E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

ক্রিকেট-আকাশের রাত-জাগা তারা

টেস্ট চলাকালীনও রাত কাটাতেন নাইট ক্লাবে, পানীয়ের আসরে। প্রায়ই সকালে তিনি যখন ফিরছেন, তখন তাঁর টিম নামছে ব্যাট করতে। তাতে আটকাত না শতরান কিংবা আরও বড় ইনিংস। সাফল্যের প্রেরণা কী? তাঁর জবাব ছিল, ‘লেট নাইটস।’ যদিও নিজেকে বলতেন রাতের পেঁচা, তবু ক্রিকেটবিশ্ব স্যর গারফিল্ড সোবার্সকে মনে রাখবে ‘দি আউল অ্যান্ড দ্য নাইটিঙ্গেল’ হিসেবে। যে রাতের পেঁচা সকালে মাঠে গিয়ে সুরেলা পাখির গানে মুগ্ধ করত।

সুমিত ঘোষ

শেষ আপডেট: ০২ অগস্ট ২০২৬ ০৬:৩৯
কিংবদন্তি: লর্ডসে মহম্মদ আলির স্মৃতিতে ঘণ্টাধ্বনিরত স্যর গ্যারি সোবার্স।

কিংবদন্তি: লর্ডসে মহম্মদ আলির স্মৃতিতে ঘণ্টাধ্বনিরত স্যর গ্যারি সোবার্স। (ছবি: গেটি ইমেজেস)।

সকলেই পরিচিত ক্রিকেটের ‘নাইটওয়াচম্যান’ শব্দটার সঙ্গে। কিন্তু নিশাচর ব্যাটসম্যান? যদি কেউ শুনে না থাকেন, চলুন এক অতিমানবের আশ্চর্য জীবনকাহিনিতে ঢুঁ মারা যাক।

১৯৭৩। লর্ডসে তাঁর জীবনের শেষ টেস্ট। দিনের শেষে তিনি ৩১ নট আউট, পরের দিন বড় স্কোর করে লর্ডসে রাজকীয় বিদায়ের মঞ্চ প্রস্তুত। সন্ধ্যার দিকে অনুজ সতীর্থ ক্লাইভ লয়েড এসে বললেন, “নাইটক্লাবে যাবে নাকি?” তিনি সঙ্গে-সঙ্গে রাজি। লন্ডনে লয়েডের কয়েক জন গায়ানিজ় বন্ধুর সঙ্গে প্রথমে নৈশভোজ সারেন তাঁরা। অবশ্যই কয়েক রাউন্ড পানীয় সহযোগে। এর পর পুরনো বন্ধু রেগ স্কারলেটের সঙ্গে দেখা হয়। হোটেলে ফেরার ভাবনা ত্যাগ করে তাঁর সঙ্গে ফের পানীয়ে ডুব দিলেন, সঙ্গে নাইটক্লাবে উপস্থিত সুন্দরীদের সঙ্গে নাচ। ভোর চারটের সময় বন্ধুকে বললেন, “এখন ঘুমোলে আর উঠতে পারব না।” তা হলে? “চলো আরও কয়েক রাউন্ড পানীয় হয়ে যাক,” প্রস্তাব তাঁর। সকাল পর্যন্ত বন্ধুর সঙ্গে পানীয়ের ফোয়ারায় ডুবে, ঠান্ডা জলে স্নান করে দলের সঙ্গে মাঠে চলে গেলেন।

মাসাজ রুমে গিয়ে যে সামান্য ঘুমিয়ে নেবেন, সে উপায়ও নেই— কারণ তিনি নট আউট ব্যাটসম্যান। শুরুতেই ব্যাট করতে যেতে হবে। আর প্রথম ওভারটাই যিনি করবেন, তাঁর নাম? বব উইলিস। প্রথম পাঁচটা বল ফরোয়ার্ড খেললেন এবং প্রত্যেকটাই ‘মিস’ করলেন। উইলিস এসে কড়া চাহনি দিয়ে যাচ্ছেন, আর ওদিকে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে পুরো টিম হাসছে, কারণ তত ক্ষণে সকলে জেনে গিয়েছে— সারা রাত কী দস্যিপনা করে বেড়িয়েছেন তিনি। ষষ্ঠ বলটা ব্যাটে-বলে হওয়ায় কিছুটা আত্মবিশ্বাস পেলেন। ইনিংস এগোচ্ছে। ৭০-এ পৌঁছে হঠাৎ আবিষ্কার করলেন, পেট মুচড়ে উঠছে, শৌচাগারে যেতে হবে। পরক্ষণেই মনে হল, না আর কিছুক্ষণ ব্যাট করে যাই। শরীরের মধ্যে প্রবল অস্বস্তি, এবং নেশা-না-কাটা অবস্থায় সেঞ্চুরিও করে ফেললেন। ১৩২ ব্যাটিং। আর পারছেন না। আম্পায়ারকে গিয়ে বললেন, “আমাকে ড্রেসিংরুমে যেতেই হবে।” আম্পায়ার চার্লি এলিয়ট তো অবাক। বিন্দুমাত্র অস্বস্তি এতক্ষণ যাঁর ব্যাটিংয়ে ধরা পড়েনি, বোলারদের হেলায় পিটিয়ে সেঞ্চুরি করে ফেলেছেন, তাঁকে ড্রেসিংরুমে ফিরতে হবে কেন? আম্পায়ারকে বললেন, “আধ ঘণ্টা ধরে অনেক চাপ সহ্য করে ব্যাট করে যাচ্ছি। এর পর যদি আমাকে বেরোতে না দেন, মাঠের মধ্যে বিশ্রী ঘটনা ঘটে যাবে।”

আম্পায়ার ‘গো’ বলার আগেই তিনি ড্রেসিংরুমের দিকে হাঁটা লাগিয়েছেন। দাঁড়ান, কাহিনি এখানে শেষ হয়নি। বরং সবে শুরু হল।

বিশ্রামে যাওয়া নট আউট ব্যাটসম্যান ড্রেসিংরুমে পৌঁছতেই সামনে অধিনায়ক রোহন কানহাই। যিনি আজীবন তাঁকে ‘ক্যাপ্টেন’ বলে সম্বোধন করে এসেছেন। কানহাই জানতে চাইলেন, “ক্যাপ্টেন, কী হয়েছে? চলে এলে যে!” তিনি বললেন, “স্কিপার, আমার পেটের অবস্থা খুব খারাপ। একমাত্র ওষুধ হচ্ছে পোর্ট (পর্তুগালের রেড ওয়াইন) আর ব্র্যান্ডি মিক্সচার।” অধিনায়ক কানহাই দ্রুত ড্রেসিংরুম কর্মীকে বললেন, “ক্যাপ্টেনের জন্য ড্রিঙ্ক আনো।” এক নিঃশ্বাসে সেটা গলা দিয়ে নামিয়ে দিয়ে ফের তৃষ্ণার্ত গলায় কানহাইয়ের দিকে চেয়ে থাকলেন। কানহাই এর পর চিৎকার করে নির্দেশ দিলেন, “ক্যাপ্টেনের জন্য আর একটা পোর্ট আর ব্র্যান্ডি আনো, আর এ বার বড় আনবে।” পানীয় চলে এল, সেটাও নিমেষে শেষ। অদ্ভুত ব্যাপার, পেটও বিদ্রোহ করা থামিয়ে দিয়েছে। ওদিকে একটা উইকেট পড়তেই ফের ব্যাট করতে যাওয়ার জন্য উঠে পড়লেন তিনি। কিংবদন্তি ধারাভাষ্যকার, ‘ভয়েস অব ক্রিকেট’ জন আর্লট তখন ধারাবিবরণী দিচ্ছেন। অমর হয়ে আছে তাঁর সেই মন্তব্য, “ওয়েস্ট ইন্ডিজ় সেভেন ফর সিক্স হান্ড্রেড ফোর অ্যান্ড গ্যারি সোবার্স কামিং টু ব্যাট এগেন।”

তরুণ বয়সে   স্যর গ্যারি সোবার্স।

তরুণ বয়সে স্যর গ্যারি সোবার্স।

স্যর গারফিল্ড সেন্ট অব্রান সোবার্স— এমনই সব অবিশ্বাস্য কাণ্ড ঘটিয়ে গিয়েছেন। সারা রাত জেগে, উদ্দাম নৈশজীবনে ডুব দিয়ে পরের সকালে এসে মহাকাব্যিক সব ইনিংস খেলে গিয়েছেন। লর্ডসে জীবনের শেষ টেস্টে পানীয়ের ওষুধে তরতাজা সোবার্স ক্রিজ়ে ফেরত গিয়ে করলেন ১৫০ নট আউট। এ রকম নিশাচর ইনিংস তিনি আরও অনেক উপহার দিয়েছেন। ১৯৬৮-তে পার্‌থে ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচ। সকালে টিম যখন হোটেল থেকে মাঠে যাবে বলে বেরোচ্ছে, তিনি নাইটক্লাব থেকে ফিরছেন। মাঠে গিয়ে প্যাড পরে তৈরি হয়ে বসে একটু ঝিমোচ্ছিলেন। দ্রুতই ডাক পড়ল। স্যাম গ্যানন নামে এক অজ্ঞাত বোলার চটপট কয়েকটা উইকেট তুলে নিয়েছেন। বাকি বোলাররা কারা? গ্রাহাম ম্যাকেঞ্জি, লরি মেন, টনি লক। ১১৩ বলে ১৩২ করে ফিরে যে চেয়ারটায় বসে ঝিমোতে-ঝিমোতে ব্যাট করতে গিয়েছিলেন, সোজা সেটাতে গিয়ে বসে একদম গভীর ঘুমে।

ভারতেও আছে এমন নৈশজীবনের কাহিনি। কানপুরে বড়দিনের সময় ধনী কয়েক জন বন্ধু ডেকে নিয়ে গেল। টিম ম্যানেজার বার্কলে গ্যাসকিনের চোখ এড়ায়নি, ভোরবেলায় হোটেলে ঢুকছেন সোবার্স। ম্যানেজার তত দিনে বুঝে গিয়েছেন, রাত-জাগা সোবার্স মানে প্রতিপক্ষের কাছে আরও বড় ত্রাস। তাই ঠিক করলেন, ‘আগে দেখে নিই ব্যাটা কেমন খেলে, না হলে তো আমাকেই আমার কথা গেলাবে।’ একদম সঠিক সিদ্ধান্ত। কারণ সোবার্স সেই ম্যাচে করলেন ১৯৮। রান আউট না হলে কোথায় গিয়ে থামতেন কে জানে! ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের নামী মনোবিদ রুডি ওয়েবস্টার, যাঁকে গ্রেগ চ্যাপেল কোচ থাকার সময় ভারতীয় দলের জন্য কয়েকটি ক্লাস করাতে নিয়ে এসেছিলেন, একবার সোবার্সকে ইন্টারভিউ করছিলেন তাঁর বই ‘উইনিং ওয়েজ়’-এর জন্য। রুডি জিজ্ঞেস করেন, “তোমার সাফল্যের প্রেরণা কী?” সোবার্সের সংক্ষিপ্ততম জবাব, “লেট নাইটস।” সোবার্স নিজে বলে গিয়েছেন, তিনি ছিলেন রাতের পেঁচা। ক্রিকেটবিশ্ব যদিও তাঁকে মনে রাখবে ‘দি আউল অ্যান্ড দ্য নাইটিঙ্গেল’— কবিতা হিসেবে। আউল, নাইটিঙ্গেল— একই অঙ্গে দুই রূপ ছিল তাঁর। রাতের পেঁচা সকালে মাঠে গিয়ে সুরেলা পাখির গানে মুগ্ধ করত।

গ্যারি সোবার্স কখনও একা ক্রিকেট খেলেননি। টেস্টে ৮০৩২ রান, ২৩৫ উইকেট, ১০৯ ক্যাচের আড়ালে রয়েছে আসলে দু’টি মুখ। এক জন— তিনি সোবার্স। অন্য জন— তাঁর অভিন্নহৃদয় বন্ধু কলি স্মিথ। ইংল্যান্ডে ল্যাঙ্কাশায়ার লিগে খেলার সময় পথদুর্ঘটনায় মারা যান কলি। গাড়ি চালাচ্ছিলেন সোবার্সই। হাইওয়েতে হঠাৎ হেডলাইটের জোরালো আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে যায় তাঁর। পশু-বোঝাই বিশাল ট্রাকে গিয়ে ধাক্কা মারেন। কলির স্পাইনাল কর্ডে মারাত্মক চোট লাগে, দুর্ঘটনার তিন দিন পরে তাঁর মৃত্যু হয়। সোবার্স বিধ্বস্ত, শোকস্তব্ধ। প্রবল অপরাধবোধ থেকে গভীর অবসাদে ভুগতে শুরু করেন তিনি। ঠিক এর পরেই দেশে ফিরে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সিরিজ়। সোবার্স খেলার মতো অবস্থাতেই নেই। জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায় থেকে বেরোতে সাহায্য করেন প্রাক্তন ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটার সি বি ‘বার্তি’ ক্লার্ক। তিনি ডাক্তারও ছিলেন। ক্লার্কই তাঁকে বোঝান, “এক জন চলে গিয়েছে। এ রকম চলতে থাকলে ক্যারিবিয়ান ক্রিকেট খুব শীঘ্রই আরও এক প্রতিভাকে হারাবে।” সম্বিৎ ফেরে সোবার্সের। শপথ নেন, “এখন থেকে একা নও, তুমি আসলে দু’জন। গ্যারি আর কলি। কলির জন্য ব্যাট করো।”

দুর্ঘটনার পরে প্রথম টেস্ট ব্রিজটাউন বার্বেডোজ়ে, তাঁর ঘরের মাঠ। সোবার্স ২২৬। প্রত্যেকটা রান তিনি করলেন কলিকে স্মরণ করতে করতে। এর পর জামাইকা, কলির ঘরের মাঠ। সোবার্স সংশয়ে ছিলেন, প্রিয় সন্তানের অকালে ঝরে যাওয়া নিয়ে কী ভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে জামাইকার জনতা। গ্যালারি থেকে কেউ যদি চিৎকার করে ওঠে, এই লোকটার হাতেই স্টিয়ারিং ছিল সেই কালান্তক রাতে! কিন্তু সব আশঙ্কাকে উড়িয়ে দিয়ে জামাইকা সেই টেস্টে ভীষণ ভাবেই সোবার্সের পাশে থাকল। যেন কলি গ্যালারিতে উপস্থিত থেকে সবাইকে বলছিলেন, “আমাকে যেমন তোমরা ভালবাসায় ভরিয়ে দিতে, গ্যারিকে সেটা দাও!” জামাইকার উষ্ণ অভ্যর্থনার আবেগে ভাসতে ভাসতে সোবার্স উপহার দিয়ে গেলেন অনবদ্য ১৪৭। জামাইকায় সবচেয়ে সফল তিনি। হবে না কেন? কলির ঘরের মাঠ যে!

সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডার যে তিনিই, তা নিয়ে সংশয় নেই অনেকের। ডব্লিউ জি গ্রেস থেকে শুরু করে উইলফ্রেড রোডস, জর্জ হার্স্ট, দক্ষিণ আফ্রিকার অব্রি ফকনার, কিথ মিলার— তালিকায় অনেকেই থাকবেন প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে। সত্তর এবং আশির দশকের টোনি গ্রেগ থেকে শুরু করে পঞ্চপাণ্ডব— ইয়ান বোথাম, কপিল দেব, রিচার্ড হ্যাডলি, ইমরান খান, মাইক প্রোক্টর। আধুনিক যুগের অ্যান্ড্রু ফ্লিনটফ, জাক কালিস, বেন স্টোকস। শুধুমাত্র পরিসংখ্যান গিয়ে মাপলে কালিস হয়তো সোবার্সের কাছাকাছি আসতে পারেন। কিন্তু সম্পূর্ণতায়? যে কোনও বিশ্বমানের টেস্ট দলে সোবার্স ঢুকে পড়তে পারতেন বাঁ-হাতি ব্যাটসম্যান হিসেবে, বাঁ-হাতি পেস বোলার হিসেবে, বাঁ-হাতি অর্থোডক্স স্পিনার হিসেবে, বাঁ-হাতি রিস্ট স্পিনার হিসেবে অথবা নিছক ফিল্ডার হিসেবেও। পেসারের বিরুদ্ধে স্লিপে ফিল্ডিং করতেন, স্পিনারের বিরুদ্ধে শর্ট লেগে। ‘কট মার্শ বো লিলি’র অনেক আগেই বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিল ‘কট সোবার্স বো লান্স গিবস’।

১৯৬৭-র ইডেনে নিউ ইয়ার টেস্টে সোবার্সের একটা না ধরতে পারা ক্যাচ পর্যন্ত ক্রিকেটের লোকগাথায় স্থান করে নিয়েছে। চার্লি গ্রিফিথের বল বুধি কুন্দেরনের ব্যাটের কানায় লেগে আকাশে ওঠে। দ্বিতীয় স্লিপ থেকে সোবার্স থার্ডম্যানের দিকে দৌড়তে শুরু করেন। ব্যাটসম্যানের দিকে পিছন ফিরে শ্বাসরুদ্ধ করা ৭০ গজের দৌড়ে প্রায় ধরে ফেলেছিলেন সেই ক্যাচ। একটুর জন্য ফস্কে যায়। ওই টেস্টই কুখ্যাত হয়ে রয়েছে পুলিশ ও দর্শকের খণ্ডযুদ্ধের জন্য। অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে ইডেন, খেলা থামিয়ে দিতে হয়। তুলকালাম সেই টেস্টে ৭০ রান ও দুই ইনিংস মিলিয়ে সাত উইকেট নিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের ইনিংস জয়ের অন্যতম নায়ক ছিলেন সোবার্স।

এই ভারত সফরেই অঞ্জু মহেন্দ্রর প্রেমে হাবুডুবু খেয়ে তাঁর সঙ্গে বাগ্‌দান সেরে ফেলেন সোবার্স। ঠিক তার আগেই টাইগার পটৌডির সঙ্গে শর্মিলা ঠাকুরের বিয়ে হয়েছে। আর একটি ক্রিকেট-বলিউড বিবাহবন্ধনের খবর সব সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হতে থাকে। কিন্তু সোবার্স-অঞ্জু বিয়েটা আর হয়নি। ইংল্যান্ড সফরে তাঁর সঙ্গে অঞ্জুকে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন সোবার্স। তাঁর মতে, অঞ্জুর পরিবারের আপত্তিতে তা আটকে যায়। দু’বছর পরে অস্ট্রেলীয় প্রুডেন্স কির্বিকে বিয়ে করেন সোবার্স। তার আগে ফোন করে অঞ্জুকে বিয়ের কথা জানান, লিখিত অনুমতিও নিতে হয়েছিল, যে-হেতু বাগ্‌দান হয়ে গিয়েছিল।

গ্যাবায় ঐতিহাসিক প্রথম টাই টেস্টেও অন্যতম নায়ক তিনি। প্রথম ইনিংসে রিচি বেনোকে পিটিয়ে করলেন ১৩২। অ্যালান ডেভিডসন বরাবর এই ইনিংসটির কথা বলে গিয়েছেন, “এত জোরে বল মারতে আর কখনও কাউকে দেখিনি।” এর আগে বেনো তাঁকে বারবার বোকা বানাচ্ছিলেন। লেখালিখি হচ্ছিল, বেনোর বোলিং কিছু বুঝতেই পারছেন না সোবার্স। টেস্টের পরে ড্রেসিংরুমে এসে দেখা করে ব্র্যাডম্যানের সেই অমর উক্তি, “রিচির রহস্য বুঝতে না পেরেও তুমি যা করলে! রহস্য বুঝলে যে আমাদের কী দুর্দশা হত কে জানে!” জো সলোমনের ঐতিহাসিক থ্রো-তে যখন অস্ট্রেলিয়ার ইয়ান মেকিফ রান আউট হলেন, কেউ বুঝতেই পারেনি টাই হয়েছে। সোবার্স কিন্তু জানতেন। মাঠে এতটাই সজাগ থাকতেন সর্বক্ষণ।

টেস্টে তাঁর ৮০৩২ সাত বছর ধরে সর্বাধিক রানের নজির হিসেবে অক্ষত ছিল। যিনি সেই রেকর্ড ভেঙেছিলেন, সেই জেফ্রি বয়কট আবার টের পেয়েছিলেন, বোলার সোবার্স কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারেন। একটি সিরিজ়ে সোবার্স তাঁকে বেশ কয়েক বার আউট করার পরে বয়কট ম্যাচ চলাকালীনই জিজ্ঞেস করে ফেললেন, “গ্যারি, তুমি আমাকে বারবার ইনসুইঙ্গারে এলবিডব্লিউ করছ কী ভাবে?” সোবার্সের জবাব, “শোনো জেফ্রি, তোমার দেশের ওই পণ্ডিতগুলোর মতো আমি মনে করি না, তোমার টেকনিক খুব ভাল। ফ্রন্টফুটে খেলার সময় তোমার পা অনেক বেশি অফস্টাম্পের দিকে চলে যাচ্ছে, তাই আমি ইনসুইং করাচ্ছি, আর তুমি সামলাতে পারছ না।”

বয়কট মাথা নেড়ে চলে গেলেন। পরের সকালে যখন তিনি ব্যাট করতে এলেন, নতুন বল হাতে তৈরি সোবার্স। এ বার বয়কটকে অবাক করে দিয়ে আউটসুইঙ্গার। ব্যাটের কানা নিয়ে স্লিপে ক্যাচ। বিস্মিত বয়কট ফিরে যাচ্ছেন। সোবার্স বলে উঠলেন, “দুঃখিত জেফ্রি, কাল বোধ হয় তুমি অন্য বলটা নিয়ে জিজ্ঞেস করতে ভুলে গিয়েছিলে। ইনসুইং ছাড়া পেসারদের আরও একটা বল হয়— আউটসুইং, আর আমি ওটাও একটু-আধটু করাতে পারি।”

১৯৬৮-তে নটিংহ্যামশায়ারের হয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে প্রথম বার এক ওভারে ছয় ছক্কার রেকর্ড, ১৯৮৫-তে যা স্পর্শ করলেন রবি শাস্ত্রী। নটিংহ্যামের সেরা তিন নায়ক? রবিনহুড, হ্যারল্ড লারউডের সঙ্গে চিরকাল এক নিঃশ্বাসে উচ্চারিত হবে গ্যারি সোবার্সের নাম। নটিংহ্যামের ঘরের ছেলে না হয়েও, এক দূরদ্বীপবাসী হয়েও। কিংবদন্তি ইংরেজ সাংবাদিক, লেখক এবং ধারাভাষ্যকার ই ডব্লিউ সোয়ানটন একবার নটিংহ্যামের উপর দিয়ে যাওয়ার সময় ট্রেন্টব্রিজ মাঠের ধারে এসে দাঁড়ান। ভিতরে সোবার্সের নেতৃত্বে খেলছে নটিংহ্যামশায়ার। খুবই একঘেয়ে ম্যাচে সোবার্স ব্যাট করতে নামছেন দেখে সোয়ানটন একটা চিরকুট পাঠালেন আম্পায়ারের কাছে। সোবার্স ক্রিজ়ে গার্ড নিয়ে দাঁড়ানোর আগে আম্পায়ার সেই চিরকুট তাঁর হাতে তুলে দিলেন। তাতে লেখা: “খেলা দেখতে এসে বিরক্ত হয়ে গেলাম, একটু বিনোদন উপহার দিতে পারো কি?” সোয়ানটনের গাড়ি চিনতেন সোবার্স, দূর থেকে দেখে নিলেন কোথায় পার্ক করা আছে। দু’-তিনটে বল একটু দেখে নিয়ে এর পর পেল্লাই ছক্কা গিয়ে পড়ল সোজা তাঁর গাড়ির বনেটে। বলা হয়, সোবার্স সেদিন এত মেপে ছক্কাটি মেরেছিলেন যাতে বলটা বনেটে গিয়েই পড়ে, গাড়ির কাচে নয়।

বোলার সোবার্স।

বোলার সোবার্স।

চিরবন্দিত তিনি কয়েকবার প্রবল নিন্দিতও হয়েছেন। ১৯৬৮-তে পোর্ট অব স্পেনে ইংল্যান্ডের একঘেয়ে ক্রিকেটে তিতিবিরক্ত হয়ে যখন ডিক্লেয়ার করে দিয়ে ম্যাচ হেরে বসলেন। একটা সময়ে ৩৫ ওভারে ৩৫ রান উঠেছিল। কে না বিরক্ত হবে এই ক্রিকেট দেখে? ওয়েস্ট ইন্ডিজ় দুই উইকেটে ৯৩, ২১৫ রানে এগিয়ে থেকে ইংল্যান্ডকে ব্যাট করার আমন্ত্রণ জানান অধিনায়ক সোবার্স। সবাইকে চমকে দিয়ে তিন বল বাকি থাকতে সেই রান তুলে টেস্ট জিতে যায় ইংল্যান্ড। পোর্ট অব স্পেনে সেই রাতে সোবার্সের কুশপুতুল পুড়েছিল। আবার ইংরেজ সংবাদমাধ্যম তাঁর উচ্ছ্বসিত প্রশংসাও করেছিল ক্রিকেটকে বাঁচিয়ে তোলার জন্য। রোডেশিয়ায় ডাবল উইকেট খেলতে গিয়ে প্রবল সমালোচিত হন, কারণ সেখানে তখন বর্ণবিদ্বেষী লোকজনের আধিপত্য। যদিও সোবার্স পরে জানান, রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ তিনি ভাবেননি, শুধু ক্রিকেট খেলতেই গিয়েছিলেন। আর একটা বহুচর্চিত দিক— জুয়ার জালে আটকে পড়া। ক্যাসিনোতে যেতে ভালবাসতেন, ঘোড়দৌড়েও বাজি ধরতেন। লক্ষ লক্ষ টাকা উড়িয়েছেন জুয়ায়। তাতে ব্যক্তিগত জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্ত্রী প্রুর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের অন্যতম কারণ জুয়ার নেশা। বেনিফিট ম্যাচ থেকে সংগৃহীত মোটা অর্থ তাঁর হাতে না তুলে দিয়ে ট্রাস্টে রাখতে হয়েছিল, পাছে সোবার্স ক্যাসিনোয় গিয়ে সব উড়িয়ে দেন।

গ্যারি সোবার্স না ডন ব্র্যাডম্যান— কে সর্বকালের সেরা? যত দিন ক্রিকেট থাকবে, এই তর্কও চলতে থাকবে। কিথ মিলারকে স্মরণ করা যেতে পারে। একবার ছেলের সঙ্গে বসে টিভিতে খেলা দেখছিলেন অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তি অলরাউন্ডার। স্ক্রিনে কিছু পরিসংখ্যান ভেসে ওঠে, তার পর ধারাভাষ্যকার বলে ওঠেন, “ডন ব্র্যাডম্যান— বিশ্বের সর্বকালের সেরা ক্রিকেটার।” সঙ্গে সঙ্গে সোফা থেকে লাফিয়ে ওঠেন মিলার— “সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যান ব্র্যাডম্যান। সর্বকালের সেরা ক্রিকেটার গ্যারি সোবার্স।” ব্র্যাডম্যান যদি নিখুঁত এক ব্যাটসম্যানের ছবি হন, তা হলে সোবার্স ব্যাট ও বল হাতে অনাবিল স্বাধীনতার নাম। জীবনযুদ্ধে লড়াই করতে করতে এগোতে হয়েছে, তবু সমস্ত প্রতিকূলতাকে জয় করে বিশ্ব দরবারে ভয়ডরহীন ভাবে নিজেকে মেলে ধরতে যাঁর বুক কাঁপেনি। ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের রেগে সঙ্গীতের মহাতারকা বব মার্লে বলেছিলেন, “যে জীবন পেয়েছ তাকে ভালবাসো, যে জীবন ভালবাসো তাকে আঁকড়ে ধরো।” বার্বেডোজ়ের সোবার্স ছিলেন জামাইকার মার্লের জীবনদর্শনের সেরা প্রতিবিম্ব।

বাবা শ্যামন্ট কানাডিয়ান মার্চেন্ট নেভিতে কাজ করতেন। ১৯৪২-এর বিশ্বযুদ্ধে জার্মানদের টর্পেডোয় ধ্বংস হয়ে যায় শ্যামন্টদের নৌকা। বাবা আর ফেরেননি। সোবার্সের তখন বয়স মাত্র পাঁচ, কখনও ভোলেননি মা থেলমার সেদিনের ফুঁপিয়ে কান্না। সোবার্স পৃথিবীতে আসেন দুই হাতে বারো আঙুল নিয়ে। প্রথমটি ছেলেবেলায় কেটে ফেলা হয় শক্ত দড়ি জড়িয়ে জোরে টান দিয়ে, অনেকটা যে ভাবে বাচ্চাদের দাঁত তোলা হয়। দ্বিতীয়টি ছুরি দিয়ে কেটে ফেলা হয়, যখন তিনি কিশোর। গলির মধ্যে, বাড়ির পিছনের জমিতে, সমুদ্রসৈকতে— যেখানে যখন পারতেন, দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করতে করতে ক্রিকেট খেলতেন কিশোর সোবার্স। আসল সরঞ্জাম কেনার পয়সা জুটত না, কাঠ কেটে ব্যাট বানাতেন তাঁরা, টায়ারের অংশ থেকে তৈরি হত বল। বেশি গরম পড়লে সেই টায়ারের বল গলে যেত, তখন ইট বা পাথর কাপড়ের মধ্যে ঢুকিয়ে সেটাকেই বল হিসেবে ব্যবহার করা হত। ব্রিজটাউন বার্বেডোজ়ে তাঁদের এই ক্রিকেটের একটা নাম ছিল— লিলিপুট ক্রিকেট। কে জানত, লিলিপুট ক্রিকেট থেকেই একদিন উদয় হবেন বিশ্ব ক্রিকেটের সর্বকালের অন্যতম সেরা গালিভার!

ক্রিকেটের কোহিনুর রত্ন হিসেবে থেকে যাবে তাঁর ব্যাকফুট প্লে। এমন অবলীলায় আগুনে ফাস্ট বোলারদের হুক-পুল মেরে আর কেউ ধ্বংস করতে পারেননি। তরুণ ডেনিস লিলির নিশ্চয়ই মনে থাকবে। ১৯৭১-’৭২ মরসুমে মেলবোর্নে অবশিষ্ট বিশ্ব একাদশ বনাম অস্ট্রেলিয়া টেস্ট। লিলির বাউন্সারে দু’বার আউট হওয়ার পরে ড্রেসিংরুমে লিলির দিকে পানীয়ের গ্লাস হাতে এগিয়ে এলেন সোবার্স। “ওয়েল বোল্ড সন,” বলে শুনিয়ে গেলেন, “শুধু মনে রেখো, আমিও বাউন্সার দিতে পারি আর তোমার চেয়ে বোধ হয় সামান্য ভাল ব্যাটও করি।” পরের দিন খেলা শেষে যখন ড্রেসিংরুমে দু’জনের আবার পানীয়ের গ্লাস হাতে দেখা হল, সোবার্স ১৩০ নট আউট! তিনি গিয়ে থামলেন ২৫৪-তে, অবশিষ্ট বিশ্ব একাদশ ম্যাচ জিতে নিল। ডন ব্র্যাডম্যান এই ইনিংসকেই অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে খেলা সর্বকালের সেরা আখ্যা দিয়েছিলেন।

১৯৫৭-’৫৮ মরসুমে একুশ বছর বয়সে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লেন হাটনকে টপকে ৩৬৫ অপরাজিত, টেস্টে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত স্কোরের নজির। ছত্রিশ বছর ধরে অক্ষত থাকার পরে সেই রেকর্ড ভাঙেন ব্রায়ান লারা। থ্রি ডব্লিউজ়, রামাধীন, ভ্যালেন্টাইনের পরে তখন নতুন মুখ খুঁজছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ়। এর পর শুরু হবে সোবার্স-কানহাই-গিবস যুগ। আর এই ৩৬৫ নট আউট জন্ম দিয়ে গেল ক্রিকেটের ইতিহাসে তৃতীয় মহামানবের। ঊনবিংশ শতাব্দী যদি হয় দাড়িওয়ালা ভিক্টোরিয়ান ডব্লিউ জি গ্রেসের, দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী যুগের সম্রাট যদি হন ডন ব্র্যাডম্যান, তা হলে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের শাসক তিনি— গারফিল্ড সোবার্স।

শুকনো পরিসংখ্যান দিয়ে তাঁকে মাপতে যাওয়া মানে লিয়োনার্দো দা ভিঞ্চির আঁকা ছবির সংখ্যা হাতড়ে বেড়ানো, বা মিকেলাঞ্জেলোকে তাঁর ভাস্কর্যের সংখ্যা দিয়ে বিচার করতে যাওয়া। নেভিল কার্ডাস লিখে গিয়েছেন, “ক্রিকেট মাঠে বসে সোবার্সের ব্যাটিং দেখা আর হলে বসে মোৎজ়ার্টের কনসার্ট শোনা একই মাদকতা সৃষ্টি করে।” সোবার্স ছিলেন ক্রিকেটের মহম্মদ আলি। শ্বেতাঙ্গ-শাসিত ক্রিকেটে এক অকুতোভয় কৃষ্ণাঙ্গ শাসক। কলার-তোলা জামা, গোটানো হাতা, প্রায় কোমর পর্যন্ত খুলে রাখা জামার সব বোতামে সদর্প উপস্থিতির মধ্যে যেন লেখা থাকত এক বিবৃতি: ‘শোনো হে, আমরা কারও চেয়ে কম নই।’ ১৯৬৩-র ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে দাঁড়িয়ে যখন এক নির্ভীক যুবক ব্রায়ান স্টাথামকে সপাটে হুক করে ছক্কা মারল, পৃথিবী দেখল গায়ের রং বিজয়ীর পদক ঠিক করে দিতে পারে না। ইংল্যান্ডের উপর চাবুক মেরে ওয়েস্ট ইন্ডিজ় সেই টেস্ট জেতে দশ উইকেট, সিরিজ় ছিনিয়ে নেয় ৩-১। যাঁরা ভাবছিলেন, শ্বেতাঙ্গরা সব সময় কৃষ্ণাঙ্গদের চেয়ে এগিয়ে, তাঁদের শুধু সোবার্সের ব্যাটিং দেখতে হত।

রোডেশিয়ায় বিতর্কে জড়ালেও বর্ণবিদ্বেষীদের জবাব দিতে ভুলতেন না সোবার্স। সাউথ অস্ট্রেলিয়ার হয়ে খেলার সময় দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে একটি দল সফর করতে এসেছিল। তখন বর্ণবৈষম্যের অন্ধকার অধ্যায়। অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, নিউ জ়িল্যান্ড ছাড়া কারও সঙ্গে খেলে না দক্ষিণ আফ্রিকা। সোবার্স এই ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের টুপি পরে মাঠে নেমে দক্ষিণ আফ্রিকার বোলিংকে উড়িয়ে দিয়ে করলেন দুর্ধর্ষ ১৫৫। অনেক দিন পরে ইয়ান চ্যাপেল তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিলেন, “সেদিন সাউথ অস্ট্রেলিয়ার টুপি না পরে কেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের টুপি পরে মাঠে নেমেছিলে?” সোবার্স বলেন, “আসলে ইয়ান, ওই সময় ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান টুপিটা দেখা হয়ে ওঠেনি দক্ষিণ আফ্রিকার। তাই ওদের একটু দেখিয়ে দেওয়ার কথা ভেবেছিলাম যে টুপিটা আসলে কী রকম, আর এমন ভাবে দেখাতে চেয়েছিলাম, যাতে ওরা চট করে না ভোলে।”

শ্রীলঙ্কার কোচ হয়ে এসে অর্জুন রণতুঙ্গাকে দেখেই বুঝেছিলেন, এই মোটা ছেলেটাই ভবিষ্যৎ। নির্বাচকেরা তখন কিছুতেই নেবেন না রণতুঙ্গাকে। সোবার্সের ভোটও নেই, সে-সবের তোয়াক্কা না করে বললেন, “এই ছেলেটাকে না নিলে আমাকে বোর্ড প্রেসিডেন্টকে ফোন করতে হবে।” রণতুঙ্গা কলকাতায় এসে গল্প শুনিয়ে গিয়েছিলেন, ইংল্যান্ডের হোটেলে একবার ঘর দেওয়ার জন্য রিসেপশন থেকে নাম ধরে ডাকছিল: গ্যারি সোবার্স, গ্যারি সোবার্স। তিনি এক পা-ও নড়েননি। এর পর রিসেপশন থেকে এসে তাঁকে যখন জিজ্ঞেস করছে, “আপনিই গ্যারি সোবার্স তো?” তিনি জবাব দিলেন, “স্যর গ্যারি সোবার্স বলুন। আপনাদের রানিই তো বার্বেডোজ়ে এসে উপাধিটা দিয়ে গিয়েছিলেন।”

গ্যারি সোবার্স মানেই এমন সব রোমাঞ্চকর কাহিনিতে গাঁথা এক রুদ্ধশ্বাস রূপকথা। তাঁর প্রয়াণের খবর শুনে প্রথমেই মনে হয়েছিল, রাতে ঘুমোতে না-চাওয়া ক্রিকেটের এক দামাল সন্তান— কী করে চিরঘুমে চলে গেলেন?

নাকি ভুল হচ্ছে আমাদের? তিনি সেই চেয়ারটায় বসে একটু ঝিমিয়ে নিচ্ছেন! রোহন কানহাই তাঁর ক্যাপ্টেনের প্রিয় পানীয় আনার নির্দেশ দিয়েছেন, তার অপেক্ষায় রয়েছেন। নিমেষে গলা দিয়ে নামিয়ে আবার ছুটবেন ব্যাট হাতে। তিনি— স্যর গারফিল্ড সেন্ট অবার্ন সোবার্স— ক্রিকেটের চিরশ্রেষ্ঠ ‘নট আউট এন্টারটেনার’! তাঁকে আউট করবে কার সাধ্যি!

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
West Indies Gary Sobers

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy