প্রাচীনত্ব ও ঐতিহ্যের নিরিখে রথযাত্রা বললেই প্রথমেই নাম আসে পুরীর। পশ্চিমবঙ্গে সেই বিচারে হুগলির মাহেশের রথের স্থান সম্ভবত সর্বাগ্রে। ৬২৫ বছরের পুরনো এখানকার রথযাত্রা। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘রাধারাণী’ উপন্যাসেও মাহেশের রথের মেলার উল্লেখ রয়েছে।
মাহেশে এখন যে রথ টানা হয়, সেটি চার তলবিশিষ্ট লোহার রথ। উচ্চতা ৫০ ফুট। ১২টি লোহার চাকা। রথের প্রথম তলে চৈতন্যলীলা, দ্বিতীয় তলে কৃষ্ণলীলা এবং তৃতীয় তলে রামলীলা চিত্রিত রয়েছে। চার তলায় বিগ্রহ বসানো হয়। তামার দু’টি ঘোড়া রথের সামনে লাগানো হয়। কাঠের তৈরি সারথিও থাকে।
প্রাচীনত্ব এবং ঐতিহ্যের বিচারে মাহেশের রথযাত্রা ভক্তমহলের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হলেও, এই রাজ্যের জেলায় জেলায় রথযাত্রা হয়। সেই সব রথের ইতিহাসও বেশ পুরনো। এমন রথও হয় যেখানে রথে আসীন হন রঘুনাথ, মদনমোহন। কোথাও আবার রথযাত্রাকে ঘিরে মজার রীতিরও প্রচলন রয়েছে। জেনে নিন এমন রথ কোথায় হয়?
শান্তিপুরের রথ
শান্তিপুরের রথযাত্রা। ছবি:সংগৃহীত।
রাস, ঝুলন কিংবা জন্মাষ্টমীর মতোই শান্তিপুরের রথযাত্রার ঐতিহ্য সুপ্রাচীন। তবে শান্তিপুরের রথে আসীন হন গোস্বামীবাড়িগুলির মূলদেবতা রঘুনাথ। এটি আসলে রামচন্দ্রের দারুমূর্তি। ধূতি পরিহিত পদ্মাসনে আসীন তিনি। গায়ের রং সবুজ। পাশে থাকে জগন্নাথের বিগ্রহ। প্রায় আড়াইশো বছরেরও বেশি পুরনো বড়গোস্বামী বাড়ির রথযাত্রা। একসময় জগন্নাথের বিগ্রহের পাশাপাশি রঘুনাথের কাঠের বিগ্রহ রথে তোলার প্রচলন হয়। কালক্রমে রঘুনাথই হয়ে ওঠেন রথের মূল আকর্ষণ। রথের সময় নানা রকমের ভোগের প্রচলন আছে। যেমন উল্টোরথের আগের দিন আষাঢনবমীতে রাতে ‘দেওড়াভোগ’ দেওয়া হয়। এতে কলমিশাক-সহ থাকে নিরামিষ হরেক পদ, যেমন সাদা ভাত, খিচুড়ি, তরকারি, দই, পায়েস, ভাজা। রথযাত্রার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িয়ে আছে মেলা। শান্তিপুরে মূলত দু’টি রথের মেলা বসে। একটি বড়গোস্বামী বাড়ি সংলগ্ন মাঠে, অন্যটি রথতলায়।
কী ভাবে যাবেন?
শিয়ালদহ থেকে শান্তিপুর লোকাল ধরে পৌঁছোতে পারেন। স্টেশন থেকে টোটো পাওয়া যাবে। কলকাতা বা যে কোনও জায়গা থেকেই সড়কপথেও শান্তিপুর যাওয়া যায়।
কোচবিহারের রথ
কোচবিহারে মদনমোহনের রথযাত্রা। ছবি:সংগৃহীত।
কোচবিহারের রথযাত্রা হয় মদনমোহনকে কেন্দ্র করে। ১৮৯০ সালে শুরু হয় এই রথযাত্রা। রীতি মেনে রথযাত্রার আগের দিন হয় অধিবাস। সুগন্ধি তেল মাখিয়ে চলে মদনমোহনের অঙ্গরাগ পর্ব। পরদিন থাকে মদনমোহনের মহাস্নান। রথযাত্রার দিন মূল মন্দিরের পশ্চিম দিকে অন্য একটি মন্দিরে স্থানান্তরিত করা হয় মদনমোহনকে। মদনমোহনের রথের উচ্চতা ২২ ফুট। ছ’টি চাকা। সামনে দু’টি রুপোর ঘোড়া। সারথিরা কাঠের। মন্দিরেই ফি বছর ৪০ কেজি পাট দিয়ে তৈরি হয় রথের রশি।
রথে শহর পরিক্রমা করে মদনমোহন মাসির বাড়ি ‘গুঞ্জবাড়ি’তে সাত দিন থাকেন। উল্টোরথের শেষে মন্দিরে ফিরে এলে মদনমোহনকে বারান্দায় রাখা হয়। ঠাকুর বিশ্রাম নেন। ‘ঠাকুরের হাওয়া খাওয়া’ নামে এই রীতিটি প্রচলিত। এই সময় তাঁকে বিশেষ ভোগ হিসেবে নিবেদন করা হয় শুধুই রসগোল্লা। পরে সিংহাসনে গিয়ে বসেন তিনি।
কী ভাবে যাবেন?
হাওড়া, শিয়ালদহ থেকে ট্রেন ধরে যেতে হবে নিউ কোচবিহার। সেখান থেকে টোটোয় মদনমোহন মন্দির।
গুপ্তিপাড়ার রথ
হুগলির আর একটি ঐতিহ্যবাহী রথ হয় গুপ্তিপাড়ায়। এটি পরিচিক বৃন্দাবন জিউয়ের রথ নামে। ছবি:সংগৃহীত।
গুপ্তিপাড়ার রথ ‘বৃন্দাবন জিউ’-এর রথ নামেও পরিচিত। হুগলির বলাগড় থানা এলাকায় বর্ধমান জেলার সীমানায় রয়েছে বর্ধিষ্ণু এই জনপদ। গুপ্তিপাড়ার রথ ও রথের মেলার খ্যাতি বহু দিনের। ২৮৫ বছরের পুরনো রথযাত্রায় ৯ চূড়ার রথ টানা হয়। প্রতিটি চূড়াতেই থাকে রঙিন ধ্বজা। বৃন্দাবন মন্দির থেকে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা যান প্রায় এক কিলোমিটার দূরে গোঁসাইগঞ্জ-বড়বাজারে মাসির বাড়ি। গুপ্তিপাড়ার রথের বিশেষত্ব হল ভান্ডার লুট। উল্টোরথের দিন মাসির বাড়ির মন্দিরের তিনটি দরজা একসঙ্গে খোলা হয়। ভিতরে মালসায় থাকে রকমারি খাবার। সেই ভোগপ্রসাদের জন্যেই হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। ৫২টি পদের প্রচুর মালসা থাকে। পুণ্যার্থীরা সেখানে ঢুকে যা প্রসাদ পান, তুলে নেন।
কী ভাবে যাবেন?
হাওড়া থেকে কাটোয়া লোকালে করে নামুন গুপ্তিপাড়া স্টেশনে। সড়কপথেও যেতে পারেন। কলকাতা থেকে দূরত্ব প্রায় ৯৪ কিলোমিটার।