মেঘ-কুয়াশার চাদের ঢাকা পাহাড়ের কথা ভাবলেই, মন পালাই পালাই করে? মনে পড়ে দার্জিলিং, হিমাচল প্রদেশের মনালী বা তামিলনাড়ুর উটির মতো কোনও পাহাড়ি শহরের কথা? দূরে নয়, কলকাতা থেকে ৭-৮ ঘণ্টার পথ পেরোলেই পৌঁছে যাবেন এমন ঠিকানায়, যেখানে প্রকৃতি দু’হাত বাড়িয়ে আলিঙ্গন করবে। পৌঁছোনো যাবে এমন স্থানে, যেখানে হরিণ খেলা করে নির্ভয়ে। নিরালা সৈকতে প্রবল শব্দে ঝাঁপিয়ে পড়ে ফেনিল জলরাশি। বর্ষা ফুরোনোর আগে জেনে নিন এমন তিন ঠিকানা, যেখানে যাওয়ার জন্য দীর্ঘ পরিকল্পনার দরকার নেই। ট্রেনের টিকিট বা গাড়ির ব্যবস্থা করতে পারলে হুট বললেই চলে যাওয়া যাবে।
মাঠাবুরুর আহ্বানে
গত কয়েক বছর ধরে বাংলার পর্যটন মানচিত্রে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে পুরুলিয়ার আনাচকানাচ। এ জেলার রূপ আমূল বদলে যায় মরসুমের সঙ্গে। বসন্তে পুরুলিয়া ছেয়ে যায় আগুনরঙা পলাশে। শীতে আবার পাহাড় মনোরম। আর বর্ষা এখানে মনে করাতে পারে উত্তরবঙ্গের কথা। কখনও ঘন মেঘের চাদরে আস্ত পাহাড় ঢেকে যায়। মুষলধারে বৃষ্টি নামলে মেঘ-কুয়াশার চাদর ছিঁড়ে উঁকি দেয় শ্যামলিমা।
পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড় সার্কিটের অদূরেই মাঠাবুরু বা মাঠা পাহাড়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে পর্যটনক্ষেত্র। ১৫৩ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে রয়েছে বনভূমি। কুসুম, শাল, শিমুল গাছ ঘিরে রয়েছে পাহাড়। ২ হাজার ফুট উঁচু মাঠাবুরুর চূড়ায় রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দাদের দেবতা। মকরসংক্রান্তির উৎসবের পরের দিন মন্দিরে পুজো হয়। পাহাড়ের কোলে মেলাও বসে। শীতের দিনে পাহাড় চড়ার প্রশিক্ষণও হয়। তবে ঘোর বর্ষায় এ পাহাড় সবুজ, সতেজ, শ্যামল। কিচ্ছুটি না করে, শুধু সেই সবুজেই বিভোর হওয়া যায়। কাছেই রয়েছে লহরিয়া, পারডি ড্যাম, পাখি পাহাড়।
বর্ষায় মাঠাবুরু মেঘের চাদরে ঢেকে যায়। ছবি:সংগৃহীত।
মাঠা পাহাড় চড়া যায়। তবে বর্ষা আদর্শ সময় নয়। কারণ সাপের ভয় তো আছেই। তা ছাড়া, বৃষ্টিতে আলগা নুড়ি-পাথরে পা পড়লেই হড়কে যাওয়ার আশঙ্কা। তার চেয়ে বরং পায়ে হেঁটে আশপাশের রাস্তাঘাট, গ্রামগুলি ঘুরতে পারেন। গাড়ি নিয়ে চলে যেতে পারেন অযোধ্যা পাহাড়েও। ছৌ মুখোশের গ্রাম চড়িদা, লোয়ার-আপার ড্যাম, বামনি ফল্স, মুরুগুমা— দর্শনীয় স্থান মোটেও কম নেই।
কী ভাবে যাবেন
হাওড়া বা শালিমার স্টেশন থেকে রূপসী বাংলা বা চক্রধরপুর এক্সপ্রেস ধরে বরাভূম স্টেশনে নামতে হবে। সেখান থেকে মাঠাবুরু প্রায় ৩০ কিলোমিটার। পুরুলিয়া জংশন স্টেশনে নেমেও যাওয়া যায়। দূরত্ব ৫০ কিলোমিটার। সড়কপথে কলকাতা থেকে মাঠাবুরুর দূরত্ব ৩৪০-৩৫০ কিলোমিটারের কাছাকাছি। যেতে ৬-৭ ঘণ্টা সময় লাগবে।
কোথায় থাকবেন
মাঠা পাহাড়ের কোলেই রিসর্ট রয়েছে। সরকারি অতিথি আবাসও পাওয়া যাবে।
পুরীর অদূরে নির্জন নুয়ানই
ঘুরে নিতে পারেন পুরীর অদূরে নুয়ানই। ছবি:সংগৃহীত।
সৈকতশহর পুরীর অদূরে বালুখণ্ড-কোনারক বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের কাছে নুয়ানই। এঁকেবেঁকে বয়ে গিয়েছে নুয়ানই নদী। হেটে পৌঁছোনো যায় মোহনায়। বালুকাবেলা নিরালা। দোকানবাজার, কোলাহলের অদূরে তার ঠাঁই। সাগরের নোনা হাওয়া, নদীর সঙ্গত রয়েছে এখানে। তৈরি হয়েছে উপকূলীয় বনভূমি। ম্যানগ্রোভ অরণ্য সবুজ করে তুলেছে নুয়ানাইকে।
পুরী থেকে কোনার্ক যাওয়ার পথে মেরিন ড্রাইভ ধরে গেলে পৌঁছোনো যায় বালুখণ্ড-কোনারক অভয়ারণ্যে। সমুদ্রের সান্নিধ্য থাকায় এখানে ম্যানগ্রোভের অরণ্য তৈরি হয়েছে। রয়েছে ওড়িশার সরকার পরিচালিত নেচার ক্যাম্প। সেখানেই ঘুরে বেড়ায় হরিণের দল। হাতে ২-৩ দিন সময় থাকলেই এই জায়গা ঘোরা যাবে।
কী ভাবে যাবেন?
পুরী থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে নুয়ানই। পশ্চিমবঙ্গ-সহ দেশের যে কোনও রাজ্যের সঙ্গেই পুরী সড়কপথে যুক্ত। কলকাতা থেকে সড়কপথে পুরীর দূরত্ব ৫০০ কিলোমিটার। হাওড়া বা শালিমার থেকে রাতের ট্রেন ধরলে ভোরে পৌঁছোবেন পুরী। সেখান থেকে গন্তব্যস্থল আরও ১ ঘণ্টা। এ ছাড়া বিমানে ভুবনেশ্বর পৌঁছে সেখান থেকেও গাড়িতে যেতে পারেন।
কোথায় থাকবেন
নুয়ানইতে ওড়িশা সরকারের নেচার ক্যাম্প রয়েছে।
লব কুশের কাহিনির সেই তপোবন
ঘুরে নিতে পারেন অরণ্যের মধ্যে তপোবন। ছবি:সংগৃহীত।
ঘন সবুজের বুক চিরে গিয়েছে কালো পিচ রাস্তা। সেই রাস্তাই পৌঁছে দেবে এমন এক স্থানে, জনশ্রুতি সেখানেই শৈশব কেটেছিল রামায়ণের লব-কুশের। এই স্থানের নাম তপোবন। কলকাতা থেকে বড়জোড় ঘণ্টাপাঁচেকের পথ। পূর্ব মেদিনীপুরের গোপীবল্লভপুর থেকে দূরত্ব ২২-২৫ কিলোমিটার। তপোবনের পথ নির্দেশিকা মিলবে রাস্তার ধারের বোর্ডেই। লোকমুখে প্রচলিত, এই স্থানেই না কি দস্যু রত্নাকর ‘মরা’ থেকে রামনাম জপে, পাপস্খলন করে বাল্মীকি হয়েছিলেন। ধ্যান করার সময় তাঁর গায়ে উইয়ের ঢিবি হয়ে গিয়েছিল।
রয়েছে সেই উইয়ের ঢিবি। সীতার মন্দির। অনির্বাণ প্রজ্জ্বলিত ধুনি। এখানকার পুরোহিতেরা কাঠকুঠোর জোগান দিয়ে তা নিরন্তর জ্বালিয়ে রাখেন। আছে হনুমানের মন্দির। কাছেই রয়েছে সীতা নালা। বর্ষায় তাতে অনেক জল থাকে। এখানে মাঝেমধ্যে হরিণও আসে।
তপোবন থেকে যাওয়া যায় রামেশ্বর শিব মন্দিরে। দূরত্ব ৭ কিলোমিটার। পুরনো এই মন্দিরটি নবকলেবরে সেজে উঠেছে। প্রাচীনত্বের চিহ্ন বহন করছে ধ্বংসপ্রাপ্ত স্তম্ভগুলি। গাছগাছালি ঘেরা শান্ত মন্দিরচত্বর। ঘোরাঘুরির তালিকায় জুড়ে নিতে পারেন গোপীবল্লভপুর ইকোপার্ক। সুবর্ণরেখার একেবারে কাছেই এটি।
কী ভাবে যাবেন?
ঝাড়গ্রাম স্টেশন থেকে সড়কপথে গোপীবল্লভপুর ৪২ কিলোমিটার, গোপীবল্লভপুর থেকে সড়কপথে ২২ কিলোমিটার এগোলেই তপোবন। ট্রেনে গেলে ঝাড়গ্রামে নেমে সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে নিতে হবে।
কলকাতা থেকে গোপীবল্লভপুর আসার সহজ রাস্তা হল কোলাঘাট, রতুলিয়া, খড়্গপুর, কলাইকুন্ডা, ফেকো মোড় হয়ে গোপীবল্লভপুর। তবে ঝাড়গ্রাম হয়েও আসতে পারেন।
কোথায় থাকবেন?
গোপীবল্লভপুরে থাকার হোটেল পেয়ে যাবেন। যদিও সংখ্যাও কম। ঝিল্লিতেও থাকার জায়গা রয়েছে।