জীবনের পথটি মসৃণ ছিল না কোনওকালেই, তবু থমকাননি তিনি। কলমের আঁচড়েই সৃষ্টি করেছেন ‘পথের দাবির’ মতো উপন্যাসে ‘সব্যসাচী’র মতো দুঃসাহসী বিপ্লবীর চরিত্র। ‘দেবদাস’, ‘দত্তা’, ‘পরিণীতা’, ‘পল্লীসমাজ’, ‘মহেশ’-এর মতো উপন্যাস, ছোটগল্পে তিনি দেশবাসীকে ভাবিয়েছেন, কাঁদিয়েছেন, জাগাতে চেয়েছেন ঘুমিয়ে থাকা চেতনাকে।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্যকর্মের সেই স্থল, তাঁর শেষজীবনের আবাসটি চারচাকায় ঘুরে আসতে পারেন পুজোর ছুটিতে। কথাসাহিত্যিকের জন্মের সার্ধশতবর্ষ এবং ‘পথের দাবি’-র শতবর্ষ উপলক্ষে মুক্তি পাচ্ছে সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ছবি ‘এম্পেরার ভার্সেস শরৎচন্দ্র’। হাওড়ার দেউলটিতে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতে হয়েছে ছবির কিছুটা অংশের শুটিংও। সেই বাড়ির কয়েকটি দৃশ্য সিনেমার ট্রেলারেও দেখা গিয়েছে। সেখানেই ঘুরে আসতে পারেন কোনও এক দিন।
কথাশিল্পী শরৎচন্দ্রের দেউলটির বাড়ি। —নিজস্ব চিত্র।
নিছক ভ্রমণ নয়, এ সফরের উদ্দেশ্য হতে পারে, সাহিত্যের একটি অধ্যায়কে ছুঁয়ে দেখা, ঐতিহ্যের কাছে গিয়ে শান্ত সময় কাটানো, সেই সঙ্গে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ইতিহাসকে তুলে ধরা। শোনা যায়, এখানে বসেই ‘বিপ্রদাস’-সহ বেশ কিছু গল্প এবং উপন্যাস লিখেছিলেন তিনি।
কলকাতা থেকে দেউলটির দূরত্ব প্রায় ৬০ কিলোমিটার। জাতীয় সড়ক থেকে কয়েক কিলোমিটার ভিতরে গেলে সামতাবেড় গ্রাম। সঙ্কীর্ণ হলেও পাকা রাস্তা এখন সেখানে। মোড়ের মাথায় শরৎচন্দ্রের আবক্ষ মূর্তি। সেখানেই দেওয়া রয়েছে দিকনির্দেশ। নির্দেশিত পথে কিছুটা এগোলেই লাল পাঁচিল। সামনে লেখা ‘শরৎ কুঠি’। গাছগাছালি ঘেরা রাস্তার একপাশে বাঁধানো পুকুর। ঠিক তার উল্টোদিকে দুই সাদা থামে আটকানো কালো রঙের লোহার প্রবেশদ্বার। থামের ফলকে জ্বলজ্বল করছে ‘শরৎ স্মৃতি মন্দির’। চওড়া থামে শরৎ সাহিত্য থেকে বিভিন্ন উদ্ধৃতি।
নিজগুণেই এই বাড়ি দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কারণ, এমন নির্মাণশৈলী সচরাচর চোখে পড়ে না। গাছগাছালি ঘেরা বাগান। টালির চালের দোতলা বাড়ি। তাকে বেড় দিয়ে রেখেছে চওড়া বারান্দা। লাল রঙের মেঝে।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের শেষজীবনের আস্তানা। —নিজস্ব চিত্র।
দোতলা বাড়িটির সর্বত্রই সাহিত্যিকের স্মৃতি ছড়িয়ে আছে। কাঠের বারান্দা, উঠোন, সব জায়গাই ঘুরে দেখতে পারেন পর্যটকেরা। সামনের দিকে বাগানচত্বরে কথাশিল্পীর মূর্তি। বাড়ির পিছনে বাঁশবাগান, শান্ত পরিবেশে আজও ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারে অতীতে।
লোহার শিক দেওয়া জানলা। ঘরের ভিতরে কাঠের খাট, আরামকেদারা থেকে টেবিল-চেয়ার সবকিছু পরিপাটি করে রাখা। দেখলে মনে হবে, হয়তো লেখক ক্ষণিকের জন্য ঘর থেকে বেরিয়েছেন।
শরৎচন্দ্রের ব্যবহৃত জিনিসপত্র সাজানো রয়েছে। —নিজস্ব চিত্র।
বাড়ি জুড়ে সংরক্ষণ করা হয়েছে সাহিত্যিকের ব্যবহৃত জিনিসপত্রও। ঠাকুরঘরে রয়েছে রাধাকৃষ্ণের মূর্তি। এই মূর্তিটি নাকি চিত্তরঞ্জন দাশ উপহার দিয়েছিলেন লেখককে, শোনা যায় এমনটাই। এখনও নিত্যপূজা হয় এই ঠাকুরঘরে।
এই বাড়ি আর তাঁর স্মৃতি চার পুরুষ ধরে আগলে রেখেছেন টুবাই পতির পরিবার। নকুলচন্দ্র পতি বাড়ির দেখভালের দায়িত্ব পেয়েছিলেন। এখন বাড়িটির রক্ষণাবেক্ষণ করেন, পর্যটকেরা এলে সাহিত্যিকের ভিটে ঘুরিয়ে দেখান টুবাই। কথায় কথায় শোনালেন, এই বাড়ির ইতিহাস। এককালে রুদ্ধদ্বারে বিপ্লবীদের বৈঠক হত। রয়েছে গোপন কক্ষও। স্বয়ং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এসেছেন এখানে। বিপিনবিহারী গঙ্গোপাধ্যায়, চিত্তররঞ্জন দাশের মতো স্বাধীনতা সংগ্রামীরা নদীপথে আসতেন। এখানে রয়েছে বহু পুরনো দম দেওয়া ঘড়ি। সাজানো আছে সাহিত্যিকের দোয়াত-কলম। হোমিয়োপ্যাথি ওষুধের বাক্স। কারণ, সামতাবেড় গ্রামে স্থানীয় বাসিন্দাদের চিকিৎসাও করতেন শরৎচন্দ্র।
দেউলটিতে শরৎচন্দ্রের মূর্তিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান টোটা রায়চৌধুরী, আবীর চট্টোপাধ্যায়। —নিজস্ব চিত্র।
এই বাড়ির কড়ি-বড়গা, ইট-পাথর নানা ঘটনার সাক্ষী। আসন্ন ছবিতে শরৎচন্দ্রের ভূমিকায় অভিনয় করছেন টোটা রায়চৌধুরী। জানালেন, অভিনয়ের সুযোগ পরে এসেছে। বহু বছর আগে পর্যটক হিসাবে কন্যাসন্তানকে কোলে নিয়ে এই বাড়িতে এসেছিলেন। মেয়েকে বলেছিলেন এটা কথাসাহিত্যিকের বাড়ি। বড় হলে সাহিত্যিকের লেখা বই তাঁকে পড়তে দেবেন। সেই চরিত্রে অভিনয় করতে পেরে আবেগাপ্লুত তিনি। শরৎচন্দ্রের সৃষ্ট সব্যসাচী মল্লিকের চরিত্রে অভিনয় করছেন আবীর চট্টোপাধ্যায়। দেউলটির এই স্থান তাঁর কাছে তাই আবেগের স্থল। একসময় এই গ্রামের নাম ছিল সামতা। পাশেই গোবিন্দপুরে ছিল শরৎচন্দ্রের দিদি অনিলাদেবীর শ্বশুরবাড়ি। দিদির উদ্যোগেই একসময় রূপনারায়ণের কাছে নিরিবিলি স্থলে বাড়িটি তৈরি করিয়েছিলেন সাহিত্যিক। কালের নিয়মে সময় গড়িয়েছে। শরৎচন্দ্রের জন্মের ১৫০তম বর্ষে এসে দেউলটি, পানিত্রাস, সামতাবেড়ের বদল হয়েছে অনেকটাই।
রূপনারায়ণ বয়ে গিয়েছে সামতাবেড়ে। ছবি:সংগৃহীত।
মেঠো পথের জায়গায় এখন পাকা সড়ক। গাছগাছালি কাটা পড়েছে কিছু, তবে কিছু রয়েও গিয়েছে। বিদ্যুৎ এসেছে। চালাবাড়িগুলি পাকা হয়েছে। সাহিত্যিকের বাড়ি থেকে ঢালাই রাস্তা এগিয়েছে রূপনারায়ণের দিকে। নদের পাশেই ধানজমি, গাছপালা।
সামতাবেড়ে শহুরে হাওয়া লাগলেও, এখনও তা পুরো শহর হয়ে ওঠেনি। দেউলটি এলে শরৎচন্দ্রের শেষজীবনের ভিটে দর্শনের পাশাপাশি চলে আসতে পারেন রূপনারায়ণের পাড়ে। শরতে কাশফুল ফুটেছে সেখানে। পড়ন্ত বিকেলে নদের রূপও স্নিগ্ধ।
শরৎচন্দ্রের বাড়ি থেকে রূপনারায়ণে যাওয়ার রাস্তাটি পাকা হয়েছে এখন। —নিজস্ব চিত্র।
শরৎচন্দ্রের শেষ জীবনের ভিটে দেখতে কিছু পর্যটক আসেন। তবে সংখ্যায় হাতগোনা। বরং শীতের দিনে রূপনারায়ণের পাড়ে পিকনিক পার্টির ভিড় জমে বেশি। অথচ এই অঞ্চলের স্থানমাহাত্ম্য কিছু কম নয়। শরৎচন্দ্রের বাড়ি ছাড়াও প্রাচীন বঙ্গজীবনের বেশ কিছু স্বাক্ষর আজও পাওয়া যাবে এখানে। রয়েছে শ্রীরাধা ও মদনগোপালের প্রাচীন আটচালা মন্দির। মন্দিরের গায়ে টেরাকোটার কাজ।
কিন্তু পর্যটনস্থল হিসাবে দেউলটিকে জানেন ক’জন? শরৎচন্দ্রকে নিয়ে ছবি, সেখানে অবশ্যম্ভাবী ভাবেই এসে পড়ে দেউলটি। সিনেমার হাত ধরে দেউলটিতে পর্যটন মানচিত্রে জনপ্রিয় হলে খুশি হবেন বলে জানালেন পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায়। বললেন, ‘‘আমরা চাই, সেটা হোক। শরৎচন্দ্রের জন্মের সার্ধশত বর্ষ, পথের দাবির ১০০ বছর। শুধু সাহিত্যের দিক থেকে নয়, শরৎচন্দ্রের জীবনের সঙ্গে সংযুক্ত সমস্ত কিছুই যথাযথ ভাবে উদ্যাপিত হওয়া দরকার। সাহিত্যিকের একাধিক গল্প উপন্যাস নিয়ে বিভিন্ন ভাষায় ছবি হয়েছে। আশা করব, ভবিষ্যতে সেই পথ মসৃণ হবে।’’
সিনেমা, শুটিং নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যেও বাড়তি উৎসাহ তৈরি হয়েছে। ওই এলাকায় ডাব বিক্রি করেন মিঠু ধাড়া। জানালেন, সারাবছর কম-বেশি পর্যটকদের আনাগোনা লেগেই থাকে। সিনেমা তৈরি হলে যদি লোকে আরও বেশি আসে, তাঁদের মতো গ্রামবাসীদের বিক্রিবাটা ভাল হবে।
তবে শুধু দেউলটি নয়, চারচাকার সফর সাজাতে পারেন অদূরে কোলাঘাটকে কেন্দ্র করেও। ঘুরে নিতে পারেন দেউলটি থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে বেনাপুরের চর। সবুজ ঘাসে ঢাকা স্থানটি বিকেল হলেই স্থানীয়দের আড্ডার স্থলে পরিণত হয়। খুদেরা খেলাধুলো করে। জায়াগাটি বেশ মনোরম।
খোলা এবং বন্ধের সময়
সকালে ১০-১২টা, দুপুরে ১টা থেকে আড়াইটে, বিকেলে ৪টে থেকে পৌনে ছ’টা পর্যন্ত শরৎচন্দ্রের বাড়িটি পর্যটকদের জন্য খোলা থাকে।
কোথায় থাকবেন
দেউলটিতে থাকার জায়গা হাতেগোনা। তবে অদূরে কোলাঘাটে রূপনারায়ণের তীরে একাধিক নামী-দামি রিসর্ট গড়ে উঠেছে। সেখানে একটি বা দু’টি দিন কাটিয়েও আসতে পারেন।
কী ভাবে যাবেন
কলকাতা থেকে ১৬ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে দেউলটি হয়ে সামতাবেড়। দেউলটি থেকে শরৎরোড ধরতে হবে।