Advertisement
E-Paper

এক অলিম্পিক্সে জোড়া পদকজয়ী একমাত্র ভারতীয়, দু’বছর পর এশিয়াডেই করুণ দশা মনুর! কারণ খুঁজল আনন্দবাজার ডট কম

এশিয়ান গেমসে তিনটি ইভেন্টে নেমেছিলেন মনু ভাকর। তিনটি ইভেন্টেই হতাশ করেছেন। যাঁর কাছে অন্তত দু’টি পদকের আশা ছিল ভারতের, সেই তিনিই খালিহাতে ফিরছেন এশিয়াড থেকে।

দেবার্ক ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৮:৫৯
sports

মনু ভাকর। ছবি: পিটিআই।

একের পর এক ইভেন্টে ব্যর্থতা। যাঁর কাছে ভারতের সবচেয়ে বেশি আশা ছিল, অলিম্পিক্সে জোড়া পদকজয়ী সেই শুটার মনু ভাকর হতাশ করেছেন। খালিহাতে ফিরতে হচ্ছে এশিয়ান গেমস থেকে। মনু কি শেষ? মনু কি এক প্রতিযোগিতার চমক? এই সব প্রশ্ন উঠছে। সত্যিই কি মনুর দাপট শেষ?

নাগোয়ায় এশিয়ান গেমসে ভারতের শুরুটা হয়েছিল তাঁর হাত ধরে। উদ্বোধনে দেশের জাতীয় পতাকা নিয়ে ঢুকেছিলেন মনু। ঢুকবেন না কেন? দু’বছর আগে অলিম্পিক্সে নজির গড়েছেন তিনি। ১০ মিটার এয়ার পিস্তলের ব্যক্তিগত ও মিক্সড ইভেন্টে জিতেছেন ব্রোঞ্জ। এক অলিম্পিক্সে প্রথম ভারতীয় হিসেবে জোড়া পদক জিতেছেন। শুটিংয়ে প্রথম ভারতীয় মহিলা হিসেবেও জিতেছেন পদক। তিনি তো তারকা। কিন্তু সেই তারকার কাছ থেকে একটিও পদক পেল না ভারত।

ব্যর্থতার শুরুটা ১০ মিটার এয়ার পিস্তলের ব্যক্তিগত ইভেন্ট দিয়ে। কোয়ালিফিকেশন রাউন্ডে তৃতীয় হয়ে ফাইনালে উঠেছিলেন। সেখানে হলেন পঞ্চম। ১০ মিটার এয়ার পিস্তলের দলগত বিভাগে হলেন চতুর্থ। হাতছাড়া হল ব্রোঞ্জ। আর ২৫ মিটার পিস্তল ইভেন্টে কোয়ালিফিকেশনে ১১ নম্বরে শেষ করেছেন মনু। হ্যাঁ, অলিম্পিক্সে ব্রোঞ্জজয়ী প্রথম দশেও থাকতে পারেননি। এর পর সমাপ্তি অনুষ্ঠানে হয়তো ভারতের জাতীয় পতাকা আর দেখা যাবে না তাঁর হাতে।

তবে মনুর এই ব্যর্থতা সাময়িক বলেই মনে করেন অলিম্পিক্সে ব্রোঞ্জজয়ী গগন নারং। আনন্দবাজার ডট কম-কে তিনি বললেন, “শুটিং এমন একটা খেলা, যেখানে পয়েন্টের ভগ্নাংশে পদক পাওয়া-না পাওয়া নির্ভর করে। কখনও আপনি সব কিছুই ঠিক করেন। তার পরেও দেখেন পদক পাননি। যারা ফাইনালে ওঠে তারা প্রত্যেকেই চ্যাম্পিয়ন। ফলে মনু ব্যর্থ হয়েছে, এই রব এখন থেকেই তোলা উচিত নয়।”

সকলকে সেরা দেওয়ার অনুরোধ করে নিজেই পারলেন না

এশিয়ান গেমস শুরু হওয়ার আগে ভারতীয় প্রতিযোগীদের নিজের সেরাটা দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন মনু। বলেছিলেন, “আমরা নিজেদের সেরাটা নিংড়ে দিয়ে প্রস্তুতি নিয়েছি, যাতে আসল মঞ্চেও নিজেদের উজাড় করে দিতে পারি। এই জায়গায় আসার জন্য প্রচুর পরিশ্রম করেছি। তাই এটা ঠিক নয়, ওটা ঠিক নয়, এ সব বলে নিজেদের শক্তি অপচয় করার কোনও অর্থ নেই।”

নিজের বেলায় সেই প্রত্যয় ধরে রাখতে পারলেন না তিনি। কোথাও কি মনঃসংযোগে ব্যাঘাত হয়েছে? বিশ্বস্তরে শুটিংয়ে নজরকাড়া তারকা এশীয় স্তরে ব্যর্থ। এর কী ব্যাখ্যা রয়েছে?

sports

অলিম্পিক্সে পদক জেতার পর মনু ভাকর। ছবি: পিটিআই।

কোচ যশপালের আকস্মিক মৃত্যু

অলিম্পিক্সে মনুর সাফল্য যাঁর হাত ধরে, সেই যশপাল রানার চলতি বছর জুন মাসে ৪৯ বছর বয়সে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে। প্রাক্তন কোচের না থাকার প্রভাব মনুর খেলার উপর পড়েছে। ১০ মিটার এয়ার পিস্তলের ব্যক্তিগত ইভেন্টের শেষে প্রাক্তন কোচের কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেছিলেন মনু। তিনি বলেছিলেন, “অনেক স্মৃতি আছে। সেই সব স্মৃতি আমার মনে সারাজীবন থেকে যাবে। আমার জীবনের অনেকটা জুড়ে রয়েছেন যশপাল স্যার।” সেই কোচকেই পাশে পাননি মনু।

নতুন কোচের সঙ্গে বোঝাপড়ার অভাব

যশপালের মৃত্যুর পর সার্বিয়ার জ়েলেনা আরুনোভিচ ও গোরান ম্যাকসিমোভিচকে কোচ করেছেন মনু। তাঁদের সঙ্গে কি আদৌ ভাল বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে? ১০ বছর সার্কিটে রয়েছেন মনু। তার বেশির ভাগটাই যশপালের কোচিংয়ে। নতুন কোচের সঙ্গে বোঝাপড়া হতে তো কিছুটা হলেও সময় লাগবে। তার খেসারত দিতে হচ্ছে ভারতীয় তারকাকে।

মানসিক সমস্যা হচ্ছে মনুর

শুটিং এমন একটি খেলা, যেখানে মনের জোর খুব গুরুত্বপূর্ণ। রেঞ্জে দাঁড়িয়ে মনকে একাগ্র করে লক্ষ্যভেদ করতে হয়। কিন্তু এশিয়াডে মনুর কয়েকটি শট দেখে মনে হয়েছে, মন একাগ্র নেই। নইলে এতটা খারাপ স্কোর তিনি করেন না। হতে পারে যশপালের যে পরামর্শ তাঁকে মানসিক জোর দিত, সেটাই পাচ্ছেন না ভারতীয় তারকা।

তবে বাইরে বসে এই ধরনের মন্তব্য করা ঠিক হবে না বলেই মনে করেন গগন। তিনি বললেন, “বাইরে থেকে মনুর এই ব্যর্থতাকে টেকনিক্যাল বা মানসিক সমস্যা বলে দাগিয়ে দেওয়া উচিত নয়। প্রত্যেক অ্যাথলিটের কেরিয়ারে এই সময় আসে। প্রত্যাশা অনুযায়ী ফল হয় না। আমারও হয়েছে। লম্বা কেরিয়ার হলে এটা আসবেই। আমি নিশ্চিত, ২০২৮ অলিম্পিক্সে মনু সফল হবে।”

প্রত্যাশার চাপ

মনুকে নিয়ে প্রত্যাশা ছিল। অলিম্পিক্সে তাঁর সাফল্যই প্রত্যাশা বাড়িয়েছে। যেমন নীরজ চোপড়া কোনও প্রতিযোগিতায় নামলেই সকলে ভাবেন, সোনা জিততে হবে। রুপোতেও সন্তুষ্ট হন না ভক্তেরা। মনুর ক্ষেত্রেও হয়তো তাই। সেই প্রত্যাশার চাপেই কি ভুল করে ফেলছেন ভারতীয় তারকা?

প্রত্যাশার চাপের কথা শোনা গেল গগনের মুখেও। তিনি বললেন, “অলিম্পিক্সে দুটো পদকের পর ওর কাছে প্রত্যাশা অনেকটা বেড়ে গিয়েছিল। কিন্তু মনুকে আমি বলব, কয়েকটা ফল খারাপ হয়েছে বলেই নিজেকে নিয়ে প্রশ্ন কোরো না। তুমি বিশ্বকে দেখিয়েছ, তোমার ক্ষমতা কী। নিজের উপর ভরসা রাখো। উপভোগ করো। তুমি ফিরবেই।”

আয়োজকদের দুষছেন মনুর বাবা

মনুর বাবা রাম কিশন ভাকর আবার পুরো দায় চাপিয়েছেন এশিয়ান গেমসের আয়োজকদের উপর। তাঁর মতে, যে পরিস্থিতিতে শুটারদের খেলতে হচ্ছে, তা মোটেও উপযুক্ত নয়। রাম কিশন বলেন, “শুটিং রেঞ্জে নর্দমার গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। যেখানে শুটারেরা রয়েছে সেখান থেকে বাসে ৪-৫ ঘণ্টা যাত্রা করে রেঞ্জে যেতে হচ্ছে। এ ভাবে কি খেলা সম্ভব? এই ধরনের বড় প্রতিযোগিতা আয়োজন করা জাপানের পক্ষে কঠিন। এই সব বিষয় শুটারদের মানসিকতায় প্রভাব ফেলছে।”

sports

এশিয়ান গেমসে হতাশ মনু ভাকর। ছবি: পিটিআই।

সাম্প্রতিক ফল কী বলছে?

অলিম্পিক্সের পর মনু যে একেবারে ব্যর্থ তা বলা যায় না। ২০২৫ সালে বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপে ১০ মিটার এয়ার পিস্তলের দলগত ইভেন্টে রুপো, এশিয়ান শুটিং চ্যাম্পিয়নশিপে ১০ মিটার এয়ার পিস্তলের ব্যক্তিগত ও দলগত বিভাগে তিনটি ব্রোঞ্জ, বিশ্বকাপে রুপো জিতেছেন তিনি। এশিয়ান গেমসের থেকে বিশ্বকাপ তো কঠিন। তা হলে তুলনামূলক সহজ প্রতিযোগিতায় কেন পদক জিততে পারলেন না তিনি? কেন এতটা করুণ দশা তাঁর?

মনুর উপর ভরসা রাখছেন গগন। ভরসা রাখছে শুটিং সংস্থা। কিন্তু সাফল্যের মাপকাঠি পদক। যেখানে চিন, জাপান, কোরিয়া দাপট দেখাচ্ছে, সেখানে ভারতের বড় আশা ছিল মনুকে নিয়ে। কিন্তু পারলেন না তিনি। দু’বছর পরে অলিম্পিক্স। এষা সিংহের মতো তারকা উঠে আসছেন। তাঁরা মনুর জায়গা নিতে তৈরি। সুতরাং বিদেশি প্রতিপক্ষের পাশাপাশি দেশীয় প্রতিপক্ষের সামনেও লড়তে হবে মনুকে। তিনি যাতে ‘ওয়ান ইভেন্ট ওয়ান্ডার’ না হয়ে ওঠেন তার জন্য এর পর আর একটিই ইভেন্ট পাবেন। তবে তার আগে চাপ কিন্তু ক্রমশ বাড়বে ভারতীয় তারকার উপর।

Manu Bhaker Asian Games 2026

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy