Advertisement
E-Paper

তুমিও হেঁটে দেখো লন্ডন! অন্য রকম বিলেতভ্রমণের সন্ধান দিলেন সেখানে ঘর করা বাঙালিনি সাহানা

বাঙালি এখন গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে। যাঁরা নিজের দেশেই থাকেন, তাঁদের অনেকেও ছুটি কাটাতে দেশ-বিদেশে যান। বিলেত দেখতে ইচ্ছুক বাঙালি পর্যটকের জন্য নিজের মতো করে লন্ডন দেখার কথা ভাগ করে নিলেন লন্ডনবাসী বাঙালি শিল্পী।

সাহানা বাজপেয়ী

শেষ আপডেট: ২১ অগস্ট ২০২৬ ০৯:১১
সাহানা বাজপেয়ীর সঙ্গে পায়ে পায়ে লন্ডন।

সাহানা বাজপেয়ীর সঙ্গে পায়ে পায়ে লন্ডন। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

বেড়াতে যাওয়ার গপ্পো বলার সময়ে প্রথম প্রশ্ন এটাই হওয়া বাঞ্ছনীয়— আমি কি লন্ডনে বেড়াতে এসেছিলাম? ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে এক বার এসেছিলাম বটে। বাবা কাজে আর আমি বাবার লেজুড় হয়ে। স্মৃতি আবছা তার। তার পর বড় হয়ে এক বার আমাদের একসময়ের ব্যান্ড ‘বাংলার’ সঙ্গে গান গাইতে। কিছুই ঘুরে দেখিনি সেই সময়ে। তার পর শেষ যে এলাম, আর তেমন করে ফেরা হল না!

শাড়ি পরে লন্ডনের পথে।

শাড়ি পরে লন্ডনের পথে। — নিজস্ব চিত্র

আসলে লন্ডনে আমি পালিয়ে এসেছিলাম। ‘সোয়াস ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডন’-এর সাউথ এশিয়ান স্টাডিজ়ের স্নাতকোত্তর ছাত্রী হয়ে। সেটা আসলে ছিল একটা অছিলা। নিজের মনভাঙা থেকে, কোথাও একটা নিজের থেকেও পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা ছিল। যে সময়ে এলাম, সে সময়ে আমি বেশ কিছু বছর একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রী পড়িয়েছি। আমার ছাত্রী হওয়ার বিশেষ প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু পালানোর প্রয়োজন ছিল প্রবল। আর এই সুবিশাল শহর, আমার বাবার ছাত্রাবস্থার শহর আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল। এ কথা আমি নিশ্চিত করেই বলতে পারি!

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পাড়া হল ব্লুমসবেরি। তার একটা ছোট পার্কে গান্ধীজি আসীন। আর একটায় আমি থাকতে থাকতে এলেন রবীন্দ্রনাথ। এক বাড়ি যদি নীল প্লাক লেখা ভার্জিনিয়া উল্ফের, তো আর একটা টি. এস. এলিয়টের অফিস। যে রাস্তা দিয়ে রোজ হেঁটে ক্লাসে যাই, তার এক বাড়ি লেনিনের লন্ডনের বাসস্থান, তো আর এক বাড়িতে কবি শেলি ও তাঁর ততোধিক গুণী স্ত্রী মেরি শেলি থাকতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে ব্রিটিশ মিউজ়িয়াম। সাউথ এশিয়া সেকশনে ঢুকলেই গা জ্বালা করে। ভাই আনলি তো আনলি অমরাবতীর অর্ধেক তুলে আনলি? দেশীয় বন্ধু বোঝায়, ভাব তো, দেশে থাকলে এইগুলো টিকত? ভেঙে ভেঙে তো সব পাথরের বাড়ি বানাচ্ছিল। আর বাদবাকিটায় এস + বি করে করে প্রেমের ইস্তেহার খোদাই করা হত!

মনকে খানিক মলম দেওয়া কথা। তার পর ইজিপ্টের ঘরে গিয়ে দেখা যায় এমন যে, মনে হয় সব মমি ওখানেই। আজব জাতি রে ভাই!

কিন্তু এই আজব জাতির শহরই বাঁচিয়ে দিল আমাকে। বুঝিয়ে দিল— ওহে, তুমি কোনও হনু নও। তুমি আমাদের সকলের মতোই। দেখিয়ে দিল, চাইলেই নতুন করে জীবন শুরু করা যায়। যে যা খুশি পরে ঘোরো, সঙ্গীর হাত ধরে মাঝপথে ঠোঁটে চুম্বন এঁকে দাও, দিব্যি অনেক রাতে একা বাড়ি ফেরো— কোনও ভয় নেই।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পাড়া

বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছেই ‘স্কুব বুক্‌স’। পুরোনো বইয়ের দোকান। সেখান থেকে শেলিদের বাড়ির দিকে গেলে ‘এলজিবিটিকিউ’ সম্প্রদায়ের জন্য নিবেদিত একটি বইয়ের দোকান। আরও হাঁটলেই ব্রিটিশ লাইব্রেরি। সেখানে নানা পত্রিকার তুমুল সম্ভারের মধ্যে তত্ত্ববোধিনী ও বামাবোধিনীর প্রথম সংখ্যাগুলিও আছে। নতুন বানানো বাড়ি, আধুনিক স্থাপত্য, কিন্তু ঠিক লাগোয়া ১৮৬০-এর সময়ে বানানো বিশালাকার সেন্ট প্যানক্রাস বিল্ডিংয়ের সঙ্গে কোনও দ্বন্দ্ব নেই। দৃষ্টিকটু লাগে না। সেন্ট্রাল লন্ডনের যে কোনও অলি-গলিতে এরকুল পোয়ারো যে কোনও সময়ে হেঁটে আসতে পারেন। কিংবা ডিকেন্সের দেখা পাওয়া যাবে। গান্ধীজি আসীন যে ট্যাভিস্টক স্কোয়ারে, তার উল্টো দিকের বাড়িতেই তিনি থাকতেন।

‘সোয়াস ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডন’।

‘সোয়াস ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডন’। — নিজস্ব চিত্র

বোঝাই যায় না, হিটলার এই শহরটাকে গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন বোমার পর বোমা ফেলে। যুদ্ধের আগে যেমনটি ছিল, বাড়িঘর ঠিক তেমন করেই গড়ে নেওয়া হয়েছে। সামঞ্জস্যে বিচ্যুতি হয়নি। এটা সাহেবদের পক্ষেই সম্ভব। (না হলে সোনাঝুরি বনের একপাশে ক্যাটক্যাটে গোলাপি আর অন্যপাশে ক্যাটক্যাটে সবুজ রঙের বাড়িগুলির মতো বাড়ি উঠত! কেউ কিচ্ছু বলত না।)

থিয়েটারপাড়া

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়েই হাঁটা পথে চলে যাওয়া যায় থিয়েটারপাড়া কভেন্ট গার্ডেন (যেখানে আমাদের নিউ মার্কেটের মতোই অবিকল একটা বাজার আছে) আর লেস্টার স্কোয়্যারে। পথে পড়ে ডেনমার্ক স্ট্রিট। রাস্তা জুড়ে শুধু গানবাজনার যন্ত্রের দোকান সেখানে। লেস্টার স্কোয়্যারে বড় বড় সিনেমাহল। পার্কে মূর্তি বসেছে এখন শাহরুখ আর কাজলের। এক কোণে মিস্টার বিন। লেস্টার স্কোয়্যারের গায়ে চিনেপাড়া। ছাত্রাবস্থায় কমদামে ভরপুর খাওয়াদাওয়া করেছি সেখানে। সোজা হেঁটে চলে গেলেই ট্র্যাফলগার স্কোয়্যার। ওরে বাবা কত যে পর্যটক!

(বাঁ দিক থেকে) বেকার স্ট্রিট ও রাসেল স্ট্রিটের ঝলক।

(বাঁ দিক থেকে) বেকার স্ট্রিট ও রাসেল স্ট্রিটের ঝলক। — নিজস্ব চিত্র

এর ঠিক গায়েই ন্যাশনাল গ্যালারি। ১৩ থেকে ১৯ শতকের ইউরোপীয় চিত্রকর্মের বিশাল সংগ্রহ, যা একদিনে পুরো দেখা সম্ভব নয়। ভ্যান গঘের সূর্যমুখী তো আছেই। আরও অনেক কিছুই রাখা আছে সেখানে। তথৈবচ সেজান, মনে, ওদিকে দা ভিঞ্চি! ভিড়ে না ঢুকে চ্যারিং ক্রসের সিঁড়ি বেয়ে উঠে সোজা টেম্‌স নদীর উপর দিয়ে শুধু হাঁটার ব্রিজ। ওঠার মুখে বাঁ দিকেই থাকতেন রাডিয়ার্ড কিপলিং। ভাবতে থাকি— ভালই তো নদীর শোভা দেখতে দেখতে ব্রিটিশ ‘ইম্পেরিয়ালিজম’-এর জয়গান চলছিল! কিন্তু যেই না ফুটব্রিজে পা পড়ে, ও পারে দেখা যায় সাউথ ব্যাংক। ন্যাশনাল থিয়েটার, ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউট, কুইন এলিজ়াবেথ হল (তখনও জানি না এখানেই এক দিন গান গাইব কিংবা এখানেই মাঝবয়সের পিএইচডির কনভোকেশন হবে আর ওই বারান্দা থেকে মা-বাবার জন্য খুব কাঁদব। কারণ, আমি তো পড়াশোনা শেষ করেই মায়ের কাছে চলে যাব!) অমনি মন গলে যায়। ডান দিকে তাকালে পেল্লাই লন্ডন আই। ও দিকে ভাই যাব না! থিকথিকে ট্যুরিস্ট (যেন নিজে বিরাট লন্ডনবাসী!) ওই পারেই ‘বিগ বেন’, ‘হাউস অফ কমন্‌স’ এবং ‘হাউস অফ লর্ড্‌স’। আর বাংলায় ১৯৪৩-এর মন্বন্তরের কারিগর চার্চিল লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে। এক দেশের হিরো, অন্য দেশের ভিলেন। গান্ধীজির বদনাম করেছিলেন। ধুর কে যাবে!

(বাঁ দিক থেকে) ক্ল্যাপ্‌হ্যাম কমন পার্কে মেয়ে রোহিণীর সঙ্গে, ব্রিটিশ পার্লামেন্ট (হাউস অফ কমনস)।

(বাঁ দিক থেকে) ক্ল্যাপ্‌হ্যাম কমন পার্কে মেয়ে রোহিণীর সঙ্গে, ব্রিটিশ পার্লামেন্ট (হাউস অফ কমনস)। — নিজস্ব চিত্র

ব্রিজ পেরিয়ে বাঁ দিকের সিঁড়ি দিয়ে নেমে সোজা হাঁটা দিই ওয়াটারলু ব্রিজের তলায় পুরোনো বই, ছবি, পোস্টারের বাজারে। দেখি ব্রিজের গায়ে হঠাৎ ব্যাংকসি! আমি আর আমার নতুন বন্ধুরা, যারা আমাকে চেনে, বেশি বয়সে পড়তে আসা এক জন মাথায় খানিক ছিটওয়ালা মহিলা হিসেবে (তারা আমার তখনও আর কোনও পরিচয় জানে না)। সাউথ ব্যাংক ধরে হাঁটি। গ্লোব থিয়েটারে রাত জেগে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখি ‘এ মিডসামার নাইট্‌স ড্রিম’! এক দিন এমনি হাঁটতে হাঁটতে খুঁজে পাই লাইসিয়াম ট্যাভার্ন। কিংস কলেজের মোড়ে লাইসিয়াম থিয়েটারের পাশে যেখানে ব্র্যাম স্টোকার, শোনা যায়, ড্রাকুলা লিখেছিলেন। হাইড পার্ক ধরে হাঁটি। সার্পেন্টাইন গ্যালারিতে দেখি, যদি বিনামূল্যে ঢুকতে পারার মতো কোনও প্রদর্শনী চলছে কি না।

বাংলা টাউন

একদিন এক বাংলাদেশি বান্ধবীর ঠেলাঠেলিতে চলে গেলাম পূর্ব লন্ডনের বাংলাটাউন ব্রিক লেন। আলতাব আলি পার্কের শহিদ মিনার, ব্রিক লেনের অভিবাসীদের বর্ণবৈষম্যের ইতিহাস, যাদের বার বার বর্ণবাদী গোষ্ঠীর আক্রমণ ও বৈষম্যের মুখোমুখি হতে হয়েছে। একটা বাড়ির চার্চ থেকে সিনাগগ ও তার থেকে মসজিদ হয়ে ওঠার গপ্পো। অভিবাসীদের সহাবস্থানের গপ্পো। ব্রিক লেন জুড়ে অসংখ্য গ্রাফিতি। বেশির ভাগই রাজনৈতিক। ছোট সিলেটি দোকান ‘ক্যাফে গ্রিল’। এমন মাগুর মাছের ভর্তা, চিতল মাছ, কাচ্চি বিরিয়ানি খেলাম যে আঠারো বছর ধরে সেই ট্র্যাডিশন চলেছে। এখন ব্যাপারটা এমনই দাঁড়িয়েছে যে, “আপা আজকে রোহিণীকে আনলেন না? ওর জন্য কিছু বাসায় নিয়ে যান,” বলে বেরোনোর সময়ে এক বাক্স খাবার আর মিষ্টি দই রোহিণীর জন্য উপহার।

পূর্ব লন্ডনের বাংলাটাউন ব্রিক লেন।

পূর্ব লন্ডনের বাংলাটাউন ব্রিক লেন। — নিজস্ব চিত্র

এই হল আমার ‘তুমিও হেঁটে দেখো লন্ডন’ বেড়ানোর গপ্পো। রোজ রোজ কত নতুন জিনিস আবিষ্কার করি। টুকুস করে ছবি তুলে বন্ধুদের পাঠাই। কখনও লিখি, “দেখ, এই বাড়িতে জিমি হেনড্রিক্স এসে কিছু দিন ছিলেন!” কখনও আবার, “দেখ, এই বাগানে কেমন উইস্টেরিয়া ফুটেছে,” বা “দেখ, এই বাড়িতে জিমি পেজ থাকেন।” এই শহরটা তার পুরো ওম দিয়ে আমাকে জড়িয়ে রেখেছে। মাঝেমাঝে অভিমান হয়। মৌসুমিদির ‘বাড়ি কোথায়’ শুনে কান্না পায়। কারও কারও হয়তো পালিয়ে এসে আর ফেরা হয় না। তাতে কারই বা কী ক্ষতি হয়!

ব্রিক লেনের আঁকিবুঁকি।

ব্রিক লেনের আঁকিবুঁকি। — নিজস্ব চিত্র

লন্ডনে আমি আসলে পালিয়ে বেড়াতেই এসেছিলাম। এখনও পালিয়েই বেড়াচ্ছি। প্যাডিংটন ভালুকের মতো হাঁ করে দেখেই চলেছি আর ভালবেসেই চলেছি এই চমৎকার শহরটাকে।

(লেখক সঙ্গীতশিল্পী এবং শিক্ষিকা)

Sahana Bajpaie London Diary

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy