রোবট স্যর
“ড্যাড, হু ওয়াজ় ইয়োর ম্যাথস টিচার?” প্রশ্নটা করেছিল টোকিয়ো।
এত সাধারণ একটা প্রশ্নের উত্তর দিতে এক সেকেন্ডও লাগার কথা নয়। কিন্তু অরিন্দম উত্তর দিল না।
ইয়োকোহামার এই আন্তর্জাতিক স্কুলে যেখানে টোকিয়ো পড়ে, সেখানে শিক্ষক মানেই এক জন মানুষ— এই ধারণা বদলে গেছে। শ্রেণিকক্ষের এক পাশে বিশাল ইন্টারঅ্যাক্টিভ স্ক্রিন, প্রতিটি ছাত্রের সামনে ট্যাব, আর মাঝখানে মানুষের মতো দেখতে একটি রোবট-শিক্ষক। সে ক্লান্ত হয় না, ভুলে যায় না, রাগও করে না। কোন ছাত্র কোথায় আটকে যাচ্ছে, মুহূর্তে বিশ্লেষণ করে ফেলে।
স্কুল ছুটির পর টোকিয়ো দৌড়ে এসে বাবার হাত ধরল, “আমাদের টিচার বলছিল, তোমাদের সময় নাকি সব কিছুই মানুষ পড়াত!”
“হ্যাঁ।”
টোকিয়োর চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল, “তা হলে অঙ্ক কে শেখাত?”
প্রশ্নটা শুনেই কোথাও যেন আটকে গেল অরিন্দম। তাকে অঙ্ক শেখাত বাবলাদা। তিনি কোনও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষক ছিলেন না, ছিলেন পাড়ার এক টিউটর। এত ডিগ্রি, এত সাফল্যের পরও ‘অঙ্ক’ শব্দটা শুনলেই আজও প্রথম বাবলাদার মুখই চোখে ভেসে ওঠে।
অরিন্দমের অনেক বারই মনে হয়েছে বাবলাদার কথা। দেশে ফেরার সময়েও বেশ কয়েক বার ভেবেছে, এক বার হাওড়া গিয়ে দেখা করে আসবে। হয়নি আর। নাইন থেকে টুয়েলভ— বাবলাদার কাছে অঙ্ক করতে যাওয়া মানে যেন সিম্ফনির মতো এক-একটা সন্ধে।
বাবলাদার মুখের রেখাগুলো ঝাপসা হয়ে গেছে। অথচ তাঁর গলার স্বর আজও স্পষ্ট— “অঙ্ককে ভয় পেলে অঙ্কও তোকে ভয় দেখাবে!” কথাটা এখনও কানে বাজে।
ঘড়িতে রাত সাড়ে বারোটা। বাইরে টুপটাপ বৃষ্টি। অরিন্দম হঠাৎ ল্যাপটপ বন্ধ করে দিল। মোবাইলটা হাতে নিয়ে একটা ওয়টস্যাপ গ্রুপ খুঁজতে লাগল।
জগাখিচুড়ি ২০০২: চারশোরও বেশি অপঠিত মেসেজ।
অনেক ক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে সে লিখল—
“তোদের কারও বাবলাদার খবর জানা আছে?”
মেসেজটা পাঠিয়ে ফোনটা রেখে দিল। মনে হল, জাপানের রাতের ভিতর কোথাও হাওড়ার এক লোডশেডিঙের সন্ধ্যা নেমে এসেছে। সেই অন্ধকারে, কাঁধে ঝোলা ব্যাগ নিয়ে, সাইকেলের ঘণ্টি বাজিয়ে কেউ যেন এসে বলে উঠছেন—
“সবাই খাতা বার কর। আজ পরিমিতি করাব।”
যে গ্রুপটা এখনও ক্লাস এইটে
রাত একটা কুড়ি। ইয়োকোহামার আকাশে টুপটাপ বৃষ্টি। জানলার কাচ বেয়ে জল নেমে আসছে। বাড়ির ভিতর নিস্তব্ধতা। স্ত্রী অনেক ক্ষণ আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে। ছেলের ঘর থেকেও আর কোনও শব্দ নেই। অরিন্দমের সামনে ল্যাপটপ খোলা।
ফোনটা কেঁপে উঠল।
সুমন: বাবলাদা?
রাজা: হঠাৎ?
আসিফ: কী রে! এত রাতে বাবলাদা কেন?
অরিন্দম: এমনি। আজ ছেলে জিজ্ঞেস করছিল, আমার ম্যাথস টিচার কে ছিল।
কয়েক মুহূর্ত নীরবতা। বহুদিন বন্ধ থাকা একটা দরজা খুলে গেল।
নীল: উফ... নামটা শুনেই গায়ে কাঁটা দিল।
একটা একটা করে স্মৃতি উঠে আসতে লাগল।
নবীন: তিন মাস ফি দিতে পারিনি। এক দিনও কিছু বলেনি।
রজত: মাধ্যমিকের সময়, বাবা তখন হাসপাতালে, নিজে পরীক্ষায় পৌঁছে দিত।
তার পর প্রসঙ্গ ঘুরে গেল।
অর্ক (সিডনি): ওঁর সেই ডায়লগগুলো মনে আছে?
জয়: “আগে উত্তর দেখবি না।”
নীল: “ভুল করতে ভয় পাবি না।”
বাপি: “অঙ্ক তোকে ঠকায় না। মানুষ ঠকায়।”
স্ক্রিন আবার নিঃশব্দ।
হঠাৎ আর একটি নাম।
অন্বেষা (ক্যালিফোর্নিয়া): আমি একা মেয়ে ছিলাম ওই ব্যাচে। একদিন খুব বৃষ্টি। বাবলাদা আমাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিল।
বাপি: খেয়াল করেছিস? আমরা কেউ কোনও দিন ওঁকে ‘স্যর’ বলিনি।
সবার কাছে শুধু— বাবলাদা।
এতক্ষণ নীরব প্রসেনজিৎ লিখল, “আমি এখনও ওদিকেই থাকি।”
জয়: কেমন আছেন?
সুমন: এখনও পড়ান?
প্রসেনজিৎ বেশ কিছুক্ষণ পর লিখল— “আগের মতো নয়। চোখে কম দেখেন। ছাত্রও অনেক কমে গেছে। সবাই এখন কোচিং সেন্টার, অনলাইন, নানা অ্যাপ। তবে দরজার বাইরে বোর্ডটা এখনও ঝুলছে— এখানে গণিত শেখানো হয়।”
গ্রুপ নিস্তব্ধ। জাপানের রাত আর হাওড়ার রাত একই স্ক্রিনে এসে যেন পাশাপাশি বসল। অরিন্দমের হাত শক্ত করে ধরা ফোনটা। ঠিক তখনই প্রসেনজিতের আর-একটি মেসেজ।
“তোদের যদি সত্যিই ইচ্ছে করে, এক বার চলে আয়। লোকটা এখনও রোজ বিকেলে টেবিলে খাতা-পেন সাজিয়ে বসে। ছাত্র না এলে একাই অঙ্ক করে যায়।”
অরিন্দম অনেক ক্ষণ কোনও উত্তর লিখল না। ওর মনে হচ্ছিল, বাইরে যে বৃষ্টি পড়ছে, তার শব্দের ভিতরেই কোথাও একটি সাইকেল ঘণ্টি বাজাতে বাজাতে চলে যাচ্ছে।
গোধূলিগগনে মেঘে
গলিটার কোনও বৈশিষ্ট্য ছিল না। বর্ষায় কাদা, গরমে ধুলো, শীতে শুকনো পাতা। দু’পাশে ছোট ছোট বাড়ি। কোথাও শিউলি, মানিপ্ল্যান্ট, আবার দড়িতে শুকোতে দেওয়া স্কুলড্রেস। সন্ধের পরেই গলিটা যেন অন্য রকম হয়ে উঠত। এক-এক করে জমতে শুরু করত হাওয়াই চটি। দরজার বাইরে সারি দিয়ে রাখা চটিগুলোই বলে দিত, ভিতরে ক্লাস চলছে। কারও চটি নতুন, কারও ফিতে সেলাই করা, কারও আবার বড়দের। নিম্ন মধ্যবিত্ত সংসারে ঘরের মেঝেতে শতরঞ্চি। দেওয়ালে কালো বোর্ড। এক কোণে আলমারি, তার উপর টেস্ট পেপার, খাতা-বইয়ের স্তূপ। যে আগে আসত, সে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে বসার জায়গা পেত। ভিতরের ঘর থেকে বাবলাদার গলা ভেসে আসত, “যার যত কম অঙ্ক হবে, সে তত সামনে বসবে।”
এক মুহূর্তে সব চুপ। সামনের জায়গাটা আর কেউ চাইত না। লোডশেডিং তখন খুব স্বাভাবিক বিষয়। আচমকা আলো নিবে গেলেই চাপা উল্লাস। কিন্তু সেই আনন্দ পাঁচ সেকেন্ডের বেশি স্থায়ী হত না। ভিতরের ঘরে দেশলাই জ্বলার শব্দ। তার পর হ্যারিকেনের কাচে আগুনের আলো। বাবলাদা ধীরে ধীরে সলতে বাড়াতেন। যেন এটাও অঙ্কেরই অংশ। আলো স্থির হতেই তিনি বোর্ডের সামনে দাঁড়াতেন। চকটা হাতে নিতেই ঘর শান্ত হয়ে যেত।
মাসের শুরুতে টেবিলের কোণে একটা পুরনো বিস্কুটের টিন রাখা থাকত। সবাই চুপচাপ তার ভিতরে একটা খাম রেখে দিত। কেউ দিত না, হয়তো দিতে পারত না। ক্লাসের মধ্যে কোনও দিন সেই টিনের ঢাকনা খোলা হয়নি। আর কোনও দিন কেউ জিজ্ঞেসও করেনি— কে মাইনে দিল, কে দিল না।
বছর কেটে যেত। মুখ বদলে যেত, খাতার মলাট বদলে যেত। বিকেল পাঁচটা বাজলেই দরজার বাইরে আবারও জমে উঠত হাওয়াই চটির সারি।
অঙ্কে যত শূন্য পেলে
গ্রুপটা আবার চুপচাপ হয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ একটি মেসেজ।
প্রসেনজিৎ: জানিস... বাবলাদা কোনও দিন হাওড়া ছাড়েনি কেন?
কেউ উত্তর দিল না। প্রশ্নটা যেন স্ক্রিনে ঝুলে রইল।
কিছুক্ষণ পরে প্রসেনজিৎ আবার লিখল, “গত বছর এক দিন অনেক গল্প হয়েছিল। তখনই শুনেছিলাম।”
অনেক বছর আগে বাবলাদার নাম ছিল শুধু বাবলু। পাড়ায় সবাই বলত, ছেলেটার মাথায় অঙ্ক যেন খেলা করে। স্কুলের শিক্ষকরা বিশ্বাস করতেন, এ ছেলে অনেক দূর যাবে। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সুযোগও এসেছিল। তার পর এক দিন সব হিসাব বদলে গেল। হঠাৎ বাবা মারা গেলেন। সংসারে বৃদ্ধা মা, দুই ছোট বোন, আর একগুচ্ছ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা স্বপ্ন। সংসার বড় হয়ে গেলে স্বপ্নকে সরে দাঁড়াতে হয়। বাবলুও সরে দাঁড়িয়েছিলেন। প্রথমে দু’-এক জনকে পড়ানো। তার পর চার জন। তার পর দশ জন। কখন যে বাবলু সবার বাবলাদা হয়ে উঠলেন, কেউ জানে না। সময় অনেক কিছু কেড়ে নেয়। আবার নতুন নামও দিয়ে যায়।
আরও একটা গল্প শোনা যায়। এক বার নাকি বিয়েও ঠিক হয়েছিল। সব কথা এগিয়েও গিয়েছিল। শেষে মেয়ের বাড়ির লোক শুধু টিউশন পড়ানো বাবলাদাকে উপযুক্ত পাত্র মনে করেনি। বাবলাদা কোনও দিন এ নিয়ে কোনও কথা বলেননি। মা মারা যাওয়ার পর বাড়িটা আরও নির্জন হয়ে যায়। দুই বোনেরই নিজের নিজের সংসার দূরে। তবু বিকেল হলেই বাড়িটা ভরে উঠত, অন্য যে কোনও বাড়ির থেকে বেশি।
ঠিক তখন প্রসেনজিৎ লিখল, “এক দিন জিজ্ঞেস করেছিলাম— এত ছাত্র দেশে-বিদেশে। কারও কাছে চলে যান না কেন? বাবলাদা বলেছিলেন, ‘গাছের বয়স হলে তাকে আর অন্য মাটিতে বসানো যায় না। শিকড় বাঁচে না। আর কে জানে! যদি কোনও দিন হঠাৎ কোনও পুরনো ছাত্র দরজায় এসে দাঁড়ায়? জীবনের অঙ্কের হিসাব চাইতে!’”
জাপানের জানলার বাইরে বৃষ্টি থেমে গেছে। কোটি কোটি ইয়েনের ব্যবসা, অসংখ্য কর্মী, আন্তর্জাতিক সম্মান— সব কিছুর মাঝখানে আচমকা বিছানায় শুয়ে অরিন্দমের মনে হল, মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় ঋণগুলোর কোনও ব্যালান্স শিট হয় না। সেগুলো জমে থাকে। শুধু এক দিন, কোনও অকারণ রাতে, হঠাৎ মনে পড়ে।
আর সেই মনে পড়ার দিনটির নামই হয়তো— শিক্ষক দিবস।
শিক্ষক দিবস
কলকাতার আকাশে বর্ষার মেঘ। বিমানবন্দর থেকে গাড়ি ছাড়তেই অরিন্দম বুঝল, শহর বদলেছে, মানুষও। তবু হাওড়ার সেই গলিতে ঢুকতেই সময় যেন হাঁটা কমিয়ে দিল। গলিটা আগের চেয়ে সরু মনে হচ্ছে। না কি সে-ই বড় হয়ে গেছে? ওই তো বাড়িটা! দরজার উপরে টিনের বোর্ড। রং উঠে গেছে। তবু পড়া যায় ‘এখানে গণিত শেখানো হয়।’
অরিন্দম দরজায় কড়া নাড়ল। দরজা খুললেন বছর পঞ্চাশের এক ভদ্রলোক। কিছু ক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন— “আপনি?”
“বাবলাদার ছাত্র, অরিন্দম।”
ভদ্রলোক হেসে বললেন, “সেই জাপানের অরিন্দম?”
অরিন্দম অবাক, “আপনি আমাকে চেনেন?”
“মামার কাছে আপনার কথা অনেক শুনেছি। আসুন।”
ঘরে ঢুকতেই এক অদ্ভুত গন্ধ। পুরনো বই। চকের ধুলো। কাঠের আলমারি। মনে হল, এই ঘরে সময় জমাট বেঁধে থাকে। কালো বোর্ডটা এখনও আছে, আলমারিটাও। শুধু শতরঞ্চির উপর আর বসে নেই কোনও কিশোর।
অরিন্দম জিজ্ঞেস করল, “বাবলাদা আছেন?”
ভদ্রলোক বললেন, “না। তিন দিনের জন্য কৃষ্ণনগর গেছেন। ওঁর এক পুরনো ছাত্রের ছেলে মাধ্যমিক দেবে। অঙ্কে খুব ভয় পায়। অনেক দিন ধরে ডেকেছিল। মামা বলল, ‘ছেলেটার ভয়টা আগে কাটুক। তার পর তো নম্বর পাবে।’”
অরিন্দম কিছু বলল না। তার মনে হল, এত বছরেও মানুষটা যেন একটুও বদলাননি।
ভদ্রলোক আলমারির উপর থেকে একটি নীল ফাইল নামালেন, “এটা আপনার জন্য রেখে গিয়েছেন। প্রসেনজিৎ বলেছিল, আপনি আসবেন।”
অরিন্দম বিস্মিত। ফাইল খুলতেই বেরিয়ে এল একটি পুরনো অঙ্কের খাতা। মলাটের রং ফিকে। উপরে লেখা— অরিন্দম মুখার্জি, একাদশ শ্রেণি। আঙুলের ডগা দিয়ে নিজের নাম ছুঁয়ে রইল সে। পাতা উল্টোল। লাল কালি। টিকচিহ্ন। ভুলের পাশে ছোট্ট গোল। কোথাও লেখা— “তাড়াহুড়ো করিস না।”
আর এক পাতায়, “শেষ ধাপটা আবার কর।”
শেষের দিকে এসে হাত থেমে গেল। সেখানে কোনও অঙ্ক নেই। শুধু লাল কালিতে দুটো শব্দ।
“তুই পারবি।”
অরিন্দম আর পাতা উল্টোল না। খাতাটা আলতো করে বন্ধ করে বুকের কাছে চেপে ধরল।
বাইরে কয়েক জন স্কুলপড়ুয়া ছেলে হেসে হেসে রাস্তা দিয়ে চলে যাচ্ছে। তাদের হাতে রঙিন কাগজে মোড়া ফুল। আজ শিক্ষক দিবস?
ভদ্রলোক হঠাৎ বললেন, “মামার ওটাই ছাত্রদের দেওয়া প্রাইজ়, এখনও কোনও কোনও খাতা রেখে দেন।”
অরিন্দম বাইরে বেরিয়ে দরজার সামনে এক বার দাঁড়াল। জাপান থেকে আনা দামি পেন বা লিখে আনা চেক, কোনওটাই বার করতে পারল না। এ বার আর দেখা হল না বাবলাদার সঙ্গে।
অরিন্দম ধীরে ধীরে গলির দিকে হাঁটতে লাগল। দূরে কোথাও একটা সাইকেলের ঘণ্টি বাজছে। সে আর ফিরে তাকাল না। কারণ কিছু কিছু শিক্ষককে চোখে দেখার প্রয়োজন হয় না। তাঁরা আজীবন হেঁটে চলেন ছাত্রদের ভিতরেই।