Advertisement
E-Paper

বরফ গলেই চলেছে আন্টার্কটিকায়, দূষণ কমলেও থামবে না! কত ইঞ্চি বাড়তে পারে সমুদ্রের জলস্তর? ইঙ্গিত গবেষণায়

আন্টার্কটিকার বরফ ক্ষয়ের প্রভাব সরাসরি পড়ে সমুদ্রতীরবর্তী দেশগুলির উপকূলে। বিজ্ঞানীদের দাবি, বরফ গলার ফলে সমুদ্রের জলস্তর ধীরে ধীরে বাড়ছে। যা আগামী দিনে বিপদ ডেকে আনতে পারে।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ০৫ অক্টোবর ২০২৬ ০৯:০৪
আন্টার্কটিকা মহাদেশের বরফ দ্রুত গলে যাচ্ছে।

আন্টার্কটিকা মহাদেশের বরফ দ্রুত গলে যাচ্ছে। ছবি: রয়টার্স।

আন্টার্কটিকার বরফস্তর থেকে ক্রমেই বরফের ভর কমছে। বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে তাপমাত্রা যত বাড়ছে, তত উষ্ণ হচ্ছে সমুদ্রের জল। আন্টার্কটিকা সংলগ্ন সমুদ্রের উষ্ণ স্রোতে বরফ গলে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই তা নিয়ে আশঙ্কিত। সম্প্রতি একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন ব্যাপক ভাবে কমিয়ে আনা হলেও ২১০০ সালের মধ্যে আন্টার্কটিকার বরফক্ষয় অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। সবচেয়ে কম নির্গমনের পরিস্থিতিতেও ২১০০ সালের মধ্যে আন্টার্কটিকার বরফস্তরের নিট বরফের ভর কমে যাওয়ার সম্ভাবনা অন্তত ৯২ শতাংশ। অর্থাৎ, নির্গমন কমিয়ে আনলেও বরফক্ষয় পুরোপুরি থামবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে নির্গমনের মাত্রার উপর ভবিষ্যতে বরফক্ষয়ের পরিমাণ অনেকটাই নির্ভর করবে।

আন্টার্কটিকার বরফক্ষয় বিশ্ব জুড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে, যার প্রভাব পড়ে সমুদ্রতীরবর্তী দেশগুলির উপকূলে। বিজ্ঞানীদের দাবি, আন্টার্কটিকার স্থলভাগের বরফের ভর কমে যাওয়ায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। নতুন বরফ তৈরি হওয়ার সঙ্গে গলনের ভারসাম্য নেই। পরিস্থিতি এমন চলতে থাকলে পরিস্থিতিভেদে ২১০০ সালের মধ্যে আন্টার্কটিকার বরফক্ষয়ের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা কতটা বাড়তে পারে, তারও পূর্বাভাস দিয়েছে গবেষণাটি। হংকঙের সিটি ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ইউচেং লিন আন্টার্কটিকা সংক্রান্ত এই গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন। গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে নেচার জিয়োসায়েন্স জার্নালে।

গবেষকেরা দেখিয়েছেন, গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন ব্যাপক ভাবে হ্রাস পেলেও এই শতাব্দীতে, অর্থাৎ ২১০০ সালের মধ্যে আন্টার্কটিকার বরফ ক্ষয় বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবে ক্ষয়ের পরিমাণে তারতম্য হতে পারে। সেই সংক্রান্ত পরিসংখ্যানের দিকে তাকানোর আগে বোঝা দরকার, কী ভাবে আন্টার্কটিকা মহাদেশের বরফের উপর উষ্ণায়নের প্রভাব কার্যকর হচ্ছে।

আন্টার্কটিকার মূল ভূখণ্ডের ৯৮ শতাংশই বরফাবৃত। এই বরফ রয়েছে শক্ত ভূখণ্ডের উপর। তার কিনারা বরাবর কিছু ভাসমান বরফের স্তর রয়েছে, যার গুরুত্ব অপরিসীম। বিজ্ঞানীদের দাবি, চলমান হিমবাহগুলির গতি কমাতে সাহায্য করে বরফের এই ভাসমান স্তরই। স্থলভাগের হিমবাহ ও বরফপ্রবাহ স্বাভাবিক ভাবেই সমুদ্রের দিকে এগিয়ে যায়। ভাসমান বরফের স্তর তাদের সেই গতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করে। অর্থাৎ, তাদের কিছুটা ঠেকিয়ে রাখে ভাসমান বরফের স্তর। এতে হিমবাহের গতি পুরোপুরি রুদ্ধ না হলেও অনেকাংশে হ্রাস পায়। কিন্তু বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাবে এই গুরুত্বপূর্ণ স্তরই বিপন্ন হয়ে পড়েছে। গবেষণায় বিশেষ ভাবে দেখানো হয়েছে, সমুদ্রের জলের উষ্ণতা বাড়লে ভাসমান বরফের স্তরের নীচের অংশ দ্রুত গলতে পারে। এর ফলে বরফের সেই স্তর পাতলা ও দুর্বল হয়ে পড়ে। ভাসমান বরফের স্তরটি স্থলভাগের বরফের সমুদ্রের দিকে এগিয়ে যাওয়ার গতি অনেকটা আটকে রাখে। সেটি দুর্বল হয়ে গেলে এই প্রতিরোধ কমে যায় এবং স্থলভাগের হিমবাহ ও বরফ দ্রুত সমুদ্রের দিকে প্রবাহিত হতে পারে। এর ফলে সমুদ্রের জলস্তরও বাড়তে পারে।

আমেরিকার রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তথা এই গবেষণাপত্রের অন্যতম লেখক রবার্ট কর্প বলেছেন, ‘‘উপকূল এলাকায় যাঁরা বসবাস করেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির জন্য তাঁদের প্রস্তুত হতে হবে। বিপদ কতটা আসন্ন, তার কতটা মোকাবিলা প্রয়োজন, তা আমাদের আজকের কাজকর্ম এবং সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করছে। এখন থেকে গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন কমালে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ঝুঁকি কিছুটা কমবে।’’

গবেষণায় আরও দেখা গিয়েছে, বেশি গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হলে ২১০০ সালের মধ্যে কম নির্গমনের পরিস্থিতির তুলনায় আন্টার্কটিকার বরফক্ষয় বেশি হওয়ার সম্ভাবনা অন্তত ৮৯ শতাংশ। অর্থাৎ, এই ৮৯ শতাংশ সমুদ্রের জলস্তর বাড়ার সম্ভাবনা নয়, বরং বেশি নির্গমনের ফলে আন্টার্কটিকার বরফক্ষয় আরও বেশি হওয়ার সম্ভাবনাকেই নির্দেশ করছে। গবেষকদের মতে, বরফক্ষয়ের এই অতিরিক্ত মাত্রা ভবিষ্যতে উপকূলীয় এলাকাগুলির সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকিও বাড়াবে। ইউচেং এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘‘ক্ষতি আটকাতে না পারলেও তার পরিমাণ এখনও আমাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। মনে রাখতে হবে, মানুষের কাজের জন্য বায়ুমণ্ডলে নির্গত এক এক টন গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রভাব শত শত বছর ধরে স্থায়ী থাকে।’’

আন্টার্কটিকার বরফক্ষয়ের পরিমাণ অনুমান করতে গবেষকেরা ২০০২ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত উপগ্রহের মাধ্যমে পাওয়া তথ্য ব্যবহার করেছেন। এই তথ্যের সাহায্যে ওই সময়ে আন্টার্কটিকার বরফের ভর কত হারে কমেছে, তার হিসাব করা হয়েছে। পরে সেই পর্যবেক্ষণ-তথ্যের সঙ্গে আইস শিট মডেল ইন্টারকম্প্যারিজন প্রজেক্ট-এর ১২টি গাণিতিক মডেলের ৩৪০টি পূর্বাভাস মিলিয়ে দেখেন গবেষকেরা। মেশিন লার্নিং-ভিত্তিক একটি পদ্ধতির সাহায্যে বিভিন্ন মডেলের ফলাফল বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতে আন্টার্কটিকার বরফক্ষয়ের সম্ভাব্য গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে অনুমান করা হয়েছে। গবেষণার পূর্বাভাস বলছে, গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন খুব বেশি থাকলে ২১০০ সালের মধ্যে আন্টার্কটিকার বরফ গলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা গড়ে প্রায় ১৫.৭ সেন্টিমিটার বা ৬.২ ইঞ্চি বাড়তে পারে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে এই বৃদ্ধি প্রায় ২৫.৪ সেন্টিমিটার বা ১০ ইঞ্চি পর্যন্ত হতে পারে। এর ফলে সমুদ্রতীরবর্তী শহরগুলিতে বিপদ বাড়তে পারে।

গবেষকদের দাবি, এই পূর্বাভাস ১০০ শতাংশ নিশ্চিত নয়। বিভিন্ন মডেল, পর্যবেক্ষণ-তথ্য এবং একাধিক সম্ভাব্য পরিস্থিতির ভিত্তিতে এই পূর্বাভাস তৈরি করা হয়েছে। তবে আন্টার্কটিকার জলবায়ু অনিশ্চিত। মহাদেশটির পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, এমন প্রতিটি সম্ভাবনা মডেলগুলির অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। রবার্টের মতে, ‘‘আন্টার্কটিকা কত দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে, তা নিয়ে এখনও প্রশ্ন রয়েছে। তবে বিভিন্ন দিকে নগরায়ন, শিল্পায়ন বেড়ে চলেছে। বড় বড় বাড়ি, প্রতিষ্ঠান, অবকাঠামো নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। অদূর ভবিষ্যতের ঝুঁকি সম্পর্কে তাই একটি স্পষ্ট ধারণা তৈরি করে দেওয়া দরকার।’’

Antarctica Antarctica icebergs Glaciers Scientific Research Global Warming Greenhouse Gas Emissions

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy