মায়ানমারের সন্ধে শুরু হয় চায়ের পেয়ালায়। সারা দিনের কর্মব্যস্ততার শেষে ভিড় জমে ওঠে রাস্তার ধারের চায়ের দোকানগুলোয়। চায়ের কাপে আড্ডা বাড়ে রাজনীতি থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের গল্পগাছায়। আর চায়ের কাপের সঙ্গী হয় পাওসে, পালাতার মতো ফিঙ্গার ফুড। ছোট ছোট খাবারের অনুষঙ্গে রাতের অন্ধকার গাঢ় হয়ে ওঠে। সেখানে না আছে কাজে যাওয়ার তাড়া বা খাবার শেষ করার অস্থিরতা। বরং ঘণ্টার পর ঘণ্টা চায়ের কাপ হাতে ধীরেসুস্থে সময় কাটান স্থানীয়রা। কলেজের অধ্যাপক থেকে চিকিৎসক, কর্পোরেট কর্মী, লেখক, কলেজপড়ুয়া... নানা পেশার মানুষই ভিড় জমান চায়ের দোকানগুলোয়।
চিন-ভারত হয়ে বর্মায়
এক সময়ে ভারত, চিনের বণিক সম্প্রদায় এই ধরনের চায়ের দোকানেই দেখা করতেন স্থানীয়দের সঙ্গে। সেখানেই ব্যবসায়িক আদানপ্রদান সাঙ্গ হত চায়ের পেয়ালা সঙ্গী করে। চিনের সঙ্গে ব্যবসায়িক আদানপ্রদানের সঙ্গেই তৎকালীন বর্মার হেঁশেলে ঢুকে পড়ে চিনের জনপ্রিয় স্টিমড বান। এই ধরনের বানের মধ্যে নানা রকমের পুর ভরা থাকে। বর্মায় যা ক্রমে পরিচিতি পায় পাওসে নামে। চায়ের সঙ্গে হালকা অথচ সুস্বাদু খাবার হিসেবে বার্মিজ় টি-শপে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে পাওসে। ময়দা ফার্মেন্ট করে তৈরি হয় গোল গোল বানের মতো পাওসে। এর মধ্যে মাংস বা কর্নের পুর ভরা থাকে। আবার মিষ্টি বানের জন্য কোকোনাট ক্রিম, স্থানীয় কাস্টার্ডও ব্যবহার করা হয় পুর হিসেবে।
মায়ানমারে চায়ের আড্ডায় পালাতাও অনেকটা এ ভাবেই ঢুকে পড়ে ব্রিটিশ আমলে। ব্রিটিশশাসিত ভারতের অনেকেই তখন কর্মসূত্রে মায়ানমারে (তৎকালীন বর্মায়) যেতেন। তার ফলে ভারতীয় পরোটা ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে বর্মায়। স্তরে স্তরে মাখন দিয়ে ক্রমশ পরোটা বানাতে শেখেন বর্মার স্থানীয়রা। পরোটা থেকে এই পালাতাই ক্রমশ জায়গা করে নেয় বার্মিজ় কুইজ়িনে। সম্প্রতি বার্মিজ় টি-শপের অনুপ্রেরণায় কলকাতায় ‘পাওসে অ্যান্ড পালাতা- উইন্ডোজ় টু বর্মা’ নামে নতুন মেনু নিয়ে এল বর্মা বর্মা, কলকাতা। এদের মেনুতে যেমন রয়েছে পাওসে, পালাতা, তার সঙ্গে পাওয়া যাচ্ছে নানা রকম বান, বার্গার, সুপ, স্যান্ডো আর রকমারি চা।
এখানে যেমন ক্রিস্পি কর্ন প্যাটি দিয়ে তৈরি বার্গারের মধ্যে রয়েছে ম্যাঙ্গো-পাইনঅ্যাপল সালসার ট্যাঙ্গি ফ্লেভার। তার সঙ্গত করছে স্পাইসি মশলা দেওয়া ফ্রেঞ্চ ফ্রায়েজ়। বার্মিজ় মশলা দিয়ে তৈরি টোফু অ্যান্ড স্ক্যালিয়ন টুইস্ট পরিবেশন করা হয় স্পাইসি স্প্রিং অনিয়ন ডিপের সঙ্গে। বার্মিজ় টি-শপে যে ভাবে পরিবেশিত হয়, ঠিক সে ভাবেই এখানে পরিবেশন করা হচ্ছে লেন্টিল সুপের মধ্যে ব্রাউন অনিয়ন সহযোগে টি ব্রেক পালাতা।
অবাক চা-পান
তবে বার্মিজ় টি-শপের খাওয়াদাওয়া যখন, তখন নানা রকম চায়ের গল্প ছাড়া তা অসম্পূর্ণ। বর্মায় যেমন চা-পাতা ফুটিয়ে কনডেন্সড মিল্ক দিয়ে খাওয়ার চল রয়েছে, তেমনই ফার্মেন্টেড টি-ও সমান জনপ্রিয় এই অঞ্চলে। লাফেট নামে পরিচিত এই চা পাতা মূলত স্যালাডে ব্যবহার হয়। অনেক সময়ে আবার পিকলড করেও দীর্ঘ দিন রেখে দেওয়া হয়। ফার্মেন্টেড চা পাতার সঙ্গে রসুন, বাদাম, লঙ্কা, টম্যাটোর মিশ্রণে তৈরি হয় স্যালাড। অনেক সময়ে শ্রিম্প মেশানো হয় এই স্যালাডে।
কখনও আবার চায়ের সঙ্গে দুধের মিশ্রণে পুলড টি, কখনও আবার চায়ের ফ্লেভারের সুপও পরিবেশন করা হয়। চায়ের সঙ্গে কনডেন্সড মিল্ক বা ইভ্যাপোরেটেড মিল্ক মিশিয়ে চা তৈরি হয়। এই ধরনের চায়ে ক্যারামেল ফ্লেভার বেশি পাওয়া যায়। অনেক সময়ে মধু, কেশরও মেশানো হয় চায়ে ফ্লেভার আনার জন্য। সিনামন স্পাইস পুলড টি-তে আবার ধরা পড়ে দারুচিনি ও স্টার অ্যানিসের সুবাস। এ ছাড়াও জেসমিন টি, অরেঞ্জ টি-র মতো অনেক বৈচিত্র রয়েছে চায়ে। শুধু গরম নয়, চিলড টি-ও রয়েছে এদের মেনুতে। আবার কখনও ঠান্ডা পানীয়ের মধ্যে কোলা ফ্লেভারের সঙ্গে মেলবন্ধন ঘটানো হয়েছে তেঁতুলের। ফলে এক চমকপ্রদ তরতাজা স্বাদ এনে দিচ্ছে এই পানীয়।
আর শেষ পাতে রয়েছে মায়ানমারের কিছু স্থানীয় মিষ্টিমুখের সন্ধান। তার মধ্যে যেমন রয়েছে ক্রিমের পুর ভরা পাফ, তার সঙ্গে রয়েছে নাটি বানানা সান্ডে। বর্মার স্থানীয় খাবার হোক বা চা, দুটোই বেশ হালকা। ফলে পেট ভার করার সমস্যা থাকে না, কিন্তু এদের রান্নার আকর্ষক স্বাদে মন ভরে থাকে দীর্ঘক্ষণ।
ছবি: সর্বজিৎ সেন; ফুড ও লোকেশন: বর্মা বর্মা, কলকাতা