নীতেশ তিওয়ারির ‘রামায়ণ’-এর ট্রেলার মুক্তি পেতেই নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে তা নিয়ে। কোন অভিনেতাকে কোন চরিত্রে কতটা মানাচ্ছে, তা নিয়ে মতামত, তর্ক-বিতর্কের শেষ নেই।
‘রামায়ণ’ মহাকাব্যের নায়ক যদি রাম হন, খলনায়ক রাবণ। তিনি সীতাহরণকারী। তবে মহাকাব্য অনুযায়ী রাবণও শিবভক্ত। তিনি লঙ্কেশ্বর। সেই ‘লঙ্কা’ বর্তমানে শ্রীলঙ্কা বলেই বিশ্বাস অনেকের। তবে শ্রীলঙ্কায় নয়, মহাকাব্যের পটভূমি ভারতেরই বিভিন্ন জায়গায় রয়েছে রাবণের মন্দির। যেখানে তিনি বীর হিসাবে পুজো পান। তাঁর মৃত্যুতে শোকপালন হয়। জ্ঞানী হিসাবে শ্রদ্ধা করা হয় তাঁকে।
বিসরখ, উত্তরপ্রদেশ
বিসরখে রয়েছে শিবমন্দির। অনেকে রাবণমন্দিরও বলেন। ছবি:সংগৃহীত।
রামচন্দ্র রাবণকে হত্যা করে অন্যায়, অহংকারের বিনাশ করেছিলেন বলে বিশ্বাস। বিজয়াদশমীতে ভারতের নানা প্রান্তে রাবণের কুশপুতুল জ্বালিয়ে দশেরা পালন করা হয়। তবে উত্তরপ্রদেশের গ্রেটার নয়ডার কাছের বিসরখ গ্রামটিতে রাবণ অধর্মের প্রতীক নন। মনে করা হয়, এই গ্রাম রাবণের জন্মস্থান। এখানে মন্দিরে পূজিত হন রাবণ। নবরাত্রিতে রাবণের আত্মার শান্তি কামনা করা হয়, শিবযজ্ঞের আয়োজন করা হয়।
মনে করা হয়, রাবণের পিতা মহর্ষি বিশ্রবার নামানুসারে এই গ্রামের নাম প্রথমে ‘বিশ্বশ্রা’ এবং পরে পরিবর্তিত হয়ে ‘বিসরখ’ হয়েছে। এখানেই রাবণের শৈশব কেটেছে বলে স্থানীয়দের বিশ্বাস। গ্রামের কেন্দ্রস্থলে রয়েছে বিশ্বেশ্বর শিবমন্দির। কথিত আছে, এখানেই রাবণের পিতা তপস্যা করেছিলেন। এখানে রয়েছে, অষ্টকোণাকৃতি শিবলিঙ্গ।
কী ভাবে যাবেন: দিল্লি, নয়ডা, গাজ়িয়াবাদ থেকে সড়কপথে খুব সহজেই বিসরখে যাওয়া যায়।
মন্দসৌর, মধ্যপ্রদেশ
মন্দসৌরে রয়েছে রাবণের সুবিশাল মূর্তি। ছবি:সংগৃহীত।
অবস্থানগত দিক দিয়ে মধ্যপ্রদেশে হলেও, শহরটি রাজস্থানের সীমানায় অবস্থিত। রামায়ণ অনুসারে, প্রাচীনকালে এই স্থানটির নাম ছিল ‘দশপুর’, যা ছিল রাবণের পত্নী মন্দোদরীর বাপের বাড়ি। সেই সূত্রে রাবণ হলেন মন্দসৌরের জামাতা। ভারতের নানা প্রান্তে যখন দশেরার দিন রাবণের কুশপুত্তলিকা দাহ করে আনন্দ করা হয়, তখন মন্দসৌরে শোক পালিত হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা রাবণকে একজন পণ্ডিত, পরাক্রমশালী বীর এবং পরম শিবভক্ত হিসেবে শ্রদ্ধা এবং পুজো করেন। এখানে ৩৫ ফুট উঁচু রাবণের মূর্তি রয়েছে।
কী ভাবে যাবেন: উদয়পুর, ইনদওর বিমানবন্দর থেকে যাওয়া যায়। রতলাম জংশন, শামগড় স্টেশন থেকে সড়কপথেও যাওয়া যায়।
কাকিনাড়া, অন্ধ্রপ্রদেশ
শিবমন্দিরের সামনেই ভক্ত হিসাবে রাবণের বিশালকায় মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। ছবি:সংগৃহীত।
অন্ধ্রপ্রদেশের পূর্ব গোদাবরী জেলার কাকিনাড়ায় রয়েছে শিবের মন্দির। সেই মন্দিরের সামনেই ভক্ত হিসাবে রাবণের বিশালকায় মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। অন্ধ্রপ্রদেশের এই উপকূলীয় অঞ্চলটির সঙ্গে রাবণের শিবভক্তির কিংবদন্তি জড়িত। সমুদ্রের তীরে বেশ কয়েকটি মন্দির রয়েছে। মন্দিরের দেওয়ালে এবং চত্বরে রাবণের শিব আরাধনার দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মহাশিবরাত্রিতে এখানে বিশেষ পুজোপাঠ হয়।
কী ভাবে যাবেন: বিশাখাপত্তনম, বিজয়ওয়াড়া, রাজমুন্দ্রির মতো অন্ধ্রপ্রদেশের বড় শহরগুলি থেকে বাস পরিষেবা রয়েছে। সড়কপথে কাকিনাড়া পৌঁছোনো যায়।
বৈজনাথ মন্দির, হিমাচল প্রদেশ
হিমাচল প্রদেশের বৈজনাথ মন্দিরের সঙ্গেও জুড়ে শিবভক্ত রাবণের কাহিনি। ছবি:সংগৃহীত।
হিমাচল প্রদেশের কাংড়া জেলায় রয়েছে বৈজনাথ শিব মন্দির। ভারতের একটি তীর্থক্ষেত্র। গর্ভগৃহে রয়েছে শিবলিঙ্গ। ধৌলাধার পর্বতমালা ও বিনওয়া নদীর তীরে অবস্থিত এই মন্দিরটি কেবল নাগারা স্থাপত্যশৈলীর জন্যই নয়, বরং লঙ্কাধিপতি রাবণের শিবভক্তির সঙ্গেও গভীর ভাবে জড়িত। শিবভক্ত রাবণের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনে এখানে দশেরা পালিত হয় না। বরং রাবণের মৃত্যুতে এখানে শোক পালিত হয়।
কিংবদন্তি অনুসারে রাবণের ভক্তিতে তুষ্ট হয়ে শিব, তাঁর সঙ্গে যেতে সম্মত হন। শর্ত ছিল একটি, শিবলিঙ্গ যেখানে স্থাপন হবে, সেই স্থান ছাড়া কোথাও তা মাটিতে রাখা যাবে না। কিন্তু দেবতাদের কৌশলে একসময় রাবণ শিবলিঙ্গ মাটিতে রাখেন। সেই স্থানটি ছিল বৈজনাথ, সেই সময় নাম ছিল কিরাগ্রাম। শিব সেখানেই প্রতিষ্ঠিত হন। এই স্থান রাবণের ভক্তিক্ষেত্র। রাবণ এখানে শিবভক্ত হিসাবে বন্দিত।
কী ভাবে যাবেন: জায়গাটি কাংড়া এবং মন্ডীর মাঝে। পঠানকোট এবং মনালী, যে কোনও স্থান থেকেই সড়কপথে যাওয়া যায়।
গডচিরোলী, মহারাষ্ট্র
গডচিরোলীতেও বিশেষ সম্প্রদায়ের কাছে পূজনীয় রাবণ। ছবি:সংগৃহীত।
গডচিরোলী জেলার গোন্দ সম্প্রদায়ের সংস্কৃতিতে রাবণ কেবল রামায়ণের চরিত্র নন, বরং তিনি একজন মহান নেতা, ন্যায়পরায়ণ রাজা। তাঁদের কাছে রাবণ দেবতা হিসেবে পূজিত হন। রাবণ ছিলেন শিবভক্ত। আদিবাসীদের বিশ্বাস, রাবণ রাজা এবং তাঁর পুত্র মেঘনাদ বীর, প্রজ্ঞাবান শাসক। গোন্দদের ফাল্গুন উৎসবে পূজিত হন রাবণ।
কী ভাবে যাবেন: গডচিরোলী থেকে নাগপুরের দূরত্ব ১৮০ কিলোমিটার। নিকটবর্তী রেলস্টেশন হল চন্দ্রপুর।