কবে শেষ রাতের আকাশে তারা গুনেছেন মনে পড়ে? তারার দেখা পাওয়াই তো কঠিন। অমাবস্যার রাতে যদি-বা গুটিকয়েক আলোর ঝিকিমিকি দেখা যায়, কিন্ত তা-ও কিছু সময় পরে কালো ধোঁয়া কবলিত মেঘের আড়ালে গা ঢাকা দেয়। পৃথিবী থেকে লক্ষ কোটি আলোকবর্ষ দূরের তারারা দৃষ্টিরও বাইরে চলে যাচ্ছে ক্রমশ। কৃত্রিম আলোর ঝলকানি চোখের সামনে এক পর্দার আড়াল রেখেছে, যা ভেদ করে নক্ষত্রদের দিকে চোখ রাখা বড়ই কঠিন। নাগরিক জীবনে দূষণমুক্ত পরিষ্কার আকাশ এবং স্পষ্ট দিগন্তরেখা, দুই-ই বিরল। ততোধিক বিরল নক্ষত্র দর্শন। তাই রাতের আকাশকে বেশি করে কাছে পেতে অনেকেই পাড়ি দিচ্ছেন নির্দিষ্ট কিছু গন্তব্যে। দেশের কিছু জায়গা খুবই প্রিয় স্কাই গেজ়ার বা নক্ষত্রসন্ধানীদের কাছে। তার মধ্যে একটি হল নাসিকের উধমাল গ্রাম। প্রায় অখ্যাত এই আদিবাসী গ্রামটিই এখন দেশের অ্যাস্ট্রো-ট্যুরিজ়মের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠতে চলেছে।
শহুরে কোলাহল সেখানে নেই। নিভৃত প্রান্তরে রাতের অন্ধকারই তার প্রধান সম্পদ। মহারাষ্ট্র সরকার রাজ্যের বেশ কিছু জায়গায় অ্যাস্ট্রো-ট্যুরিজ়মের জন্য চিহ্নিত করেছে। তার মধ্যে উধমালের নাম প্রথমেই রয়েছে। রাত হলেই গোটা গ্রাম যেন জ্বলে ওঠে কোটি কোটি নক্ষত্রের আলোকে। সেখানে কৃত্রিম আলোর প্রবেশ নিষেধ। গ্রামের যে প্রান্তেই যান না কেন, তারায় ঝলমলে আকাশ মুগ্ধ করবেই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা তারাখচিত আকাশের দিকে তাকিয়ে কাটিয়ে দেওয়া যায় সময়।
নক্ষত্রখচিত রাতের আকাশ দেখতে উধমাল গ্রামে ভিড় জমাচ্ছেন পর্যটকেরা।
আরও পড়ুন:
শহরে রেস্তরাঁ, শপিং মল থেকে রাস্তার দোকান, বাজার সর্বত্রই আলোর দাপট। বাড়ির বাইরের বাতিস্তম্ভের আলো থেকে শুরু করে তীব্র হ্যালোজেনের আলো, রঙিন নিয়ন আলো খানখান করে দিচ্ছে রাতের অন্ধকার। ওয়ার্ল্ড অ্যাটলাস অফ আর্টিফিশিয়াল স্কাই লুমিনিসেন্সের সমীক্ষা বলছে বিশ্বের জনসংখ্যার ৮০ শতাংশই আলোক দূষণের শিকার। আর আলোর দূষণেই হারিয়ে যাচ্ছে নক্ষত্রেরা। তাদের যদি কাছে পেতে হয়, তা হলে উধমাল গ্রামে ঢুঁ মারাই যায়।
মহারাষ্ট্রের নাশিক জেলার সুরগাণা তালুকের ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম উধমাল। কোনও ঐতিহাসিক স্মৃতিসৌধ, বিলাসবহুল রিসর্ট বা বিনোদনের ব্যবস্থা নেই। গ্রামটির নামও প্রায় কেউ জানতেন না এত দিন। কিন্তু এখন এখানেই নক্ষত্রসন্ধানীরা ছুটে আসছেন নির্মল ও দূষণমুক্ত রাতের আকাশের খোঁজে। অন্ধকারই এই গ্রামের সেরা আকর্ষণ। নক্ষত্রখচিত রাতের আকাশকেই উদ্যাপন করে উধমাল।
গ্রামটিতে কোকনা আদিবাসীদেরই বসবাস। মানুষের সংখ্যা ৫০০ থেকে ৬০০। আদিবাসীরাই প্রথম উধমালের তারায় ভরা আকাশকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগেন। ‘পেসা’ আইনের অধীনে গ্রামটিকে ‘ডার্ক স্কাই কমিউনিটি’-র অধীনে আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়। পরবর্তী কালে আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ডার্কস্কাই ইন্টারন্যাশনাল’ উধমাল গ্রামকে এই কর্মসূচির আওতায় আনে ও অ্যাস্ট্রো-ট্যুরিজমের কেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার কথাও বলে।
রাত ৮টার পরে সমস্ত আলো নিভে যায়, আঁধার রাতের আকাশই এই গ্রামের সম্পদ।
রাতের আকাশকে বাঁচিয়ে রাখাই এখানকার মানুষজনের লক্ষ্য। অপ্রয়োজনীয় কৃত্রিম আলো নিবিয়ে রেখে রাতের অন্ধকারকে সযত্নে লালনপালন করা হয় এই গ্রামে। আলোর দূষণ এখানে নেই। ‘লাইট ট্রেসপাস’, ‘ওভার ইলুমিনেশন’, ‘লাইট ক্লাটার’ ইত্যাদি আলোর দূষণের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলিও এখানে অজানা। কোনও উজ্জ্বল আলো যখন অন্যের অস্বস্তির কারণ হয়, তখন তাকে ‘লাইট ট্রেসপাস’-জনিত দূষণ বলে। যেমন, রাস্তায় বা বাইরের কোনও আলো যখন অন্যের বাড়ির কাচের জানলা ভেদ করে ঘরে ঢুকে যায় তখন তাকে ‘লাইট ট্রেসপাস’ বলে। ‘ওভার ইলুমিনেশন’ দূষণে অতি উজ্জ্বল আলোয় বিস্তীর্ণ অঞ্চলে আলোকদূষণ হয়। ‘লাইট ক্লাটার’ দূষণের ক্ষেত্রে বিপুল বৈচিত্রপূর্ণ রঙিন আলো মানুষকে বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট করে। এখানে এ সব কিছুই হয় না। প্রাকৃতিক আলোই পথ দেখায় গ্রামবাসীদের। আর এই বৈশিষ্ট্যই পর্যটকদের আকর্ষণের মূল কারণ। দূরবিন ছাড়াই এখানে স্পষ্ট দেখবেন নক্ষত্রপুঞ্জ। তার মাঝে আঁকাবাঁকা ছায়াপথ। কোনও বাড়তি আলো নেই, কেবল রাতের আকাশে তারাদের আলোই দৃশ্যমান হবে।
অ্যাস্ট্রো-ট্যুরিজমের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠছে উদমল গ্রাম।
কী ভাবে পৌঁছোবেন উধমালে?
হাওড়া বা শালিমার থেকে মুম্বইগামী ট্রেনে চেপে নাশিক রোড স্টেশনে নামতে হবে।
ট্রেন সফরশেষে নাশিক রোড স্টেশন থেকে বাস বা ট্যাক্সি নিয়ে চলে যেতে পারেন সুরগাণা তালুকে।
সুরগাণা থেকে ট্যাক্সি বা জিপে চেপে পাহাড়ি রাস্তা পেরিয়ে পৌঁছে যাওয়া যাবে উধমাল গ্রামে।
কলকাতা থেকে মুম্বই বা পুণেগামী বিমানে গিয়ে সেখান থেকে সড়কপথ বা ট্রেনে নাশিক আসা যায়।
কোথায় থাকবেন?
বড় হোটেল বা বিলাসবহুল রিসর্ট এখানে নেই। স্থানীয় কোকনা আদিবাসীদের মাটির ঘরে থাকতে পারেন। খাওয়ার ব্যবস্থা তারাই করে। রাত ৮টার পরে এখানে অপ্রয়োজনীয় আলো জ্বালানো নিষিদ্ধ।
পর্যটকদের আনগোনা বাড়তে থাকায় এখানে হোম-স্টের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।