রথযাত্রা বললেই দৃশ্যপটে ভাসে বিশাল রথ আর ‘জয় জগন্নাথ’ ধ্বনিতে মুখর আকাশ-বাতাস। এই উৎসবে বলরাম, সুভদ্রা থাকলেও, রথযাত্রার মধ্যমণি কিন্তু জগন্নাথই।
রথযাত্রার উৎসবে ঘুরে নিতে পারেন পূর্ব বর্ধমানের রায়নার এমন এক মন্দিরে, যেখানে জগন্নাথ নন, মূল আরাধ্য দেবতা বলভদ্র। সেই মূর্তি আবার যেমন-তেমন নয়। হলধারী বিগ্রহের দীর্ঘ দেহ আর পুরুষ্টু গুম্ফ দেখলেই সম্ভ্রম জাগে। এই মন্দির পরিচিত বোড়ো বলরামের মন্দির নামে। দেবমাহাত্ম্যে বোড়ো গ্রামের নাম হয়েছে বোড়ো বলরাম। এই গ্রামের জীবনযাপনে প্রতি মুহূর্তে জড়িয়ে রয়েছেন গ্রামদেবতাই।
কৃষিভিত্তিক সমাজের প্রতীক বলভদ্র। তিনি কৃষি এবং শস্যক্ষেত্রের দেবতা। দারুনির্মিত বিগ্রহের হাতে রয়েছে হল বা লাঙল। ১৪ ফুটের মূর্তির ১৪টি হাত। মাথায় ১৩টি মাথাওয়ালা অহিছত্র। ত্রিনেত্রের অধিকারী তিনি।
বলভদ্রের ১৪ হাত, মাথায় অহিছত্র। ছবি সংগৃহীত।
মন্দির যে পুরনো, তা সন্দেহাতীত। তবে, ঠিক কবে এটি নির্মিত, তা নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন। মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর ‘চণ্ডীমঙ্গল’ কাব্যে, মালাধর বসুর ‘শ্রীকৃষ্ণবিজয়’ কাব্যে বোড়ো বলরামের উল্লেখ পাওয়া যায়। মনে করা হয়, প্রায় ৭০০ বছরের পুরনো মন্দিরটি। তার গঠনশৈলীতেও রয়েছে নিজস্বতা। মন্দিরটি মাটি থেকে প্রায় ১৫ ফুট উঁচুতে অবস্থিত। প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতে হয় অনেকগুলি ধাপ পেরিয়ে। তার পর সিংহদরজা। দরজায় কৃষ্ণ, বলরাম ও সুভদ্রার মূর্তি। মন্দির রয়েছে দু’টি। বলরামের মূল মন্দিরের উচ্চতা ৪০ ফুটের বেশি। একটি রত্নবিশিষ্ট, অন্যটি ওড়িশার রেখ দেউল শৈলীতে নির্মিত।
একটি রত্নবিশিষ্ট, অন্যটি ওড়িশার রেখ দেউল শৈলীতে নির্মিত। ছবি:সংগৃহীত।
এই বলরাম মন্দির ঘিরে রয়েছে নানা জনশ্রুতি। মূর্তি নির্মাণ নিয়েও রয়েছে কাহিনি। মন্দিরের কাছেই বাসদেবপুর গ্রামে রয়েছে বাসুদহ নামে বিল। এক ব্রহ্মচারী সেই দহে স্নান করতে নেমে নিমকাঠ পান। পরে এক নির্মাণশিল্পী স্বপ্নে পান এই রূপ। তৈরি হয় বলরামের বর্তমান বিগ্রহ। তাঁর ত্রিনেত্র চন্দ্র, সূর্য এবং অগ্নির প্রতীক। মনে করা হয়, চতুর্দশ হস্তে তিনি হাসিমুখে পৃথিবীকে লালন করছেন।
নিয়মিত অন্নভোগ নিবেদন করা হয় এখানে। পায়েস বলভদ্রের বিশেষ পছন্দের। নিয়ম করে পুজোর পাশাপাশি বিশেষ বিশেষ তিথিতে উৎসব হয়। গাজনে খুব বড় উৎসব হয়। প্রচলিত রীতি অনুসারে, মন্দিরের ঠিক উল্টোদিকের একতলা বাড়ি থেকে সন্ন্যাসীরা ঝাঁপ দেন খড়ের গাদায়। এক ‘পাট ভাঙা’ বলে। বুদ্ধপূর্ণিমায় বলরামের চক্ষুদান হয়। অক্ষয়তৃতীয়ায় নিমকাঠের উপর গঙ্গামাটির প্রলেপ দিয়ে অঙ্গরাগ হয়। দোলপূর্ণিমায় পঞ্চম দোল হয়।
বর্ধমানের মহারাজ বিজয়চাঁদ মহতাব বলরাম মন্দিরের জন্য ৩৬৫ বিঘে জমি দান করেছিলেন বলে শোনা যায়। সেই জমিতে উৎপাদিত ফসলেই ভোগ রান্না হয়। মন্দির পরিচালনা, উৎসবের খরচও সেখান থেকে আসে বলেও জানা যায়।
কী ভাবে যাবেন?
ট্রেনে এলে হাওড়া থেকে বর্ধমান লোকাল ধরুন। নামতে হবে শক্তিগড় স্টেশনে। সেখান থেকে বড়শুলের বাস ধরুন। নামতে হবে শম্ভুপুরে। বাকি রাস্তা টোটো-অটোয় যেতে পারবেন। ট্রেনে বর্ধমান এসে গাড়ি ভাড়া করে রায়না হয়ে বোড়ো বলরামপুরে আসতে পারেন। সরাসরি গাড়িতেও আসা যায়। কলকাতা থেকে দূরত্ব প্রায় ১০০ কিলোমিটার। যেতে ৩ ঘণ্টার মতো সময় লাগতে পারে।
কোথায় থাকবেন?
সকালে এসে মন্দির ঘুরে বাড়ি ফেরা যায়। শক্তিগড়ে খাবারের দোকান পেয়ে যাবেন। রায়নাতেও খাওয়ার হোটেল মিলবে। শক্তিগড় বা বর্ধমান শহরে থাকার জায়গাও রয়েছে।