হেমন্তের শিরশরানি, নীল আকাশ, মিঠে হাওয়া— সব মিলিয়ে আদর্শ বেড়ানোর মরসুম। অক্টোবর-নভেম্বর না থাকে রোদের রক্তচক্ষু, না থাকে শীতের বাড়বাড়ি। পরিবেশের এই আরামটুকুকে দোসর করেই বেরিয়ে পড়ুন। দূর যেতে হবে, কে বলেছে? যাঁদের নিয়ম করে লোকাল ট্রেন চাপা হয় না, যাঁরা নৌকা কবে চেপেছেন মনে করতেই পারেন না, তাঁরা কাছেপিঠে সাজিয়ে নিন সফর। যাওয়া-আসার ধকলও তেমন থাকে না, দু’টি দিন নিশ্চিন্তে প্রকৃতির আলিঙ্গনও উপভোগ করতে পারবেন। ৫ ঠিকানায় ঘুরে নিতে পারেন এখনই।
জিয়াগঞ্জ-আজিমগঞ্জ
বড়নগরে রাস্তার আশপাশে এমন একাধিক টেরাকোটার মন্দির রয়েছে। —নিজস্ব চিত্র।
মুর্শিদাবাদ মানেই হাজারদুয়ারি বা বাংলার নবাবির স্মৃতিবিজড়িত জায়গা নয়। এই জেলার আনাচকানাচে ছড়িয়ে অনেক ঐতিহাসিক নিদর্শন। জিয়াগঞ্জ ও আজিমগঞ্জ মুর্শিদাবাদে ভাগীরথী নদীর দুই পাড়ে অবস্থিত দু’টি শহর। গঙ্গার পূর্বে জিয়াগঞ্জ এবং পশ্চিমে আজিমগঞ্জে ছড়িয়ে রয়েছে জৈন মন্দির, প্রাসাদোপম অট্টালিকা এবং টেরাকোটার অপূর্ব সব শিব মন্দির। এখানেই বড়নগরে রয়েছে রানি ভবানীর তৈরি মন্দির। শোনা যায়, বড়নগরকে তিনি ‘গুপ্ত বারাণসী’ হিসাবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তৈরি করিয়েছিলেন একের পর এক টেরোকোটার মন্দির। তারই মধ্যে নজর কাড়ে চার বাংলা মন্দিরটি। ভাগীরথীর তীরে একটি প্রাঙ্গণের চারপাশে মুখোমুখি চার মন্দির। কুঁড়েঘরের আদলে তৈরি প্রতিটি মন্দিরেই রয়েছে তিন খিলানের প্রবেশদ্বার। এক একটি মন্দিরে তিনটি করে শিবলিঙ্গ রয়েছে। মন্দিরগাত্রের টেরাকোটার কারুকাজে নিখুঁত ভাবে বর্ণিত হয়েছে রামায়ণ-মহাভারতের দৃশ্যাবলি, তৎকালীন সমাজচিত্র। আশপাশে আরও কয়েকটি মন্দির রয়েছে। আজিমগঞ্জ-জিয়াগঞ্জ, কাঠগোলার নানা প্রান্তে রয়েছে জৈনদের কোঠি, প্রাসাদোপম অট্টালিকা এবং একাধিক মন্দির। নদী পার করে চলে যেতে পারেন কাঠগোলা প্যালেসেও। মিউজ়িয়াম রয়েছে সেখানে। কাছাকাছি আরও অনেক দর্শনীয় স্থানই মিলবে। ঘুরে নিতে পারেন তাঁতিবাড়ি। মুর্শিদাবাদের সিল্কের শাড়ি, গরদ কী ভাবে বোনা হয়, চাক্ষুষ করতে পারবেন, কিনতেও পারবেন।
রানী ভবানীর তৈরি মন্দির। —নিজস্ব চিত্র।
থাকার জায়গা
জিয়াগঞ্জ, আজিমগঞ্জ, দুই শহরেই থাকার হোটেল রয়েছে। সংখ্যায় যদিও কম।
কী ভাবে যাবেন?
সরাসরি গাড়িতেই যেতে পারেন। হাওড়া থেকে ট্রেনে আজিমগঞ্জ যাওয়া যায়। শিয়ালদহ থেকে ট্রেনে জিয়াগঞ্জে পৌঁছোতে পারেন।
আসাননগর
আসাননগরেও দু’দিন ঘুরে আসতে পারেন। গ্রাম বাংলার সৌন্দর্য ক্লান্তি থেকে মুক্তি দেবে। ছবি:সংগৃহীত।
নদিয়ার কৃষ্ণনগরের ছোট্ট গ্রাম আসাননগর। আসাননগরের আর এক পরিচিতি সেখানকার বাউল-ফকির পরম্পরার কারণে। প্রতি বছর শীতে এখানে অনুষ্ঠিত হয় লালন মেলা। এখানে অংশ নেন দু’পার বাংলার বাউল, ফকিরেরা। আসাননগরে দোসর হবে সবুজ প্রকৃতি, মেঠো পথ। চাইলে বয়ে যাওয়া ঝোর নদীতে স্নানও সেরে নিতে পারবেন। ভোর উঠে আলপথ বেয়ে বহু দূর চলে যেতে পারবেন। শহুরে জীবনে হাঁপিয়ে উঠলে, এখানে এসে দু’টি দিন জিরিয়ে নিতে পারেন। জায়গাটি কৃষ্ণনগর শহর ও মাজদিয়ার মধ্যবর্তী । কলকাতা থেকে দূরত্ব ১২০ কিলোমিটার। যেতে সময় লাগবে ৪ থেকে সাড়ে ৪ ঘণ্টা।
থাকার জায়গা
আসাননগরে থাকার জায়গা বিশেষ নেই। বেসরকারি উদ্যোগে একটি অতিথিনিবাস রয়েছে।
কী ভাবে যাবেন?
ট্রেনে কৃষ্ণনগর এসে আসাননগর পৌঁছোন অটো বা গাড়ি ভাড়া করে। সরাসরি কলকাতা থেকে গাড়িতেও আসতে পারেন। বারাসত-রানাঘাট হয়ে যেতে পারেন। চূর্ণী নদী পার করে ডান দিকের রাস্তায় যেতে হবে। বীরনগর, তাহেরপুর পার করে বড়কুল্লা বাজার। খামার শিমুলিয়া থেকে ডান দিকে বেঁকে গেলে পড়বে কুলগাছি। সেখান থেকে আবার ডান দিকে বাঁকলে আসাননগর।
শান্তিপুর
শ্যামচাঁদের মন্দির গাত্রের টেরাকোটার কাজ অপূর্ব। —নিজস্ব চিত্র।
শান্তিপুরের রাস এবং কালীপুজোর খ্যাতি থাকলেও, বাংলার পর্যটন মানচিত্রে এক প্রকার ব্রাত্যই রয়ে গিয়েছে গঙ্গার তীরের জনপদটি। রাস ও কালীপুজোর সময়টুকু বাদ দিয়ে শান্তিপুর যে ভ্রমণতালিকায় রাখা যেতে পারে, এমনটা বোধ হয় অনেকেই ভাবতে পারেন না। অথচ জানা যায়, সন্ন্যাস গ্রহণের পরে গঙ্গা পেরিয়ে প্রথম শান্তিপুরেই এসেছিলেন চৈতন্যদেব। শান্তিপুর কিন্তু শুধু চৈতন্যতীর্থই নয়, এখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে স্থাপত্য আর ইতিহাসের নানা উপকরণ। সেই তালিকায় যেমন রয়েছে তোপখানার মসজিদ, ইটের তৈরি আটচালার শ্যামচাঁদ মন্দির, তেমনই আছে অদ্বৈতাচার্যের সাধনক্ষেত্র অদ্বৈতপীঠ। এ ছাড়া রয়েছে গোস্বামী বাড়ি-সহ একাধিক ঐতিহ্যবাহী বাড়ি, আগমেশ্বরী মন্দির, জলেশ্বরের শিবমন্দির। আর আছে এখানকার তাঁতশিল্প, দিবারাত্র সেখানে ব্যস্ততা থাকে। যে শাড়ি শখ করে কেনেন, সেই শাড়ি তৈরির পিছনে কতটা শ্রম থাকে, চাক্ষুষ করতে পারেন এখানকার তাঁতিপাড়ায়।
বনগাঁয় ইছামতীর পাড়ে মঙ্গলগঞ্জে অবস্থিত নীলকুঠি নিয়ে ইদানীং পর্যটকদের উৎসাহ বেড়েছে। গা ছমছমে পরিবেশে ‘তেনা’-দের যদি সাক্ষাৎ মেলে, এমনই আশায় পা বাড়াচ্ছেন পর্যটকেরা। আসলে এই নীলকুঠি ঘিরে রয়েছে জমজমাট সব ভৌতিক গল্প। শান্তিপুর থেকে ঘুরে আসতে পারেন সেখানেও। দূরত্ব বড় জোড় ৫০ কিলোমিটার হবে।
দিন দুই শান্তিপুরে থাকলে প্রাপ্তি হবে গ্রামীণ পরিবেশের সান্নিধ্য, এখানকার সংস্কৃতিকে কাছ থেকে জানা আর খানিক ঘোরাঘুরি। তিন দিন কাছেপিঠে ঘোরার পরিকল্পনা থাকলে শান্তিপুর মোটেই হতাশ করবে না।
থাকার জায়গা
শান্তিপুরে নদীর ধারে তৈরি হয়েছে একাধিক আধুনিক সুযোগ-সুবিধা যুক্ত রিসর্ট। যেখানে ঘরোয়া খাবারও মেলে, প্রকৃতির কোলে দু’দিন কাটানোও যায়, আশপাশ ঘুরেও দেখার সাধও মেটে। শান্তিপুরের নিখুঁতি বেশ জনপ্রিয়। এখানে গেলে চেখে দেখতে ভুলবেন না।
কী ভাবে যাবেন
শিয়ালদহ থেকে শান্তিপুরগামী একাধিক ট্রেন আছে। কলকাতার যে কোনও প্রান্ত থেকেই সড়কপথে শান্তিপুরে আসা যায়।
হাতিবাড়ি
ঝাড়গ্রামে হাতিবাড়িও ঘুরে নিতে পারেন। ছবি:সংগৃহীত।
শালের অরণ্য, সুবর্ণরেখার সৌন্দর্য দেখতে চলুন হাতিবাড়ি। ভাবছেন এই জায়গা কোথায়? হাতিবাড়ির অবস্থান পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা এবং ঝাড়খণ্ড রাজ্যের সংযোগস্থলে, নির্মল প্রশান্ত পরিবেশের মাঝে। ঝাড়গ্রাম জেলার মধ্যে এটি পড়ে। এখানে রয়েছে একটি হাতি চলাচলের পথ বা ‘এলিফ্যান্ট করিডর’। হাতির পালের দেখাও মিলে যেতে পারে।
আশেপাশে ঘুরে দেখতে চান তবে চলে যেতে পারেন চিল্কিগড়। এখানে জামবনির রাজা গোপীনাথ সিংহের ৩০০ বছরের প্রাচীন রাজবাড়ি রয়েছে। ভগ্নদশার এই রাজবাড়ি বহন করছে কালের চিহ্ন। ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে এলে ঘুরে দেখতে পারেন কনকদুর্গা মন্দির।
থাকার জায়গা
পশ্চিমবঙ্গে বনোন্নয়ন নিগমের অতিথি আবাস রয়েছে জঙ্গলঘেরা মনোরম পরিবেশে।
কী ভাবে যাবেন?
ট্রেনে যেতে হলে, হাওড়া থেকে ঝাড়গ্রাম পর্যন্ত এক্সপ্রেস ও লোকাল ট্রেন আছে। ট্রেনে কলকাতা থেকে ঝাড়গ্রামে পৌঁছাতে সময় লাগে কমপক্ষে আড়াই ঘণ্টা।
সড়কপথে যেতে চাইলে, ঝাড়গ্রাম শহর হয়ে গোপীবল্লভপুর। গোপীবল্লভপুর থেকে সড়কপথে ২২ কিমি এগোলেই হাতিবাড়ি।
জয়পুর
জয়পুরের অরণ্য। জঙ্গলের বুক চিড়ে এগিয়েছে রাস্তা। —নিজস্ব চিত্র।
এই জয়পুর রাজস্থানে নয়, বাঁকুড়ায়। উজাড় করা প্রকৃতি, গ্রামবাংলার রূপের কমতি নেই এখানে। ক্যামেরাবন্দি করার জন্য পক্ষী পর্যবেক্ষকদেরও বিষয়ের অভাব নেই। দুধরাজ থেকে ফিঙে, এশিয়ান ওপেনবিল, স্যান্ড লার্ক-সহ অনেক পাখির দেখা মিলবে দেখতে জানলে।
আর পথের দু’ধারে রয়েছে শাল, মহুয়া, সেগুন, বেহেড়া। মিলেমিশে যেন তারা গল্প জুড়ে দিয়েছে। শালবনের বুক চিরে কালো পিচের মসৃণ রাস্তা চলে গিয়েছে বিষ্ণুপুরের দিকে। রোদের তাপে যদি নামতে ইচ্ছা না-ও হয়, সেই রাস্তা ধরে গাড়ি ছোটালেই দু’চোখ ভরে সবুজ দেখতে পাবেন।
জয়পুর অরণ্যে গাছগাছালির ভিতরেই রয়েছে একটি পরিত্যক্ত এয়ারফিল্ড বা বিমানঘাঁটি। জায়গাটি 'বাসুদেবপুর চাতাল' নামেও পরিচিত। বেলা পড়লে বরং সেখানে ঢুঁ মারতে পারেন। শোনা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এটি ব্যবহৃত হত। জয়পুর হয়ে বিষ্ণুপুরেও যেতে পারেন। এখানে রয়েছে টেরোকোটার মন্দির।
থাকার জায়গা
জয়পু্রের জঙ্গল শুরুর মুখে, জঙ্গলের ভিতরে রিসর্ট আছে। বিষ্ণপুরেও রয়েছে বিভিন্ন মানের হোটেল।
কী ভাবে যাবেন?
কলকাতা থেকে সড়কপথে জয়পুর অরণ্যের দূরত্ব ১২৮ কিলোমিটার। কলকাতা থেকে ডানকুনি, আরামবাগ হয়ে পৌঁছোতে বড়জোর ঘণ্টা চার-পাঁচ লাগবে। ট্রেনে যেতে হলে চলুন বিষ্ণুপুর স্টেশন। সেখান থেকে জয়পুর জঙ্গলের দূরত্ব ২০ কিলোমিটার।