কালীপুজো-দীপাবলির সময়ে আকাশ যেমন মেঘমুক্ত থাকে, তেমন ঠান্ডা বা গরম কোনওটাই বেশি থাকে না। তার উপর উৎসবের মরসুম বলে লম্বা ছুটিও মিলে যায়। এমন সময়ে তাই বেড়াতে যেতে চান অনেকেই।
যাওয়ার জায়গা বিস্তর। ভিড় এড়াতে চাইলে আছে শৈল শহরের অজানা, অচেনা পাহাড়ি গ্রাম। দ্বীপ থেকে শহর, পাহাড়, সমুদ্র, জঙ্গল— সফর করা যায় যে কোনও জায়গায়। কিন্তু আলোর উৎসবের সাক্ষী হতে, একটু অন্য রকম দীপাবলি উপভোগে কোথায় যেতে পারেন? শেষবেলায় খানিক ভিড় ঠেলে যাবেন কোথায়?
স্বর্ণমন্দির
অমৃতসরের স্বর্ণমন্দির। ছবি:সংগৃহীত।
হাজার হাজার প্রদীপ জ্বলে দীপাবলিতে। সোনার মন্দিরে প্রদীপের আলো এক অদ্ভুত দ্যুতির জন্ম দেয়। পঞ্জাবের অমৃতসরের স্বর্ণমন্দিরে আলোয় মুড়িয়ে দেওয়া হয় এই সময়ে। এমন সৌন্দর্য বছরের অন্য সময়ে পাওয়া যায় না। অমৃত সরোবরে আলোকোজ্জ্বল মন্দিরে প্রতিবিম্ব এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করে। ওয়াঘা সীমান্তে বিএসএফ-এর তরফেও পালিত হয় দীপাবলি। এই দিনে বিশেষ উৎসব-অনুষ্ঠানেরও আয়োজন হয় এখানে।
বেড়াতে গেলে স্বর্ণমন্দির ছাড়াও ঘুরে নিতে পারেন জালিয়ানওয়ালা বাগ, ওয়াঘা সীমান্ত, পার্টিশন মিউজ়িয়াম, মহারাজা রণজিত সিংহ মিউজ়িয়াম। অমৃতসরের জনপ্রিয় খাবার কুলচা-ছোলে, লস্যি। লঙ্গরের খাবার খেতে ভুলবেন না। স্বর্ণমন্দিরেও থাকা যায়, তবে তার অদূরে অসংখ্য হোটেলও রয়েছে।
অযোধ্যা
অযোধ্যায় দীপোৎসব হয় দীপাবলিতে। ছবি:সংগৃহীত।
দীপাবলিতে লক্ষ লক্ষ প্রদীপে সেজে ওঠে অযোধ্যার মন্দির চত্বর। অযোধ্যায় নতুন রাম মন্দিরের আকর্ষণ আছেই, তবে দীপাবলিতে সেই রূপ ধরা দেয় অন্য ভাবে। হয় লেজার শো। সরযূ নদীর তীরে অযোধ্যায় দীপাবলিতে প্রতি বছর ‘দীপোৎসব’ উদ্যাপন করা হয়। ৫- ৮ নভেম্বর হয় উৎসব। ৭ নভেম্বর লক্ষ লক্ষ মাটির প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই সময়ে আলোয় সাজে শহর। রামলীলা অভিনীত হয়, আয়োজন হয় নানা অনুষ্ঠানের। লোকমুখে শোনা যায়, দীপাবলি আসলে রামের ১৪ বছর বনবাসের পরে নিজ শহর অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তনের সময়কাল। তাঁর প্রত্যাবর্তনকে উদ্যাপন করতেই বড়সড় উৎসব হয় এখানে। রাম মন্দির, সরযূ নদীর ঘাট ছাড়াও, হনুমান গড়ি, দশরথ মহল, গুপ্তার ঘাট, নাগেশ্বর নাথ মন্দির ঘুরে নিন। এখানে এলে অবশ্যই রাবড়ি, জিলিপি, পেঁড়া খেয়ে দেখুন। উৎসবে অযোধ্যায় গেলে আগে থেকে হোটেল বুক করে নিন। বিভিন্ন মানের হোটেল আছে।
বারাণসী
বারাণসীতে পালিত হয় দেব দীপাবলি। ছবি:সংগৃহীত।
দীপাবলির ১৫ দিন পরে দেব দীপাবলি পালিত হয় গঙ্গা তীরের প্রাচীন জনপদটিতে। কার্তিক পূর্ণিমায় পালিত হয় দেবতাদের দীপাবলি উৎসব। পৌরাণিক বিশ্বাস, এই তিথিতে শিব ত্রিপুরাসুর নামক রাক্ষসকে বধ করেছিলেন। সেই বিজয়কে উদ্যাপন করতে স্বর্গ থেকে স্বয়ং দেব-দেবীরা মর্ত্যে নেমে আসেন এবং গঙ্গার ঘাটে প্রদীপ জ্বালিয়ে আনন্দ উৎসব করেন। এই বছর ২৪ নভেম্বর দেব দীপাবলি উদ্যাপিত হচ্ছে। সন্ধ্যা হলেই তিথি মেনে বারাণসীতে গঙ্গার ঘাটগুলিতে লক্ষ লক্ষ প্রদীপ জ্বালানো হয় দেব দীপাবলিতে। গঙ্গার ঘাটের আলোকসজ্জার সেই রূপ মনে গেঁথে থাকার মতোই। ভক্তেরা অসংখ্য মাটির প্রদীপ নদীতে ভাসান। দশাশ্বমেধ ঘাট এবং অসি ঘাটে গঙ্গা আরতির সময়ে পুরোহিতদের সমবেত মন্ত্রোচ্চারণ, শঙ্খধ্বনি, ঢাকের আওয়াজ এবং বাতাসে কর্পূরের গন্ধ আধ্যাত্মিক পরিবেশ সৃষ্টি করে। আতশবাজির খেলা ও লেজার শো এই প্রাচীন শহরকে নতুন রূপ দেয়।
বিকেলে বা ভোরে গঙ্গার ঘাটগুলি নৌকা করে ঘুরে নিন। বিশ্বনাথ দর্শনের পাশাপাশি এখানকার পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়, শহর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে সারনাথেও ঘুরে আসতে পারেন। থাকার জন্য বারাণসীতে বিভিন্ন মানের হোটেল পেয়ে যাবেন। অবশ্যই পেঁড়া, রাবড়ি, চাট, মিষ্টি, লস্যি, পান খেয়ে দেখুন।
উদয়পুর
এই ভাবেই আলোয় সাজে উদয়পুরের হ্রদ থেকে প্যালেস, দুর্গ।
অরাবলীর সবুজ পাহাড় যেন বেড় দিয়ে রেখেছে হ্রদগুলিকে। আর সেই জলাশয় ঘিরেই তৈরি হয়েছে প্রাসাদ, মহল, মন্দির। রাজস্থানের ঐতিহাসিক শহর উদয়পুরে দীপাবলি উৎসবের সাক্ষী হতে পারেন। শুধু দুর্গ, হ্রদ চত্বর আলোয় সাজে না। এখানে হয় লণ্ঠন উৎসব। আকাশে হাজার হাজার ফানুস ওড়ানো হয়। দেখলে মনে হয় তারারা যেন হাত ধরাধরি করে নেমে এসেছে। হ্রদের পাড়ে কোনও ক্যাফেতে বসে চা-কফি খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উপভোগ করতে পারেন আকাশে বাজির প্রদর্শন। বাজার, দোকান, বাড়িগুলিও আলোয় সেজে ওঠে। মিষ্টির দোকানে তৈরি হয় বিশেষ বিশেষ মিষ্টি। প্রদীপ বিক্রি হয়। সবমিলিয়ে দীপাবলিতে উদয়পুর হয়ে ওঠে মায়াবী।
সিটি প্যালেস, অমর বিলাস, বড়ী মহল, ভীম বিলাস, দরবার হল, ফতেপ্রকাশ প্যালেস, কৃষ্ণ বিলাস, লক্ষ্মী বিলাস, মাণক মহল, মোর চক— ঘোরার অজস্র স্থান রয়েছে এখানে। পিছোলা লেক এবং ফতেহ সাগরের কাছের হোটেলে থাকলে চারপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দারুণ উপভোগ করা যায়। শহর জুড়েই রয়েছে ছোট-বড় হোটেল।
ডাল বাটি চুরমা, লাল মাস, মেওয়ারি খাট্টা, গাট্টে কি সব্জি-সহ স্থানীয় অনেকে কিছুই চেখে দেখতে পারেন।
জয়পুর
জয়পুরে দীরাবলি উদ্যাপন। ছবি:সংগৃহীত।
আকাশ জুড়ে রঙিন বাজির খেলা, আলোকমালায় সেজে ওঠা হাওয়া মহল, সিটি প্যালেস, বিশাল দুর্গ, প্রদীপের সজ্জায় সেজে ওঠা বাড়িঘর রূপ বদলে দেয় রাজস্থানের শহরটির। ‘গোলাপি শহর’ জয়পুর যেন হয়ে ওঠে মায়ানগরী। উঁচু কোনও স্থান থেকে আতসবাজির রঙের বিস্ফোরণ, আলোয় মোড়া জয়পুরকে তখন কোনও স্বপ্নের চেয়ে কম মনে হয় না। শহর জুড়েই সাড়ম্বরে পালিত হয় দীপাবলি। ঘরে ঘরে রঙ্গোলি দেওয়া হয়। রাজস্থানের ঐতিহাসিক স্থান, স্থানীয় সংস্কৃতির ছোঁয়া পেতে একবার এই সময়ে সেখানে যাওয়ার পরিকল্পনা করতেই পারেন।
হাওয়া মহল, আমের ফোর্ট, সিটি প্যালেস, নাহারগড় ফোর্ট, জল মহল, যন্তরমন্তর, অ্যালাবার্ট হল মিউজ়িয়াম-সহ একাধিক দর্শনীয় স্থান রয়েছে। সব জায়গাই আলোয় সাজানো হয়। রাজস্থানি রঙিন পোশাক, গয়না সত্যিই দেখার মতো। অবশ্যই চেখে নিন স্থানীয় খাবার। থাকার জন্য জয়পুরের নানা প্রান্তেই অজস্র হোটেল রয়েছে।