নীল আকাশে পেঁজা তুলোট মেঘ দেখলেই মন বলে পালাই পালাই? বেরিয়ে পড়ুন চারচাকাকে সঙ্গী করেই। ট্রেনসফরের নিজস্ব ছন্দ আছে। বিমানে উঠলে গন্তব্যে পৌঁছোনো যায় চটজলদি। তবে সড়কপথে পাড়ি দেওয়ার আনন্দটুকু নেহাত কম নয়। গাড়ির স্টিয়ারিং যাঁর হাতে, তাঁর হাতে নিয়ন্ত্রণ। ইচ্ছামতো দাঁড়ানো যায়। মন চাইলে ঢুঁ মারা যায় অচেনা পথেও। গন্তব্যে পৌঁছোনোর চেয়েও আনন্দ যেন পথচলাতেই।
তাই দূরত্ব নয়, পথের আনন্দটুকু চেটেপুটে নিতেই পুজোয় চারচাকাতেই সাজিয়ে ফেলুন সফর। সেই তালিকায় থাক মানস ভ্রমণ। মননে সফর নয়, অসমের জাতীয় উদ্যান মানসই হতে পারে গন্তব্য। ঘুরে নিন গুয়াহাটি শহরও। কামাখ্যা দর্শন করে ফিরুন।
দূরত্ব যেহেতু খুব কম নয়, তাই মাঝে একটা বিরতির প্রয়োজন। কাকভোরে কিংবা রাতেও সফর শুরু হতে পারে। মাঝেমধ্যে বিরতি নিলেও ১২-১৩ ঘণ্টায় পৌঁছোতে পারেন শিলিগুড়ি বা নিউ জলপাইগুড়ি। কলকাতা থেকে সড়কপথে শিলিগুড়ির দূরত্ব কম বেশি ৬০০ কিলোমিটারের মতো। পথে কোমর-পিঠের আড় ভাঙতে খানিক জিরিয়ে নিতে পারেন কৃষ্ণনগর, মালদহ কিংবা রায়গঞ্জে। চেখে নিতে পারেন কৃষ্ণনগরের সরপুরিয়া কিংবা মালদহের আমসত্ত্ব।
মানসে পাবেন বেঁকি নদী। ছবি:সংগৃহীত।
শিলিগুড়ি বা নিউ জলপাইগুড়িতে রাত্রিবাস করে পরের দিন প্রাতরাশ সেরে বেরিয়ে পড়ুন মানস জাতীয় উদ্যানের উদ্দেশে। আলিপুরদুয়ার, বঙ্গাইগাঁও, বরপেটা রোড হয়ে মানসের অরণ্য। দূরত্ব কমবেশি ৩৬০ কিলোমিটারের মতো। যাত্রাপথে কোথাও সঙ্গ দেবে চা-বাগিচা, কোথাও ছবির মতো সাজানো প্রকৃতির ক্যানভাস।
অসমে প্রায় ৯০০ বর্গ কিলোমিটার বিস্তৃত বিশ্ব ঐতিহ্যক্ষেত্র মানস জাতীয় উদ্যানে ৫৫টি প্রজাতির শ্বাপদ, প্রায় ৪০০ প্রজাতির পাখি, ৫০ রকম সরীসৃপ ও কয়েক ধরনের উভচরের দেখা মেলে। অরণ্যের প্রায় ২৫০ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে রয়েছে তৃণভূমি। মানসের তৃণভূমিতে একশৃঙ্গ গন্ডারের বাস। এ ছাড়াও রয়েছে রয়্যাল বেঙ্গল, চিতাবাঘ, সোয়াম্প ডিয়ার, হগ ডিয়ার, হিসপিড খরগোশ, পিগমি হগ, বুনো মোষ, বেঙ্গল ফ্লোরিকান ও হাতি। হাতির পিঠে চড়ে অরণ্যের শোভা উপভোগ এবং জঙ্গল সাফারির সুযোগ কিন্তু ছাড়া যাবে না। চাইলে স্থানীয় হোমস্টেগুলি সেই ব্যবস্থা করে দিতে পারে।
মানসের তৃণভূমি একশৃঙ্গ গন্ডারের বিচরণক্ষেত্র। ছবি:সংগৃহীত।
নিজস্ব গাড়ি নিয়ে গেলেও মানসের জাতীয় উদ্যানে সাফারির জন্য ভাড়া করতে হবে নির্দিষ্ট জিপসি। সঙ্গে সচিত্র পরিচয়পত্র থাকা বাধ্যতামূলক। মূলত বাঁশবারী, ভূঞাপারা, পানবারী প্রবেশদ্বার থেকে সাফারি হয়। বাঁশবারীতে হাতির পিঠে চেপে জঙ্গল ঘোরারও সুযোগ রয়েছে। তবে বাঁশবারী ও ভূঞাপারা রেঞ্জে অনলাইন এবং অফলাইন দুই ভাবেই জিপ সাফারি বুকিং করা যায়। আর পানবারী রেঞ্জে স্থানীয় নথিবদ্ধ ইকো-লজ, ট্যুর অপারেটর কিংবা ফরেস্ট গাইডের মাধ্যমে বুকিং করতে হয়। তিনটি রেঞ্জেরই একটি নির্দিষ্ট সাপ্তাহিক বন্ধের দিন থাকে— বাঁশবারী রেঞ্জ মঙ্গলবার, ভূঞাপারা বৃহস্পতিবার এবং পানবারী রেঞ্জ শুক্রবার পর্যটকদের জন্য বন্ধ থাকে।
মানসের জঙ্গলে গাড়িতে সাফারি। ছবি: সংগৃহীত।
মানসের অরণ্যসংলগ্ন স্থানে রাত্রিবাসের রোমাঞ্চই আলাদা। বন্যপ্রাণের দেখা মেলাটা কিছুটা কপালের ব্যাপার হলেও, অরণ্যের রূপ উপভোগের জন্যই মানসযাত্রা করা যায়। দু’টি রাত থাকুন মানসেই। কাছেই রয়েছে বেঁকি নদী। সেখানে নৌবিহার করতে পারেন।
ব্রহ্মপুত্রের উপরে রোপওয়ে। ছবি: সংগৃহীত।
পঞ্চম দিনে চলে আসুন গুয়াহাটি। মানস থেকে সড়কপথে ঘণ্টা তিন-চারেকেই পৌঁছে যাবেন। গুয়াহাটিতে সুবিশাল ব্রহ্মপুত্র নদের দেখা মিলবে। তারই মধ্যে একটি ছোট্ট দ্বীপে রয়েছে উমানন্দ মন্দির। নৌকো করে সেখানে পৌঁছে যান। ভারি মনোরম স্থলটি।
এখানে অবশ্য জুড়ে নিতে পারেন রোপওয়ে চড়ার অভিজ্ঞতা। মাত্র কয়েক বছর আগে এই রোপওয়ে চলাচল শুরু হয়েছে। সূর্যাস্ত দেখতে ব্রহ্মুপুত্রের বুকে ভেসে পড়া যায় ক্রুজ়ে। বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত তিন দফায় ক্রুজ চলে। পুজোর সময় টিকিট পেতে অসুবিধা হতে পারে। তাই আগাম অনলাইনেও বুকিং সেরে নিতে পারেন। ঘুরে নিতে পারেন কামাখ্যা মন্দির, বশিষ্ঠ মন্দির, ওয়ার মেমোরিয়াল-সহ আশেপাশের নানা দ্রষ্টব্য।
গুয়াহাটি শহর ভ্রমণ করে পরের দিন চলুন কামাখ্যা মন্দির। ৫১ শক্তিপীঠের একটি হল কামাখ্যা। অসমের গুয়াহাটির নীলাচল পাহাড়ের কোলের মন্দিরটিতে অম্বুবাচীতে বিশেষ উৎসব হয়। তবে দুর্গাপুজোয় এলেও নিরাশ হতে হবে না। কৃষ্ণানবমীতে কামাখ্যায় দুর্গাপুজো শুরু হয়। চলে দশমী পর্যন্ত।
কামাখ্যার মন্দির। ছবি:সংগৃহীত।
কামাখ্যা ঘুরে কলকাতা ফেরার পালা। ফিরতি পথে লম্বা সফরের ধকল এড়াতে রাত্রিবাস করতে পারেন আলিপুরদুয়ারে। চা-বাগিচা এবং সবুজের সমারোহ ভালই লাগবে। রাতটা এখানকার কোনও হোমস্টে-তে কাটিয়ে পরের দিন আবার যাত্রা। সফর দীর্ঘায়িত হলে যদি সমস্যা না হয়, তা হলে রায়গঞ্জ বা মালদহেও একরাত থেকে যেতে পারেন। সেখান থেকে ফেরার পথ ধরুন।
কোথায় থাকবেন?
মানস জাতীয় উদ্যানের আশেপাশে সরকারি, বেসরকারি থাকার জায়গা রয়েছে। একাধিক হোমস্টে মিলবে। গুয়াহাটিতে বিভিন্ন মানের হোটেল পেয়ে যাবেন। শিলিগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, মালদহ, রায়গঞ্জ, যে কোনও শহরেই জাতীয় সড়কের আশপাশে থাকার সুব্যবস্থা রয়েছে।
কী ভাবে যাবেন?
কলকাতা থেকে বারাসত-কৃষ্ণনগর-মালদহ-রায়গঞ্জ হয়ে নিউ জলপাইগুড়ি। দূরত্ব কম-বেশি ৬০০ কিলোমিটারের মতো। যেতে হবে ১২ নম্বর, তার পরে ২৭ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে। নিউ জলপাইগুড়ি থেকে মানস জাতীয় উদ্যানের দূরত্ব ৩২৬ কিলোমিটার ২৭ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে গেলে। শেষের দিকে পড়বে ৬ নম্বর রাজ্যসড়ক। বঙ্গাইগাঁও, বরপেটা রোড হয়ে রাস্তা গিয়েছে। মানস থেকে গুয়াহাটির দূরত্ব ১৩১ কিলোমিটার।