ঘন কালো মেঘের ক্যানভাসে উজ্জ্বল সবুজ অরণ্য। নুড়িপাথরের উপর দিয়ে সশব্দে বয়ে চলা খরস্রোতা নদী। কখনও বৃষ্টির রিমঝিম, কখনও-বা মুষলধারা। বর্ষার এমন রূপের টানেই বার বার যাওয়া চলে ডুয়ার্স। সমতল আর পাহাড়ের সন্ধিস্থলের এই জায়গায় এক অদ্ভুত মায়া আছে। প্রকৃতির সেই মায়ার প্রেমে যিনি এক বার পড়েছেন, তাঁকে বার বার ফিরতেই হয় সেখানে।
পূর্ব হিমালয়ের পাদদেশ, যা ‘ডুয়ার্স’ বলেই পরিচিত, সেখানকার অরণ্য, পাহাড়, নদীর মেলবন্ধনের মধ্যে এমন এক নিজস্বতা রয়েছে, যা হয়তো দেশের অন্য কোনও পর্যটনক্ষেত্রে পাওয়া যাবে না। সবুজ ডুয়ার্স বর্ষায় আরও সবুজ, আরও সজীব। ডুয়ার্সের একটি আকর্ষণ যদি প্রকৃতি হয়, অন্য আকর্ষণ অবশ্যই বন্যপ্রাণ। এখানকার গহীন বনভূমি হাতি, বাইসন, হরিণ, বাঘ-সহ অসংখ্য বন্যপ্রাণের আস্তানা। জঙ্গল সাফারির সময়েই তাদের সঙ্গে মাঝেমধ্যে সাক্ষাৎ হয়ে যায়। তবে বর্ষায় জঙ্গলের গহীনে যাওয়ার অনুমতি থাকে না। জুন থেকে সেপ্টেম্বর বন্ধ থাকে অভয়ারণ্য, জাতীয় উদ্যান। তা সত্ত্বেও, ডুয়ার্সের কিছু কিছু স্থান বর্ষাতেই উপভোগ্য হয়ে ওঠে। খুব বেশি ঘোরাঘুরি না করেও, প্রকৃতির মাঝেই সময় কাটানো যায়। সেই তালিকায় রাখতে পারেন কোন কোন জায়গা?
জলঢাকার কোলে ঝালং
ঝালং দিয়ে বয়ে চলেছে জলঢাকা। দূরে দেখা যায় পাহাড়। আর নদী-পাহাড়কে বেড় দিয়েছে ঘন সবুজ বনভূমি। এ এক এমন জায়গা, যেখানে নদীর ধারে বসেই কাটিয়ে দেওয়া যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। অনুভব করা যায় প্রকৃতির নিজস্ব শব্দ। গাছগাছালি ঘেরা এই স্থানে চুপ করে বসে থাকলে দেখতে পাওয়া যায় বহু জাতের পাখি। শোনা যায়, টুপ করে গাছ থেকে পাতা খসে পড়ার শব্দও।
বর্ষায় ঝালঙের শ্যামলিমা উপভোগ করতে চলুন ডুয়ার্স। ছবি:সংগৃহীত।
নিউ জলপাইগুড়ি থেকে ঝালং আসার পথটি বেশ সুন্দর। পড়বে চাপড়ামারির অরণ্য। শহর ছাড়ালে সেই পথ ভুলিয়ে দেবে ক্লান্তি। ঝালঙে প্রাপ্তি হতে পারে ঘরোয়া খাবার, এখানকার বিখ্যাত বোরোলি মাছ, তিব্বতি মোমো এবং থুকপা। এই জায়গা ক্লান্ত জীবন থেকে দু’দিন সব কিছু ভুলে ছুটি কাটানোর জন্য। এখান থেকে ঘুরে নেওয়া যায় গরুমারা জাতীয় উদ্যানও, তবে বর্ষায় সেটি বন্ধ থাকবে। এমন মরসুমে ঝালং থেকে ঘুরে নিতে পারেন বিন্দু, পারেন। যাওয়া যেতে পারে দলগাঁও, রঙ্গো, তোদে-র মতো কিছু জায়গা।
কোথায় থাকবেন
ঝালঙে থাকার একটি সুন্দর জায়গা হল পশ্চিমবঙ্গ বনোন্নয়ন নিগমের বাংলো। নদীর পাড়েই তৈরি হয়েছে কটেজ। এখানে থাকলে দিনরাত কানে আসবে খরস্রোতা নদীর শব্দ। এ ছাড়াও বেশ কয়েকটি হোমস্টে রয়েছে আশপাশে।
কী ভাবে যাবেন
ট্রেনে গেলে নামতে হবে নিউ মাল জংশন অথবা নিউ জলপাইগুড়ি। বাসে এলে শিলিগুড়ি। বিমানে বাগডোগরা বিমানবন্দর। সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে চলে আসুন ঝালং। নিউ মাল জংশন থেকে ঝালঙের দূরত্ব ৪০ কিলোমিটার। নিউ জলপাইগুড়ি থেকে ঝালঙের দূরত্ব ৯৫ কিলোমিটার।
স্বল্প চেনা সিসামারা
গরুমারার পাশাপাশি ডুয়ার্সে রয়েছে জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যান। তারই দক্ষিণ প্রান্ত দিয়ে বয়ে গিয়েছে সিসামারা নদী। তার নামেই এই জায়গার পরিচিতি। নদীর ধারেই তৈরি হয়েছে হোমস্টে-রিসর্ট। পর্যটকদের ভ্রমণতালিকায় ক্রমশ পাকাপাকি জায়গা করে নিতে শুরু করেছে এই স্থান। আলিপুরদুয়ার জেলার স্বল্পচেনা ঠিকানাটি ধীরে ধীরে পর্যটকমহলে জনপ্রিয়ও হচ্ছে। সিসামারা পৌঁছোনোর পথেই মন ভাল হয়ে উঠবে সবুজের ছোঁয়ায়। যাত্রাপথেই দেখা মিলবে চা-বাগিচার। ডুয়ার্সের এই জায়গা থেকে শোনা যায় পাখির ডাক, দিনরাত কানে আসে ঝিঁঝির আওয়াজ আর রাতবিরেতে বুনো জন্তুর শব্দ। বর্ষার জল পেয়ে নদী ফুঁসে উঠলে অবশ্য আলাদা কথা। ছবি তোলার শখ থাকলে বিষয়বস্তুর অভাব হবে না। হেঁটে বা গাড়িতে চলে যেতে পারেন ডুয়ার্সের গ্রামগুলিতেও।
সিসামারা নদী বয়ে গিয়েছে অরণ্যের মধ্যে দিয়ে। ছবি:সংগৃহীত।
বর্ষার মরসুমে অরণ্য ধরাছোঁয়ার বাইরে। তবে এখান থেকে কোচবিহার ঘুরে নিতে পারেন, যেতে পারেন রকি আইল্যান্ড, মূর্তি নদীর দিকটিতেও। পাখি দেখারও সুযোগ রয়েছে এখানেও।
কোথায় থাকবেন
সিসামারায় থাকার জন্য রিসর্ট এবং হোমস্টে রয়েছে। নদীর কাছেই মিলবে আস্তানা। এই জায়গাটিও বেশ নির্জন।
কী ভাবে যাবেন
হাসিমারা বা নিউ আলিপুরদুয়ার জংশন থেকে সিসামারা আসা সুবিধাজনক। হাসিমারা থেকে দূরত্ব ২৭ কিলোমিটারের মতো, নিউ আলিপুরদুয়ার থেকে দূরত্ব ৪৬ কিলোমিটার। হাওড়া বা শিয়ালদহ থেকে উত্তরবঙ্গগামী এক্সপ্রেস বা মেলে চেপে এই দুই স্টেশনের একটিতে নামুন। নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে নেমে গাড়ি করেও পৌঁছোনো যায়। নিউ জলপাইগুড়ি থেকে সিসামারার দূরত্ব প্রায় ১২০ কিলোমিটার।
নদীর নামেই জায়গার নাম মূর্তি
বর্ষার মূর্তি আক্ষরিক অর্থেই পাগলপারা। গরমে সে নদী হেঁটে এপার-ওপার পার করা গেলেও, বর্ষায় তার কূলছাপানো জল। ডুয়ার্সের অন্যতম আকর্ষণ এই নদীটি। তাকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে পর্যটনকেন্দ্র। সরকারি অতিথিনিবাস তো আছেই। এখন সেখানে একাধিক ছোট-বড় রিসর্ট এবং হোমস্টে তৈরি হয়েছে। মূর্তি নদীর পাশে বসেই সময় কাটানো যায়। এখান থেকে লাটাগুড়ি বেশি দূর নয়। তবে বর্ষায় সফর সাজাতে পারেন অন্য ভাবে। এখান থেকে ঘুরে নিতে পারেন রকি আইল্যান্ড বা সান্তালেখোলা। চলে যেতে পারেন গজলডোবাও।
মূর্তি নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করতে যাওয়াই যায় মূর্তিতে। ছবি:সংগৃহীত।
কোথায় থাকবেন
মূর্তিতে থাকার জন্য পশ্চিমবঙ্গ বনোন্নয়ন নিগমের অতিথিনিবাস রয়েছে নদীর ধারেই। রয়েছে গাছ-বাড়ি। একাধিক হোমস্টে, রিসর্টও মিলবে।
কী ভাবে যাবেন
নিউ মাল জংশন থেকে মূর্তির দূরত্ব ১৮ কিলোমিটার। নিউ জলপাইগুড়ি থেকেও গাড়ি বুক করে আসতে পারেন। বিমানে আসতে চাইলে নামতে হবে বাগডোগরা বিমানবন্দরে।
চা-বাগান ঘেরা মানাবাড়ি
পাহাড়ের কোলে চা-বাগান। বর্ষার জল পেয়ে তা হয়ে ওঠে উজ্জ্বল সবুজ। এক ঝলকে মনে হবে কোনও ইম্প্রেশনিস্ট নিসর্গচিত্রের ফ্রেম টপকে ঢুকে পড়েছেন সেখানে। সঙ্গ দেবে ঘিস নদী। চা-বাগিচা ঘেরা রাস্তা পৌঁছে দেবে এমন এক জায়গায়, যেখানে হাত ধরাধরি করে রয়েছে পাহাড় এবং নদী। মেঘের চাদর সরলে সূর্যাস্তের রং ছড়িয়ে দেয় রঙিন ছায়া। টুপ করে ছোট্ট পাহাড়ের কোলে ডুবে যায় সূর্য। প্রকৃতি এখানে অকৃত্রিম। কোলাহলবর্জিত এই স্থান হতে পারে প্রিয়জনের সঙ্গে সম্পর্ক ঝালিয়ে নেওয়ার আদর্শ জায়গা। কখনও কখনও পার্শ্ববর্তী অরণ্য থেকে হাতির দল নদীতে জল খেতেও চলে আসে। তবে সে সব দেখতে পাওয়া কপালের ব্যাপার। বন্যপ্রাণ চোখে না পড়লেও প্রকৃতি নিরাশ করবে না। গরুমারা জাতীয় উদ্যান এখান থেকে খুব কাছে। তবে বর্ষায় অরণ্যে প্রবেশাধিকার থাকে না।
একইসঙ্গে পাহাড় এবং নদীর দেখা মিলবে মানাবাড়িতে। ছবি:সংগৃহীত।
মানাবাড়ি থেকে ঘুরে দেখতে পারেন লুংসেল, ঝান্ডি, গজলডোবা-সহ আশপাশের বেশ কিছু জায়গা। ঘন অরণ্যে প্রবেশের ছাড়পত্র না থাকলেও, বর্ষা-প্রকৃতির শোভা মোটেই হতাশ করবে না।
কোথায় থাকবেন
মানাবাড়িতে থাকার জন্য একাধিক হোমস্টে রয়েছে। নদী-পাহাড়ের গায়েই তার অবস্থান। জায়গাটি বেশ নির্জন।
কী ভাবে যাবেন
ডুয়ার্সের গন্তব্যগুলি নিউ মাল জংশন রেলস্টেশন থেকেই কাছে হবে। তবে ট্রেন বা বাসে নিউ জলপাইগুড়ি, শিলিগুড়ি হয়েও আসা যায়। ওদলাবাড়ি পর্যন্ত শেয়ার জিপ মিলবে। বাকি রাস্তা টোটোতে আসা যাবে। বাগডোগরা বিমানবন্দর বা এনজেপি স্টেশন থেকে সরাসরি গাড়ি বুক করেও চলে আসতে পারেন। এনজেপি থেকে দূরত্ব কমবেশি ৫০ কিলোমিটার। মালবাজার থেকে ১৮ কিলোমিটারের মতো।
নতুন ঠিকানা ডালিমখোলা
কোথাও অরণ্য, কোথাও চা-বাগান। গরুবাথান হয়ে যেতে হবে সেই পথে। জায়গার নাম ডালিমখোলা। প্রকৃতি এখানে উপুড়হস্ত। চেলখোলা হয়ে পৌঁছোতে হবে ডালিমখোলা। পাহাড়ি লোকজন নদীকে বলেন ‘খোলা’। নদীকে কেন্দ্র করেই পর্যটনকেন্দ্রটি গড়ে উঠেছে। চারদিক বেশ নির্জন। হেঁটে ঘুরে দেখতে পারেন আশপাশের লোকালয়। গুটিকতক ঘরবাড়ি নিয়ে গ্রাম। বাড়িতে বাড়িতে গাছগাছালি। ডালিমখোলায় নদীর পাড়ে বসে দিব্যি সময় কেটে যাবে। চাইলে গরুবাথান, পাপরখেতি, লাভা, লোলেগাঁওয়ের দিকেও ঘুরে আসতে পারেন।
ডালিমখেলা। ছবি:সংগৃহীত।
কোথায় থাকবেন
ডালিমখোলায় থাকার জন্য হোমস্টে তৈরি হয়েছে। চাইলে গরুবাথানেও থাকতে পারেন।
কী ভাবে যাবেন
নিউ মাল জংশন থেকে গরুবাথান হয়ে ডালিমখোলা। দূরত্ব ২০-২২ কিলোমিটারের মতো। নিউ জলপাইগুড়ি থেকেও গাড়ি ভাড়া করে আসা যাবে।
কী কী মাথায় রাখা দরকার?
ডুয়ার্স মানেই অরণ্য, চা-বাগিচা, খরস্রোতা নদীর সমাহার। তবে বর্ষা বন্যপ্রাণীদের প্রজননের সময়। তা ছাড়া, এই সময় অরণ্যের মধ্যে গাছপালা দ্রুত বেড়ে যায়। নানা স্থান জলেও ডুবে যায়। বর্ষায় ডুয়ার্স যেতে হলে জঙ্গল সাফারি সম্ভব হবে না।
তা সত্ত্বেও এই বর্ষাই ডুয়ার্স যাওয়ার জন্য আদর্শ। কারণ, প্রকৃতির রং। কৃষ্ণবর্ণ মেঘের ক্যানভাসে উজ্জ্বল সবুজ অরণ্য, পাহাড়, খরস্রোতা নদীর রূপ দর্শনের আকাঙ্ক্ষা অন্য ঋতুতে পূরণ হওয়া কঠিন।