মোহনবাগান - ১ (জেলকোভিচ)
ইস্টবেঙ্গল - ০
ডুরান্ডের ফাইনালে হারের বদলা নিল মোহনবাগান। আইএফএ শিল্ডের ফাইনালে ইস্টবেঙ্গলকে ১-০ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হল তারা। জয়ের নায়ক মোহনবাগানের বিদেশি সামির জেলকোভিচ। প্রথমার্ধে করা তাঁর একমাত্র গোলেই হল খেলার ফয়সালা। ২২তম শিল্ড ঢুকল গঙ্গাপাড়ের তাঁবুতে। ডুরান্ড ফাইনালে হারলেও শিল্ডের ফাইনালে আন্তোনিয়ো লোপেজ় হাবাসকে হারালেন পানাজিয়োটিস দিমপেরিস। তবে দুই দলের খেলা মন ভরাতে পারল না। ছন্নছাড়া ফুটবলের সাক্ষী থাকল যুবভারতী।
ডুরান্ডের ফাইনালে দু’দলের কাছেই ভাল ফুটবল দেখা গিয়েছিল। ইস্টবেঙ্গল তো বটেই, মোহনবাগানও সুযোগ তৈরি করেছিল। কিন্তু শিল্ডের ফাইনালে দেখে মনে হল, শুরু থেকেই ক্লান্ত হয়ে নেমেছে দুই দল। খারাপ ফুটবল, মিস্ পাসের প্রতিযোগিতা চলছে। পানামা, ব্রাজ়িল, উরুগুয়ের বিরুদ্ধে খেলার পর ভারতীয় ফুটবলারদের পারফরম্য়ান্স কি আরও খারাপ হল? সেই প্রশ্ন উঠছে।
জাতীয় দল থেকে ফেরা ফুটবলার দুই দলেই ছিল। ইস্টবেঙ্গলে এডমুন্ড লালরিনডিকা, জয় গুপ্ত, মোহনবাগানে সাহাল আব্দুল সামাদ, অভিমিতেই, মেহতাব সিংহেরা শুরু থেকেই খেলছিলেন। বাগান শুরু করেছিল চার বিদেশিতে। আলবের্তো রদ্রিগেজ়, সামির জেলকোভিচ, দেজান দ্রাজিচ ও লি আরউইনকে নামিয়েছিলেন দিমপেরিস। হাবাস শুরু করেছিলেন তিন বিদেশি নিয়ে। রশিদ, দিয়েগো জিভুলিচ ও দানি রামিরেজ। পরে আরও তিন বিদেশি নামান তিনি। কিন্তু খেলায় তার প্রভাব চোখে পড়ল না।
অবশ্য খেলার শুরুতেই সোনার সুযোগ পেয়েছিলেন এডমুন্ড। একা পেয়েছিলেন বিশাল কাইথকে। কিন্তু ঠিক জায়গায় বল রাখতে পারলেন না গত ডার্বিতে হ্যাটট্রিক করা স্ট্রাইকার। বিশাল বাঁচালেন মোহনবাগানকে। ডুরান্ডের ডার্বির পর এডমুন্ডের খেলা চোখে পড়ছে না। জাতীয় দল ও ইস্টবেঙ্গলের হয়ে পর পর ভাল সুযোগ হাতছাড়া করেছেন তিনি। সেই সময় ইস্টবেঙ্গল গোল করে ফেললে খেলার ছবিটা অন্য রকম হতে পারত।
শুরু থেকে অনেক গুছিয়ে আক্রমণ করছিল ইস্টবেঙ্গল। মোহনবাগানের অর্ধে একের পর এক পাস খেলছিল তারা। বার বার বাঁ প্রান্ত দিয়ে আক্রমণে ওঠার চেষ্টা করছিল। ১২ মিনিটের মাথায় বিপিন সিংহ বক্সের বাইরে থেকে গোল করতে গেলেও শট প্রতিহত হয়।
১৫ মিনিটের মাথায় প্রথম সুযোগ পায় বাগান। ইস্টবেঙ্গলের কয়েকজন ফুটবলারকে কাটিয়ে বাঁ পায়ে শট নিয়েছিলেন আরউইন। কিন্তু দুর্বল শট ধরতে অসুবিধা হয়নি লাল-হলুদ গোলরক্ষক ফুর্বা লাচেনপার। তিন মিনিট পর সুযোগ নষ্ট করেন লালিয়ানজুয়ালা ছাংতে। বাঁ প্রান্ত থেকে একাই বল নিয়ে অনেকটা উঠে ইস্টবেঙ্গলের বক্সে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু কাউকে পাস না দিয়ে নিজেই শট নিতে গেলেন। ইস্টবেঙ্গলের রক্ষণ ভাগ আক্রমণ থামিয়ে দেয়।
ধীরে ধীরে আক্রমণ বাড়ায় মোহনবাগান। ২৩ মিনিটের মাথায় বাঁ প্রান্ত থেকে ভেসে আসা অভিষেকের ক্রস হেড করেছিলেন ফাঁকায় থাকা মেহতাব। কেউ তাঁকে মার্ক করেননি। কিন্তু তিনি বল গোলে রাখতে পারলেনই না। অনেকটা সময় ছিল তাঁর কাছে। দরকারে বল বুকে রিসিভ করে শটও মারতে পারতেন।
খেলা যত বিরতির দিকে যাচ্ছিল, মোহনবাগান চাপ বাড়াচ্ছিল। ৩৬ মিনিটের মাথায় বক্সের বাইরে থেকে দূরপাল্লার শট মেরেছিলেন ছাংতে। ফিস্ট করে উড়িয়ে দেন লাচেনপা। কর্নার ক্লিয়ার করতে পারেনি ইস্টবেঙ্গল। আবার বক্সের বাইরে থেকে শট নিয়েছিলেন সাহাল। এটিও বাঁচিয়ে দেন লাচেনপা।
ক্রমাগত চাপের ফল পায় বাগান। বিরতির ঠিক আগেই মোহনবাগানকে এগিয়ে দেন জেলকোভিচ। তাঁর পা থেকেই আক্রমণ শুরু হয়েছিল। তিনি আরউইনকে পাস দেন। আরউইনের পাস থেকে চলতি বলে ভাসানো ক্রস দেন সাহাল। সেই বল বুকে রিসিভ করে গোল করেন জেলকোভিচ। তাঁকে মার্ক করতে ব্যর্থ ইস্টবেঙ্গল। ফাঁকায় থাকার সুযোগ কাজে লাগান তিনি। ১-০ গোলে এগিয়ে বিরতিতে যায় বাগান।
আরও পড়ুন:
প্রথমার্ধে যদিও বা কিছুটা আক্রমণ করেছিল দু’দল, দ্বিতীয়ার্ধে তা-ও দেখা গেল না। মনে হল, দু’দলই ক্লান্ত হয়ে গিয়েছে। এমনকি, বিদেশি ফুটবলারেরাও। সকলে শারীরিক ফুটবল খেলার চেষ্টা করছিল। ফাইনাল ট্যাকল করতে যাচ্ছিল। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, দমে পারছেন না বলেই ট্যাকল করার চেষ্টা করছেন ফুটবলারেরা।
মাঝেমাধ্যে ফাউলকে কেন্দ্র করে মাঠের পরিস্থিতি উত্তপ্ত হচ্ছিল। ৫৪ মিনিটের মাথায় দ্রাজিচ হেড করতে গিয়েছিলেন। সংঘর্ষ হয় সন্দীপ মান্ডির সঙ্গে। দু’জনেই মাটিতে পড়ে যান। দেখা যায়, দ্রাজিচের মাথার পিছন থেকে রক্ত বেরাচ্ছে। এর পরেই দু’দলের ফুটবলারেরা হাতাহাতি করেন। দ্রাজিচ মাথায় ব্যান্ডেজ বেঁধে আবার খেলতে নামেন।
গোলের লক্ষ্যে পিভি বিষ্ণু, ক্রিস ইকনমিডিস এবং আকে লোবাকে নামিয়ে দেন হাবাস। বিরতির পরেই আর এক বিদেশি লুকাস জিয়োলিনস্কিকে নামিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তাতে কাজের কাজ হয়নি। এক গোলে পিছিয়ে থাকার পরেও ইস্টবেঙ্গলের খেলায় সেই ঝাঁঝ দেখা যাচ্ছিল না। ফুটবলারেরা না পারছিলেন ঠিক করে পাস দিতে, না পারছিলেন ভাল কোনও মুভ তৈরি করতে।
৬৭ মিনিটের মাথায় আবার মোহনবাগানকে বাঁচান বিশাল। ডান দিক থেকে নুঙ্গার তোলা ক্রসে হেড করেছিলেন জিয়োলিনস্কি। ডান দিকে ঝাঁপিয়ে বাঁচান বিশাল। অল্পের জন্য বেঁচে যায় মোহনবাগান। পর মুহূর্তেই ছাংতের শটও অল্পের জন্য বাইরে যায়।
বাকি সময়ে ম্যাড়মেড়ে ফুটবলের সাক্ষী থাকল যুবভারতী। ৭৫ মিনিটের পর পুরোপুরি রক্ষণাত্মক হয়ে পড়ে বাগান। এমনকি, দ্রাজিচ, লিস্টনেরাও ডিফেন্স করছিলেন। সেই সময় একের পর এক আক্রমণ করলেও কোনও ভাল আক্রমণ তুলে আনতে পারেনি ইস্টবেঙ্গল। দেখে মনে হয়নি, গোল হতে পারে। রশিদও একটি ফ্রি কিক সরাসরি ওয়ালে মারেন। সাত মিনিট সংযুক্তি সময় পেয়েও কাজে লাগাতে পারেনি ইস্টবেঙ্গল। ১-০ গোলে জিতে মাঠ ছাড়ে মোহনবাগান।