বর্ষার মরসুমে ফুঁসে উঠছে নদী। জলের তোড়ে ঝর্না যৌবনবতী। শ্যামল স্পর্শে সেজে উঠেছে পাহাড়ও। এই মেঘলা দিনে ঘরে মন না টিকলে বেরিয়ে পড়ুন বন্ধুবান্ধব, পরিবার বা প্রিয়জনের সঙ্গে। বর্ষা বিদায়ের আগে অগস্টেই ঘুরে নিতে পারেন কোন কোন জায়গা?
মহেন্দ্রগিরি, ওড়িশা
বর্ষায় ঘুরে নিতে পারেন ওড়িশার গজপতি জেলার মহেন্দ্রগিরি। ছবি:সংগৃহীত।
পূর্বঘাট এবং পশ্চিমঘাট পর্বতমালার শোভা দর্শনের আদর্শ সময় বর্ষা। পূর্বঘাটের একটি শৃঙ্গ হল মহেন্দ্রগিরি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা ৪ হাজার ৯২৫ ফুট। ওড়িশার গজপতি জেলায় তার অবস্থান। এই রাজ্যের দ্বিতীয় উচ্চতম শৃঙ্গ মহেন্দ্রগিরি। এই জায়গার সঙ্গে জড়িয়ে রামায়ণ ও মহাভারতের নানা কাহিনি। কারও বিশ্বাস, রামায়ণের মহেন্দ্রপর্বতই মহেন্দ্রগিরি। কেউ বলেন, এই স্থান পঞ্চপাণ্ডবের পদধূলিতে ধন্য। তাঁদের নামে মন্দিরও আছে। কথিত আছে, পাহাড়ে তপস্যা করেছিলেন পৌরাণিক চরিত্র পরশুরাম।
বর্ষায় মহেন্দ্রগিরির অনতিদূরে অবস্থিত মানকদডিয়াঁ জলপ্রপাত হয়ে ওঠে আরও সুন্দর। প্রবল জলরাশি পাহাড় থেকে নীচে আছড়ে পড়ে। এ পথেই দেখা মেলে মহেন্দ্রতনয়ারও। বৃষ্টির জলে পুষ্ট নদী হয়ে ওঠে খরস্রোতা। মহেন্দ্রগিরিতে রয়েছে পুরনো শিবমন্দির। পাহাড়ি পথে সিঁড়ি বেয়ে পৌঁছোনো যায় ভীম মন্দিরে। আরও চড়াইয়ে গেলে পৌঁছোনো যায় পরশুরামের মূর্তির কাছে। মেঘের চাদর ধোঁয়াটে না হয়ে থাকলে, পাহাড়ের উপর থেকে চারপাশের দৃশ্য লাগে ভারি সুন্দর।
কী ভাবে যাবেন
ব্রহ্মপুর থেকে মহেন্দ্রগিরির দূরত্ব ১২৫ কিলোমিটার। ভুবনেশ্বর থেকে ব্রহ্মপুর বা পাড়ালাখেমুন্ডি হয়ে মহেন্দ্রগিরি আসা যায়।
কোডগু, কর্নাটক
কোডগুর চা-বাগিচা । ছবি:সংগৃহীত।
ঢেউখেলানো অনুচ্চ পাহাড়, সর্পিল পথ, ছোট-ছোট ঝরনা, নদী, একরের পর একর জমিতে কফি চাষ। সব মিলিয়ে পশ্চিমঘাট পর্বতের ঢালে কোডগু (কুর্গ) যেন ক্যালেন্ডারের পাতার কোনও ছবি। বৃষ্টির ছোঁয়ায় পাহাড় হয়ে ওঠে আরও সবুজ। কফি-চা বাগিচা ঘেরা জনপদে বর্ষার জমাটবাঁধা মেঘ তৈরি করে রঙের বৈপরীত্য। ভাগমণ্ডল, তলাকাবেরী, দুবারে এলিফ্যান্ট ক্যাম্প, নামড্রোলি মনাস্ট্রি, অ্যাবি জলপ্রপাত সব নিয়েই কোডগু। মাদিকেরী শহর থেকে গাড়ি নিয়ে দুই দিনে ঘুরে নেওয়া যায় আশপাশ। শীতে শহরটিতে পর্যটকদের ভিড় থাকলেও, বর্ষার রূপ আলাদা।
কী ভাবে যাবেন
মায়সুরু জংশন রেলস্টেশন থেকে মাদিকেরীর দূরত্ব ১২০ কিলোমিটার। গাড়ি ভাড়া করে বা বাসে যেতে পারেন। মঙ্গলুরু ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট থেকেও যাওয়া যায়।
জগদলপুর, ছত্তীসগঢ়
জগদলপুরের চিত্রকোট জলপ্রপাত। ছবি:সংগৃহীত।
পাহাড় থেকে সবেগে নেমে আসা ইন্দ্রাবতী নদী থেকে তৈরি হয়েছে চিত্রকোট জলপ্রপাত। জলের তো়ড় এতটাই যে ধোঁয়ার মতো হয়ে থাকে আশপাশ। কখনও সূর্যালোকের প্রতিফলনে তৈরি হয় রামধনু। ছত্তীসগঢ়ের বস্তার জেলার জগদলপুর শহরটিকেও রাখতে পারেন বর্ষাভ্রমণের তালিকায়। সৌন্দর্যের জন্য চিত্রকোট জলপ্রপাতটিকে অনেকেই নায়াগ্রার সঙ্গে তুলনা করেন। অগস্টের ভ্রমণসূচি সাজাতে পারেন জগদলপুরের পাশাপাশি বস্তর জেলাকে কেন্দ্র করেও। জঙ্গলাকীর্ণ পথে আর একটি আকর্ষণীয় জলপ্রপাত হল তীরথগড়। জগদলপুর শহর থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে ৩০০ ফুট উঁচু পাহাড়ে কাঙের নদী থেকে তৈরি হয়েছে জলপ্রপাতটি। এ ছাড়াও ঘুরে নিতে পারেন তামড়া ঘুমর, মণ্ডবা ও চিত্রধারা।
কী ভাবে যাবেন
ট্রেনে বা বিমানে বিশাখাপত্তনম গিয়ে সেখান থেকে সড়কপথে জগদলপুর যেতে পারেন। হাওড়া থেকে রাতে ছাড়ে সমলেশ্বরী এক্সপ্রেস। এই ট্রেনটি সরাসরি জগদলপুর যায়।
ম্যাকলুস্কীগঞ্জ, ঝাড়খণ্ড
নদী, অরণ্য, টিলা সবটাই মিলবে ম্যাকলুস্কীগঞ্জে। ছবি:সংগৃহীত।
একসময় ম্যাকলুস্কীগঞ্জ ছিল বাঙালির হাওয়া বদলের ঠিকানা। সাহিত্যের পাতায় বার বার উঠে এসেছে নদী-অরণ্য ঘেরা স্থানটি। বর্ষায় অরণ্যঘেরা পাহাড়ি শহরটির সর্বত্রই সৌন্দর্য চোখে পড়বে।
এখান থেকে ঘুরে নেওয়া যায় ডুগাডুগি নদী, রেলস্টেশন, সর্বধর্মস্থল, সীতাকুণ্ড। শোনা যায়, অ্যাংলো ইন্ডিয়ান ব্যবসায়ী আর্নেস্ট টিমোথি ম্যাকক্লাস্কি এই জায়গার সৌন্দর্য দেখে প্রেমে পড়ে যান। এখানকার জলবায়ু এতটাই স্বাস্থ্যকর এবং মনোরম ছিল যে, তিনি ছোটনাগপুরের রাজার কাছ থেকে অনেকটা জমি কেনেন। পরবর্তীতে সেখানে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান বসতি গড়ে ওঠে। লোকমুখে ম্যাকক্লাস্কির নাম বদলে গিয়েছে। এখন এই জায়গা পরিচিত ম্যাকলুস্কীগঞ্জ নামে।
কী ভাবে যাবেন
হাওড়া থেকে সরাসরি ম্যাকলুস্কীগঞ্জে পৌঁছোনো যায় শক্তিপুঞ্জ এক্সপ্রেসে। না হলে, কলকাতা থেকে ট্রেনে বা বাসে রাঁচী পৌঁছে সেখান থেকে গাড়ি নিয়ে চলুন ম্যাকলুস্কীগঞ্জ। গাড়িতেও পুরো রাস্তাটি যাওয়া যায়।
জয়পুর, বাঁকুড়া
বরাত ভাল থাকলে জয়পুরের অরণ্যে দেখা মিলতে পারে হরিণেরও। ছবি:সংগৃহীত।
বর্ষার পশ্চিমবঙ্গও কম সুন্দর নয়। বাঁকুড়া জেলার নানা প্রান্তে রয়েছে শাল-সেগুনের অরণ্য। আছে টেরাকোটার মন্দির, পাহাড়ও। বর্ষাভ্রমণে বেছে নিতে পারেন জয়পুর। কলকাতা থেকে মাত্রা ঘণ্টা তিনেকের পথ। সেই পথ পৌঁছে দেবে মন ভাল করা এক জায়গায়। রাস্তার দু’পাশে ঘন শালের বন। উদ্দেশ্যহীন ভাবেও ঘুরে নেওয়া চলে এই বনপথ। চাইলে যেতে পারেন অরণ্যের ভিতরে পরিত্যক্ত এক বিমানঘাঁটিতে। আরণ্যক পরিবেশের সান্নিধ্য চাইলে থেকে যেতে হবে জয়পুরে। এখানে নামী রিসর্ট, বন দফতরের অতিথি আবাস দুই-ই আছে। জয়পুর থেকে ঘুরে নিতে পারেন বিষ্ণুপুর। টেরাকোটার মন্দির, বালুচরী শাড়ির জায়গা এটি।
কী ভাবে যাবেন?
জয়পুর যেতে হলে গাড়ি করে যাওয়াই সুবিধাজনক। নিকটবর্তী স্টেশন হল বিষ্ণুপুর। সেখান থেকে জয়পুরের দূরত্ব ১৪-১৫ কিলোমিটার।