Advertisement
E-Paper

চিনে হাজার হাজার বছর ধরে পাহারায় রহস্যময় বাহিনী! গড়েছিল কারা? বলে দিল ২২০০ বছরের পুরনো আঙুলের ছাপ

১৯৭৪ সালে চিনের শানস্কি প্রদেশের লিনটং কাউন্টিতে প্রথম টেরাকোটা বাহিনীর খোঁজ মেলে। খোঁড়াখুঁড়ির পর বোঝা যায়, মাটির নীচে সারি দিয়ে সেনাদের মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে। যেন সম্রাটের সমাধিটির পাহারাদার।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ২৩ অক্টোবর ২০২৬ ০৯:০০
বছরের পর বছর ধরে চিনের সম্রাটের সমাধি পাহারা দিচ্ছে টেরাকোটা বাহিনী।

বছরের পর বছর ধরে চিনের সম্রাটের সমাধি পাহারা দিচ্ছে টেরাকোটা বাহিনী। —ফাইল চিত্র।

হাজার হাজার বছর ধরে সম্রাটকে ‘পাহারা’ দিচ্ছে তারা। রোদ, ঝড়, জলেও কর্তব্যে অবিচল। চিনের রহস্যময় সেই টেরাকোটা বাহিনী দীর্ঘ দিন ধরেই প্রত্নতত্ত্ববিদ এবং ইতিহাসবিদদের আকর্ষণের কেন্দ্রে। বলা হয়, আজ থেকে প্রায় ২২০০ বছর আগে সম্রাট কিন শিহুয়াংয়ের সমাধি পাহারা দেওয়ার জন্য পোড়ামাটির তৈরি বিশাল সেনাবাহিনী গড়ে তোলা হয়েছিল, এখনও যার পরতে পরতে লুকিয়ে রহস্য। মাটির নীচে সেনাবাহিনীর বহর কত দূর পর্যন্ত বিস্তৃত এখনও তা নিশ্চিত করা যায়নি।

১৯৭৪ সালে চিনের শানস্কি প্রদেশের লিনটং কাউন্টিতে প্রথম টেরাকোটা বাহিনী আবিষ্কার করা হয়েছিল। স্থানীয় কয়েক জন কৃষক সম্রাটের সমাধিস্থল থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে কূপ খনন করতে গিয়ে আচমকা পোড়ামাটির কাজের কিছু অংশ খুঁজে পান। সেখানে আরও খোঁড়াখুঁড়ির পর বোঝা যায়, মাটির নীচে ওই অংশে সারি সারি সেনাদের মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে। যেন সম্রাটের সমাধিটিকেই পাহারা দিচ্ছে তারা।

তার পর থেকে টেরাকোটা বাহিনী নিয়ে বহু বার বহু গবেষণা হয়েছে। প্রতি বার উঠে এসেছে নতুন নতুন তথ্য। গবেষকদের অনুমান, প্রায় ৮০০০ সৈন্য, ৫২০টি ঘোড়া, ১৫০ জন অশ্বারোহী এবং ১৩০টি রথ পোড়ামাটি দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু সুবিশাল সমাধিক্ষেত্রের অধিকাংশই এখনও খনন করা হয়নি। তাই টেরাকোটা বাহিনীর কোনও সামগ্রিক, সম্পূর্ণ চিত্র প্রকাশ্যে আসেনি। অনেক প্রশ্ন অজানা রয়ে গিয়েছে।

টেরাকোটা বাহিনী কেন ও কী ভাবে তৈরি করা হয়েছিল, তা নিয়ে অতীতে অনেক গবেষণা হয়েছে। কিন্তু কারা এই বাহিনী সযত্নে, নিখুঁত দক্ষতায় গড়ে তুলেছিলেন, তা নিয়ে আলোচনা তেমন হয়নি। এত দিন মনে করা হত, প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ কারিগরেরাই পোড়ামাটির সৈন্যবাহিনী তৈরি করেছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণায় অন্য ইঙ্গিত মিলেছে। ২২০০ বছরের পুরনো স্থাপত্যে পাওয়া আঙুলের ছাপ বলে দিয়েছে, শুধু পুরুষ নয়, মহিলারাও এই কাজে হাত লাগিয়েছিলেন। এমনকি, ছিল নাবালকেরাও!

চিনের সম্রাট কিন শিহুয়াং সমাধিস্থল জাদুঘরের প্রত্নতত্ত্ববিদ শিয়াওক্সি লি-এর নেতৃত্বে একদল গবেষক সম্প্রতি টেরাকোটা বাহিনীর কারিগর-রহস্যে মনোনিবেশ করেছিলেন। তাঁদের গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে ‘জার্নাল অফ কালচারাল হেরিটেজ’-এ। গবেষণায় দাবি, কিন রাজবংশের শাসনের সময় চিনে নারী ও শিশুরাও রাষ্ট্রপরিচালিত কর্মশালায় যোগ দিতেন। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে পোড়ামাটির কাজে পারদর্শী ছিলেন তারা। সকলের অবদান রয়েছে এই বিশাল বাহিনী গড়ে তোলার নেপথ্যে।

টেরাকোটা বাহিনীর বৈচিত্র্য কিন্তু অন্য জায়গায়। দূর থেকে দেখলে আপাত দৃষ্টিতে হাজার হাজার যোদ্ধাকে সেখানে একই রকম দেখতে মনে হয়। কিন্তু কাছে গিয়ে খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, প্রত্যেক সৈন্যের মুখ, চুলের ধরন, বর্ম ভিন্ন ভিন্ন। যেন হাজার হাজার বছর আগে ঠিক এই স্থানেই যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁরা সকলে। তার পর কোনও এক অজানা মন্ত্রে পাথর হয়ে গিয়েছেন!

বাহিনী তৈরিতে নারী ও শিশুদের ভূমিকা যে ছিল, কী ভাবে নিশ্চিত হলেন গবেষকেরা? বস্তুত, একটিমাত্র খননগর্ত থেকে সংগৃহীত ৩৬ জন যোদ্ধার নমুনা বিশ্লেষণের ভিত্তিতে গবেষণাটি সম্পন্ন হয়েছে। প্রাথমিক ভাবে ৯১টি আঙুলের ছাপ নথিভুক্ত করা হয়েছিল। পরে ১২টি বাদ দেওয়া হয়। অর্থাৎ, শিয়াওক্সিদের গবেষণার কেন্দ্রে ছিল মোট ৭৯টি আঙুলের ছাপ। টেরাকোটার যোদ্ধাদের মাথা, হাত, বর্ম, গলা এবং পায়েও এই ধরনের ছাপ ছিল। আঙুলের সেই ছাপই কারিগরদের লিঙ্গ নির্ধারণের সহায়ক হয়ে ওঠে।

গবেষকদের ব্যাখ্যা, মানুষ বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আঙুলের ছাপের রেখাগুলি দূরে সরে যায়। পুরুষ ও নারীর ক্ষেত্রে তার পার্থক্য রয়েছে। আবার, দেহের বৃদ্ধি থেমে গেলে পুরুষদের দাঁতের মাড়ির ফাঁক মহিলাদের তুলনায় বেশি হয়। এখান থেকেও লিঙ্গ নির্ধারণের সূত্র মিলতে পারে। আধুনিক পদ্ধতি প্রয়োগ করে আঙুলের ছাপ এবং অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করে কারিগরদের দলে নারী ও শিশুর উপস্থিতি নিশ্চিত করেছেন গবেষকেরা। এখান থেকে প্রাচীন চিনের সমাজ ও সংস্কৃতির একটি পরিচয়ও পাওয়া যায় বলে অনেকের মত।

গবেষণায় দেখা গিয়েছে, আঙুলের ছাপগুলির মধ্যে মাত্র ৪৫ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের। ৩২.৭ শতাংশ আঙুলের ছাপ মহিলাদের বলে মনে করছেন গবেষকেরা। বাকি ২২.৩ শতাংশ আঙুলের ছাপ এসেছে ১৫ বছর বা তার কমবয়সিদের হাত থেকে। শিয়াওক্সিরা মেনে নিয়েছেন, তাঁদের গবেষণায় অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। টেরাকোটা বাহিনীর কারিগরদের নিয়ে আরও বিশদ, তথ্যভিত্তিক ও নিখুঁত গবেষণা প্রয়োজন। শিয়াওক্সি গবেষণাপত্রে লিখেছেন, ‘‘আমাদের গবেষণা অসংখ্য ঐতিহাসিক নথিপত্রকে জোরালো ভাবে সমর্থন করে। কিন রাজবংশের রাষ্ট্রপরিচালিত কর্মশালাগুলিতে নারী-পুরুষ একসঙ্গে কাজ করতেন। কিশোর-কিশোরীরাও যোগ দিত তাঁদের সঙ্গে। সম্ভবত তারা শিক্ষানবিশ হিসেবে থাকত।’’

Terracotta army China Scientific Research

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy