তিনি কি কলকাতা ডার্বিতে গোল করার জন্যই জন্মেছেন?
রবিবারের পর এই প্রশ্ন নিজেই নিজেকে করতে পারেন এডমুন্ড লালরিনডিকা। জীবনের প্রথম ডার্বিতে গোল। এই মরসুমে আইএসএলের একমাত্র ডার্বিতে গোলে সহায়তা করেছিলেন। এ বার ডুরান্ড কাপের ফাইনালে একেবারে হ্যাটট্রিক। সামনে মোহনবাগানকে দেখলেই জ্বলে ওঠেন তিনি। রবিবারের পর থেকে তিনি যে ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের চোখের মণি হয়ে উঠবেন, তা বলাই বাহুল্য।
২৯ বছর পর ইস্টবেঙ্গলের জার্সিতে কোনও ফুটবলার ডার্বিতে হ্যাটট্রিক করলেন। ইস্টবেঙ্গলের প্রথম এবং একমাত্র ফুটবলার হিসাবে এত দিন এই নজির ছিল বাইচুং ভুটিয়ার। ১৯৯৭-এর সেই ঐতিহাসিক ফেডারেশন কাপে হ্যাটট্রিক করেছিলেন তিনি। তার পর এডমুন্ডই হ্যাটট্রিক করলেন। সেটাও হল একটি ফাইনালে।
ইস্টবেঙ্গলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নতুন নয়। এই নিয়ে দ্বিতীয় বার খেলতে এসেছেন। প্রথম বার এসেছিলেন ২০২০-তে। ইস্টবেঙ্গলের কোচ তখন আলেসান্দ্রো মেনেন্দেজ়। স্পেনীয় কোচ বুঝেছিলেন তরুণ স্ট্রাইকারের প্রতিভা। ইস্টবেঙ্গলের হয়ে এডমুন্ডের প্রথম ম্যাচই ছিল কলকাতা ডার্বি। প্রথম ম্যাচেই একক প্রয়াসে দর্শনীয় গোলের অ্যাসিস্ট করেছিলেন তিনি। গোল করেছিলেন মার্কোস জিমেনেজ়। কিন্তু সেই ম্যাচেই বড় চোট পান। বাকি মরসুমে আর ভাল খেলতে পারেননি। চার মাস পরেই ফিরে যান বেঙ্গালুরু এফসি-তে।
তবে প্রথম ম্যাচেই ডার্বির স্বাদ ভুলতে পারেননি তিনি। এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “এক মিনিটের জন্য আমার হৃৎস্পন্দন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। পঞ্চাশ হাজার সমর্থক। নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। পাগলের মতো পরিবেশ ছিল। আগে কোনও দিন ও রকম দেখিনি। কিন্তু কোচ বলে দিয়েছিলেন আমাকে কী করতে হবে। সেটাতেই নজর দিয়েছিলাম।” ইস্টবেঙ্গল সেই ম্যাচে হারলেও এডমুন্ড বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি এসে গিয়েছেন।
মিজোরামের লুংলেই গ্রামে জন্ম এডমুন্ডের। প্রথম বার ফুটবলে লাথি মেরেছিলেন গ্রামে সর্বশিক্ষা অভিযানের একটি ম্যাচে। ২০০৮-এ লুংলেই জেলা ফুটবল সংস্থার চোখে পড়ে যান। সেখান থেকে মিজোরামের অনূর্ধ্ব-১২ দলে সুযোগ পান। এর পর আসেন কলকাতায়। যাত্রা শুরু হয় ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের আঞ্চলিক অ্যাকাডেমিতে। তার পর ফেডারেশনের এলিট অ্যাকাডেমিতে।
এডমুন্ড বলেছিলেন, “যে সাফল্য পেয়েছি তার নেপথ্যে রয়েছে ফেডারেশন। ওখানেই অনুশীলন, পরামর্শ এবং বন্ধুদের পেয়েছি। সুরেশ (সিংহ ওয়াংজাম), প্রভসুখনকে (গিল) অনেক বছর ধরে চিনি। অ্যাকাডেমির কোচেদের অধীনেই আমাদের খেলার স্টাই বদলে গিয়েছিল। ইন্ডিয়ান অ্যারোজে থাকাকালীন প্রচুর পরিশ্রম করেছি।”
তিনি আরও বলেছিলেন, “গোল করতে দারুণ লাগে। তবে প্রান্ত দিয়েই খেলতে ভালবাসি। ঠিক ক্রিশ্চিয়ানো (রোনাল্ডো) এবং (উইলফ্রেড) জ়াহার মতো। প্রান্ত ধরে খেলতে খুব ভাল লাগে। রক্ষণ চিরে এগিয়ে যেতে ভালবাসি।”
ছোটবেলায় নিজেকে ফিট রাখতে প্রচুর সাইকেল চালিয়েছেন। বাবাকে সাহায্য করেছেন স্টিলের দোকানে। পাহাড়ি হওয়ায় জিনগত ভাবে পরিশ্রমী। সেটাই কাজে লেগেছে ফুটবলার হয়ে।
আরও পড়ুন:
বেঙ্গালুরুর বি দলের হয়ে পেশাদার কেরিয়ার শুরু হয়েছিল। এর পর ইন্ডিয়ানো অ্যারোজ, বেঙ্গালুরু, ইস্টবেঙ্গল ঘুরে ইন্টার কাশীতে যোগ দেন। সেখানে আন্তোনিয়ো লোপেজ় হাবাসের অধীনে খেলেছেন। ইস্টবেঙ্গলকে এসেও এ বার পেয়েছেন হাবাসকে। এ দিন হ্যাটট্রিকের পর ছুটে গিয়ে আগে হাবাসকে জড়িয়ে ধরেন। চোট থাকা পিভি বিষ্ণুর জায়গায় হাবাস খেলিয়েছিলেন এডমুন্ডকে। হ্যাটট্রিক করে তাঁর আস্থার দাম রেখেছেন মিজোরামের ফুটবলার।
জাতীয় দলের হয়ে বিভিন্ন সময়ে বয়সভিত্তিক দলে খেলেছেন। ইগর স্তিমাচ কোচ থাকাকালীন ভারতের সিনিয়র দলের হয়ে অভিষেক হয়। স্তিমাচ ২০২৪-এ এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “এডমুন্ড পুরোপুরি আলাদা জাতের ফুটবলার। গত পাঁচ বছরে যে ক’জন তরুণ ফুটবলারকে দেখেছি, তাদের মধ্যে প্রথম কয়েকদিনে ছাপ ফেলার নিরিখে এডমুন্ড সকলের উপরে থাকবে। সব ফিটনেস পরীক্ষায় প্রথম হয়েছে। ওর মানসিকতা বাকিদের চেয়ে আলাদা।”
আইএসএলের একাধিক ক্লাবের প্রস্তাব ফিরিয়ে এক সময় কানাডার ক্লাব অ্যাটলেটিকো ওটাওয়ার হয়ে অনুশীলন করেছিলেন এডমুন্ড। শেষ পর্যন্ত মূল দলে সুযোগ না পেলেও প্রচুর অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন। সেটাই কাজে লাগাচ্ছেন ভারতীয় ফুটবলে।