সামনে দিয়ে বয়ে চলেছে নদী। পাথরে ধাক্কা খেয়ে উঠছে ফেনিল জল। অবিরাম সেই জলস্রোত কানে সুরের মতোই বাজছে। এমন কোনও জায়গাতেই যদি দু’টি দিন কাটানো যায়?
গতিময় জীবনে একটু থমকাতেই পারেন এমন নদীর রূপে বিভোর হয়ে। দিনভর কিচ্ছুটি করতে হবে না, শুধু নদীর পাশেই তৈরি হওয়া কোনও হোম স্টেতে বসে সকাল-বিকেল কেটে যাবে। খুঁজছেন এমন কোনও জায়গা? তবে চলুন উত্তরবঙ্গের তিন পাহাড়ি গ্রামে।
ঋষিখোলা
ঋষিখোলায় জলকেলি করতে চান? যাবেন কোথায়? ছবি:শাটারস্টক।
খোলা মানে নদী। ঋষি নদীকে কেন্দ্র করেই ছোট্ট গ্রাম। নদীর নামেই নাম ঋষি খোলা। এখানে আসতে গেলে ভারি মজার একটি বিষয় লক্ষ্য করবেন। নদীর একপাশে পশ্চিমবঙ্গ, অন্য পাড়ে সিকিম।
ছোট্ট পার্বত্য গ্রাম ঋষিখোলার উচ্চতা ১৭০০ ফুট। গাড়ি লটবহর সমেত যেখানে নামিয়ে দেবে সেখান থেকে পাহাড়ি পথে উতরাই বেয়ে, নুড়ি পাথর টপকে, বাঁশের সেতুপথ পেরিয়ে জঙ্গুলে পথ কিছুটা হাঁটতে হয়।
ঋষি নদীর সীমানা ছুঁয়ে ইকো-কটেজ। একাধিক হোম স্টে তৈরি হয়েছে। কাঠের বারান্দায় বসে দিনভর নদী দেখা যায়। চাইলে ঋষি নদীর শীতল জলে স্নানও সেরে নিতে পারেন। নদীর জলে ছোট ছোট মাছ রয়েছে। অনেক সময়ে হোম স্টের কর্মীদের অনুরোধ করলে তাঁরা মাছ ধরে, ভেজেও দেন।
দিনের ঋষিখোলা একরকম। পড়ন্ত বিকেলে সেই রূপ মায়াময়। রাতে যখন আশপাশে আলো জ্বলে ওঠে, মনে হয় কোনও তারার রাজ্য।
ঋষিখোলা দিয়ে সিকিমে যেতে চাইলে ট্যুরিস্ট পারমিট লাগে। সঙ্গে পাসপোর্ট, ছবি, সচিত্র পরিচয়পত্রের ফোটোকপি রাখা দরকার।
কোথায় থাকবেন?
ঋষি নদীর পাশে একাধিক হোম স্টে তৈরি হয়েছে। পুজোর মুখে গেলে আগাম বুকিং করে যাওয়া ভাল। যেহেতু বেশ কিছুটা পথ চড়াই-উতরাই বেয়ে হাঁটতে হয়, তাই বয়স্করা থাকলে ভেবেচিন্তে যাওয়াই ভাল।
কী ভাবে যাবেন?
নিউ জলপাইগুড়ি থেকে দূরত্ব ১০০-১০৫ কিলোমিটার। গাড়িতে যেতে সাড়ে চার ঘণ্টার মতো সময় লাগবে। চাইলে সিকিমের রংপো পর্যন্ত শেয়ার জিপে যেতে পারেন শিলিগুড়ি থেকে। বাকি রাস্তা গাড়ি বুক করে পৌঁছোতে হবে।
বিজনবাড়ি
ছোট রঙ্গিত নদী। নিজস্ব চিত্র।
ছোট রঙ্গিত নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে চলুন বিজনবাড়ি। দার্জিলিঙ জেলার এই পাহাড়ি গ্রামটি আর পাঁচটি নির্জন গ্রামের মতোই। তবে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা খুব বেশি নয়। তাই দার্জিলিঙে হাড়-কাঁপানো ঠান্ডা থাকলেও অক্টোবর-নভেম্বরে বিজনবাড়ির আবহাওয়া থাকে বেশ মনোরম।
নদী ঘিরে তৈরি হয়েছে একাধিক হোম স্টে। নামে হোম স্টে হলেও তার মধ্যে কয়েকটি বেশ ঝাঁ চকচকে। পাহাড়ি খাবার খেয়ে দিব্যি দু’দিন হোম স্টেতেই কাটিয়ে দেওয়া চলে।
ছোট রঙ্গিতের রূপ উপভোগের পাশাপাশি ঘুরে নিতে পারেন মেগিটার। এখানে রয়েছে ছোট্ট একটি উদ্যান। স্থানীয়দের কাছে পিকনিক স্পট। এখানকার ভিউ পয়েন্ট থেকে দূরদূরান্ত পর্যন্ত দেখা যায়। ঘুরে নিতে পারেন জামুনি। নদীর ধারের জায়গাটি খুব সুন্দর। অনেকে বলেন, এখানে সেতুতে ‘বরফি’ সিনেমার একটি দৃশ্যের শুটিং হয়েছিল।
কোথায় থাকবেন?
বিজনবাড়িতে নদীর ধারে বেশ কয়েকটি হোমস্টে রয়েছে।
কী ভাবে যাবেন?
দার্জিলিং থেকে বিজনবাড়ির দূরত্ব ৩০ কিলোমিটার। দার্জিলিং থেকে বিজনবাড়ি যাওয়ার পথে সিংতম, রিশিহাট চা-বাগান পড়ে। এই পথেই পড়বে জামুনি। এটিও ঘোরার মতো জায়গা। নিউ জলপাইগুড়ি থেকে বিজনবাড়ির দূরত্ব ৯৫ কিলোমিটারের মতো। সরাসরি গাড়ি বুক করে আসতে পারেন। দার্জিলিং শেয়ারে এসে বাকিটা গা়ড়ি ভাড়া করতে পারেন। সেক্ষেত্রে যাত্রাপথে ধকল বেশি হবে। প্রয়োজনে এক বা দুই রাত দার্জিলিঙে থেকে, ঘুরে নেওয়ার পরিকল্পনাও করতে পারেন।
ঝালং
জলঢাকা নদীর ধারেই থাকার বন্দোবস্ত। ছবি:সংগৃহীত।
নদীর পাড়ে থাকার জায়গার খোঁজ করলে সফরসূচিতে জুড়ে নিতে পারেন ঝালংও। ভুটান সীমান্তের একেবারে কাছাকাছি রয়েছে ঝালং। জায়গাটি পড়ে কালিম্পং জেলায়। জলঢাকা নদী বয়ে গিয়েছে ঝালংয়ের উপর দিয়ে। কাছেই ভুটান পাহাড়।
নদী, পাহাড়, অরণ্যের এক অপূর্ব মেলবন্ধন তৈরি হয়েছে ঝালং-এ। অসংখ্য পাখি, বন্যপ্রাণের আবাসস্থল এটি। নিউ জলপাইগুড়ি থেকে ঝালং যাওয়ার রাস্তাতেই প়ড়ে চাপড়ামারি অভয়ারণ্য। ঝালং থেকে বিন্দু, ঘুরে নিতে পারেন।
কোথায় থাকবেন?
জলঢাকা নদীর গায়েই পশ্চিমবঙ্গে বনোন্নয়ন নিগমের থাকার জায়গা রয়েছে। আশপাশে আরও কয়েকটি হোম স্টে পেয়ে যাবেন।
কী ভাবে যাবেন?
ট্রেনে নিউ মাল জংশন নামলে সুবিধা হবে। এখান থেকে ঝালংয়ের দূরত্ব ৫০ কিলোমিটার। নিউ জলপাইগুড়ি থেকে দূরত্ব প্রায় ১০০ কিলোমিটারের কাছাকাছি। সরাসরি গাড়ি বুক করে নেওয়াই ভাল।