুডে।” বাকি পথটুকু নির্বিঘ্নে কাটিয়ে হাওড়া স্টেশনের ভিড় এড়াতে ঘোষসাহেবের পরামর্শ ও নির্দেশে অনিয়মিত ১৪ নম্বর প্ল্যাটফর্মে সেলুনটিকে দাঁড় করানো হয়। সকাল সাড়ে ন’টা নাগাদ যাত্রা শুরু করে ট্রেনটি হাওড়া পৌঁছয় দুপুর প্রায় ২-৪০ মিনিটে। সেখান থেকে নিউ থিয়েটার্স-এর বাসে করে যখন কবি জোড়াসাঁকোয় পৌঁছলেন, তখন বেলা তিনটে পনেরো। প্রমোদনাথ রায় হাওড়া স্টেশন থেকে কবিকে জোড়াসাঁকো পৌঁছে দেওয়ার জন্য নিউ থিয়েটার্স-এর বাসের ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন।
নিবারণবাবু এই অমূল্য স্মৃতিটিকে দেশবাসীর জন্য অক্ষয় অমর করে রাখতে চেয়েছিলেন। কয়েক দিন বাদেই কবির প্রয়াণের পর তিনি রেলওয়ে বোর্ডকে জানান যে, কবির শেষ বার ট্রেনযাত্রার স্মৃতিবিজড়িত এই সেলুনটি তিনি আর ব্যবহার করবেন না, এবং সেলুনটি যেন রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ কবির প্রতি চিরকালীন শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের স্মারক হিসেবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে। তাঁর ইচ্ছাতেই সেলুনটিতে কবির ছবি-সহ একটি তাম্রফলক বসানো হয়। ১৯৪৪ সালের এপ্রিল মাসে বোলপুর স্টেশনে একটি বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে এটি স্থাপিত হয়। পণ্ডিত ক্ষিতিমোহন সেন বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণ করে অনুষ্ঠানটির শুভ সূচনা করেন এবং ফলকটি উন্মোচন করেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ইংরেজ আমলে সেলুনটি খড়্গপুর রেল ইয়ার্ডে সংরক্ষিত ছিল। পরে বোলপুর স্টেশনে কবি যে ঘরটিতে ট্রেন ধরার জন্য অপেক্ষা করতেন, সেই ঘরটি যখন প্রদর্শনীকক্ষ হিসেবে রক্ষিত হয়, সেখানেই সেলুনটিকে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়।
‘রবিবাসর’ ছিল কলকাতার একটি ঐতিহ্যপূর্ণ পাক্ষিক সাহিত্যবাসর। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ এবং নিবারণবাবুও এর সদস্য ছিলেন। কবিপ্রয়াণের পর রবিবাসরের সদস্যরা এক বার নিবারণবাবুর কাছে সেই সেলুনটিকে দেখার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তিনি তখন চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন। তাঁর অনুরোধক্রমেই পূর্ব রেলের ব্যবস্থাপনায় খড়্গপুর থেকে হাওড়াতে সেলুনটিকে নিয়ে আসা হয়। হাওড়া স্টেশনে বর্তমানে যেখানে ১২ নম্বর প্ল্যাটফর্ম, সেখানে কয়লার ঘেস ফেলে উঁচু করে অস্থায়ী প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে সেই লাইনে সেলুনটি রাখা হয়। পুষ্পশোভিত শামিয়ানায় ফরাস বিছিয়ে গান-বাজনার মধ্যে দিয়ে দিনটি উদ্যাপিত হয়। রবিবাসরের সদস্য-সমন্বিত ঐতিহাসিক সেলুনটির ছবি তাদের বার্ষিক সম্মেলনের নবম খণ্ডে স্থান পায়।
স্মৃতি পুনরুদ্ধারের সময় সেই শূন্য কামরাগুলির অব্যক্ত মর্মবেদনা ঘোষসাহেবকে নিশ্চয়ই নিদারুণ ভাবে ছুঁয়ে গেছিল। রেলে কবির সান্নিধ্যের প্রতিটি মুহূর্তের স্মৃতি ঈশ্বরের আশীর্বাদ রূপে বাকি জীবন তাঁর হৃদয়ে সঞ্চিত ছিল— “দ্যাট অ্যান ইনসিগনিফিকেন্ট পার্সন লাইক মি শুড হ্যাভ অ্যান অপরচুনিটি টু সার্ভ দিস গোল্ডি ম্যান ওয়াজ় ইনডিড আ রেয়ার প্রিভিলেজ— এ ব্লেসিং বেসটোড অন মি বাই দ্য হেভেন ইটসেল্ফ।” কবির শেষ বিদায়ের সময় আশ্রমিকেরা গেয়েছিলেন, “আমরা যেথায় মরি ঘুরে সে যে যায় না কভু দূরে/ মোদের মনের মাঝে প্রেমের সেতার বাঁধা যে তার সুরে।” কবির জীবনাধার নিঃসৃত সেই সুর নিবারণবাবুর জীবনে কোনও দিনই ফিকে হয়ে যায়নি।