বনকাপাসি এখন সাদা হয়ে আছে শোলার রঙে। ঘরে ঘরে শোলা চেরার মিহি শব্দ। কোথাও পাতলা চাকু শান পড়ছে পাথরে। বাতাসে ভাসছে শোলার পাপড়ি আর বিশেষ আঠার গন্ধ। বিশ্বকর্মা পুজো মিটতে দম ফেলার সুযোগ নেই রাজ্যের অন্যতম এই শোলা-শিল্প মহলের। বর্ধমান জেলা পূর্ব-পশ্চিমে ভাঙার অনেক আগে থেকেই সে জাগিয়ে রেখেছে আয়োজন, সাজাতে হবে যে মা-কে!
দেবী দুর্গা বীর্য ও শক্তির প্রতীক। ‘শ্রীশ্রীচণ্ডী’র দশম অধ্যায়ে তিনি বলেছেন, ‘একৈবাহং জগত্যত্র দ্বিতীয়াকা মমাপরা’— এই জগতে একমাত্র আমিই আছি, আমি ছাড়া দ্বিতীয় আর কে আছে? আবার একাদশ অধ্যায়ে দেবীর স্তুতিতে আছে, তিনি অনন্তবীর্যা, বিশ্বের বীজশক্তি। সমস্ত ক্ষমতার আধারশক্তিও তিনি। তিনি নিজেই একান্ত রূপ, আবার অনন্ত অরূপ। কমলাকান্তের পদে গিরিরাজ পত্নী মেনকাকে বলেছেন, ‘দেখো, মনে রেখ ভয়, সামান্যা তনয়া নয়,/ যাঁরে সেবে বিধি বিষ্ণু হরে।’ তা হলে তাঁকে সাজানোর আয়োজন, এ তো বাতুলতা! বনকাপাসির মেয়েরা শোলার গায়ে ছুরি চালাতে চালাতে বলবেন, “বা রে, উনি তো আমাদের মেয়েও। বাপের বাড়ি আসবেন ক’দিনের জন্য, তাঁকে সাজিয়েগুজিয়ে রাখব না ক’টা দিন! আমরা তো সেইটুকুই মাত্র করি।” মনে পড়ে যাবে শাক্তপদাবলির আগমনী পর্যায়ের পদে মা মেনকার সেই খেদোক্তি— ‘বাছার নাই সে বরণ, নাই আভরণ,/ হেমাঙ্গী হইয়াছে কালীর বরণ।’ তত্ত্বকথা যা-ই বলুক না কেন, স্বামীর ঘরে দারিদ্র আর অবহেলায় সে যে লাবণ্যহীন হয়ে পড়েছে, মেনকার মুখে সে কথা শুনে তো আমরা বিশ্বাস করি। তাই ঘরের মেয়েকে সাজানোর আয়োজন! বনকাপাসি তাই নিদ্রাহীন, মায়ের আভরণ নির্মাণে।
সেখান থেকে ফেরার পথে তাই মনে পড়বে কুমকুম মালাকারের কথা। প্রতিমা গড়তেন বাবার সঙ্গে, সেই ছোট্টবেলায়। হাওড়া আন্দুলের প্রতিমাশিল্পী রবি চিত্রকর। মেয়ের বিয়ে দিলেন বনকাপাসি গ্রামে। সেটাও এক শিল্পীর ঘর। শ্বশুরবাড়িতে এসে কুমকুম দেখলেন, দেওয়াল জুড়ে মস্ত সব ছবি। দেশের একাধিক রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কখনও তাঁর স্বামী, কখনও শ্বশুরমশাই, জাতীয় শিল্পীর পুরস্কার নিচ্ছেন। তাঁদের পাশে এক প্রবীণা, কাজে মগ্ন। লাল সিমেন্টের মেঝে জুড়ে সাদা শোলার অপূর্ব সব অলঙ্কার বানাচ্ছেন তিনি। কুমকুমের স্বামী আশিস মালাকার সে-ছবির সামনে দাঁড়িয়ে হাতজোড় করে চিনিয়ে দিয়েছিলেন, “আমার ঠাকুমা, জাতীয় পুরস্কারজয়ী কাত্যায়নী মালাকার। ওঁর হাত ধরেই শিল্পগ্রামের মর্যাদা পেয়েছে বনকাপাসি।” মাথার কাপড়টা আর একটু টেনে নিয়ে জোড়া হাত সেদিন কপালে ঠেকিয়েছিলেন কুমকুম মালাকারও। পাশে দাঁড়িয়ে জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত শোলা-শিল্পী আশিস মালাকার। দেশ-বিদেশে বিপুল খ্যাতি আশিসের। সিঙ্গাপুর থেকে নিউ ইয়র্ক, ইটালি, নরওয়ে বা এডিনবরা, তিনি ছড়িয়ে আছেন তাঁর শিল্প নিয়ে।
ঠাকুর গড়তে শিখেছিলেন বাবার কাছে। শ্বশুরবাড়িতে ঠাকুর গড়ার চল নেই। কিন্তু স্বামীর কাছে কুমকুম শিখলেন ঠাকুরের সাজ গড়ার কাজ— “এখানে ঠাকুর গড়তে না পারলেও মনের মতো ঠাকুরের সাজ বানাতে পারব জেনে খুব আনন্দ হয়েছিল।” বনকাপাসির সবচেয়ে বড় বাড়ি এটা। সবচেয়ে বিখ্যাতও। রাজ্য ও জাতীয় স্তরের একাধিক পুরস্কারে উজ্জ্বল এ বাড়ির শিল্পীরা। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক স্তরেও তাঁরা সমান ভাবে আদৃত।
উঠোনের এক পাশে ধানের গোলা আর তুলসীমন্দির। অন্য দিকে, আশিস মালাকারের কারখানা। লাল মেঝে জুড়ে অসংখ্য শোলার সাজ, মূর্তি, কারুকাজ এক পাশে সাজিয়ে রাখা। অন্য দিকে থাকে থাকে নানা মাপের শোলার দণ্ড। আশিসের বাবা আদিত্য মালাকারও বিশিষ্ট শিল্পী, পেয়েছেন দেশ-বিদেশের নানা পুরস্কার। মাত্র ছ’বছর বয়সে বাবাকে হারান আদিত্য। কুমোরটুলিতে ওঁদের দোকান ছিল। আশিসের ঠাকুরদা মৃত্যুঞ্জয় মালাকারের তৈরি দোকান। তখন হত ডাকের সাজ। জার্মানি থেকে ডাকযোগে আসতো জরি, রাংতা, চুমকি। সে-সব দিয়ে বানানো হত প্রতিমার অলঙ্কার। তাই এর নাম ডাকের সাজ। কিন্তু হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল জার্মানির ডাক আসা। শিল্পীদের মাথায় হাত। কী ভাবে চলবে তাঁদের ব্যবসা! চার পাশে তখন অনেক জলা, শোলায় ভরে থাকত। মৃত্যুঞ্জয়ের মাথায় খেলে গেল, যদি জরি-চুমকি ছাড়া শুধু শোলার সাজ করা যায়!শুধু শোলা দিয়ে যে প্রতিমার সাজ হতে পারে, তখন কেউ ভাবেনি। শুরু হল শোলার সাজ তৈরি। মৃত্যুঞ্জয় সফল হলেন। বনকাপাসিতে কান পাতলে এখনও শোনা যায়, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু নাকি তাঁর কাজে মুগ্ধ হয়ে বাড়ির কালীপুজোয় সেই সাজের বরাত দেন। তার পর একে একে কলকাতার বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোয় প্রবেশ তাঁর। সবে দাঁড়াচ্ছেন ব্যবসায়, এমন সময় অকালমৃত্যু মৃত্যুঞ্জয়ের। স্বামীর কাছে কাজ শিখেছিলেন স্ত্রী কাত্যায়নী। বিপর্যয়ে দমেননি। ছ’বছরের শিশুপুত্র আদিত্যকে নিয়ে কাজে নামলেন। কাত্যায়নীই বনকাপাসির সেই হ্যামলিন, যিনি একটু একটু করে গোটা গ্রামকে টেনে আনলেন শোলা শিল্পের অন্তরমহলে। আশিসের কথায়, “এখন বনকাপাসির ৯০ শতাংশ মানুষ এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। সারা বছর প্রায় দু’কোটি টাকার কাজ হয় এই শিল্পী গ্রামে। আমাদের
কাজে কোনও যন্ত্র লাগে না। শিল্পীমন, দুটো হাত, শোলা আর নানা মাপের চাকু— এই হল এ
শিল্পের উপকরণ।”
বছরভর তাঁদের কাজ, বিরামহীন। আশিসের ছেলে অভিজিৎ কাজ করছেন বাবার সঙ্গে। আর তাঁদের চতুর্থ প্রজন্ম অরিজিৎ পাঁচ বছর বয়সেই শিখে গেছে শোলা ধরতে। কথা বলার সময় নেই এখন বনকাপাসির। গোটা গ্রাম শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ব্যস্ত কাজে। ঘরে ঘরে সাদা হাওয়া, যেন সফেদ শোলার আলো। নতুন লোক দেখলে ছোটরা খবর পাঠায় ভিতর-বাড়িতে। শিল্পীরা কেউ কেউ হাতের কাজ খানিক সরিয়ে রেখে পথের দিকে তাকান। অতিথি নিকটে এলে জানতে চান, ‘কী ধরনের মাল খুঁজছেন?’ কয়েক মিনিটের কথাবার্তা। ফের ডুবে যান কাজে। ফিরে আসার আগে শিল্পগুরু আশিস মালাকার বলেছিলেন, “কাত্যায়নী তো দুর্গার আর এক নাম। মা দুর্গাই যেন আমার স্বর্গত ঠাকুমার রূপ নিয়ে মরা গ্রামটাকে প্রাণ দিয়েছিলেন এই শিল্পে টেনে এনে। আজ দেখুন, এ গ্রামে সবাই শিল্পী। কেউ প্রতিমার সাজ গড়ান, কেউ অন্য শিল্পকর্ম। প্রাণের আনন্দে কাজ করি। ঈশ্বরের কাজ তো, তাই সব কষ্ট মানিয়ে নিতে পারি আমরা।” গোধূলির আলোয় তখন চকচক করছে বনকাপাসির মুখ। আশিস মালাকার মন দেন কাজে।